২৩ নভেম্বর ২০১৯

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বাংলাদেশ

-

এ দেশে কোনো সাম্প্রদায়িক বৈষম্য নেই। যদি থাকত তাহলে প্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারি সব স্তরের চাকরিতে ৩০ শতাংশ পদে নিয়োগের সুযোগ সংখ্যালঘুরা পেতেন না। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সাথে সমান সুযোগ পেয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চাকরি পেয়েছেন। যদি কোটা থাকত, তাহলে তারা এত সুযোগ পেতেন না। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। শুধু সরকারি চাকরি নয়, বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও একইভাবে সংখ্যালঘুরা সমানভাবে সুযোগ পাচ্ছেন। আবার ব্যবসায় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তারা স্বাধীনভাবে ব্যবসায় করছেন। বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়, তথা মুসলমানেরা যদি বিজেপির উগ্র হিন্দুদের মতো হতেন, তাহলে এত সুযোগ-সুবিধা দেয়া তাদের ক্ষেত্রে দুষ্কর হয়ে পড়ত। কাজেই এমন উদার সাম্প্রদায়িকতার দেশ বর্তমান বিশ্বে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে কি?

ভারত নিজেকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ ভাবে, সেখানে কি সরকারি চাকরিতে সংখ্যালঘু মুসলমানেরা এত সুযোগ সুবিধা পায় কিংবা এর কল্পনা করতে পারেন? কিংবা প্রথম শ্রেণীর নাগরিকের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন? বাস্তবতা তো এই, ভারতের মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণী বা তারও নিচে গণ্য করা হয়। সে দেশের নাটক সিনেমাগুলোয় মুসলমানের চরিত্রগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, সেখানে মুসলমানদের কিভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সাধারণত নিচু স্তরের কর্মচারী, না হয় সন্ত্রাসী হিসেবে দেখানো হয়। অন্য দিকে, বাংলাদেশের মতো সংখ্যালঘুদের ওপর রাজনৈতিক বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে কদাচ হামলা হলে তাদের পাশে যেভাবে সুশীল ও সচেতন নাগরিকরা দাঁড়ায়, তা ভারতে দেখা যায় না। সেখানে ধারাবাহিকভাবে মুসলমানদের ওপর হত্যা, নিপীড়ন, হামলা, জবরদখল, নির্যাতন, জোর করে হিন্দু বানানোর অপচেষ্টা চলছে, তার বিরুদ্ধে সুশীল ও সচেতন নাগরিকরা কি দাঁড়াচ্ছেন বা প্রতিবাদ করার সাহস ও সুযোগ পাচ্ছেন? মুসলমানদের ওপর গরু জবাই এবং গোশত রাখা নিষিদ্ধ করার মতো বিধিনিষেধ আরোপিত হয় ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে। কিন্তু বাংলাদেশের কোথাও হিন্দুদের জোর করে মুসলমান করা কিংবা কোথাও হিন্দুদের জোর করে গরুর গোশত খাওয়ানোর ঘটনা ঘটেনি? বাংলাদেশে হাজার বছর ধরে সব ধর্মের মানুষ পাস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করে আসছে। পারস্পরিক দুঃখ-কষ্টে এবং আনন্দ-বেদনায় শামিল হয়ে আসছে। মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যই হলো, তারা একসাথে চলতে চলতে অনেক সময় ঝগড়াঝাটিতে লিপ্ত হয়। তার অর্থ এ নয়, তারা চির বৈরী হয়ে যায়। ঝগড়া শেষে আবার একত্রে বসবাস করে। সব ধর্মের মানুষ নিয়ে আমাদের বাংলাদেশের চিরায়ত সামাজিক বৈশিষ্ট্য এটাই। আমরা বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি, হিন্দু-মুসলমান একসাথে বসবাস করার সময় কেউ কারো সাথে দুর্ব্যবহার করতে দেখেনি। বরং হিন্দু বাড়ির লোকজন ব্যবসায় বাণিজ্য করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে। গ্রামে গ্রামে শুধু হিন্দু বাড়ি নয়, উচ্চবর্ণের হিন্দুদের বসবাস রয়েছে। কেউ কেউ কালচক্রে স্বেচ্ছায় ভারতে পাড়ি দিয়েছেন।

তাদের বাড়ি উত্তরাধিকার সূত্রে বহালতবিয়তে রয়ে গেছে। কেউ জোরপূর্বক দখল করা সহজ নয়। মাঝে মধ্যে দেশের কোনো কোনো এলাকায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার যে অভিযোগ ওঠে, তা স্থানীয় অসৎ দুষ্টচক্রের কাজ। কোনো বিবেকবান লোক এ কাজ কোনো দিন সমর্থন করতে পারেন না। এটা সামাজিক ও প্রশাসনিক সহায়তার মাধ্যমে দমন করা যায়। আর এটা এমন দেখা যায় না যে, তা বছরের পর বছর অবাধে চলতে থাকে। এ ব্যাপারে সরকার রয়েছে কঠোর অবস্থানে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়ার দাবিদার ভারতে এমন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নজির আছে কি? মোটেও নেই।

