১৬ ডিসেম্বর ২০১৯

‘মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন’ : সঙ্কীর্ণতা এবং প্রতিকার

-

কয়েক যুগ ধরে সারা পৃথিবীতে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বেড়ে চলেছে। অসংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে বিকল কিডনি রোগ অন্যতম। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৪০-৪৫ হাজার নতুন রোগী বিকল কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। দরিদ্র জনগণ অধিকতর হারে বিকল কিডনি রোগে আক্রান্ত হয় শৈশবে চর্মরোগ, ধূমপান, খাদ্যে ভেজাল, অপ্রয়োজনীয় বা ভুল চিকিৎসা, সময়মতো বহুমূত্র ও উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা না নেয়া এবং পরিবেশগত কারণে। এর উত্তম চিকিৎসা হচ্ছে কিডনি সংযোজন। ডায়ালাইসিসে সম-উপকার পাওয়া যায় তবে তা খুবই ব্যয়বহুল।

এই উপমহাদেশে সবচেয়ে বড় ডায়ালাইসিস কেন্দ্র হলো গণস্বাস্থ্য ডায়ালাইসিস সেন্টার। প্রতিদিন গড়ে ২৬০ জন বিকল কিডনি রোগী ডায়ালাইসিস নেন। অতি দরিদ্র রোগীরা সপ্তাহে তিনবার ৪ ঘণ্টার হেমোডায়ালাইসিস পান এক হাজার ৮০০ টাকায়, দরিদ্র রোগীরা দেন দুই হাজার ৪০০ টাকা, মধ্যবিত্ত রোগীরা প্রতিবার হেমোডায়ালাইসিসের জন্য দেন দুই হাজার ৫০০ টাকা করে এবং ধনী রোগীরা তিন হাজার টাকা। তারা অতিরিক্ত ৫০০ টাকা দিয়ে কেবিনে চিকিৎসার সুবিধা পাচ্ছেন। সব রোগী ৪ ঘণ্টা ডায়ালাইসিসকালে ন্যূনতম তিনবার রক্তে চিনি ও রক্তচাপ পরীক্ষা করা হয় এবং চিকিৎসা অতিরিক্ত চার্জ ছাড়াই দেয়া হয়। দ্রুত চিকিৎসা দেয়ার জন্য ওয়ার্ডে ভেন্টিলেটর, কার্ডিয়াক মনিটর আছে এবং প্রত্যেক রোগীর জন্য আলাদা অক্সিজেন ব্যবস্থা আছে।

ডায়ালাইসিস গ্রহণকারী বিকল কিডনি রোগীদের সপ্তাহে একটি ইরিথ্রোপোয়েটিন ইনজেকশন নিতে হয়। এর নির্ধারিত দর হচ্ছে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা। বহু রোগীর মাসে একাধিকবার রক্ত নিতে হয়। প্রতিদিন প্রয়োজনমাফিক বহুমূত্র ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সেবন করতে হয়। এতে ব্যয় হয় দৈনিক ৩০-৩৫ টাকা। জাতীয় ওষুধনীতি যথার্থভাবে প্রয়োগ হলে ইরিথ্রোপোয়েটিন ও অন্যান্য ওষুধের মূল্য কমপক্ষে অর্ধেক হতো। বিকল কিডনি রোগীর শরীরে কিডনি প্রতিস্থাপন ব্যয় অনেক কম। দুই লাখ থেকে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে সুস্থ ব্যক্তির দেহ থেকে একটি কিডনি সংগ্রহ করে সরাসরি একজন বিকল কিডনি রোগীর পেটের নিচের দিকে, উরু থেকে ৪ - ৬ ইঞ্চি উপরে প্রতিস্থাপন করলে রোগী ১৫-২০ বছর সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।

