১২ ডিসেম্বর ২০১৯

‘বঙ্গশার্দুল’ বাহিনীর জনক মেজর এম এ গণি

মেজর মোহাম্মদ আবদুল গণি - ছবি : সংগ্রহ

এমন এক বীরপুরুষের কথা লিখছি যার অসম সাহস, দেশপ্রেম ও অব্যাহত প্রচেষ্টার ফসল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এ বাহিনীর যারা বীজ বপন করেছিলেন, তাদের অন্যতম ছিলেন মেজর মোহাম্মদ আবদুল গণি। ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরিরত, দুঃসাহসী কিছু বাঙালি মুসলমান সামরিক অফিসার এ ভূখণ্ডের অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায় জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। তাদের অন্যতম হলেন মেজর গণি। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা বা জনক হিসেবে তিনি ‘বঙ্গশার্দুল’ ও ‘টাইগার গণি’ নামে পরিচিত।

১৯৪৭ সালের আগে ব্রিটিশ-ভারতের সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর লোকদের নিয়ে তাদের নামে রেজিমেন্ট ছিল। কিন্তু ছিল না অবহেলিত বাঙালি জাতির কোনো রেজিমেন্ট। বিশ্বযুদ্ধের প্রয়োজনে বাঙালিদের নিয়ে কিছু বাঙালি রেজিমেন্ট গঠন করা হলেও যুদ্ধ শেষে সেগুলো ভেঙে দেয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালি সৈনিকদের পাশাপাশি কিং কমিশনড অফিসার যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মেজর জেনারেল মুহাম্মদ ইশফাকুল মজিদ (১৯০৩-১৯৭৩), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খাজা ওয়াসিউদ্দিন (১৯২০-১৯৯২), জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী (১৯১৮-১৯৮৪), মেজর আবদুল গণি (১৯১৫-১৯৫৭)। তারা প্রধানত বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে একটি রেজিমেন্ট গঠনের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। পাকিস্তান কায়েম হওয়ার সূচনালগ্নেই মেজর গণির স্বপ্ন বাস্তবায়িত অর্থাৎ প্রতিষ্ঠিত হয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়ন ১ ইস্ট বেঙ্গল।

১৯১৫ সালের পয়লা ডিসেম্বর কুমিল্লার বর্তমান ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার নাগাইশ গ্রামে মেজর মোহাম্মদ আবদুল গণি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের আড়াই বছর পরই তার মমতাময়ী মা ইন্তেকাল করেন। পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী, তাকে মাদরাসায় ভর্তি করা হয়। ফলে জীবনের শুরুতেই তিনি পবিত্র কুরআন ও হাদিসের ওপর জ্ঞানার্জনের সুযোগ লাভ করেন, যা তার বাকি জীবনের নানা কাজে প্রভাব ফেলে। কিছু দিন তিনি স্কুলেও পড়ালেখা করেন। স্থানীয় জুনিয়র মাদরাসায় চূড়ান্ত পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার পর তাকে চট্টগ্রামে ইসলামিয়া হাই মাদরাসায় ভর্তি করা হয়। তিনি খেলাধুলায় অংশ নিয়ে প্রতিযোগিতায় কৃতিত্বের পরিচয় দেন। শৈশবেই তার মধ্যে সমাজসেবার প্রতি প্রবল আকর্ষণ লক্ষ করা যায় এবং এর মাধ্যমে নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হয়।

প্রাথমিক শিক্ষার সময়ে ছাত্রদের সঙ্ঘবদ্ধ করে খেলাধুলা, কুচকাওয়াজ, জনসেবা ইত্যাদি কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। চট্টগ্রামে অধ্যয়নকালে মাদরাসার ছাত্রদের নিয়ে মহানবী সা:-এর ‘হিলফুল ফুজুল’-এর অনুসরণে গড়ে তোলেন ‘সবুজ কোর্তা’ নামে সমাজসেবামূলক সংখ্যা গঠন। সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এর তরুণেরা খেলাধুলা ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিতেন। ‘সবুজ কোর্তা’র মাধ্যমে তরুণদের সামরিক রীতিনীতির ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান ও দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে একে আধা সামরিক বাহিনীতে পরিণত করা হয়। ১৯৩৩ সালের ডিসেম্বর মাসে চট্টগ্রামে আন্তঃজেলা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় এম এ গণির নেতৃত্বে সবুজ কোর্তা ও মাদরাসার ছাত্রদের সম্মিলিত কুচকাওয়াজে তিনি ব্যক্তিগত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। বিভাগীয় কমিশনার তার সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের ভূয়সী প্রশংসা ও পুরস্কার প্রদান করেন।

