২৩ নভেম্বর ২০১৯

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ

-

‘প্রণমিয়া পাটুনী কহিছে জোড় হাতে,
আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে।
তথাস্তু বলিয়া দেবী দিলা বরদান
দুধেভাতে থাকিবেক তোমার সন্তান।’

একসময় ‘মঙ্গলকাব্য’ জুড়ে ছিল দেব-দেবীর মহিমাকীর্তনসহ ঈশ্বরের স্তব স্তুতি। ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’ এই উক্তি থেকে বাঁক নেয় দেবদেবীর মহিমাকীর্তনে। গরিব ঈশ্বরী পাটুনী সোনার সেঁউতি বুকে নিয়ে জলভরা চোখে জোড় হাতে দেবীর কাছে ঐশ্বর্য চাইলেন না- চাইলেন না পরকালের অন্তহীন সুখের ঠিকানা; নিজের সুখ, শক্তি, ক্ষমতা ও রাজত্বের পরিবর্তে শুধু চেয়েছিলেন, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে।’ বহুলালোচিত ‘অন্নদা মঙ্গল’-কাব্যের লেখক ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর (১৭১২-১৭৬০) সন্তানের মঙ্গলকে বড় করে হয়ে ওঠেন অষ্টাদশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ও শক্তিমান কবি।

আড়াই শ’ বছর পর আমরা এখন আইনের শাসন, বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে। এ যুগেও সন্তানের নিরাপত্তার বিষয়টি মা-বাবার মাথা থেকে নামছে না; বরং নতুন করে বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিককালে ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির নির্মম হত্যা ও বুয়েটের আবরার হত্যাকাণ্ড বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেয়াসহ বুঝিয়ে দিয়ে গেছে, শিক্ষার্থীরা শিক্ষক কিংবা সহপাঠী- কারো কাছেই নিরাপদ নয়।

গত ২৫ অক্টোবর ছিল রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডি নির্বাচন। ২৫ হাজারের মতো অভিভাবক ভোটার। উপস্থিত ভোটারদের বক্তব্য এবং আচরণেও প্রাধান্য পেয়েছে শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার বিষয়। একই সময়ে ভোট নেয়া হচ্ছে বেইলি রোড, ধানমন্ডি, বসুন্ধরা ও আজিমপুর-ভিকারুননিসার এই চার শাখায়। একজন মহিলাপ্রার্থীকে ২৫ হাজার অভিভাবকের কাছেই যেতে হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে রওনা হয়ে শান্তিনগর মোড়ে নেমে বেইলি রোডের দিকে মুখ করতেই চোখ পড়ে পোস্টারে। হাজার হাজার পোস্টার। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাস্তার ওপর গিজগিজ করছে মানুষ- পোস্টারে পোস্টারে যেন সব দিক ছেয়ে রয়েছে।

আমার এক ভাগ্নি এ নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলাপ্রার্থী। বারবার অনুরোধ করেছে নির্বাচনের দিন তার ক্যাম্পে উপস্থিত থাকার জন্য। যেহেতু ভাগ্নি, সেহেতু থাকতেই হলো। নির্বাচনের বিষয়ে বিস্তারিত শ্রবণ করার পর আমার কাছে নির্বাচনযুদ্ধ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চেয়েও জটিল মনে হলো। এ কারণ, চার শাখায়ই প্রার্থীদের নির্বাচনী পোস্টার, ক্যাম্প, এজেন্টসহ রয়েছে সর্বক্ষণ চা-পান এবং লাঞ্চের আয়োজন। বেলা ২টা বাজতেই ভ্যানভর্তি লাঞ্চ। প্রতি প্যাকেট মুরগি-পোলাও মূল্য ১৪০ টাকা। কর্মী বাহিনীর জন্য জনপ্রতি ক্যাপসহ একটি করে গেঞ্জি। মূল শাখার ২ নম্বর গেট বরাবর সোনালী ব্যাংকের পূর্ব দিকে সিদ্ধেশ্বরী রোডের পাশে ভাগ্নির নির্বাচনী প্যান্ডেল। সামনে অপরাপর শাখায় যোগাযোগের জন্য গোটা দুই ট্যাক্সিসহ কয়েকটি বাইক। প্রার্থী খুব ব্যস্ত। দেখা হতেই জানতে চাই, স্কুলের নির্বাচনে এ কী এলাহি কাণ্ড! বিশাল ডামাডোল! আকাশছোঁয়া প্রস্তুতি, টাকার শ্রাদ্ধ, প্রাণান্তকর খাটাখাটুনি; তার পরও রয়েছে ঝুঁকি। ‘ঘরের খেয়ে জঙ্গলের মোষ তাড়ানো’র মতো, স্কুল কমিটির নেই মালামাল বণ্টনের দায়-দায়িত্ব। এত কিছু জানার পরও তোমার নির্বাচন করার ইচ্ছা জাগল কেন?

