১৮ নভেম্বর ২০১৯

সংগ্রামী জননেতা তরিকুল ইসলাম

তরিকুল ইসলাম - ফাইল ছবি

দেশপ্রেমিক, সংগ্রামী প্রগতিশীল, জাতীয়তাবাদী, দক্ষ, সৎ ও সজ্জন এক জনদরদি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও জননেতা। বৃহত্তর যশোর তথা এ দেশের এক কীর্তিমান পুরুষ। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম। এক বছর আগে তিনি চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। মরহুম তরিকুল ইসলাম সারা জীবন দেশ ও জনগণের কল্যাণে, অসত্যের বিরুদ্ধে ও সত্যের সন্ধানে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অকুতোভয় সৈনিকের ভূমিকা রেখেছেন। রাজনীতিতে, দেশ পরিচালনায়, সমাজ পরিবর্তনে এবং জনসেবায় নিজেকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। তার মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ রাজনীতি এবং বিএনপি একজন ত্যাগী, ন্যায়নিষ্ঠ ও সাহসী নেতাকে হারিয়েছে।

তরিকুল ইসলাম ১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর যশোর শহরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত সফল জীবনে পদচিত্র রেখে ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর তারিখে তিনি পরলোক গমন করেন। মরহুম ইসলাম ১৯৬১ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৬৩ সালে মাইকেল মধুসূদন কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৬৮ সালে একই কলেজ থেকে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে এমএ পাস করেন। বরাবরই একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন।

মরহুমের রাজনীতিতে হাতেখড়ি, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভের মাধ্যমে। একজন কর্মী হিসেবে যাত্রা শুরু করে তিনি যশোর জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে যশোর এম এম কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে একজন ছাত্রনেতা হিসেবে বৃহত্তর যশোর জেলায় প্রচারকার্যে বিরাট ভূমিকা রাখেন। এতে আইয়ুব সরকার তার প্রতি ক্ষুব্ধ এবং তিনি গ্রেফতারসহ নানা নির্যাতনের শিকার হন। এম এম কলেজে শহীদ মিনার তৈরির উদ্যোগ নেয়ায় তাকে প্রথম কারা ভোগ করতে হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে যশোরের এম এন এ-এর মিথ্যা মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে তরিকুল ইসলাম ৯ মাস কারাবরণ করেন। ১৯৬৯ সালে গণতান্ত্রিক ছাত্র গণ-আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়েও কয়েক দিনের জন্য তাকে হাজতবাস করতে হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্র গণ-আন্দোলনে তার পুরো ছাত্রজীবন অতিবাহিত হয়েছিল।

মরহুম তরিকুল ইসলাম ১৯৭০ সালে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগদান করেন। ১৯৭১-এ ভারতে অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখেন। স্বাধীন হওয়ার পর দেশে ফিরে তিনি ন্যাপের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৭৩ সালে যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৭৮ সালে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের দুঃশাসন, একনায়কসুলভ আচরণ ও রক্ষীবাহিনীর নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় তিনি ১৯৭৫ সালে তিন মাস কারাভোগ করেন। ১৯৭৯ সালে ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান যাদু মিয়ার নেতৃত্বে ন্যাপ বিলুপ্ত করে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগদান করেন। ১৯৭৫ সালে শাসকদল আওয়ামী লীগ এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল সৃষ্টির ফলে যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা পূরণের লক্ষ্যে শহীদ জিয়া বিএনপি প্রতিষ্ঠা করে ছিলেন। বিএনপির আদর্শ এবং শহীদ জিয়ার উৎপাদনের রাজনীতিতে আকৃষ্ট হয়ে তরিকুল বিএনপিতে যোগদান করেন। এর পরপরই দলের যশোর জেলা কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব প্রদান করেন। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে যশোর-৩ আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। এর মাধ্যমে সংসদীয় রাজনীতিতে তার অভিষেক ঘটে।

১৯৮০ সালে জেলা বিএনপির প্রথম সম্মেলনে তিনি সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালে বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় তরিকুল ইসলাম সড়ক ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে অস্ত্রের মুখে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক আইন জারি করেন সেনাপতি এরশাদ। তার ক্ষমতা দখলের পর বিএনপি নেতাদের গ্রেফতার ও নির্যাতন এবং অন্য দিকে, বিএনপি ভাঙার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। শহীদ জিয়ার আদর্শের সৈনিক ও সাচ্চা জাতীয়তাবাদী নেতা তরিকুল ইসলাম দল ভাঙার খেলায় যোগ দেননি। তিনি সাহসের সাথে বিএনপির মূল ধারায় শক্তভাবে অবস্থান গ্রহণ করেন। ফলে মরহুম তরিকুল ইসলামের ওপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। ১৯৮২ সালেই তাকে গ্রেফতার এবং এরশাদ হত্যার চেষ্টার কথিত মামলায় আসামি করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে অনেক দিন অজ্ঞাত স্থানে রেখে নির্মমভাবে নির্যাতন করা ছাড়াও দীর্ঘ ৯ মাস কারাবন্দী রাখা হয়।