গণির ছাত্রজীবন কেটেছে অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তার অমায়িক আচার-আচরণ, নম্রতা, বিনয়, শিষ্টাচার, সাহসিকতা, সমাজসেবা, পরোপকারী মনোভাব দেখে অনেক সরকারি কর্মকর্তা তার হিতাকাক্সক্ষীতে পরিণত হন। আর্থিক অভাবের সময় এগিয়ে আসেন চট্টগ্রামের তদানীন্তন মহকুমা প্রশাসক হামিদ হাসান নোমানী ছিলেন অবাঙালি মানবহিতৈষী ব্যক্তিত্ব। গণিকে তিনি তার ছেলের সাথে চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুলে ভর্তি এবং নিজ বাড়িতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। নোমানী খুলনা জেলায় বদলি হলে গণিকেও তিনি সাথে নিয়ে নিজ ছেলের সাথে খুলনা জেলা স্কুলে ভর্তি করান। ১৯৩৬ সালে এই স্কুল থেকেই গণি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং এখানেও তার আর্থিক সঙ্কট ছিল। কিন্তু মহান আল্লাহই তাকে অভিভাবক জুটিয়ে দেন।

তখন তার মামা ডাক্তার সোবহান বার্লিন ইউনিভার্সিটি থেকে এমডি ডিগ্রি অর্জন করে কলকাতায় চলে আসেন এবং এগিয়ে আসেন ভাগ্নের সহযোগিতা করার জন্য। ইসলামিয়া কলেজ থেকে এম এ গণি ১৯৩৮ সালে আইএ এবং ১৯৪০ সালে বিএ পাস করেন। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ইসলামিয়া কলেজে বিএ ক্লাসে গণির সহপাঠী ছিলেন। বিএ পরীক্ষার পরপরই তিনি কলকাতা ফায়ার ব্রিগেডে অফিসার পদে নিয়োগ লাভ করেন এবং এখানে তিনিই ছিলেন প্রথম বাঙালি মুসলমান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা যখন বেজে উঠল, তিনি ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিং কমিশন অফিসার পদের জন্য আবেদন করলেন। সব পরীক্ষায় সফল হয়ে প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন। ১৯৪২ সালে ভারতীয় পাইওনিয়ার কোরে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। গণি ছিলেন অত্যন্ত কর্তব্যপরায়ণ, নিষ্ঠাবান, পরিশ্রমী, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমান, নির্ভীক, বিনয়ী, কৌশলী ও কর্মতৎপর অফিসার; যা সব ব্রিটিশ অফিসারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তিনি তাদের প্রিয়ভাজন ছিলেন। ১৯৪২ সালে লেফটেন্যান্ট এবং ১৯৪৩ সালে ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হন। এ সময় তাকে বার্মার আরাকানে জাপানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপারেশনে পাঠানো হয়।

সেখানে তিনি তীক্ষ্ণ মেধা-বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতা, রণকৌশল, বীরত্ব ও ক্ষিপ্রতাকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধ করতে থাকেন। তার পারফরম্যান্সে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন খুবই সন্তুষ্ট। এক সময় জাপানের একটি ডিভিশন ক্যাপ্টেন গণির ইউনিটকে চতুর্দিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। কিন্তু দুঃসাহসী গণি দমে যাননি।

বুদ্ধিমত্তা ও রণকৌশলকে কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন। তার এ অসম সাহসের বর্ণনা পাওয়া যায় শামসুল আলমের লেখা থেকে : ‘দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ক্যাপ্টেন গণি বার্মা ও আরাকান রণাঙ্গনে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। একপর্যায়ে জাপানিদের দ্বারা কয়েক হাজার সৈন্য অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পাহাড়ি অঞ্চল বলে মূল বাহিনী থেকে তাদের খাদ্য পাঠানো ছিল খুবই অসুবিধাজনক। অত্যন্ত সাবধানতার সাথে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে কিছু খাদ্য সরবরাহ করা হতো। পরিশেষে প্রস্তরসঙ্কুল পর্বতের ভেতর দিয়ে সুড়ঙ্গ কেটে ক্যাপ্টেন আবদুল গণির নেতৃত্বে আটকা পড়া ১২০০ সৈন্যের বিরাট বাহিনী প্রতিরোধ ভেদ করে বের হয়ে আসে।’