- মামা, এখন আপনার প্রশ্নের কোনো উত্তরই দিতে পারব না। ক’দিন আগে বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দিয়েছি। সেখানে অনেক প্রশ্নের উত্তর রয়েছে- বলেই ট্যাক্সিতে উঠে বের হয়ে গেল অন্যান্য শাখার উদ্দেশে। বেইলি রোডের প্যান্ডেলের তত্ত্বাবধানে জামাতা লিটন। ওর কাছে লাঞ্চ সম্পর্কে জানতে চাই, দেখতে না দেখতে ৩০০ প্যাকেট শেষ! - মামা, শুধু খায় না, খাওয়া শেষে অনেকেই দু’চার প্যাকেট হাতে করে নিয়ে যায়। ৩০০ প্যকেটের পরে আরো ১০০ প্যাকেটের অর্ডার দিয়েছি।’

খেতে দাও ঠিক আছে, কিন্তু নিতে দাও কেন?
- খাওয়া কিংবা নেয়া কোনোটাতেই না বলার সময় এখন নয়।
- এ নির্বাচনে এ পর্যন্ত কত খরচ হয়েছে?
- ১৫ লাখের ঊর্ধ্বে।

সব শুনে বিদ্রোহী কবির ‘সঙ্কল্প’ কবিতার, ‘কিসের নেশায় কেমন করে’ চরণটি আওড়াতে শুরু করি।

প্যান্ডেলের পাশেই মিলন ভাইয়ের বাসা। ‘শিকড় প্রকাশনী’র স্বত্বাধিকারী। ‘মেঘনা পাবলিকেশন্স’-এর স্বত্বাধিকারী আবুল হোসাইনসহ আমাকে তাদের বাসায় নিয়ে লাঞ্চ করানোর জন্য বসে আছেন। মিলন ভাইয়ের তিন বেডের এক হাজার ৩০০ বর্গফুটের বাসা। ভাড়া ৩০ হাজার টাকা। ডাইনিংয়ে বসে প্রসঙ্গক্রমে ‘বাসা ভাড়া খুব বেশি মনে হচ্ছে?’ জানতে চাওয়ার উত্তরে মিলন ভাই বললেন, ‘আমরা পুরান ভাড়াটিয়া। লিফট নেই, তাই ৩০ হাজার টাকা। সমপর্যায়ের বাসা কমসেকম ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া।’

কারণ জানতে চাইলে তিনি জানালেন, এখানে রয়েছে ভিকারুননিসা ও সিদ্ধেশ্বরীর মতো দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দু’টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষার সাথে যেহেতু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয় জড়িত, বিশেষ করে মেয়েদের নিরাপত্তা, সেহেতু সবাই এ এলাকায় বাসা নিতে চান।

- আপনার প্রকাশনা ব্যবসা। বই বিক্রি করে ৩০ হাজার টাকা বাসাভাড়া দিয়ে চলেন কী করে?

- বই বিক্রির অবস্থা আপনি নিজেই ভালো জানেন। আমার দুই মেয়ে। স্ত্রী ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মেয়ে দু’টির নিরাপত্তাসহ সুষ্ঠু লেখাপড়ার বিষয় চিন্তা করেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন গৃহকর্মী। দুই মেয়েই ভিকারুননিসায়। আমার বাসা থেকে হেঁটেই স্কুলে যাওয়া যায়। বাড়িতে টাকা দিতে হয় না। বরং বাসাভাড়ার ৩০ হাজার টাকা বাড়ি থেকে আনতে হয়। অনেক কষ্ট করে চলি, তার পরও স্বস্তি বোধ করছি এই ভেবে যে, আমাদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন, মেয়ে দু’টি ভালো স্কুলে নিরাপদে আছে।

দেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ফার্স্ট চয়েজ ভিকারুননিসা। এ কারণেই ভিকারুননিসার গভর্নিং বডির সদস্য হওয়া সম্মান ও সৌভাগ্যের বিষয়। জেতা কঠিন হওয়ার পরও কেউ না কেউ তো জিতবেনই। যে বা যারাই জেতেন, তাদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা। নিরাপত্তার প্রথম শর্ত, শিক্ষার্থীদের রাজনীতির বাইরে রাখা। প্রত্যেক অভিভাবকও এটাই চান। কারণ, বিদ্যাপীঠে এ যাবৎ যত সমস্যা হয়েছে, সেগুলোর পেছনে কোনো না কোনোভাবে রাজনীতি ও আর্থিক কারণ জড়িত। রাজনীতি ও আর্থিক কারণ ছাড়া কোনো কারণই মুখ্য নয়। এসব কারণে, সারা দেশের শিক্ষার্থীই যেন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অভিভাবক প্রথমেই চান সন্তানের নিরাপত্তা। বিশেষ করে, কন্যাসন্তানদের নিয়ে অভিভাবকের ঘুম উধাও হয়ে গেছে। এ অবস্থায় ভিকারুননিসার মতো বিদ্যালয়ে সন্তান ভর্তি করানোর সুযোগপ্রাপ্তি সোনার হরিণ প্রাপ্তির চেয়েও দামি।