অঙ্গ প্রতিস্থাপনের আগে দাতা ও গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ ও টিস্যু টাইপিং করাতে হয়। উভয়ের পুরো টিস্যু টাইপিং খরচ প্রায় ২০ হাজার টাকা। সম গ্রুপের কিডনি না হলে অতিরিক্ত Immune suppressant ওষুধ নিয়মিত খেতে হয়। এতে বছরে ২০-২৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। মৃত ব্যক্তির শরীর থেকে অঙ্গ নিয়ে ৬ ঘণ্টার মধ্যে জীবিত বিকল রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা যায়। তবে এতে কিছু সমস্যা আছে। মৃতব্যক্তির অঙ্গ সংযোজনের ফলাফল জীবিত ব্যক্তি থেকে নিয়ে বিকল কিডনি রোগীতে প্রতিস্থাপনের সমতুল্য নয়। পৃথিবীতে প্রতি বছর কয়েক লক্ষাধিক কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় যার ৬০ শতাংশ জীবিত ব্যক্তির দান করা।

প্রথম কিডনি প্রতিস্থাপন
১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বপ্রথম জীবিত ব্যক্তির কিডনি বিকল কিডনি রোগীর উরুর উপরে প্রতিস্থাপন করা হয়। ’৬০-এর দশক থেকে জীবিত ব্যক্তির কিডনি সরাসরি বিকল রোগীর পেটের নিম্নাংশে চামড়ার নিচে (ঊরুর ওপরে) প্রতিস্থাপন করে মূত্রনালীকে প্রস্রাব থলিতে এবং রেনাল শিরা ও ধমনি ইলিয়াক শিরা ও ধমনিতে যুক্ত করে দেয়া হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রতিস্থাপিত কিডনি কার্যকর হয় এবং রোগী প্রস্রাব করা শুরু করে। পুরো অপারেশনে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে। যেকোনো সুস্থ ব্যক্তি কিডনি দান করে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। নিয়মিত দাতার রক্তচাপ, প্রস্রাবে প্রোটিন এবং কিডনির কার্যক্রম পরীক্ষা করা বাঞ্ছনীয় প্রতি বছর।

বিভিন্ন দেশে অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন
যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত ১৮ থেকে ৭০ বছর বয়স্ক যেকোনো সুস্থ ব্যক্তি তিনভাবে কিডনি দান করে থাকেন- ১. পছন্দমতো রোগীর জন্য সরাসরি দানের মাধ্যমে ২. হাসপাতালের প্রয়োজনমাফিক অনাত্মীয় বিকল কিডনিতে প্রতিস্থাপনের জন্য ৩. রক্তের গ্রুপ না মিললে দু’জন দাতার কিডনি প্রয়োজন অনুযায়ী দু’জন বিকল কিডনি রোগীর মধ্যে প্রতিস্থাপন।

কানাডায় যেকোনো সুস্থ সুহৃদ ব্যক্তি অপরিচিত রোগীর জন্য কিডনি দান করতে পারেন। তিনি ইচ্ছা করলে একটি কিডনি, যকৃতের অংশবিশেষ এবং ফুসফুসের একটি অংশ দান করতে পারেন। জীবিত ও মৃত দাতার শরীরের অংশ দিয়ে আটজনের জীবন রক্ষা করা যায় এবং ৭৫ জন অসুস্থ রোগীর জীবনের উন্নয়ন সম্ভব। যুক্তরাজ্যে ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে Human Tissue Act 2004 এবং স্কটল্যান্ডে Human Tissue Act 2006 আইন বলে- যেকোনো বয়সের সুস্থ নাগরিক আত্মীয় বা অনাত্মীয় রোগীকে উল্লিখিত তিনপদ্ধতিতে অঙ্গ দান করতে পারেন। আত্মীয়স্বজনের আপত্তি না থাকলে মৃতব্যক্তির অঙ্গ ব্যবহার করা আইনসিদ্ধ।

ভারতে জীবিত আত্মীয়স্বজন সরাসরি হাসপাতলে গিয়ে অঙ্গ দান করতে পারেন। অনাত্মীয় ব্যক্তি অঙ্গ দান করতে চাইলে রাজ্যের অনুমোদন কমিটিকে জানাতে হয়। কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় অনুমোদন কমিটির কাছে আপিল করা যায়। Swap Transplantation এর সুযোগ আছে। শ্রীলঙ্কায় অনাত্মীয় সুস্থ ব্যক্তি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নৈতিক সততা কমিটি অনুমতিক্রমে অঙ্গ দান করতে পারেন।

