১৭ নভেম্বর ২০১৯

নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে করণীয়

নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে করণীয় - ছবি : নয়া দিগন্ত

আমরা পারিবারিক অশান্তি বা সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ যেখানে- সেখানে সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক বা বিশ্ব নিয়ে ভাবার সুযোগ কোথায়? তবে কিছু মানুষ অবশ্যই ভাবছেন সীমিত বিষয় নিয়ে। বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা তাই বলে। অথচ তাকালেই দেখি ধ্বংস, ক্ষয় আর নির্মমতার ঘটনাবহুল দিন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উন্নতিও রক্ষা করতে পারছে না মানুষ নামের প্রাণী ও তার আবাসভূমিকে ধ্বংস, ক্ষয় আর চরম নির্মমতার হাত থেকে। আমরা প্রতিনিয়ত পৈশাচিক আর হৃদয়বিদারক ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি। সমাজ অভ্যন্তরে চলছে গভীর সঙ্কট। নীতি আদর্শ এবং মূল্যবোধ হারিয়ে মানুষ হয়ে উঠেছে জাহেলিয়া যুগের পশুবৃত্তি ও জিঘাংসাপ্রবন। খুন, গুম, অনৈতিক কর্মকাণ্ড মানবতাকে পদদলিত করে চলেছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুর প্রতি নৃশংসতা ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে।

মানুষকে বলা হয় ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা জীব। তাই মানুষের আচরণ হওয়া উচিত অন্যান্য জীবের চেয়ে স্বতন্ত্র। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন, ‘আমি মানব জাতিকে সম্মানিত করে সৃষ্টি করেছি’। অথচ সে মানুষই আজ দানবের মতো আচরণ করছে। দেশের কোথাও না কোথাও হত্যা, ধর্ষণ, ইভটিজিং ও আত্মহননের ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হারে ঘটে চলেছে। তুচ্ছ ঘটনায়ও মানুষ খুন হচ্ছে, খুন হচ্ছে আদালত কক্ষে বিচারকের সামনে। অর্থাৎ কে, কখন, কোথায় হত্যার শিকার হবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। হত্যার পাশাপাশি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে ধর্ষণ। ধর্ষকদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না ছয়-সাত বছরের মেয়েশিশু কিংবা ছয় মাসের কোলের শিশু। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে মোট ৪৯৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আইন ও সালিস কেন্দ্রের নিয়মিত মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৬৩০টি। ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টায় শিশু হত্যার ঘটনা ঘটে ২১টি। ধর্ষণের শিকার শিশুদের মধ্যে বেশির ভাগ শিশুর বয়স সাত থেকে ১২ বছরের মধ্যে। বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০১৮ সালে সারা দেশে ৪৩৩টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের কারণে একই বছর প্রাণ হারায় ২২ শিশু। এ ছাড়াও ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয় ৫৩ শিশুর ওপর। যৌন নির্যাতনে একটি শিশু মারা যায়। ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, হত্যা ও শারীরিক নির্যাতনে মারা গেছে ২৭১ শিশু। বিভিন্নভাবে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে আরো এক হাজার ছয়জন।

