২৩ অক্টোবর ২০১৯

ডাণ্ডাবেড়ি পরানো অমানবিক

ডাণ্ডাবেড়ি পরানো অমানবিক - ছবি : সংগ্রহ

ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালত কক্ষে কোনো আসামিকে হাজির করা যাবে না বলে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে কারাগার থেকে আদালতে আনা-নেয়ার সময় ডাণ্ডাবেড়ি পরানো যাবে বলে মত দিয়েছেন আদালত। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান এবং বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ ১৪ মার্চ ২০১৭ তারিখে এ আদেশ দেয়ার পর তৎকালীন ডিআইজি প্রিজন মো: তোহিদুল ইসলাম আসামিদের ডাণ্ডাবেড়ি পরানোর ঘটনায় নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পরে আদালত তাকে সতর্ক করে অব্যাহতি দেন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বাধ্যতামূলক কার্যকরতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, আপিল বিভাগের ঘোষিত আদেশ হাইকোর্ট বিভাগের জন্য এবং সুপ্রিম কোর্টের যেকোনো বিভাগের ঘোষিত আদেশ অধঃস্তন সব আদালতের জন্য অবশ্য পালনীয় হবে। এবার আসল কথায় আসি। আমাদের সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, ‘কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর অমানুষিক বা লাঞ্ছনারকর দণ্ড দেয়া যাবে না কিংবা কারো সাথে কোনোরূপ নির্দয় আচরণ করা যাবে না। সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। আইনানুযায়ী ছাড়া জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না কিংবা কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে এমন কাজ করা যাবে না। আইনসম্মত নিরপেক্ষ আদালতের প্রকাশ্য বিচার ছাড়া কাউকে কোনো ধরনের শাস্তি দেয়া যাবে না।’

বাংলাদেশের কারাগারে বন্দীদের শাস্তির জন্য ডাণ্ডাবেড়ি এবং আড়–য়াবেড়ি নামে দুটি লোহার যন্ত্রের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ডাণ্ডাবেড়ি হচ্ছে বন্দী বা বিচারাধীন অভিযুক্ত ব্যক্তির পায়ে মোটা লোহার রিং পরিয়ে তাতে শেকল এঁটে তা ওই বন্দির হাতে ধরিয়ে দেয়া। জেল কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট করে দেয়া সময় পর্যন্ত তাকে এটি পড়ে থাকতে হয়। ওঠা, বসা, হাঁটা, চলা, ঘুমানো সবই এ বেড়ি পরে করতে হয় ওই বন্দির।

আড়–য়াবেড়ি হচ্ছে যারা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে অবাধ্য তাদের দু’পায়ে রিংয়ের সাথে একটি এক ফুট লম্বা লোহার রড লাগিয়ে দেয়া হয়। এর ফলে বন্দি দু’পা একত্রে করতে পারেন না। তাকে হাঁটতে হয় দু’পা ফাঁক করে, ঘুমাতে হয় চিৎ হয়ে বা উপুড় হয়ে। এর নাম আড়ুয়াবেড়ি। শাস্তির নামে, বিচারের নামে কী বর্বর নির্যাতন চলে মানুষের ওপর।
ডাণ্ডাবেড়ি এবং আড়–য়াবেড়ি বিষয়ে আইনে কী বলা আছে, তা দেখে নেয়া যাক। জেলের ভেতর কেউ অপরাধ করলে তার নিষ্পত্তির নিয়ম রয়েছে জেল কোডের ১৯ নম্বর অধ্যায়ে। এ অধ্যায়ের ৭০৮ নম্বর বিধান অনুযায়ী, জেলের মধ্যে কেউ অপরাধ করলে জেল সুপারিনটেনডেন্ট ১১ ধরনের লঘু ও ১১ ধরনের গুরুতর শাস্তি দিতে পারেন। গুরুতর শাস্তির মধ্যে রয়েছে সব বন্দী থেকে আলাদা করে কাউকে সাত দিনের জন্য কোনো সেলে আটক রাখা, ৩০ দিনের জন্য ডাণ্ডাবেড়ি পরানো ইত্যাদি। অপরাধী সাব্যস্তকরণের কোনো সাবলীল নিয়ম নেই। কর্তার ইচ্ছায় এখানে কর্ম। সুপারিনটেনডেন্ট যাকে অপরাধী মনে করবেন, তিনিই অপরাধী। আবার জেলে হাজার অপরাধ করলেও অপরাধ হবে না।