বাংলাদেশে অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন পাকিস্তানের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অনুকরণে সৃষ্ট। পাকিস্তানে অনাত্মীয়কে অঙ্গ দান আইনসিদ্ধ নয়। তবে নিকটাত্মীয় থেকে অঙ্গ পাওয়া না গেলে মানব অঙ্গদান কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে জীবিত ব্যক্তি ও মৃতব্যক্তির অঙ্গ পাওয়ার ব্যবস্থা আছে। মৃতব্যক্তির অঙ্গ নিতে হলে গোত্রের প্রধানের অনুমতির প্রয়োজন। সব প্রতিস্থাপন জাতীয় মনিটরিং কর্তৃপক্ষকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জানাতে হয়। নিয়ম ভঙ্গ করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ রুপি অর্থদণ্ডের বিধান আছে। পাকিস্তানে প্রতি সপ্তাহে ১০-১২ জনের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। এপ্রিল ২০০৮ সালে করাচির Sindh Institute of Urology Technology-তে প্রথম মৃতব্যক্তির কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। ইসলামাবাদে মৃতব্যক্তি থেকে Kidney Transplant করা হয় মার্চ ২০১০ সালে।

সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, নেপাল ও মিয়ানমারে অনাত্মীয় থেকে অঙ্গদান আইনে স্বীকৃত নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আইনের অনুসরণে নেপালে অঙ্গদান আইন পরিবর্তিত করার প্রক্রিয়া চলমান। অন্যান্য দেশের রোগীরা নিজ দেশের স্বরাষ্ট্র বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আত্মীয়তা সম্পর্কিত প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়ে সিঙ্গাপুরে অঙ্গ প্রতিস্থাপন সুবিধা নিতে পারে।

মিসর একমাত্র মুসলিম রাষ্ট্র যেখানে অঙ্গ সংযোজন কোনো আইন প্রণীত হয়নি। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের উলামাদের মতে, ক্ষতি না হলে জীবিত অঙ্গদানে শরিয়াহতে বাধা নেই। মৃত ব্যক্তির অঙ্গ দানে আপত্তি নেই। কিডনি বেচাকেনা অনৈতিক এবং দরিদ্রদের প্রতারণা থেকে বাঁচানোর লক্ষ্যে আইন তৈরি হয়নি। সৌদি আরবে ১৯৮৩ সাল থেকে মৃত ব্যক্তির অঙ্গ নিয়ে জীবিত বিকল কিডনি রোগীতে প্রতিস্থাপন শুরু হয়। ১৯৯৪ সাল থেকে জীবিত ব্যক্তির কিডনি, ফুসফুস, যকৃত ও হৃৎপিণ্ডের ভালো প্রতিস্থাপন কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৯৭ সালে ২৬৭ জন বিকল কিডনি রোগীতে সফলতার সাথে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

সেরা আইন ইরানে
আদর্শ অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন কার্যকর আছে ইরানে। সে দেশের ১৯৬৭ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত কেবল জীবিত আত্মীয়রা অঙ্গ দান করতে পারতেন। ১৯৮৮ সাল থেকে জীবিত অনাত্মীয়দের অঙ্গদান আইনে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ২০০০ সাল থেকে মৃতব্যক্তির অঙ্গ দান চালু হয়। ২০০৫ সালে তিন হাজার ৪২১ জন জীবিত আত্মীয়, ১৫ হাজার ৩৫৬ জন জীবিত অনাত্মীয় এবং ৮২৩ জন মৃত ব্যক্তির অঙ্গ অসুস্থ ব্যক্তির শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। ১৯৮৮ সাল থেকে ইরানে সুস্থ জীবিত সব অঙ্গ দানকারীকে বিশেষ অর্থ পুরস্কার দেয়া হয়। ফলে ইরান একমাত্র দেশ যেখানে কিডনি প্রতিস্থাপনের কোনো অপেক্ষমাণ তালিকা নেই। ইরানে বিকল কিডনি রোগীদের বেশির ভাগ জীবিত ব্যক্তির কিডনি ধারণ করে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন ১৫ বছর ধরে। অন্যরা পেরিটোনিয়াল বা হেমোডায়ালাইসিস নিয়ে সুস্থ জীবন যাপন করছেন।

