২৩ নভেম্বর ২০১৯

আবরারের দেশপ্রেম

-

আজ মনে পড়ছে ভাষাশহীদদের কথা, যারা মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। সেই রফিক, শফিক, জব্বার, বরকত আরো কত নাম না জানা অগণিত শহীদের কথা। এই মুহূর্তে আরো মনে পড়েছে স্বাধীনতার কথা, যে স্বাধীনতার জন্য অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন অগণিত শহীদের কথাও। দেশমাতৃকার টানে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন হানাদারের বিরুদ্ধে। এমন দেশপ্রেমিক অগণিত শহীদকে হাজারো সালাম। তাদের এমন অবদান না থাকলে হয়তো আমাদের এ দেশটি স্বাধীনই হতো না। বীর বাঙালির এমন সাহসী ইতিহাস যুগে যুগে নতুন প্রজন্মকে সাহসী করে তুলবে, এটাই তো স্বাভাবিক। আর তারা এ দেশকে ভালোবেসে দেশের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে নিজেকে রাখবে সোচ্চার। এ যে আমাদের গৌরব। কারণ, বাঙালি যে বীরের জাতি তারা বার বার প্রমাণ দিয়েছে। কখনো অন্যায়ের কাছে তারা মাথা নত করে না। পূর্বপুরুষদের কাছে তারা যে তাই শিখেছে। আর সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ বা সত্য ইতিহাস তুলে ধরে শহীদ হলেন দেশপ্রেমিক আবরার ফাহাদ।

’৪৭ দেখিনি শুনেছি তার ইতিহাস, ’৬৯ দেখিনি পড়েছি বইপুস্তকে, ’৭১ও দেখিনি কিন্তু গল্প মা-বাবা-চাচাদের কাছে শুনেছি। একাত্তরে হায়েনার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া এ দেশের নিরীহ জনগোষ্ঠীর ওপর লোমহর্ষক নির্যাতন চালিয়েছিল পশ্চিমাবাহিনী। তখন আমরা ছিলাম শোষিত। আমাদের সবটুকু অধিকারই ছিল ওদের দখলে। আমরা ছিলাম নির্যাতিত-নিপীড়িত। আর আজ? আমরা কি নিরাপদে আছি? বাংলাদেশের সর্বোচ্চ মেধাবীদের প্রতিষ্ঠান বুয়েটে একটি ছেলেকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে ছাত্রলীগ নামধারী কিছু খুনি। কেন করেছে? কারণ, তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে দেশপ্রেমের কথা ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশপ্রেমের কথা প্রকাশ করলেই কি কাউকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে? আর যারা সরিয়ে দিচ্ছে, তাকে কুৎসিত চেহারা তো আমাদের সামনে রয়েছে।

মনে পড়ছে বিশ্বজিতের কথা। কী ছিল ওর অপরাধ? ওর কোনো অপরাধই ছিল না। ও ছিল একজন সাধারণ দর্জি। হিন্দু ধর্মের একজন নিরীহ নাগরিক। ওদের বেপরোয়া অস্ত্রের সামনে পড়েছিল বিশ্বজিত। ওর শরীরে কোনো রাজনৈতিক তকমা ছিল না। কিন্তু ওকে কী নির্মমভাবে দিনের আলোয় কুপিয়ে হত্যা করা হলো মানুষ আজো ভুলে যায়নি সে কথা। কারণ, বিশ্বজিত ছিল ওদের ভুল টার্গেট। সে কথাও মানুষ কোনো দিন ভুলে যাবে না। এ রকম হাজারো উদাহরণ আছে, ওরা ভিন্ন মতাবলম্বীকে পিটিয়ে হত্যা করা বা কুপিয়ে হত্যা করতে একটুও দ্বিধা করে না। আর তার আশকারা দিচ্ছে তাদের ‘বড় ভাইয়েরা’। সাধারণ মানুষের সমালোচনার মুখে ওরা ধরা খায়, কিন্তু কিছু দিন পর ওরা মুক্ত। শুধু লোকদেখানো আইওয়াশ!