তবে জেল কোডের ৭০৮ নম্বর বিধান অনুযায়ী বিচারাধীন আসামি বা রাজবন্দীদের এ ধরনের গুরুদণ্ড দেয়া যায় না। কারণ ৭০৮ নম্বর বিধানটি কেবল সাজাপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু আমাদের সংবিধান যেখানে মানুষকে নির্মম ও হিংস্র শাস্তি দেয়ার বিপক্ষে; সেক্ষেত্রে কিছু ক্যাটাগরির জেল বন্দীদের হাতকড়া এবং ডাণ্ডাবেড়ি পরানো সম্পূর্ণ সংবিধানবিরোধী।

জাতিসঙ্গের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ কারাবন্দীদের জন্য রাষ্ট্রের তরফ থেকে অনুসৃত যে ন্যূনতম নীতিমালা তৈরি করেছে; সেখানকার ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদে ডাণ্ডাবেড়ি পরানো অমানবিক বলা হয়েছে। বাংলাদেশে বন্দীদের কাছ থেকে শুধু টাকা আদায়ের জন্যও ডাণ্ডাবেড়ি পরানোর অভিযোগ রয়েছে। সাধরণত, একসাথে তিন মামলার আসামি হলে তাকে আদালতে নেয়া হয় ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে। এখানেও আছে বৈষম্য। ৩ মামলা কেন ৩০ মামলার অভিযুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরও বেশির ভাগ সময় জামাই আদরে আনা-নেয়া করা হয়। কারাগারেও তারা থাকে জামাই আদরে।

ন্যায়বিচার এমন একটি শব্দ, যার সাথে কিছু বিষয় নিবিড়ভাবে জড়িত যে, এর যে কোনো একটির ব্যত্যয় হলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না। মার্কিন মানবতাবাদী মার্টিন লুথার কিং বলেছেন, ‘যে কোনো জায়গায় অবিচার ঘটলে; তা সব স্থানের বিচারকে হুমকিতে ফেলে। ফরাসি দার্শনিক আঁনাতোলে ফ্রান্স বলেছেন, ‘আইন যদি সঠিক হয়; তাহলে মানুষও ঠিক হয়ে যায় কিংবা ঠিকভাবে চলে।’ আমাদের বিচারব্যবস্থায় বিদ্যমান চরম দুরবস্থায় উপরোল্লিখিত দু’টি উক্তি প্রণিধানযোগ্য।

দুনিয়ার এমন কোনো সভ্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে না; যেখানে আইনের বিকাশ হয়নি। সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে আইনেরও আমূল পরিবর্তন হয়েছে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে আইন কার্যকারিতা হারায়। প্রয়োজন হয় সে আইনকে সময় উপযোগী করে তোলার। গঠনমূলক সমালোচনার মধ্যে আইন অস্তিত্বের সন্ধান পায়। আমাদের পুরো আইনব্যবস্থায় রয়েছে ব্রিটিশদের শঠতার ছোঁয়া। ব্রিটিশ নিজেদের দুষ্কর্ম ঢাকতে আইনব্যবস্থার প্রবর্তন করে। তৎকালীন ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল ১৭৭২ সালে আইনব্যবস্থার গোড়াপত্তন করে তিনি সর্বপ্রথম আইন ভঙ্গ করেন। তার অধস্তন কর্মচারী জার্মান চিত্রশিল্পীর পরমা সুন্দরী স্ত্রীকে দাঁড়িপাল্লায় বসিয়ে স্বর্ণের দামে খরিদ করেছিলেন। আজকের আদালতে ব্যবহৃত ন্যায়বিচারের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা তিনিই প্রথম অনৈতিক কাজে ব্যবহার করেন। মূলত ব্রিটিশ আইন তৈরি করেছিল শাসন শোষণের জন্য, দরিদ্র কৃষকের জমির খাজনা আদায়ের জন্য কিংবা প্রজাকে কাচারিতে ধরে নিয়ে মারধর, হাত-পা বেঁধে আঁধার কুঠুরিতে ফেলে রাখা, প্রজার স্ত্রী-কন্যাকে বন্ধক হিসেবে আটক রাখা, বিষয় সম্পত্তি ক্রোক করা এবং ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা। ডাণ্ডাবেড়ির অমানবিকতা এখনো সেই উত্তরাধিকার বহন করছে মাত্র।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
Email: [email protected]


আরো সংবাদ