২৩ অক্টোবর ২০১৯

নেতানিয়াহুর কর্তৃত্বের অবসান ঘটাতে হবে

নেতানিয়াহুর কর্তৃত্বের অবসান ঘটাতে হবে - ছবি : সংগ্রহ

ইসরাইলের ১৯৪৮ সালের এলাকায় বসবাসরত ফিলিস্তিনিরা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা নেতানিয়াহুর ভীতি প্রদর্শন ও ঘৃণার রাজনীতি এবং গত দশকের অসাম্য ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। গত গ্রীষ্মে নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছিলেন, ১৯৪৮ সালের এলাকার ফিলিস্তিনিরা ‘সরকারিভাবে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হবে।’ ন্যাশন স্টেট ’ল পাস করার পর নেতানিয়াহু ইন্সটাগ্রামে লিখেছিলেন, ‘ইসরাইল সব নাগরিকের রাষ্ট্র নয়’। আমরা যে মৌলিক নাগরিকত্ব আইন পাস করেছি, সে অনুযায়ী ইসরাইল হচ্ছে ‘ইহুদি জাতির রাষ্ট্র এবং কেবল এটা ইহুদিদেরই রাষ্ট্র।’

ইসরাইল সরকার আমরা যারা ১৯৪৮ সালের এলাকার ফিলিস্তিনি, তাদের প্রত্যাখ্যান করার জন্য সব কিছু করেছে। কিন্তু আমাদের প্রভাব ক্রমেই কেবল বেড়েছে। আমরা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছি। ১৯৪৮ এলাকার ফিলিস্তিনিরা এককভাবে ইসরাইলে পরিবর্তন আনতে পারবে না। তবে আমাদেরকে ছাড়া এ দেশে পরিবর্তন অসম্ভব। এর আগে যুক্তি দেখিয়েছি যে, ইসরাইলের মধ্য-বাম দলগুলো যদি মনে করে এ দেশে ১৯৪৮ এলাকার ফিলিস্তিনিদের জায়গা আছে তা হলে তাদের অবশ্যই মেনে নিতে হবে; ‘রাজনীতিতেও তাদের (ফিলিস্তিনিদের) স্থান আছে।’

বর্তমানে ওই সব দলের তেমন কোনো পছন্দ নেই। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ১৯৪৮ এলাকার ফিলিস্তিনিদের অন্তত ৬০ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। আরব ও আরব-ইহুদি পার্টিগুলোর সমন্বয়ে গঠিত আমাদের জোট ‘জয়েন্ট লিস্ট’ এবার নির্বাচনে ১৩টি আসনে জয়লাভের মাধ্যমে নেসেটে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইসরাইলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, সে ব্যাপারে আমরা সিদ্ধান্ত নেবো। নেতানিয়াহুকে আরেক মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হওয়া থেকে বিরত রাখার জন্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে সহায়তা করার ক্ষেত্রে এটা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে অবশ্যই তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে।

অপরদিকে বেনিগান্টজ ভবিষ্যতের ব্যাপারে আমাদের বৈধ রাজনৈতিক দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সে ব্যাপারে আমরা সচেতন রয়েছি এবং ওই কারণে আমরা তার সরকারে যোগ দেব না।

আমাদের অধিকার এবং সমান ভবিষ্যতের বিষয়টি সুস্পষ্ট। আবর শহরগুলোতে যে ভয়াবহ অপরাধ সঙ্ঘটিত হচ্ছে, সে ব্যাপারে আমরা কথা বলতে চাই। আরব পৌরসভার ইহুদিদেরকে গৃহায়ন এবং পরিকল্পনা আইন অনুযায়ী যেসব সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে, ফিলিস্তিনিদেরও সেসব সুবিধা দিতে হবে এবং আরব পৌরসভার হাসপাতালগুলোতেও তাদের প্রবেশাধিকার তথা চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। আমরা ইসরাইলে বসবাসরত সবার জন্য পেনশন দাবি করছি। এতে করে আমাদের প্রবীণরা মর্যাদার সাথে বসবাস করতে পারবেন। মহিলাদের সহিংসতা থেকে রক্ষার জন্য আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ ও তহবিল গঠনের দাবি জানাচ্ছি। আমরা স্বীকৃতি না পাওয়া অধিকাংশ ফিলিস্তিনি আরব গ্রাম ও শহরকে আমরা আইনগতভাবে একীভূত করতে চাই। ওইসব জায়গায় এখনো বিদ্যুৎ অথবা পানির সুবিধা নেই।