এ বিপজ্জনক সময়ে বাঙালি মুসলমান সৈনিকদের সাহস ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখে ক্যাপ্টেন গণি উৎসাহিত হন তাদের নিয়ে একটি রেজিমেন্ট গঠন করতে। মহাযুদ্ধ শেষ হলে ১৯৪৬ সালে ক্যাপ্টেন গণিকে ভারতের ঝালনায় কোর সেন্টারে বদলি করা হয়। এ সময়ে তিনি দাক্ষিণাত্যের বিশাখাপত্তম, হায়দরাবাদ, সেকান্দারাবাদ ও মুম্বাইতে সেনাবাহিনীতে লোক ভর্তি করার দায়িত্ব পালন করেন। এটা তার জীবনে বড় ধরনের একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজে লাগে। এখানে তিনি দু’টি পাইওনিয়ার কোম্পানির অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর ব্রিটিশ জেনারেল স্যার মেসারভি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন। তিনি ক্যাপ্টেন গণিকে চিনতেন মহাযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য। সেই সুবাদে গণি মেসারভিকে বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে একটি রেজিমেন্ট গঠন করার অনুরোধ জানিয়ে পত্র লিখেন। এ পত্রের সাথে তিনি প্রাসঙ্গিক সব তথ্য ও যুক্তি পেশ করে ২০ পৃষ্ঠার একটি স্মারকলিপিও পেশ করেছিলেন। মেসারভি বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছিলেন এবং জানান, ‘আমি আশা করি বিশ্বকে তোমরা দেখাতে পারবে, বাঙালি মুসলমান সৈনিকরা অন্য সৈনিকদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।’

কোর সেন্টারের অধিনায়ক লে. কর্নেল মারিয়াটি বাঙালি রেজিমেন্ট গঠনের বিষয়ে ক্যাপ্টেন গণিকে পরামর্শ ও উৎসাহ প্রদান করেছিলেন। ক্যাপ্টেন গণির অধীনে ১২৫৬ ও ১৪০৭ পাইওনিয়ার কোম্পানি দু’টি বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে গঠিত ছিল বলে এগুলো নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর অধীনে প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। ফলে ১৯৪৭ সালে তার নেতৃত্বে কোম্পানি দু’টির সৈন্যদের বিশেষ ট্রেনে মুম্বাই থেকে ঢাকায় আনা হয়েছিল।

ঢাকায় আসার পর বাঙালি রেজিমেন্ট গঠন করার জন্য ক্যাপ্টেন গণি জোর তৎপরতা শুরু করেন। পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ক্যাপ্টেন গণিকে ভালোভাবে চিনতেন। তিনি গণিকে রেজিমেন্ট গড়ার ব্যাপারে আশ্বাস প্রদান করেন। এ সময় ক্যাপ্টেন গণিকে রংপুরে ন্যাশনাল গার্ডের অধিনায়ক হিসেবে বদলি করা হয়।

মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে রংপুর থেকে তাকে নারায়ণগঞ্জে রিক্রুটিং অফিসার হিসেবে বদলি করা হয় বাঙালি যুবকদের সৈনিক পদে ভর্তি করার জন্য, যারা প্রশিক্ষণের পর নবগঠিত রেজিমেন্টে যোগ দেবে। তিনি এ সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগান এবং ছয় ফুট দীর্ঘ স্বাস্থ্যবান যুবকদের বেছে বেছে সৈনিক পদে ভর্তি করান, যেন অন্যান্য রেজিমেন্টের চেয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকেরা বেশি আকর্ষণীয় ও শক্তিশালী হয়। সারা প্রদেশে তিনি ঘুরে বেড়ান উপযুক্ত লোকদের ভর্তি করার জন্য। কঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন সঠিক ব্যক্তিকে রিক্রুট করার জন্য, যাতে বাঙালি রেজিমেন্টের সৈনিকরা হয় সবচেয়ে উত্তম। তাদের ঢাকার কুর্মিটোলায় কঠোর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

