২৩ নভেম্বর ২০১৯

ক্যাম্পাস সন্ত্রাস উচ্ছেদে যা দরকার

-

গত ৬ অক্টোবর ২০১৯, বুয়েটের দ্বিতীয়বর্ষের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে বুয়েটেরই বেশ কয়েকজন ছাত্র মিলে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। জানি না, আবরারের বাবা কিভাবে এই সন্তান হত্যার কষ্ট সহ্য করছেন। বাবা হিসেবে এই হত্যাকাণ্ডের কথা মনে হলেই কষ্টে বুক ভেঙে যেতে থাকে। নীরবে কেঁদে কেঁদে নিজেকে অনেকবার প্রশ্ন করেছি, কেন এই নিষ্ঠুরতা? এক বাবার মেধাবী সন্তান কেন আরেক বাবার মেধাবী সন্তানকে এভাবে মেরে ফেলতে চাইল এবং পারল? কেন এই নজিরবিহীন নির্মম অপরাধপ্রবণতা? কেন এভাবে আমাদের মেধাবী ছেলেরাও সন্ত্রাসী হয়ে যাচ্ছে? প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট তো ডাকাতদের কোনো গ্রাম নয় বা অন্ধকার যুগের কোনো মহল্লা নয়! বরং বাংলাদেশের সর্বাধিক মেধাবীদের পড়ালেখার স্থান, গবেষণার পাদপীঠ। আগামী দিনের বাংলাদেশের কৃতী সন্তান তৈরির স্থান এটি। কিন্তু বাস্তবতা হলো- দেশের নিরীহ নিষ্পাপ কিছু তরুণ ‘সূর্যসন্তান’ হতে এসে হৃদয়ে ঘৃণা, মস্তিষ্কে চরমপন্থা আর গায়ে শক্তি সঞ্চয় করে সন্ত্রাসীদের মতো আচরণ করছে।

অবশ্য এ দেশে এই সন্ত্রাস নতুন নয়। তদানীন্তন পাকিস্তানি সন্ত্রাসীদের হাতে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের পরপর আমরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে বেশুমার সন্ত্রাস করেছি। সদ্য স্বাধীন দেশে সমাজতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে উগ্রপন্থী সন্ত্রাসীরা সরকারকে নাস্তানাবুদ করে রেখেছিল। অন্য দিকে রাজনৈতিক সন্ত্রাস হয়েছে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে।

১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের হত্যাকাণ্ড, ১৯৮০ সালে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ড, ১৯৮২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডা: মিলন) হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি আরো অনেক হত্যাকাণ্ড এ দেশের ছাত্র রাজনীতিতে সন্ত্রাসের কালো অধ্যায় সৃষ্টি করে রেখেছে। এ ছাড়া কথিত ধর্মভিত্তিক উগ্রবাদী বা জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসও রক্তে রঞ্জিত করেছে বাংলাদেশের মাটিকে। এদের শুরু হয়েছিল ১৯৯৯ সালে যশোর উদীচী হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। এরপর ‘জেএমবি’ আর ‘হুজি’ তছনছ করেছে এ দেশের সামাজিক শান্তিশৃঙ্খলা ২০০৬ সাল পর্যন্ত। পরবর্তীকালে মধ্যপ্রাচ্যে ‘আইএস’-এর সৃষ্টি ও দ্রুত প্রভাব বিস্তারের পর মদদ পেয়েছে এ দেশের উগ্রবাদীরা। ২০১৬ সালে শুরু করে তাদের বীভৎস তাণ্ডব ঢাকায় গুলশানের ‘হোলে আর্টিজান’ এ ভয়ঙ্কর হামলার মাধ্যমে। প্রশাসন সফলতার সাথে এই চরমপন্থী গোষ্ঠীকে খাদে আটকে রাখতে সফল হলেও থেমে নেই দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে নানাবিধ সন্ত্রাস।

হরতাল-অবরোধের রাজনৈতিক সন্ত্রাস সরকার সফলতার সাথেই দমন করতে পেরেছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একের পর এক সন্ত্রাসী আক্রমণ ঘটেই চলেছে। এই সন্ত্রাস কেন অপ্রতিরোধ্য?

