২৩ নভেম্বর ২০১৯

বাংলাদেশের পানিসম্পদ

-

যে পৃথিবীতে আমরা বসবাস করছি, তার তিন ভাগ জল বা পানি আর এক ভাগ স্থল। পানি ছাড়া মানুষ, জীবজন্তু, মৎস্য, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ ও বৃক্ষ কেউ বাঁচতে পারে না। আর স্থলও হয়ে ওঠে পানি বিহনে মরুভূমি।

বাংলাদেশের কথাই বলি। আমাদের সার্বভৌমত্ব সহকারে, যাতে আমরা সবাই খেয়ে-পরে বাঁচতে পারি। এ জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয় জল বা পানি।

বাংলাদেশের পানি নিয়ে বলতে গেলে বিশুদ্ধ বা সুপেয় খাওয়ার পানি যাতে হাতের নাগালে পাই, অন্তত বেঁচে থাকার তাগিদে, এ বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করতেই হবে। দেশের মানুষ বাঁচলেই তো দেশ বাঁচবে।

বাংলাদেশে রয়েছে অসংখ্য নদনদী, খালবিল, ডোবা, দীঘি, পুকুর ইত্যাদি। এগুলোর সংস্কার করে ব্যবহারোপযোগী করে তোলার আশুপদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। তাহলে সুপেয় পানিও যেমন হাতের নাগালে আসবে, তেমনি মৎস্য চাষও হবে ত্বরান্বিত। আর এ উদ্যোগ দেশের সব মানুষকেই নিতে হবে। বিষয়টি ব্যক্তিক নয়, সামাজিকভাবে তো বটেই, এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবেও সামগ্রিক। আমাদের পাশে আছে বন্ধুরাষ্ট্র ভারত। কিন্তু তার ঘরের লোকদের ‘দরদে’ আমাদের মতো ‘পর’দের আন্তর্জাতিক নদীর পানির ওপর বড় বড় বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এভাবে বাংলাদেশকে পানি থেকে বঞ্চিত করছে। আমাদের সেদিকে লক্ষ্য রেখে দেশ এবং দেশের জনগণকে বাঁচাতে হবে। এখানে ‘বড়র পিরিতি বালির বাঁধ’ হলে তো চলবে না। তাহলে বাংলাদেশকে বন্ধুদেশ ভারত মরুভূমি করে ছাড়বে! এখানে বলতে হয়, জাতির স্বার্থ সংরক্ষণ স্বাধীনতার নামান্তর। চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব বা চিরস্থায়ী শক্রতা বলে কিছু নেই; যা চিরস্থায়ী তা হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ। ভারতকেও বুঝতে হবে, আমরাও বাঁচি, প্রতিবেশীকেও বাঁচতে দিই।

তারপর বলতে হয় সাগর-মহাসাগরের কথা। বঙ্গোপসাগর আমাদের একমাত্র সমুদ্র সম্পদ। এখানে যেমন অপার জলরাশি রয়েছে, তেমনি আছে খনিজ পদার্থ, গ্যাস ও তেল এবং মৎস্য সম্পদ। এগুলোকে কখনোই উপেক্ষা করা চলে না। নিজের সম্পদ তথা মাতৃভূমির সম্পদ মনে করে এর সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে আমাদেরকেই। পরনির্ভরশীল হওয়া চলবে না কিছুতেই। দেশপ্রেম কেবল মৌখিক শব্দ নয়, কর্মে রূপায়ণই তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। পানি বাংলাদেশের আত্মা। আর সেই পানি সংরক্ষণ করার মাধ্যমে আমাদের বাংলাদেশের জীবন হবে সুরক্ষিত। ভূগর্ভস্থ পানির অভাবে আর্সেনিক রোগ সংক্রমণের ভয়াবহতা দেশে দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে নদীর নাব্যতা বা সমুদ্রসীমাকে সংরক্ষণ করতেই হবে। এটি সামগ্রিকভাবে আমাদের জাতীয় স্বার্থ। জানা গেছে, ‘বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী’ বিশ্বের ছয় বিলিয়ন মানুষের মধ্যে ৮৮৪ মিলিয়ন লোক বিশুদ্ধ সুপেয় পানির সঙ্কটে ভুগছে। তদুপরি গৃহস্থালি এবং অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে ২.৫ বিলিয়ন লোক এ সমস্যায় আক্রান্ত। বর্তমান বিশ্বে পানিবাহিত রোগে মৃতের হার সবচেয়ে বেশি।

তাই এ ক্ষেত্রে সব দেশের স্বার্থে একযোগে কাজ করে যেতে হবে। এসব কাজ দেশবিশেষের ক্ষুদ্র গণ্ডির মাঝে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। এ কথাও জানা গেছে, বর্তমান বিশ্বে পানিবাহিত রোগে মৃতের হার সবচেয়ে বেশি। সব রোগের মধ্যে প্রায় ৮৮ শতাংশই স্বাস্থ্যসম্মত পানির অভাবে সৃষ্ট। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ডায়রিয়ার মতো রোগে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে প্রায় তিন হাজার ৯০০ শিশু।

বিষয়টি আন্তর্জাতিক। আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। সেজন্য এখন বিভিন্ন সমস্যা ভাগাভাগি করে আপন স্বার্থে স্থায়ী সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ-ভারত পানি সমস্যা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট। তা সমাধান করতে হবে বৃহত্তর মানবিক স্বার্থে। বৃহত্তর স্বার্থকে ক্ষুদ্র স্বার্থে বিসর্জন দেয়া যায় না। বাংলাদেশ-ভারতের পানি সমস্যার সমাধানে এ দু’টি দেশকে একযোগে কাজ করতে হবে। বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা হতেই হবে নিরন্তর সদ্ভাবের স্বার্থে।

লেখক : কবি, অনুবাদক ও নজরুল গবেষক


আরো সংবাদ