অবশেষে বাঙালি মুসলমানদের দীর্ঘ দিনের আকাক্সক্ষা, ক্যাপ্টেন গণির আজীবন লালিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে। পাকিস্তান সরকার শুরুতেই ক্যাপ্টেন গণি ও আরো অনেকের ইচ্ছানুযায়ী একটি রেজিমেন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর নামকরণ করা হয় ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সেনা সদর দফতর থেকে এ রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়ন ১ ইস্ট বেঙ্গল গঠন করা জন্য পত্র জারি করা হয়।

ক্যাপ্টেন গনি ও ক্যাপ্টেন এস ইউ খানকে দায়িত্ব দেয়া হয় ঢাকা সেনানিবাসে ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠা করার জন্য। মেজর এ ডব্লিউ চৌধুরী ও মেজর সাজাওয়াল খানকে এ ইউনিটের দু’টি কোম্পানির অধিনায়ক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ক্যাপ্টেন গণি ও অন্যান্য অফিসার আপ্রাণ চেষ্টায় মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল গঠনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রিটিশ অফিসার লে. কর্নেল ভি জে ই, প্যাটারসনকে প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক নিয্ক্তু করা হয়। ১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কুর্মিটোলায় প্রতিষ্ঠিত হয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়ন ১ ইস্ট বেঙ্গল।

বর্ণাঢ্য এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রদেশের তৎকালীন গভর্নর স্যার ফ্রেডারিক বোর্ন, মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন, মন্ত্রিপরিষদের সব গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, উপ-আঞ্চলিক অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান (পরে প্রেসিডেন্ট), উচ্চপদস্থ সব সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা। রেজিমেন্টের মাধ্যমে বীজ বপন করা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সেনানিদের। ‘সৌম্য, শক্তি ও ক্ষিপ্রতা’র আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে যাত্রা শুরু করে ‘বঙ্গশার্দুল’ বাহিনী। কে জানত, এ রেজিমেন্টই একদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেবে!

আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উত্তোলন পর্বের চা চক্রে তদানীন্তন ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান সবার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘From now onwords Bengali soldiers will speak in Urdu, not in Bengali.’ এ কথার তীব্র প্রতিবাদ করে ক্যাপ্টেন গণি সবার সামনে বলেছিলেন, ‘Excuse me Sir, We Bengali soldiers will never speak in Urdu, but in our mother tongue Bengali.’ এর জবাবে আইয়ুব খান ‘Shut up. Sit down.’ বলে ক্যাপ্টেন গণিকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন। কিন্তু এ দুঃসাহসী ভূমিকার জন্য তাকে ‘টাইগার গণি’ আখ্যা দেয়া হয়। এ রকম সৎসাহস ও স্পষ্টবাদিতার উদাহরণ আজকের দিনে বিরল।

এ ঘটনার পর থেকে সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন গণি অনেকের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিলেন। তাই একজন চৌকস অফিসার হওয়া সত্ত্বেও তার পদোন্নতি হচ্ছিল না। ইস্ট বেঙ্গল থেকে তাকে বদলি করা হয়েছিল ন্যাশনাল গার্ড, দিনাজপুরে। সর্বশেষ তাকে ১৪ ডিভিশন হেডকোয়ার্টার, ঢাকায় বদলি করা হয়। যথাযথ মূল্যায়ন ও পদোন্নতি না হওয়ায় ১৯৫৩ সালে তিনি ক্ষোভে, দুঃখে পদত্যাগ পত্র দাখিল করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে অবসর প্রদান করা হয়। অবশ্য তার অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ অবসরোত্তর ‘মেজর’ হিসেবে পদোন্নতি প্রদান করা হয়।