বিগত ১০ বছরে দেশের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ছাত্রদের লাশের তালিকা শুধু দীর্ঘই হয়েছে। দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার তথ্যমতে (০৯-১০-১৯), এই সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে খুন হয়েছে আটজন শিক্ষার্থী। রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্র মাসুম এবং হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হারুনুর রশিদ ছুরিকাঘাতে নিহত হন (২০১০ সালে), যাতে সরকারের ঘনিষ্ঠ, ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতা জড়িত ছিলেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। কয়েকজন গ্রেফতারও হয়েছিল। এরপর আর কোনো অগগ্রতি নেই সেই হত্যা মামলার। ২০১২ সালে দুইজন এবং ২০১৪ সালে একজন ছাত্রশিবির নেতা নিহত হন ছাত্রলীগের সাথে সংঘর্ষে। ২০১৫ সালের শুরুতে সংস্কৃত বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র তাপস সরকার নিহত হন ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে। ২০১৬ সালে নিজ বাসায় খুন হলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরী। এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই আজ পর্যন্ত।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১০ বছর পাঁচজন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে নিজেদের কোন্দলে নিহত হন ছাত্রলীগের নেতা নাসরুল্লাহ নাসিম (২০১০ সালে), আব্দুল্লাহ আল হাসান (২০১২ সালে) ও রুস্তম আলী (২০১৪ সালে)। এসব মামলারও কোনো অগ্রগতি নেই কিংবা খারিজ হয়ে গেছে। আবার শিবির-ছাত্রলীগ সংঘর্ষে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক খুন হন (২০১০ সালে)। এতে বিরোধীদলভুক্ত শিবিরের ১০৭ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা চলছে এবং গত ২৫ জুলাই অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষে শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান নোমানী নিহত হন। এতে ছাত্রলীগের ২৭ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হলেও আদালত সব আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন (দৈনিক প্রথম আলো, ০৯-১০-১৯)।

২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্য দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কোন্দলে তিনজন শিক্ষার্থী নিহত হন যার কোনোটিরই সুষ্ঠু বিচার হয়নি। বহুল আলোচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাসের ছাত্র আবু বকর (২০১০ সালে) এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যুবায়ের আহমেদ (২০১২ সালে) ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাতের বলি হয়েছেন। এদের হত্যাকারীদের কারো আজ পর্যন্ত শাস্তি হয়নি। দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার প্রতিবেদন মোতাবেক (০৯-১০-১৯), স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৫১ জন শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে খুন হয়েছেন, যার জন্য এখনো কাউকেই আইনের আওতায় আনা হয়নি। উল্লেখ্য, ১৫১ খুনের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৯ জন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ জন, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬ জন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাতজন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ায় দুইজন, বুয়েটে দ্ইুজন এবং একজন করে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ও মওলানা ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়ে খুন হয়। বুয়েটে ২০০২ সালের ছাত্রী সাবেকুন্নাহার সনি তদান্তীন সরকার সমর্থক ছাত্রদলের দুই গ্রুপের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে নিহত হয়েছিলেন। ২০০৬ সালে হত্যাকারীদের ফাঁসি ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলেও খুনিরা পলাতক। এর আগে ১৯৯২ সালে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মইন হোসাইন রাজুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিলে যোগ দেয়ার সময় গুলি করে হত্যা করা হয় তারও কোনো বিচার হয়নি। ১৯৭৪ সালে মুহসীন হল হত্যাযজ্ঞের চার বছর পর আদালত আসামিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলেও তৎকালীন সরকার তাদের মুক্ত করে দেয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত ক্যাম্পাসভিত্তিক এসব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলোর ন্যায়বিচার অধরাই থেকে গেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, হত্যাকারীরা ক্ষমতাসীন দলের সাথে যুক্ত। অপরদিকে সংবাদপত্রের তথ্য মতে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হত্যায় ১০৭ জন শিবির নেতাকর্মীর বিচার তার ‘নিজ গতিতেই এগিয়ে যাচ্ছে।’

