১১ ডিসেম্বর ২০১৯

সমাজ সংস্কারক মুহাম্মদ শামছুদ্দিন

-

মরহুম মাওলানা মুহাম্মদ শামছুদ্দিন ছিলেন তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি, মানবসেবা, অন্তর্দৃষ্টির অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে মহীয়ান। তার ইলম ও ব্যক্তিত্ব বহু মানুষের জীবন ধারায় এনেছে পরিবর্তন। দলমত নির্বিশেষে সব মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল। অত্যন্ত উঁচু মানের আলেমে দ্বীন হওয়া সত্ত্বেও ছিলেন বিনয়ী, নিরহঙ্কার, ভদ্র ও মার্জিত। সুন্নতে রাসূল সা:-এর বাস্তব প্রতিকৃতি। সমাজসেবা ও ইসলামের দাওয়াতে সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত ছিলেন।

চট্টগ্রামের মিরসরাই থানার হাইতকান্দি গ্রামে তাঁর জন্ম। ছাত্রাবস্থা থেকেই মেধাবী ছিলেন। প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করতেন। কর্মময় জীবনে প্রথম শিক্ষকতা করেন। আদর্শ শিক্ষক হিসেবে প্রশংসিত ছিলেন। চট্টগ্রাম স্টেশন রোডস্থ জামে মসজিদের সম্মানিত খতিব ছিলেন ৩১ বছর। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর খতিবের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে আজীবন মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

মহানবী সা: সৎ জীবনযাপনের জন্য ব্যবসায়কে প্রাধান্য দিতেন। সেই আদর্শের অনুসারী মাওলানা তার বড় ভাই মাওলানা তৈয়ব উল্লাহসহ চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে প্রতিষ্ঠা করেন সিমেন্ট ও নির্মাণসামগ্রী প্রতিষ্ঠান ‘মাওলানা ব্রাদার্স’। সে সময় বাংলাদেশে কয়েকটি নির্মাণসামগ্রীর সেরা দোকানের মধ্যে এটি ছিল অন্যতম। তিনি সততা ও সুনামের সাথে ব্যবসায় পরিচালনা করেছেন।

সমাজসেবাই ছিল তার জীবনের মূলমন্ত্র। ১৯৬৩ সালে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে দেশের বিস্তীর্ণ জনপদ বিধ্বস্ত হয়েছিল। তখন তিনি চট্টগ্রাম সিটিজেন রিলিফ কমিটির মাধ্যমে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে দুর্গত মানবতার সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। চট্টগ্রামে ইসলামী সমাজ কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করে গরিব, দুঃখী, এতিম, বিধবাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছেন। পরিষদের তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন আমৃত্যু। এর উদ্যোগে বহু স্কুল, কলেজ, মক্তব, মাদরাসা, এতিমখানা, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতি বছর দেশের সর্ববৃহৎ পাঁচ দিনব্যাপী তফসিরুল কুরআন মাহফিলের আয়োজন করতেন। সেখানে লাখ লাখ লোক তফসির শুনে দ্বীনি কাজে উদ্বুদ্ধ হতেন। মাহফিলে অনেকে ইসলাম গ্রহণ করে দেশ-বিদেশে ইসলাম প্রচারে নিয়োজিত রয়েছেন। তিনি সমাজ ও মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করেই রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি ও পরে আমির নির্বাচিত হন। আমির হিসেবে ২০ বছর দায়িত্ব পালন করেন। স্বৈরশাসনের অবসানের জন্য ১৯৬২ থেকে সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুরোভাগে তিনি ছিলেন। ’৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আইয়ুব খানের বিপক্ষে ফাতেমা জিন্নাহের পক্ষে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। ফলে বেশ কয়েকবার তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয় এবং দুইবার কারারুদ্ধ হয়েছিলেন।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। ফলে তাকে কারাবরণ এবং বহুবার হুলিয়া ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। মিরসরাই আসলে দুইবার পার্লামেন্ট নির্বাচন করে বিপুল ভোটে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। দলমত নির্বিশেষে তাকে সবাই সম্মানের চোখে দেখতেন। তিনি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানের কাছে ও অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। গ্রামে তার বাড়ির পাশে বিপুলসংখ্যক অমুসলিম বসবাস করেন, সুখ-দুঃখে সব সময় এদের পাশে থাকতেন। তাদের আপনজন হিসেবে জানতেন।

সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামী জীবন বিধান কয়েম করার জন্য জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন মাওলানা শামছুদ্দিন। গোটা দেশকেই তিনি নিজের পরিবার হিসেবে চিন্তা করতেন। গরিব জনগণের কথা চিন্তা করে সুদবিহীন ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সুদবিহীন ব্যাংক কিভাবে পরিচালনা করা যায় তার জন্য বহু গবেষণা করেন। তিনি ইসলামের সার্বজনীন অর্থনৈতিক মতাদর্শ বাস্তবায়নের অন্যতম পুরোধা ছিলেন। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তিনি যথেষ্ট অবদান রাখেন এবং ব্যাংকের প্রথম পরিচালনা পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন। আজ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ব্যাংক হিসেবে পরিগণিত। মরহুম মাওলানা শিক্ষাবিদ ও শিক্ষানুরাগী হিসেবে সব সময় চিন্তা করতেন, কিভাবে দেশের তরুণ সমাজকে আধুনিক চিন্তা চেতনার সমন্বয়ের ইসলামী শিক্ষা দেয়া যায়। তিনি স্বপ্ন দেখতেন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার। সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য একটি কনভেনিং কমিটির প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন। ইসলামী আদর্শে অনুপ্রাণিত কয়েকজন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষানুরাগীকে নিয়ে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে এর প্রতিষ্ঠাতা কমিটির সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সভাপতি নির্বাচিত হন মরহুম হজরত মাওলানা আবদুল জব্বার, পীর সাহেব বায়তুশ শরফ। পীর সাহেবের ইন্তেকালের পর মাওলানা শামছুদ্দিন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি এবং সিন্ডিকেটের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। এ পদে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বহাল ছিলেন। আমার নিজের সৌভাগ্য যে আমিও আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রতিষ্ঠাতা।

মরহুম মাওলানা গরিব জনগণের স্বাস্থ্যসেবার জন্য চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ, চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল ডেন্টাল কলেজ, ২৫০ বেডের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও ডেন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন সবারই প্রিয় পাত্র। পরিবারের কোনো সমস্যা হলে তিনি বাস্তব ও সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়ে সমস্যার সমাধান করতেন। তিনি মিতব্যয়ী ও প্রচারবিমুখ ছিলেন। গোপনে মানুষ সাহায্য করতেন। দুঃসময়ে গ্রামের অসহায় লোকদের কাছে এগিয়ে আসতেন। কাউকে নিরাশ করতেন না। প্রতিটি কাজে আন্তরিকতা, একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সাথে করতেন। একই সাথে আদর্শের প্রতি আপসহীন ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টবাদী; তাই ও ন্যায় বলতে দ্বিধা করতেন না। ছিলেন মানুষ গড়ার কারিগর সত্য, ইসলামী চিন্তাবিদ, সমাজসংস্কারক, সফল সংগঠক। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও তাকে কর্মজীবন থেকে সরানো যায়নি। সময়ানুবর্তিতা ছিল তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন।

লেখক : প্রবীণ রাজনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং মরহুমের ছোট ভাই


আরো সংবাদ

সকল