১৩ নভেম্বর ২০১৯

বিশ্বনবী সা:

বিশ্বনবী সা: - ছবি : সংগ্রহ

মহান আল্লাহ তায়ালার অশেষ করুণা ও কৃপায় আমরা পবিত্র রবিউল আউয়াল মাস অতিক্রম করছি। এই পবিত্র মাসেই ‘বিশ্বনবী’ ও সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা:কে আল্লাহ পাক শান্তির অমিয় বাণী দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। রবিউল আউয়াল মাস মানবজাতির জন্য অনন্য উপহার। কারণ এটি রাসূল সা:-এর সাথে সম্পৃক্ত বিশেষ মাস। ১২ রবিউল আউয়াল পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সা:। দয়াল নবীজীর শুভাগমনের দিন বা মিলাদের দিন হলো একটি খুশির ও আনন্দের দিন। প্রচলিত মতে, ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট, ১২ রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার হজরত মুহাম্মদ সা: পবিত্র মক্কা নগরীতে কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জুন, ১২ রবিউল আউয়াল ১১ হিজরি সোমবার ৬৩ বছর বয়সে মদিনায় ইন্তেকাল করেছিলেন। তার বাবার নাম আবদুুল্লাহ এবং মায়ের নাম আমিনা।

১২ রবিউল আউয়াল যেদিন ও যে মুহূর্তে মহানবী সা:-এর ধূলির ধরায় আগমন করেন, সেদিন ও সে মুহূর্তটি বিশ্বজগতের জন্য পরম সৌভাগ্য ও মহানন্দের দিন। কেননা, তিনি সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ ও মহামানব। তিনি বিশ্বমানবতার প্রতীক এবং সত্য সুন্দরের চিরন্তন বাণীবাহক। তার পরশপাথরে অতীব বর্বর আরবজাতি একটি সুমহান জাতিতে পরিণত হয়েছিল। তিনি নির্যাতিত মানুষসহ সব মানুষের ছিলেন অকৃত্রিম বন্ধু ও পরম কল্যাণকামী। ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় হেরা গুহায় নবুওয়াত লাভের পর ইসলামের বাণী প্রচারে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। তিনি মক্কাবাসীর অবর্ণনীয় অত্যাচার ও নির্যাতনের মুখে আল্লাহর নির্দেশেই ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে ২৪ সেপ্টেম্বর মদিনায় হিজরত করেন। মহান আল্লাহ তাওহিদের বাণী প্রচারে আরব জাহানে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়, নতুন সভ্যতা সংস্কৃতির উন্মেষ আবির্ভাব ঘটে। এক নতুন জীবন ব্যবস্থার সূচনা হলো। অচিরেই নতুন সভ্যতা, ঐক্য, শান্তি, সাম্য ও মানবকল্যাণের চিন্তা-চেতনা বিশ্বের সার্বিক চিন্তাধারাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। নবুওয়য়ত প্রাপ্তির মাত্র ২৩ বছরের মধ্যে এত বড় অভাবনীয় সাফল্য আর কোনো মহাপুরুষ অর্জন করতে পারেননি। নবী-রাসূলগণ অত্যন্ত মানবিক ও মানবতাবাদী। তাঁরা জ্ঞানের ধারক ও বাহক।

মানবকল্যাণের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিভাবক হলো পবিত্র আল কুরআন। ঐশীগ্রন্থ আল কুরআন বিশ্ববাসী তথা মানবজাতির জন্য আল্লাহ তায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত ও আশীর্বাদ। কুরআন জ্ঞান ও ক্ষমার ফল্গুধারা। আল কুরআন শুধু মুসলমানদের সম্পদ নয়, বিশ্বমানবের মহাসম্পদ। ৩০ পারা কুরআনে সমগ্র মানবজাতির শাশ্বত কল্যাণ নিহিত। মহাবিশ্বের মহাবিস্ময় আল কুরআন মানবতার কাণ্ডারি। মহাগ্রন্থ আল কুরআন নিঃসন্দেহে আল্লাহর বাণী এবং ও সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর ওপর নাজিলকৃত শ্রেষ্ঠ ও শেষ আসমানি কিতাব। অপর দিকে, হজরত মুহাম্মদ সা:-এর বাণীগুলো শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর সব মানুষের জন্য কল্যাণকর। মুক্তির দিশারী হজরত মুহাম্মদ সা: প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টির অনন্য উপলক্ষ এ বিষয়টি মনে রেখেই তাঁকে অনুসরণ করতে হবে। অন্যথায় হজরত মুহাম্মদ সা:-এর অমূল্য জীবন ও আদর্শের অবমূল্যায়ন হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘হে নবী আমি আপনাকে সৃষ্টি না করলে সমগ্র বিশ্বের কোনো কিছুই সৃষ্টি করতাম না।’ যাকে উদ্দেশ করে এই জগতের সৃষ্টি, তাঁকে ছাড়া এই পৃথিবীর অস্তিত্বই কল্পনা করা যায় না বলা চলে। তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও অলৌকিক ঘটনা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হওয়ার পক্ষে সন্দেহাতীত প্রমাণ বহন করে। বিনয় ও নম্রতা ছিল তাঁর ভূষণ। আল্লাহর হুকুম এবং রাসূল সা:-এর জীবন দর্শন মেনে চললে সবখানে শান্তি বিরাজ করবে। উল্লেখ্য, বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর আগে যেসব নবী-রাসূল আ: এসেছিলেন, তারা নিজ কওমের বা নির্দিষ্ট বিশেষ কোনো অঞ্চলের লোকদের হেদায়েত করার জন্য আগমন করেন। তাদের কেউ বিশ্বনবী ছিলেন না। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা: সর্বশেষ নবী ও রাসূল হওয়ার কারণে তার উম্মতের ওপর দ্বীন প্রচারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল বিশেষভাবে।