আজ আমার মতো কোটি মায়ের বুকে রক্ত ক্ষরণ চলছে। রাতে দুই চোখের পাতা এক করতে পারি না। আতঙ্কে বারবার নিজের সন্তানকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেয়েছি। আবরারের মুখচ্ছবিতে যে নিজের সন্তানের ছবি বারবার ভেসে উঠেছে। ওর শরীরে জমাট বাঁধা রক্ত আমাকে বারেবারে কাঁদিয়েছে। কতটা নির্যাতনে ২০-২১ বছরের একটা ছেলের প্রাণটা চলে গেল, তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। হাউমাউ করে কান্না আসে আমার। আর ওর বাবা-মায়ের স্থানে নিজেকে ভাবি। কেমন কষ্টে বুকে পাথর বেঁধে তারা বেঁচে আছেন। মানুষরূপী পশুগুলোর কাছে একফোঁটা পানি চেয়েছিল ছেলেটি। দেয়া হয়নি। কী নিষ্ঠুর ওরা। কেমন বাবা-মায়ের সন্তান, কী শিক্ষায় ওদের বড় করেছে শুধু জানতে ইচ্ছে করে।

আবরারের মতো আমারও যে একটি সন্তান আছে, ও যে দুদিন পড়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার চেষ্ট করবে। ওকে কী এমন শিক্ষা দেবো, তারা যা বলবেন তাই মেনে নিতে হবে, টুঁ শব্দটি করা চলবে না। নইলে বাঁচতে পারবে না। ধরেই নিলাম বেঁচে থাকার জন্য বধির হয়ে গেলাম। প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেললাম। কিন্তু সে শিক্ষা দিলেও সে কেনইবা মেনে নেবে? কারণ, সে তো বড় হয়েছে। তার নিজস্ব মতামতের অবশ্যই অধিকার কাছে। কারণ যে গোষ্ঠীটি আবরারকে বা বিশ্বজিতকে হত্যা করেছে আমার জানামতে ওরা তো ওদের ঘরানারই লোক ছিল, তো লাভটা কী হলো। আসলে দেশপ্রেমের অভাব যদি ছাত্র সমাজের ভেতর থাকে তাহলে এ দেশের কপালে দুর্ভোগই আছে বলতে হবে। এ দেশের ছাত্রসমাজের আছে গৌরবজনক ইতিহাস। আজ ভাবতে কষ্ট হয় যারা সারাক্ষণ নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক বলে ঢাকঢোল পিটায়, যারা সারাক্ষণ বলে বেড়ায় তাদের মতো দেশপ্রেমিক এ দেশে আর কেউ নেই। আর তাদের হাতেই এমন নির্যাতন-অত্যাচারের জবাব তারা কিভাবে দেবে আমি জানি না।

কেন এমন নৃশংসতা? অনেকেই বলছেন সমাজের অবক্ষয়। আসলে কী তাই, নাকি মহাপাপ! এত পাপ কী আল্লাহ সহ্য করেন? আর কত পাপ হলে আল্লাহর গজব নেমে আসবে। আজ আবরারের মৃত্যুতে ব্যথিত গোটা সভ্যসমাজ। মাদরাসা ছাত্রী রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার পর সভ্যসমাজ বোবা কান্নায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তেমনি ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়েছিল রিফাত হত্যার দৃশ্য দেখে।

আজ ফেনী নদীর পানি ভারতকে দেয়া হলো। কেন দেয়া হলো, কারণ ওদের অঞ্চলে খাবারের পানির অভাব। তাই আমাদের প্রধানমন্ত্রী মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু পানি দিয়েছেন। ভালো কথা। কিন্তু আমাদের তিস্তার পানির ন্যায্য দাবি, যার জন্য বছরের পর বছর আমাদের আকুতি ওরা কানে তুলছে না। মরণ ফাঁদ ফারাক্কার কারণে মাইলের পর মাইল মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে আমাদের দেশটি, কিন্তু সরকার নীরব সেখানে। প্রধানমন্ত্রী নিজের মুখেই স্বীকার করেছেন ভারতকে তিনি যা দিয়েছেন সারা জীবন ভারত তা মনে রাখবে। এমন ভালোবাসা শুধুই একতরফা। ক্ষমতায় টিকে থাকার একটা সর্বনাশা কৌশল। এমন ভালোবাসার বিনিময়ে আমরা কিছুই পাব না। এমনটি হতে পারে না। তাই আজ সময় এসেছে আর একটিবার হাতে হাত রেখে শপথ নেয়ার। আমাদের দেশের ক্ষতি হোক, আমরা তা কিছুতেই মেনে নেবো না। আমরা নতজানু পররাষ্ট্র নীতিকে কিছুতেই মেনে নেবে না। আমরা জেগে উঠব আর একটিবার আমার দেশমাতৃকাকে রক্ষা করতে। জেগে উঠবে দেশপ্রেমের চেতনা, যে দেশপ্রেম ছিল আবরারের বুকে।


আরো সংবাদ