১৮ নভেম্বর ২০১৯

ঐতিহাসিক ও মনগড়া তথ্যের বই

-

প্রাচীন ও মধ্যযুগের মতো আধুনিক যুগেও বিজ্ঞজনদের কথা এবং ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে হয় ‘দেববাক্যতুল্য’। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে অজ্ঞতা, অনিচ্ছা বা স্বেচ্ছায় এটা যে বিকৃত বা সত্যের অপলাপ হয়ে থাকে, তা না বোঝার কল্পনাতীত পাঠক-শ্রোতার সংখ্যাই সর্বযুগে ও সমাজে থাকা স্বাভাবিক। ইংরেজ দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন (১৫৬১-১৬২৬) তাই বলেছিলেন, Some books are to be tasted, others to be swallowed and some few to be chewed and digested. (কিছু বই আস্বাদন করতে হয়, অন্য কতক বই উদরস্থ এবং স্বল্প কিছু চিবিয়ে হজম করতে হয়)। কালক্রমে পশ্চিমা বিশ্ব এসব কাজের স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতায় এমন মানসিক উত্তরণ ঘটিয়েছে যে, গোটা বিশ্বে যেকোনো বিষয়ে তাদের স্বীয় বক্তব্য বা বইয়ের চেয়ে তৎপ্রাসঙ্গিক পশ্চিমা বক্তব্য বা বই আজ অধিক নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচ্য হচ্ছে।

পত্র-সম্পাদক ও সমালোচক অক্ষয় চন্দ্র সরকার (১৮৪৬-১৯১৭) বলেছিলেন, ‘মুদ্রণযন্ত্র আছে বলিয়া আমরা সবাই সুলেখক, পড়িবার জন্য কোনো যন্ত্র নাই বলিয়া আমরা সবাই অপাঠক। অতএব বাংলায় পুস্তক লিখিত হয়; পঠিত হয় না।’ কথাটি আজো অপ্রিয় সত্য। তবে কেউ যখন কোনো স্বার্থবশে বা ‘বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক’ বলে অসার কৃতিত্বের অর্জনার্থে মুদ্রণযন্ত্রে ছাপানো বইয়ে উপস্থাপকের পরিবর্তে হন নির্দেশক- অর্থাৎ লেখা হয়েছে, চিবিয়ে হজম করো, তবে তা আস্বাদনের ইচ্ছা সহসা কোনো পাঠকের না থাকাই স্বাভাবিক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে আর্যদের আগমন ঘটেছিল খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ১৫০০ অব্দে। তাদের ধর্মসঙ্গীত ছাড়াও বাংলার কোনো নাম নেই ‘ধর্মগ্রন্থ নামীয় ঋগবেদ-সংহিতায়’ অর্থাৎ যে বেদে বিষয়গুলো একত্র করা হয়েছে। বৌদ্ধ ‘জাতক’ গ্রন্থে গৌতম বুদ্ধের সমকালে রাজধানীসহ ভারতে থাকা ৩০টি রাজ্যের মধ্যে এর পূর্ব অঞ্চলে বিহারের ভাগলপুরের উত্তরস্থিত তথা উদীয়মান বাংলার সীমান্তে থাকা, অঙ্গরাজ্যের নাম আছে। কিন্তু নেই বাংলার গৌড়, পুণ্ড্র্র ও আসামের কামরূপের নাম। তৎকালে খ্যাত এই অঙ্গরাজ্যের ব্রাহ্মণ রাজকন্যা সুভদ্রাঙ্গী ছিলেন বিখ্যাত সম্রাট অশোকের মাতা। বিসি সেন তার Studies in the Buddhist Jatakas নামক বইয়ের ৫৫ পৃষ্ঠায় অঙ্গের রাজধানী চম্মার সাথে বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) সরাসরি ব্যবসা চলার কথা বলেছেন।

অনেক পরে বেদের শাখা রূপে রচিত ‘ঐতরেয় আরণ্যক’ (ঐতরেয় হলো লেখক মুনির নাম এবং আরণ্যক অর্থ বন্য বা বনজাত) গ্রন্থে প্রথম বাংলার নাম পাওয়া গেছে। অনুমান করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে রচিত ‘বোধায়ন ধর্মসূত্রে’ বঙ্গের উল্লেখ আছে। তবে এতে বলা হয়েছে যে, পুণ্ড্র্র ও বঙ্গে স্বল্পকাল থাকলেও প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। এ জন্যই বাংলা খৃষ্টীয় ভাষায় সুপ্রচলিত ও অভিধান স্বীকৃত ‘পাণ্ডব-বর্জিত’ শব্দটির অর্থ ‘অনার্য বা অসভ্য’। খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে মিসরের গ্রিক জ্যোতির্বিদ টলেমির প্রদত্ত ভারতীয় ম্যাপে গঙ্গার মূল পাঁচটি শাখার প্রবাহই দেখানো হয়েছে। এককালে বাংলার রাজধানী ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের অপর পারের রাজমহলের পাহাড় স্পর্শ করা প্রাচীন রাজধানী গৌড়, লক্ষ্মণাবতী, পাণ্ডুুয়া, তাণ্ডা ইত্যাদি পার্শ্ববর্তী অঞ্চল গঠন করে গৌড়ের ২০ মাইল দক্ষিণে গঙ্গা দুই শাখায় ভাগীরথী ও পদ্মা নামে প্রবাহিত হয়েছে।

