১৬ ডিসেম্বর ২০১৯

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বদ্বীপ পরিকল্পনা

-

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুনিয়ার যেসব দেশ অস্তিত্ব সঙ্কটের সম্মুখীন, বাংলাদেশ তাদের সামনের কাতারে। জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের মানুষের কোনো ‘পাপ’ না থাকলেও কঠিন শাস্তির মুখোমুখি তারা। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী মূলত শিল্পোন্নত দেশগুলো। বায়ুমণ্ডল দূষণে তারা পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। অথচ তাদের পাপের খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো সাগরপাড়ের দেশগুলো। সাগরের জলরাশির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব দেশ ডুবে যেতে পারে এমন আশঙ্কার সম্মুখীন।

এ প্রেক্ষাপটে জলবায়ু সঙ্কটের বহুমাত্রিক সমস্যা থেকে বিশ্বের ৮০ শতাংশ মানুষকে রক্ষায় সব দেশের পার্লামেন্ট, সরকার, জাতিসঙ্ঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাকে দ্রুত, কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অস্তিত্বের সঙ্কট থেকে উত্তরণে ‘গ্রহণজনিত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হোক’ শীর্ষক প্রস্তাব সম্প্রতি পাস করেছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের যেসব দেশ সবচেয়ে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে, বাংলাদেশ অন্যতম। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে ক্রমেই বাড়ছে অপরিকল্পিত নগরায়ন। এর ফলে এ অঞ্চলে তীব্র পানি সঙ্কটের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। হিমালয়কেন্দ্রিক যে আটটি দেশের ওপর অপরিকল্পিত নগরায়নের প্রভাব পড়বে, তাতে বাংলাদেশও রয়েছে। ওই প্রতিবেদনে এ সঙ্কট নিরসনে পার্বত্য এলাকায় নগরায়নের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশগুলো আমলে নিয়ে এখন থেকে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগী হতে হবে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের দেশে অসময়ে অনাবৃষ্টি, বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়সহ অতি গরম আবহাওয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের অনেক এলাকা প্লাবিত হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল এবং সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারসহ অন্যান্য এলাকা।

দেশের জনসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এই বাড়তি জনসংখ্যার জন্য কৃষিজমিতে বাড়িঘর নির্মাণ বাড়ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিবেদনে হিমালয়ের নগরায়ন বেড়ে যাওয়ার নেপথ্য কারণ হিসেবে পর্যটন ও তীর্থযাত্রাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, অপরিকল্পিত নগরায়ন বেড়ে যাওয়ায় ঝরনা ও নদীনির্ভর পানি ব্যবস্থাপনার প্রতি নির্ভরতাও বাড়ছে।

পুরো হিমালয় অঞ্চল ছড়িয়ে আছে ৪২ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে, যা আটটি দেশের ওপর পড়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দেশগুলো হলো- আফগানিস্তান, ভুটান, চীন, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও পাকিস্তান। পরিবেশগতভাবে স্পর্শকাতর অঞ্চল হিমালয়ের এই দ্রুততর অপরিকল্পিত নগরায়ন নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কোটি কোটি মানুষ গভীর পানি সঙ্কটে পড়বে।

হিমালয় পর্বতাঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পার্বত্য নগর কেন্দ্রগুলো নিজেদের পৌর এলাকায় অবস্থিত জলাধার থেকে চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। পর্বতে অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ভূগর্ভে থাকা পানির ওপর নির্ভরতা ক্রমে বাড়ছে। পার্বত্য অঞ্চলে পানির সঙ্কটের পাশাপাশি দূষণ ও মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।
এ সঙ্কট সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত কৌশল প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা ২০০৯ সালে বলতে পেরেছে, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশের কী করা উচিত, বিশ্বের কী করা উচিত। এ বাস্তবতায় পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে সহায়তার জন্য প্রণীত হয়েছে বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০।

পানি ও পরিবেশবিষয়ক লক্ষ্যমাত্রাগুলো এ পরিকল্পনায় সময়ভিত্তিক সুনির্দিষ্টকরণ করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত তথ্যবহুল ও বিজ্ঞানভিত্তিক একটি পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের সামনে আসলে বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। সেই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর উচিত এ ব্যাপারে সম্মিলিতভাবে কাজ করা।

লেখক : সহ-সভাপতি, এফবিসিসিআই


আরো সংবাদ