বাংলাদেশের অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন
বাংলাদেশের ২০১৮ সালের সংশোধিত মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন ১৯৯৯-এর পরিধি অত্যন্ত সীমিত। এই আইন মৌলিক অধিকারের বড়খেলাপ। জীবিত অনাত্মীয় থেকে অঙ্গদানের ব্যবস্থা আইনে নেই। দেশে মানুষের জীবনকাল বেড়েছে, অথচ দাতা ও গ্রহীতার বয়স ৬৫ থেকে ৭০ বছরে সীমিত করা হয়েছে। জেলা শহরে অধ্যাপক পদমর্যাদার চিকিৎসক না থাকায় মেডিক্যাল প্রত্যয়ন বোর্ড গঠন সম্ভব হবে না- (৯ক)। অনুন্নত দেশে মৃত ব্যক্তি থেকে অঙ্গ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ সহজ নয়। ক্যাডাভেরিক জাতীয় কমিটি ঢাকায় সীমিত- ধারা (৯/২/ক)। অঙ্গ সংযোজন আইন দাতা এবং গ্রহীতা উভয়কে মিথ্যা বলতে প্রভাবিত করছে এবং আত্মীয়তা নির্ণয়ের দায়িত্ব বর্তাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকের উপর। এই আইনে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। বাংলাদেশের চেয়ে উন্নত দেশগুলোও ইরানের মতো সুস্থ আত্মীয় ও অনাত্মীয় সবার অঙ্গ দানের সুযোগ থাকা বাঞ্ছনীয়। দ্বিতীয়ত, সুস্থ জীবিত দাতা এবং অঙ্গ গ্রহীতা রোগগ্রস্ত ব্যক্তির বয়সসীমা বাড়িয়ে ৯০ বছর করা বাঞ্ছনীয়; তবে কমবয়সী গ্রহীতাদের অঙ্গ প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার থাকবে। তৃতীয়ত, প্রত্যেক জেলায় একটি প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ থাকবে যার সভাপতি হবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি/ সাংসদ/ চিকিৎসক/ সিনিয়র শিক্ষক/ সাংবাদিক/ মুক্তিযোদ্ধা/ দানশীল ব্যক্তি। তিন ধরনের জীবিত অঙ্গদান আইনসিদ্ধ হওয়া উচিত- জীবিত আত্মীয় থেকে দান (Related Living Donor), জীবিত অনাত্মীয় থেকে দান বন্ধুত্ব ও আবেগজনিত কারণের নিমিত্তে Altruistic, Swap or Paired Donation- এর ভিত্তিতে কেবল জীবিত ব্যক্তির কিডনি দান। চতুর্থত, সব অঙ্গদানকারীকে ইরানের মতো ন্যূনতম পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার এবং প্রয়োজনে দাতাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা ও অন্যান্য সুবিধা প্রদান করা উচিত।

অঙ্গ প্রতিস্থাপনকালে চিকিৎসকের অবহেলা বা লজ্জাকর ভুল না হলে শল্যচিকিৎসকের নিবন্ধন বাতিল করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

বাংলাদেশে প্রতি বছর ১০ হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন। কিন্তু প্রতি বছর মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ জন বিকল কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। শ্যামলীস্থ CKDU সেন্টারে অধ্যাপক কামরুল বছরে একাই ১৫০ জনে বিকল কিডনি রোগীতে সফলতার সাথে কিডনি প্রতিস্থাপন করে থাকেন। প্রতি বছর প্রায় এক হাজার ৫০০ বিকল কিডনি রোগী ভারত ও শ্রীলঙ্কায় গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করাচ্ছেন, এতে প্রতি রোগীর ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার অধিক ব্যয় হয়। ধনীরা সিঙ্গাপুর ও আমেরিকায় গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করান। সেখানে ব্যয় হয় এক থেকে তিন কোটি টাকা। অর্থাৎ বাংলাদেশী রোগীরা কেবল কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য আনুমানিক ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় করেন। অপরপক্ষে, প্রত্যেক জীবিত দাতাকে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার দিলে সরকারের ব্যয় হবে ৫০০ কোটি টাকা। এতে বিকল কিডনি রোগীদের অর্থ সাশ্রয় হবে ও দুর্দশা হ্রাস পাবে। দেশেরও অর্থ সাশ্রয় হবে এবং সুনাম বৃদ্ধি পাবে। চিকিৎসাশাস্ত্রেরও উন্নতি হবে।