মুক্তিলাভের পর তিনি বিএনপির নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত আন্দোলনে বৃহত্তর যশোর জেলা এবং কেন্দ্রে সাহসী ভূমিকা রাখেন। এর স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৬ সালে বিএনপির পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটিতে বেগম জিয়া তাকে দলের যুগ্ম মহাসচিবের পদে অধিষ্ঠিত করেন। দায়িত্বশীল একজন নেতা হিসেবে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার একজন বিশ্বস্ত ও নিবেদিত প্রাণকর্মী রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। আন্তর্বর্তীকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ’৯১-এর নির্বাচনে জনগণ বেগম খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন করে। তিনি তরিকুল ইসলামকে ১৯৯১ সালে সমাজকল্যাণ ও মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করেন। ১৯৯২ সালে তাকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করা হয়। খালেদা জিয়া সরকারের মেয়াদকালের পূর্ণ সময় তিনি দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সময়কালে তিনি বিরোধী দলের একজন নেতা হিসেবে সরকারের গণবিরোধী কার্যকলাপের প্রতিবাদ করেন এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে সাহসী ভূমিকা রাখেন। জাতীয় স্বার্থবিরোধী গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরোধিতা করে যশোর এবং কেন্দ্রে আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার পার্বত্য চুক্তিবিরোধী ঐতিহাসিক লংমার্চে তিনি বীরোচিত ভূমিকা পালন করে ছিলেন।

২০০১ সালের নির্বাচনে তরিকুল ইসলাম যশোর-৩ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দেশনেত্রী বেগম জিয়া দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে সরকারে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত সময়কালে তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। এ সময়কালে মরহুম তরিকুল ইসলাম বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান পদে উন্নীত হন। ২০০১-২০০৬ সময়কালে সরকারে এবং দলে দায়িত্বে থাকাকালে নিষ্ঠা ও দক্ষতার পরিচয় দেন।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জাতীয় জীবনে এক কলঙ্কময় অধ্যায়ের সূচনা হলো। জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাতিল এবং দেশে জরুরি আইন জারি করে ‘১/১১’ নামের অসাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সরকার ‘মাইনাস টু’ এবং বিরাজনীতিকীকরণের অ্যাজেন্ডা নিয়ে দেশের দুই বৃহৎ দলের দুই প্রধানসহ প্রায় সব নেতাকে ঢালাওভাবে অপবাদ দিয়ে গ্রেফতার করেছিল। মরহুম তরিকুল ইসলামও গণগ্রেফতার থেকে রেহাই পাননি। ২০০৭ সালের ৭ মার্চ আমি নিজেও গ্রেফতার হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ‘কর্ণফুলী’ সেলে অন্তরীণ ছিলাম। ‘কর্ণফুলী’তে দু’টি সামনা-সামনি বিল্ডিং দেয়াল দ্বারা অন্যান্য ওয়ার্ড বা সেল থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। এপ্রিল মাসে তরিকুল ইসলামকে যশোর কারাগার থেকে কর্ণফুলী সেলে আনা হয়। তখন কর্ণফুলীর দুই বিল্ডিংয়ে দুই দলের ১২-১৩ জন নেতা অন্তরীণ ছিলাম। মরহুম তরিকুল ইসলামকে যখন কর্ণফুলীতে আনা হয়, তখন তিনি বেশ অসুস্থ ছিলেন। রাতে তাকে অক্সিজেন ও ইনহেলার গ্রহণ করে ঘুমাতে হতো। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইনসুলিন নিতে হতো। অন্য দিকে তার স্ত্রী ও সন্তানরা বিভিন্ন মিথ্যা মামলার আসামি হয়ে পলাতক ছিলেন। এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও তাকে সহাস্য, সাহসী এবং প্রাণচঞ্চল দেখে অবাক হয়েছি। তিনি নিজের উদাহরণ দিয়ে কর্ণফুলীর অন্য বন্দীদের সান্ত্বনা দিতেন, সাহস জোগাতেন। তিনি যে অসুস্থ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, তা কাউকে বুঝতে দিতেন না। মরহুম তরিকুল ইসলাম ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে ১/১১-এর ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতেও সাহসী, দৃঢ়চিত্ত, নীতির প্রতি আপসহীন রাজনৈতিক যোদ্ধা ছিলেন। তিনি একজন নির্যাতিত ও সংগ্রামী নেতার রোল মডেল। ২০০৯ সালের দলের জাতীয় কাউন্সিলে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নীতিনির্ধারণী ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটির’ সদস্য নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

মরহুম তরিকুল ইসলামের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী যখন আমরা পালন করছি, তখন বিএনপির চেয়ারপারসন, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, গণতন্ত্রের ‘মা’ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে প্রায় ১৮ মাস ধরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় কারাবন্দী। দেশে চলছে অলিখিত একদলীয় শাসন, গণতন্ত্র আজ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বাক্সে বন্দী, লুটেরাদের কবলে অর্থনীতি বিধ্বস্ত, বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রিত, জনগণ নিরাপত্তাহীন এবং দ্রব্যমূল্য জনগণের নাগালের বাইরে। সর্বক্ষেত্রে ভয়ানক পচন ধরেছে। চাপাবাজি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ক্যাসিনোবাজি, গুম, খুন, অপহরণ ও ধর্ষণসহ সব অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জাতি আজ বিধ্বস্ত। এ অস্বাভাবিক পরিস্থিতি থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে তরিকুল ইসলামের সংগ্রামী জীবন থেকে অনুপ্রেরণা ও শিক্ষা নিয়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের সবার জন্য মরহুম তরিকুল ইসলাম সংগ্রামী ও সাহসী ব্যক্তির প্রতিচ্ছবি ও বাতিঘর। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে বেহেশত নসিব করুন।

লেখক : সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী, সদস্য, জাতীয় স্থায়ী কমিটি, বিএনপি এবং সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান,
ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাবি


আরো সংবাদ