১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দখলদারিত্বের অবসান ঘটানোর জন্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে আমরা ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সরাসরি আলাচনা শুরু করার ওপর জোর দিচ্ছি।

জাতিরাষ্ট্র আইনের মাধ্যমে আমাকে, আমার পরিবার পরিজন এবং একপঞ্চমাংশ জনসংখ্যাকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করার যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, আমরা তা বাতিল করার আহ্বান জানাই। দশকের পর দশক ধরে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীরা সাম্যের বিষয়কে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এই কারণে ১৯৯২ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো আরব বা আরব ইহুদি পার্টি থেকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্যে কাউকে সুপারিশ করা হয়নি।

এখন আমরা ভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ১৯৪৮ এলাকার ফিলিস্তিনিদের আর বেশি দিন প্রত্যাখ্যান বা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এই দেশের ভবিষ্যৎ হবে সবাইকে নিয়ে। আর ফিলিস্তিনিদের পরিপূর্ণ এবং সমান অংশগ্রহণ ব্যতীত ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড চলবে না।

ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করা ‘ন্যাশনাল স্টেট’ আইনটি পাস হওয়ার পর আমার শিশু সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাই এবং ভাবতে থাকি, তাদের এমন একটি দেশে গড়ে তুলেছি যেখানে ‘১৯৪৮ এলাকা’র ফিলিস্তিনিদের বারবার প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। ইসরাইলে আরবদের ওপর সামরিক আইন বলবৎ করার পর থেকে বারবার ফিলিস্তিনিদের প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের সংস্কৃতিকে দাবিয়ে রাখার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। পশ্চিম তীর ও গাজায় বসবাসরত আমাদের ভাই ও বোনদের ভূমি দখল করার সিদ্ধান্ত অব্যাহত রাখা হয়।

আমার কনিষ্ঠ মেয়ে শামকে সবসময় স্কুলে নিয়ে যাই। The Book of Psalms থেকে নেয়া একটি বক্তব্য আমি দেয়াল লিখনে দেখতে পেলাম : নির্মাতারা যে পাথরটি প্রত্যাখ্যান করেছে, সেটাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।’

নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, মিথ্যাচার ও ভীতিকর শাসনের অবসান হতে দেখলে ইসরাইল এবং বিশ্বব্যাপী অসংখ্য মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। অধিকতর ভালো, সাম্য ও সমতাভিত্তিক ভবিষ্যতের জন্য আমরা নিজেদের কাজ অব্যাহত রাখব। ফিলিস্তিনি হিসেবে আমাদের জাতীয় পরিচিতিতে যে বীজ প্রোথিত রয়েছে, তার চেতনা থেকে আমরা নাগরিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাবো। মাতৃভূমির হিস্যা পাওয়ার ব্যাপারে আমাদের সবার অনেক সুযোগ রয়েছে। মাহমুদ দারবিশের কবিতায় এবং আমাদের দাদা, নানা তথা পূর্বপুরুষদের গল্প ও কাহিনীতে আমাদের পরিবারের জন্য সাম্য, সমান অধিকার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি জানানোর রয়েছে অনেক সুযোগ।

লেখক : আরব জয়েন্ট লিস্টের প্রধান ও নেসেটের সদস্য
নিউ ইয়র্ক টাইমস নিউজ সার্ভিস থেকে ভাষান্তর
মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

 


আরো সংবাদ