আইন পরিবর্তনের নিমিত্তে রিট
বর্তমান আইনটি অত্যন্ত সীমিত পরিধির সঙ্কীর্ণ আইন। ইচ্ছায় আত্মীয় বা অনাত্মীয়কে অঙ্গদান করা সুস্থ নাগরিকের মৌলিক অধিকার- এই মর্মে ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম প্রতিকার চেয়ে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি খোন্দকার দিলারুজ্জামানের কোর্টে রিট আবেদন করলে আদালত সাতজন কিডনি বিশেষজ্ঞের মতামত নেন। এ তারা অঙ্গদানের বিষয় সবার জন্য উন্মুক্ত না করার পক্ষে অভিমত দিয়েছেন। তাদের মতে, সমাজের নিম্নশ্রেণীর মানুষেরা অভাবের তাড়নায় অঙ্গ বেচাকেনায় মেতে উঠবে। অবশ্য গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী ভিন্নমত পোষণ করে মাননীয় আদালতকে জ্ঞাত করেন, টাকা বা সম্পত্তি দান করার মতোই অঙ্গ দান করতে মৌলিক অধিকার। তাই কেবল নিকটাত্মীয়ের মধ্যে দানের প্রক্রিয়াটি সীমাবদ্ধ না রেখে যেকোনো সুস্থ অনাত্মীয় নাগরিকের জন্য অঙ্গদান উন্মুক্ত রাখতে হবে। তবে দরিদ্র মানুষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য আইনে বিশেষ বিধান রাখতে হবে। ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছাড়া অন্য সব বিশেষজ্ঞই নেফ্রোলজিস্ট। তারা ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। মতামত দাতাদের পেশাগত স্বার্থ জড়িত আছে এ ব্যাপারে। মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯ এর কয়েকটি ধারা- ২গ, ৩ ও ৬, কেন সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না, সেই সম্পর্কিত রুলের রায় দেবেন মাননীয় ৫ বিচারপতিদ্বয় ৫ ডিসেম্বর ২০১৯ সালে।

গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রে অঙ্গ প্রতিস্থাপন
গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতলে কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু হবে আগামী মার্চ মাসে। এ জন্য গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের চতুর্থ তলায় এক কোটি টাকারও অধিক ব্যয় করে আন্তর্জাতিক মানের দু’টি অপারেশন থিয়েটারের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। সম পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ে। প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছেন রয়েল লন্ডন হাসপাতালের অধ্যাপক মাগদী ইয়াকুব ও তার সহকর্মীরা এবং ভারতের প্রখ্যাত সার্জন ডা: দেবী শেঠীর নারায়না হৃদ্রয়ালয়। শুরুতে রয়েল লন্ডন হাসপাতালের শল্যচিকিৎসক দল এসে বাংলাদেশের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেবেন এবং নিজেরা পাঁচটি অঙ্গ স্থাপন করে দেখাবেন।

দাতা ও গ্রহীতার টিস্যু টাইপিং ও অন্যান্য পরীক্ষা এবং অপারেশন চার্জ ও ICU-তে অবস্থান,ওষুধ ও ফলোআপের খরচ বাবদ দরিদ্র রোগীদের ব্যয় হবে দেড় লাখ টাকা এবং অবস্থাপন্নদের ব্যয় হবে তিন লাখ টাকা।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী : ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র
তৌকির করিম : অধ্যাপক, নেফ্রোলজিস্ট, যুক্তরাষ্ট্র