যে বয়সে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সে তাদের দেখা যায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জরিপ মতে, কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ ৪৫ ধরনের কাজের মধ্যে ৪১ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুরা কর্মরত। পেটের দায়ে শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে থাকলেও ছোটখাটো ভুলের জন্য নির্যাতনের শিকার হতে হয়। বিশ্ব বরেণ্য বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘সমাজ কিভাবে শিশুদের প্রতি আচরণ করে তার মধ্য দিয়ে সমাজের চেহারা ফুটে উঠে’। বর্তমানে আমাদের সমাজে যে ধরনের নিষ্ঠুরতা ও যৌন উন্মাদনা চলছে, তা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। নারী ও শিশুদের ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বেড়েই চলেছে। যেভাবেই ধর্ষণ হোক না কেন, তা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী কারো ইচছার বিরুদ্ধে, সম্মতি ছাড়া, ভয় প্রদর্শন করে, প্রতারণার মাধ্যমে এবং ১৪ বছরের কম বয়সী বালিকার সাথে সহবাস করলে (ব্যক্তি বা দল) ধর্ষণ করেছে বলে গণ্য হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর ৯ ধারা মোতাবেক, ধর্ষণের ফলে যদি কোনো নারী বা শিশুর মৃত্যু হয়, তাহলে ধর্ষণকারীর জন্য রয়েছে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। উপরন্তু কমপক্ষে এক লাখ টাকার অর্থদণ্ড। দলগতভাবে নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে ধর্ষণকালে কিংবা ধর্ষণের পর মৃত্যু হলে তবে ওই দলের সবাইকে উল্লিখিত শাস্তি ভোগ করতে হবে। কেউ ধর্ষণের চেষ্টা করলে তার জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর এবং সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের কারাদণ্ডসহ অতিরিক্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবুও দুর্বৃত্তরা ক্ষান্ত হচ্ছে না। আইন ও সালিস কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে তিন হাজার ৫৮৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে পুলিশ সদর দফতরে মামলা হয়েছে ১৯ হাজারের অধিক। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১১টি ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে। তবে আসামিদের মাত্র তিন শতাংশের সাজা হয়েছে। শাস্তির আওতায় আসা আসামিদের এ সামান্য হারেই ধর্ষকদের বেপরোয়া করে তুলছে বলে বিজ্ঞজনদের অভিমত।

গত ১২ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, ‘অনেক ঘটনাই নতুন আরেক জঘন্য ঘটনার চাদরে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। কেবল সেই সব জঘন্য ঘটনার বিচার হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে যেগুলোর ব্যাপারে একযোগে মিডিয়া, সরকার ও সুশীলসমাজ সমানভাবে সোচ্চার হচ্ছে। গণমাধ্যম সোচ্চার হলে প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ দৌড়ঝাঁপ করে, কিন্তু বেশির ভাগ ঘটনা ওভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে না। এ ধরনের ঘটনার সাথে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও ক্ষমতার রাজনীতির সংযোগ রয়েছে। আজ অত্যন্ত বেদনাদায়ক এক ভয়াবহ সময়ে আমরা উপনীত হয়েছি। ঢাকাসহ দেশের সব শহরের অলিতে গলিতে বিশেষত রেললাইনের আশপাশে হতাশা, বেকারত্ব, অসৎ সঙ্গ ও পারিবারিক অশান্তির কারণে মানুষ নেশায় আচ্ছন্ন। ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য টেকনাফ এবং পার্বত্যাঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ঢুকে পড়ছে। যার ফলে ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী খুন-গুমের মতো অন্যান্য অপরাধ বেড়ে চলেছে।

সূরা আল কেয়ামায় মহান আল্লাহ সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, ‘মানুষ কি মনে করে যে, তাকে এমনি বেহিসাব ছেড়ে দেয়া হবে’? ‘আহকামুল হাকেমিন’ সর্বাবস্থায় শ্রেষ্ঠ বিচারক। এ বোধ, জ্ঞান ও অনুভূতি যার অন্তরে সে ধর্ষণ, খুন, গুম, অন্যায়, অবিচার করতে পারে না। পারে না নীতিশূন্য হতে। অন্য দিকে আল্লাহ ভীতি যার অন্তরে নেই, পরকালে জবাবদিহিতার ভয় নেই তার কাছে তো সুনীতি-দুর্নীতি, ন্যায়-অন্যায় কিংবা ভালো-মন্দ সমান। ওই যে পরকালের জবাবদিহিতার ভয়ে মানুষ অপকর্ম পরিহার করে, তাই ধর্ম। কেন না, কোনো ব্যক্তি যদি চিন্তা-চেতনা, বোধ-বিশ্বাস, আচার-আচরণে পরকালের সংশ্লিষ্টতা রাখেন, তাহলে সে ধর্মহীন হতে পারে না। ধর্ম মানুষের আদিমতম আইন, ধর্মই মানুষকে নীতিশূন্য হতে বাধা দেয়। সুতরাং সময় থাকতে আমাদের পাঠশালা, বিদ্যানিকেতন সর্বত্র নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর তালিম বা শিক্ষাদান করলে শিশু ও নারীর ওপর পাশবিকতা বা নির্যাতন অবসানের আশা করা যায়।


আরো সংবাদ