সেখানে প্রতিদিন মুসলমানদের ওপর হামলা, নিপীড়ন, নির্যাতন চলছে। তবুও সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বরং অমুসলিমদের মুসলমানের বিরুদ্ধে উসকে দিচ্ছে। সাথে সাথে দেশ থেকে মুসলমানদের বিতাড়ন করে ভারতকে পুরোপুরি ‘হিন্দুস্থান’ বানানোর প্রক্রিয়া চালাচ্ছে নানাভাবে।

২০০২ সাল মোদি গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে মুসলিমবিরোধী যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল, তা ছড়ানো হয়েছিল স্রেফ গুজব রটিয়ে। ওই বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি অযোধ্যা থেকে ট্রেনে করে একদল হিন্দু সন্ন্যাসী গুজরাটের গোধরায় আসছিলেন। সেখানে কে বা কারা আগুন ধরিয়ে দিলে ৫৮ জনের মৃত্যু হয়। রটিয়ে দেয়া হলো- মুসলমানেরাই আগুন দিয়েছে। এটা শোনে মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ দাঙ্গা লেগে যায়। উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানদের হত্যা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেখানে ওদের পেয়েছে কুপিয়েছে, পুড়িয়েছে, ইট দিয়ে আঘাত করে মাথা থেঁতলে দিয়ে হত্যা করেছে। এমনকি গর্ভবর্তী মহিলার পেট কেটে সন্তান বের করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। প্রায় দুই হাজার নির্দোষ মানুষকে হত্যা করা হয়। অভিযোগ ওঠে, ট্রেনে আগুন দেয়ার নেপথ্যে হিসেবে কাজ করেছে সংঘ পরিবারের সাম্প্রদায়িক শক্তি তদন্তে বিষয়টি ফাঁস হয়। বলা হয়- পরিকল্পিতভাবে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে শুধু মুসলমানদের আক্রমণ করার জন্য। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, বিজেপি ও তার সহযোগী উগ্রবাদী সংগঠনগুলো কতটা মুসলিমবিদ্বেষী। যেকোনো অজুহাতে তারা মুসলমানদের হত্যার জন্য উদগ্র বাসনা পোষণ করে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, কেন্দ্রে ক্ষমতায় এসে নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের দাঙ্গার অভিযোগ থেকে মুক্তি লাভ করেছেন। তবে তার শাসনামলে মুসলমানেরা যে নিরাপদ নয় তা এখন দেখা যাচ্ছে। তাদের ওপর ক্রমাগত নির্যাতন এবং বলপূর্বক ধর্মান্তরের প্রচেষ্টা চলছে।

প্রতীয়মান হচ্ছে, ভারত সরকার সঙ্কটের মাত্রা ও পরিস্থিতি বুঝেও না বোঝারও ভান করছে। সমস্যা সৃষ্টিকারীদের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে বরং একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় কোনো ভূমিকা পালন করছে না। ‘পশুর ওপর নিষ্ঠুরতা ঠেকানো’র নাম করে প্রত্যক্ষ ইসলামবিদ্বেষ প্রশ্রয় বা উসকে দিচ্ছে। অথচ বিজেপি ক্ষমতায় আসার ব্যাপারে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীরও বিপুল অবদান রয়েছে। অবশ্য ভারতের বেশির ভাগ সাধারণ হিন্দু নাগরিক এই উগ্রতা পছন্দ করেন না। সমস্যা হচ্ছে, যে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানদের নির্যাতন নিপীড়ন করলেও তারা কথিত জাতীয়তাবাদী সরকারের পক্ষ থেকে প্রশ্রয় পাচ্ছে। এর অর্থ, মোদি সরকার চাচ্ছে ভারতকে এই উগ্রবাদীরা হিন্দুত্ব রাষ্ট্রে পরিণত করুক। এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, ভারত থেকে মুসলমানদের বের করে দেয়া হবে। এ থেকে স্পষ্ট যে, ভারতের মুসলমানদের ‘স্টেটলেস’ করার প্রক্রিয়ায় বিজেপি সরকারের পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। অথচ বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানেরা তো বটেই, সরকারের কেউ কখনই এ দেশ থেকে বিতাড়ন করার চিন্তাও করে না সংখ্যালঘুদের। বরং বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ থেকে বহু হিন্দু স্বেচ্ছায় ভারতে চলে গেছেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। নিবন্ধের শুরুতেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো সাম্প্রতিক সম্প্রীতির দেশ বিশ্বে বিরল। ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশ হওয়ার সত্ত্বেও অন্যান্য ধর্মের লোকেরা যেভাবে বসবাস করছেন, অন্য কোনো দেশে সাধারণত তা দেখা যায় না।

লেখক : সাংবাদিক


আরো সংবাদ