প্রকৃত অর্থে সাম্প্রতিক আবরার হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশে শুরু থেকে গড়ে উঠা একটি রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি আমাদের সামনে উন্মোচিত হলো। সেটা হলো, সন্ত্রাসীর সংজ্ঞায়নে পরস্পর বিপরীত বা সাংঘর্ষিক অবস্থান। এর মানে হলো, ‘তোমার কাছে যে সন্ত্রাসী সে আমার কাছে ত্রাণকর্তা’। জাতিসঙ্ঘে ১৯৮৫ সালে গৃহীত সন্ত্রাসের সংজ্ঞা হলো, ‘যে সমস্ত কার্যকলাপ নিরীহ মানুষের জীবন কেড়ে নেয় বা বিপন্ন করে তোলে, মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা নস্যাৎ করে এবং মানবতার মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করে সেগুলোই হলো সন্ত্রাস’ (অহহঊ. জড়নবৎঃংড়হ, ২০১০, পৃষ্ঠা-২৮)। কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি হচ্ছে, ‘সন্ত্রাস কেউ করলেও সে যদি আমার দলভুক্ত হয় তবে সে সন্ত্রাসী নয়।’ এই রাজনৈতিক অন্যায়ের বলিই আজকের আবরার ফাহাদ। কী দোষ ছিল তার? তিনি শুধু চেয়েছিলেন নিজের মতকে, দেশের ও জাতির প্রতি নিজের ভালোবাসাকে স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে। তার ফেসবুক ওয়ালে তিনি যে তিনটি পয়েন্টে পোস্ট করেছিলেন, তা হয়তো একদিন গবেষণার বিষয়বস্তু হবে। অবাক হতে হয় এই তরুণের মেধা ও দেশপ্রেমে মোড়ানো কয়েক লাইনের সেই শক্ত গাঁথুনির ক্ষুরধার বক্তব্যে। এ যেন বিন্দুর মাঝে সিন্ধু। অতি অল্প কথায় তিনি এত বিরাট কিছু প্রকাশ করেছেন যাতে একই সাথে ছিল ইতিহাস, বক্তব্য, কবিতা, কূটনীতি, গবেষণা, প্রতিবাদ, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, বেদনা আর ভালোবাসার কথা। এতে ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের চেতনা; সঙ্গতকারণেই প্রতিবাদের তীর ছিল আমাদের ‘বন্ধুরাষ্ট্র্র’ ভারতের ভূমিকার দিকে। সে প্রতিবেশী আমাদের কাঁটাতারের বেড়ায় আবদ্ধ করে, তিস্তার পানি শুষে নিয়ে আমাদের তৃষ্ণার্ত রেখে এ দেশের ফেনী নদীর পানিতেও হাত বাড়িয়েছে, গুলিবিদ্ধ ও তারকাঁটায় ঝুলন্ত তৃষ্ণার্ত ফেলানীকে পানি না দিয়ে হত্যা করেছে। আবরার শুধু এই কষ্টগুলোর কথাই বোঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার এই দেশপ্রেমকে ‘সীমাহীন ঔদ্ধত্য’ (!) ভেবে হত্যাকারী দুর্বৃত্তরা সহ্য করতে পারেনি। তারা হয়তো ধরে নিয়েছিল দেশের পরিস্থিতির আলোকে এই অপরাধ করে পুরস্কৃত হবে। নইলে তাকে হত্যা করতে যাবে কেন ওরা? তবে এরা বুয়েটে ভয়াবহ সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, তারা যে সাধারণ ছাত্রদের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে উঠেছিল, সেটা তাদের রুম নং ২০১১তে টর্চার সেল স্থাপন করে প্রমাণ করেছে। কিন্তু উদ্বেগজনক হলোÑ আমাদের সর্ব পর্যায়ের প্রশাসন তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এসব বিপথগামী তরুণ ক্ষমতার প্রশ্রয়ে অবাধে এই ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। অথচ সরকার গত ১০ বছরে উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদসহ সন্ত্রাস অনেকাংশে দমন করে চলেছে। জঙ্গিবাদ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। এ কারণে কিন্তু ক্যাম্পাসভিত্তিক সন্ত্রাসকে আমরা কেন দমন করতে ব্যর্থ হচ্ছি বারবার? বরং গত দশকে এই সন্ত্রাসপ্রবণতা ক্যাম্পাসের আরো গভীরে প্রোথিত হয়েছে। সাম্প্রতিককালে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সংস্কার আন্দোলনে হেলমেট পরা সন্ত্রাসীদের হামলা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদী ছাত্রের ওপর হাতুড়ি হামলা এবং ডাকসু ভিপি নুরুল হক নূরের ওপর অকারণে বারবার হামলার কোনো বিচার না হওয়ায় রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা দিন দিন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