সৃষ্ট বদ্বীপাঞ্চলসহ মুর্শিদাবাদ, নদীয়া (৯টি দ্বীপের সমষ্টি), চব্বিশ পরগনা, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল ইত্যাদির সমুদ্রগর্ভ থেকে ক্রমেই উত্থান খ্রিষ্টীয় প্রাথমিক প্রায় হাজার বছরের কথা। পণ্ডিতদের মতে, পূর্বে সমুদ্র ছিল দিনাজপুরের বানগড় পর্যন্ত এবং প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে সমুদয় বাংলা ছিল সমুদ্রগর্ভে। সুতরাং এর সবচেয়ে পুরনো ভূভাগের বয়স প্রায় তিন লাখ বছরের হওয়ার বিষয়টি কাল্পনিক।

তথ্য মতে, ১০১৫ খ্রিষ্টাব্দে চন্দ্রদ্বীপের অনুলিখিত একখানা পাণ্ডুুলিপিতে তারা দেবীর মূর্তি অঙ্কিত আছে এবং দশম শতাব্দীর সুচনায় চন্দ্রবংশীয় নরপতি ত্রৈলোক্যচন্দ্র এর রাজা ছিলেন। চন্দ্রদ্বীপ ও বাকলা একই স্থান বলে সবার ধারণা। আইন-ই-আকবরীতে পরগনাস্বরূপ বাকলার উল্লেখ আছে। এর আরো আগে থেকে চন্দ্রদ্বীপ নামে কোনো স্থানের ইতিহাস নেই। মোগল আমলে এখানে জমিদারি বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রামনাথ দনুজমর্দন দে, যার বসবাস ছিল নিকটস্থ কচুয়ায়। ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে ‘সেই প্রাচীনকাল থেকে চন্দ্রদ্বীপে মোগলদের শাসন, সে স্থানসহ পটুয়াখালীর ইতিহাস প্রায় ৫০ হাজার বছরের এবং আওরঙ্গজেবের রাজত্বকাল ১৬৫৮ থেকে ১৭০৭-এর পরিবর্তে ১৬৮৮ পর্যন্ত’- এ কথাগুলো অনৈতিহাসিক।

বল্লাল সেনের রাজত্বকাল থেকে (১১১৯-১১৬৯) পাঠান রাজত্বকাল এবং সম্রাট গিয়াস উদ্দিন তুঘলক এবং শেষে আকবরের সময় ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাকে ৩০টি সরকারে ভাগ করে শাসনের কথাও ঐতিহাসিক। নদীমাতৃক বাংলায় যাতায়াত ও যোগাযোগের দুরবস্থার কিছু পরিবর্তনের জন্য শাসনের সুবিধার্থে ইংরেজরা যা করতে চেয়েছিল দুই ভাগে, অতীতে বেশ কয়েকবার তাই করা হয়েছে কয়েক ভাগে। তাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে বাঙালির ঐক্য বিনষ্ট করার অভিযোগটি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক বক্তব্য বলা যায়। ইতিহাসে কাল্পনিক দৈত্যরাজ বলির কথিত পাঁচ পুত্রের নাম অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ডু ও সুহ্ম। মনে হয় নুহ আ:-এর পুত্রের নাম বঙ্গ, ‘বাঙ’ জাতির আধিপত্য থাকা ইত্যাদি কথার ভিত্তি নেই । আইন-ই-আকবরীতে বাংলায় প্লাবন ঠেকাতে নির্মিত উঁচু বাঙ্গের (বাঁধ) কথা আছে। এর সাথে ‘আল’ যুক্ত হয়ে ‘বাঙাল’ নাম হওয়ার কথা আছে ইতিহাসে। অনেক পণ্ডিতের অনুমান, বাংলায় আদি অস্ট্র্রিকদের ভাষায় দেবতাবোধক ‘বোঙ্গা’ শব্দ থেকে তার ভক্ত অর্থে ‘বঙ্গ’ শব্দের উদ্ভব হয়েছে।

ঐতিহাসিক সত্য হলো- বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তারে সম্রাট অশোক যে অবদান রেখেছেন, খ্রিষ্টধর্ম ইউরোপে বিস্তারে তদ্রƒপ অবদান রেখেছেন রোমান সম্রাট প্রথম কনস্ট্যান্টাইন। বৌদ্ধ নির্যাতনকারী সেন বংশের পতন মুসলমান কর্তৃক ঘটার পরে ‘শূন্য পুরাণে’ আনন্দিত বৌদ্ধদের রচিত ছড়ার কয়েকটি লাইন হলো : ‘ব্রহ্মা হইল মহাম্মদ, বিষ্ণু হইল পেগাম্বর, আদম হইল সুলপানি, গণেশ হইল কাজী, কার্তিক হইল গাজী, ফকির হইল যত মুনি।’ অতএব নিপীড়ক সেন বংশের রাজত্বকালে বৌদ্ধদের দ্বিতীয় উত্থানের মতো বিকৃত তথ্যের বই পাঠকের জন্য ভ্রান্তপথের পাথেয় বৈকি।


আরো সংবাদ