দেশের অন্যতম প্রধান নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা সম্পর্কে আগে বিশেষ কিছু জানতাম না। নির্বাচনের ডামাডোল দেখাসহ যতই জানছি, ততই বাড়ছে জানার আগ্রহ। তা নিবৃত্ত করার জন্য মিলন ভাই ‘নূন প্রবাহ’ স্কুল বার্ষিকী ২০১৫-২০১৮ অর্থাৎ ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি স্মরণিকা দেন। স্মরণিকার ২৯ পৃষ্ঠায় রয়েছে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল। বিজ্ঞান শাখা বাংলা মাধ্যম মোট পরীক্ষার্থী ১৩৯৭; মোট পাস ১৩৯৭; এর মধ্যে জিপিএ ৫ এক হাজার ৩২৩। প্রায় অভিন্ন ফলাফল বিজ্ঞান শাখা ইংরেজি মাধ্যম, মানবিক শাখা এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখায়ও। বিদ্যালয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি থেকে আরো জানা যায়, মাত্র কয়েকটি শিশু নিয়ে ১৯৪৭ সালে ‘রমনা প্রিপারেটরি স্কুল’ নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু। ১৯৫০ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মালিক ফিরোজ খান নূনের স্ত্রী ভিকারুন্নিসা নূন স্কুলটি পরিদর্শনে এসে এর সার্বিক ব্যবস্থাপনা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তারই উদ্যোগে ১৯৫২ সালে স্কুলটি ‘ভিকারুননিসা নূন স্কুল’ নামে বৃহৎ কলেবরে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই প্রিপারেটরি প্রাথমিক বিদ্যায়তন দ্রুত হাইস্কুলে রূপান্তরিত হয়ে সিনিয়র কেমব্রিজ স্কুল হিসেবে পরিবর্তিত হয়। ১৯৭৮ সালে মাধ্যমিক পর্যায় থেকে উন্নীত হয় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে।

বর্তমানে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। স্কুলটি বেইলি রোডের মূল শাখাসহ ধানমন্ডি, বসুন্ধরা ও আজিমপুরে। নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির চাপে স্কুলটি পর্যায়ক্রমে একাধিক সেকশন ও বৈকালিক শিফট চালু করেছে এবং ১৯৯৫ সালে বাংলা মাধ্যমের পাশাপাশি ইংরেজি মাধ্যমেও পাঠদান শুরু করা হয়। কয়েকটি শিশুর প্রিপারেটরি স্কুলের মূল ক্যাম্পাস আজ ছয় একর জমির ওপর বিস্তৃত। সব মিলিয়ে বেইলি রোড থেকে শুরু করে রমনা থানা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির এলাকা বিস্তৃত বলে জানা যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় একজন অভিভাবক বলেন, ‘সঠিক পরিমাণ বলতে না পারলেও এই বলতে পারি যে, প্রাতঃভ্রমণে হাঁটতে শুরু করে ভিকারুননিসার চার দিক একপাক ঘুরলেই হাঁটার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়।’

এই প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের লক্ষ্যে নিয়মিতভাবে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলাধুলাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভিকরুন্নিসা নূন স্কুল ও কলেজের ছাত্রীরা নিয়মিত অংশগ্রহণ করে থাকে। ছাত্রীদের সৃজনশীল হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই প্রতিষ্ঠানে রয়েছে বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব, পরিবেশ ক্লাব এবং ইংরেজি ভাষা ক্লাব।

স্কুল ও কলেজ মোট ১১টি শাখায় প্রায় ২৩ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। সুদক্ষ ও অভিজ্ঞ বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক এখানে পাঠদান করছেন।

ভিকারুননিসার পাশেই ফখরুদ্দীনের খাবারের দোকান। ভিকারুননিসাকে কেন্দ্র করে যেভাবে গড়ে উঠেছে শিক্ষালয়, সেভাবে ফখরুদ্দীনকে কেন্দ্র করে বেইলি রোডে গড়ে উঠেছে খাদ্যালয়ও। স্কুলের উত্থানের সাথে সাথে বাবুর্চি ফখরুদ্দীনের উত্থানের একটা চমৎকার মিল রয়েছে। যেমন ‘ফখরুদ্দীন জীবিকার খোঁজে ঢাকায় আসেন ১৯৫৬ সালে। ভিকারুননিসা নূন স্কুলে নৈশপ্রহরীর চাকরি নেন। এরপর ১৯৬৬-৬৭ সালের দিকে স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে স্কুল কম্পাউন্ডে একটি ক্যান্টিন তৈরি করেন। সেই ক্যান্টিন থেকেই আজকের ফখরুদ্দীন বিরিয়ানি ও রেস্টুরেন্ট।’

পরিশেষে বলা চলে, নিরাপত্তাসহ উত্তম লেখাপড়ার জন্য ভিকারুননিসা নূন এবং উত্তম খাবারের জন্য বাবুর্চি ফখরুদ্দীনের রেস্টুরেন্ট, উভয় প্রতিষ্ঠানই বেইলি রোডে। তাই বেইলি রোড সারাক্ষণ ভোজনপটু, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর পদসঞ্চালনায় মুখর থাকে।

লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক


আরো সংবাদ