প্রধানমন্ত্রী দেশের অভিভাবক। তিনি প্রতিবেশী দেশের সাথে চুক্তি করেছেন। কূটনৈতিক দরকষাকষিতে অনেক বাধ্যবাধকতা বা না বলা ব্যাপার থাকে, যা সবার বোঝার কথা নয়। আবরার ফাহাদ নাগরিকরূপে, সরল মনে যা বুঝেছেন তাই প্রকাশ করেছেন; সেটা গণতান্ত্রিক এখতিয়ার। এ ব্যাপারটি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনার জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। সেটা জানার পর প্রধানমন্ত্রী কী নির্দেশ দেবেন সেটা তার ব্যাপার। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বুয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের একজন ছাত্র কী লিখল বা বলল, তাতে স্পর্শকাতর হয়ে পড়বেন, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবু কেন ছাত্রলীগের ওই ছেলেগুলো এমন ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে? এর পেছনে কি অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা কোনো কুশীলব রয়েছে? এ ব্যাপারটি অবশ্যই কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। কারণ মূলত আমাদের অসুস্থ রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি। তা হলো ক্ষমতাসীন দলের সাথে যুক্ত থাকলে কোনো অপরাধেই শাস্তি হবে না মনে করা। তা ছাড়া শীর্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করার অসুস্থ মানসিকতা তৈরি হয়েছে। যত বড় পদ পাওয়া যাবে তত তাড়াতাড়ি অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বেশি সমৃদ্ধ হওয়া সম্ভব বলে অনেকে হয়তো মনে করছেন। আর ভিকটিম প্রতিপক্ষ ভিন্নমতের হলে নিজ দলের নেতা-নেত্রীরা আরো বেশি খুশি হবেন বলে বিকৃত ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। এ জন্যই আবরারকে ‘শিবির করার অপরাধে’ মারা হয়েছে বলে প্রথমে চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। আরো লজ্জাকর হলো- অনেকেই বলার চেষ্টা করেছেন, আবরারের পরিবার আওয়ামী লীগের সমর্থক, তবু কেন হত্যা করা হলো? তার মানে, আওয়ামী পরিবারের সদস্যকে হত্যা করাই যেন বড় অপরাধ এবং অন্যদের প্রাণ তেমন মূল্যবান নয়। একটা ভুল ধারণা জন্মেছে যে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা এদেশে সব অভিযোগের ঊর্ধ্বে যা নষ্ট সংস্কৃতির চূড়ান্তরূপ। আর্থ-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির আরো একটু গভীরে গেলে এ ধরনের যৌক্তিক মানসিকতার উৎস খুঁজে পাওয়া যাবে। তরুণ বয়সে কাঁচা পয়সার গন্ধ এবং প্রতিপত্তির অহমিকা বড়ই আকর্ষণীয়। অল্প বয়সে এর স্বাদ অনেককে বিবেকহীন এবং হিংস্র করে তোলে।

এ পরিস্থিতি থেকে সন্তানদের টেনে তুলতে হলে প্রথমেই আমাদের এসব অপসংস্কৃতিকে কবর দিতে হবে। ক্যাম্পাস-সন্ত্রাসকে দমন করতে হলে প্রথমেই সন্ত্রাসীর সংজ্ঞা পরিবর্তন করতে হবে। সন্ত্রাসী কার্যকলাপ যেই করবে পরিচয় নির্বিশেষে সেই সন্ত্রাসী। প্রধানমন্ত্রী সব সময় বলে থাকেন, সন্ত্রাসীদের কোনো দল বা ধর্ম নেই।’ এ কথাটি রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের সর্বস্তরের সবাইকে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতে হবে। এরপর অগ্রাধিকার দিয়ে ক্যাম্পাসের প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের খুনিদের আইনের আওতায় এনে অবিলম্বে সুষ্ঠু বিচার করতে হবে। ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডারবাজি, সিট দখল, টর্চার সেল, গণরুম ইত্যাদির সাথে যারা জড়িত তাদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া বন্ধ করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আর এসব পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে আবারো কোনো আবরারের বাবার নীরব কান্না এবং মায়ের আহাজারি আমরা শুনতে পাব, যার জন্য প্রিয় মাতৃভূমির কেউ আর প্রস্তুত নয়।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Email: [email protected]


আরো সংবাদ