এবার মেজর গণি দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে রাজনীতিতে নেমে পড়েন। তার মধ্যে শৈশব থেকেই নেতৃত্বের গুণাবলি ছিল। তিনি ছিলেন ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে সুশিক্ষিত। আরবি, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় অনর্গল বক্তৃতা দিতে পারতেন। কুরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতিসহ সে বক্তব্য শোনে অসংখ্য মানুষ তার ভক্তে পরিণত হয়। তিনি উদীয়মান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৫৪ সালের ২২ মার্চ প্রাদেশিক পরিষদের ঐতিহাসিক নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি এতই জনপ্রিয় ছিলেন যে, বিপুল ভোটের ব্যবধানে তিনি নির্বাচিত হন। প্রথম দিন থেকেই তিনি এ দেশের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য কাজ শুরু করেন। তার সামগ্রিক চেষ্টা ছিল দেশ ও জাতির কল্যাণ, সাম্য, ইনসাফ, ন্যায়নীতি কায়েম, চারিত্রিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সত্য ও সুন্দরের প্রতি আহ্বান জানানো। একজন আদর্শ নেতা হিসেবে তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, সৎ, মানবতাবাদী, দেশপ্রেমিক, বিচক্ষণ, দূরদর্শী, স্পষ্টভাষী, জনদরদী ব্যক্তিত্ব। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি সরকারের কাছে দেশ ও জাতির কল্যাণে বেশ কিছু দাবি উত্থাপন করেন।

যেমন- প্রতিরক্ষা বাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানের যুবকদের কমিশন্ড অফিসার হিসেবে যোগদানের জন্য ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং সারা দেশের যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। পার্লামেন্টে তিনি জ্বালাময়ী ভাষায় যুক্তিপূর্ণভাবে মাটি ও মানুষের কথা তুলে ধরতেন। তার বক্তব্য এতই শ্রুতিমধুর ও আকর্ষণীয় ছিল যে, প্রত্যেক সদস্য ও স্পিকার স্বয়ং মনোযোগ দিয়ে তা শুনতেন। ফলে সরকার তার যুক্তিপূর্ণ অনেক দাবি মেনে নেন। তিনি অসহায় মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য প্রাণান্তকর পরিশ্রম করছিলেন। মানুষের কল্যাণ সাধনই ছিল তার জীবনের ব্রত।

মেজর আবদুল গণি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, ‘Islam is not only a religion but a complete code of life.’ মানুষের ওপর মানুষের শোষণ, জুলুম, নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তির পথ হিসেবে ইসলামী জীবনাদর্শকেই একমাত্র পথ হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। তাই তিনি ইসলামী দল গঠনের উদ্যোগও নিয়েছিলেন। এর নাম দেয়া হয়েছিল ‘ইসলাম লীগ’। মেজর আবদুল গণি ১৯৪৩ সালে তার মামাতো বোন আছিয়া খাতুনের সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন আদর্শ স্বামী। তিনি দুই ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। প্রথম ছেলে কর্নেল তাজুল ইসলাম গণি ও ছোট ছেলে লে. কর্নেল খালেদ গণি। উভয়েই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার ছিলেন।

মেজর মোহাম্মদ আবদুল গণি ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন। ক্ষণজন্মা এ বীর পুরুষ, সামরিক অফিসার, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মাত্র ৪২ বছর বেঁচে ছিলেন। ১৯৫৭ সালের ২৯, ৩০ ও ৩১ অক্টোবর তিন দিনব্যাপী বিশ্ব প্রাক্তন সৈনিক সংস্থা (World Veteran Soldiers Conference) আয়োজিত সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদানের জন্য জার্মানির ফ্রাঙ্কফ্রুটে গমন করেন। এ সম্মেলনে তিনি তার জীবনের সবচেয়ে উদ্দীপনামূলক ভাষণ প্রদান করেন। একপর্যায়ে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। সাথে সাথে তাকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ১১ নভেম্বর ১৯৫৭ সালে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে তিনি মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ সুবাহানু ওয়া তায়ালার কাছে গমন করেন। তার লাশ দেশে আনার পর সামরিক মর্যাদায় কুমিল্লা সেনানিবাসে দাফন করা হয়।

মেজর গনির অবদানে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো- এ জাতির জন্য বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র সৃষ্টির নিমিত্তে যুদ্ধ করার জন্য একদল আত্মত্যাগী, জানবাজ সংগ্রামী বীর সেনানির রেজিমেন্ট সৃষ্টি করা।
[email protected]


আরো সংবাদ