ইসলাম কোনো জাতির কিংবা কোনো বর্ণের জন্য নয়, কোনো বিশেষ অঞ্চলের জন্য নয়, ইসলাম এসেছে বিশ্বমানবতার প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ মুক্তির জন্য। বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী হিসেবে তাই তিনি বিশ্বনবী, সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও মহামানব। নবীপ্রেম মুসলমানের জন্য একান্ত অপরিহার্য। মুহাম্মদ সা:-এর সততা, বিশ্বস্ততা, চিন্তা-চেতনা, কর্মদক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা ছিল অসাধারণ, অনন্য ব্যতিক্রমধর্মী। মানবতার প্রতীক হজরত মুহাম্মদ সা: ছিলেন আল্লাহ এবং তাঁর বান্দার মধ্যে সেতুবন্ধন। মহানবী সা: সর্বাপেক্ষা সফল রাষ্ট্রনায়ক। তিনি ছিলেন শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অতুলনীয় ও অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব। তিনি পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের আলোকে কল্যাণকামী জাতি গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। রাসূল সা:-এর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হলো মিরাজ এবং রাসূলের একটি বিশেষ মোজেজা। বিশ্বনবী সা:কে আল্লাহ তায়ালা মামুলি উদ্দেশ্য নিয়ে দুনিয়ায় পাঠাননি, বরং বিশ্বমানবতার পরিপূর্ণ কল্যাণের মহতী উদ্দেশ্যেই তাকে এই জগতে পাঠানো হয়েছে। বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠানো হয়েছে তাঁকে।

ইসলাম আমাদের মানসিক, দৈহিক ও আত্মিকভাবে নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। এই নৈতিকতার শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত হজরত মুহাম্মদ সা:। তিনি প্রেরিত হয়েছেন সুমহান নৈতিক গুণাবলি তথা মূল্যবোধের পূর্ণতা সাধনের জন্য। উল্লেখ্য, মাইকেল এইচ হার্ট বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ জন মনীষীর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের ক্রমানুসারে হজরত মুহাম্মদ সা:কে সর্বপ্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। বিশ্বনবী সা:-এর জীবনী লিখতে গিয়ে খ্রিষ্টান লেখক ও প্রখ্যাত ঐতিহাসিক উইলিয়াম মুর বলেছেন, ‘হজরত মুহাম্মদ সা: যে যুগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাকে শুধু সে যুগেরই একজন মনীষী বলা হবে না, বরং তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষী।’ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘হজরত মুহাম্মদ সা: ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি, যার কথা ও কাজের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি।’

রবিউল আউয়াল মাসে আমাদের বেশি করে মহানবী সা:-এর জীবনাদর্শ নিয়ে আলোচনা এবং এর বাস্তবায়নের চেষ্টা করা কর্তব্য। তাঁর জীবনাদর্শ, চরিত্র ও জীবন দর্শন প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণই আলোচনা করে নিজ নিজ জীবনে রূপায়িত করতে হবে। রাসূলুল্লাহর সা:-এর চরিত্র বলতে পাক কুরআন শরিফকে বোঝায়। তার চরিত্র ও আদর্শ আমরা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারি না বলে জীবনে শান্তি, সুবিচার ও সাম্য আসে না। আমাদের মনে এক মুখে আরেক এবং কথার সাথে কাজের মিল নেই বলেই আমরা রাসূলুল্লাহ সা:-এর আদর্শ ও চরিত্র জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারি না। আল্লাহপ্রদত্ত একমাত্র, পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান ইসলামের আলোকে এবং রাসূল সা:-এর রেখে যাওয়া মডেল অনুসারে সমাজ ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনই সবার একমাত্র কাম্য হওয়া উচিত।
লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ, কলারোয়া সরকারি কলেজ, সাতক্ষীরা


আরো সংবাদ