২২ জানুয়ারি ২০২০

শুদ্ধি অভিযান

-

চলমানতার আবর্তে পৃথিবীতে বিভিন্ন সমাজব্যবস্থায় বিভিন্নভাবে পরিবর্তন সাধিত হয়ে থাকে। বিপ্লব সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের অন্যতম পদ্ধতি। পৃথিবীর অনেক দেশে বিপ্লবের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে। এসব দেশের পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থা দুর্নীতিমুক্ত করতে অনেক ক্ষেত্রে শুদ্ধি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। মানুষ মূলত জৈবিক ও আত্মিক শক্তির ধারক ও বাহক। যে কারণে মানুষের মধ্যে রূহ ও নফস, ন্যায় ও অন্যায়ের দ্বন্দ্ব চিরন্তন। নফস বা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে আত্মিক জিহাদই হলো প্রকৃত জিহাদ। পশুশক্তি অবদমিত করে মানবশক্তি বিকাশের মাধ্যমে মানবজাতির কল্যাণ নিহিত। সে কারণে যুগে যুগে বিভিন্ন সমাজে ও রাষ্ট্রে সংশোধন বা শুদ্ধি অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় স্টালিন আমলে শুদ্ধি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। চীনে চেয়্যারমান মাও সেতুং-এর আমলে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে শুদ্ধি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। ভিয়েতনাম ও ইরানের বিপ্লবোত্তর পরিবেশে সমাজ বিনির্মাণে শুদ্ধি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। অবশ্য মহানবী সা: বৈপ্লবিক পদ্ধতিতে ইসলামী সমাজব্যবস্থা প্রবর্তনের পর কেনো শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করেননি। তিনি ঐশীশক্তির আলোকে মানব হৃদয়ের কুপ্রবৃত্তিগুলো দূরীভূত করে আত্মিক শুদ্ধি সাধন করেছিলেন। বর্বর আরব জাতিকে সভ্যতা ও শালীনতার শীর্ষ মার্গে উপনীত করেছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এ এক বিরল ঘটনা। বর্তমানে আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চলছে। সরকার সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক স্তরে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। জনসাধারণ সরকারের এ পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাচ্ছে।

গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারের মাধ্যমে বর্তমানে আমাদের দেশ পরিচালিত হয়। নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের সাধারণ জনগণ প্রত্যক্ষ ভোট দিয়ে জনসেবার জন্য ত্যাগী নেতাদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেন। নির্বাচনের সময় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে ভোটারদের কাছে দেশ জাতি জনগণের সেবার জন্য দোয়া প্রার্থনা করেন। মূলত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের সেবক। জনগণের সেবার জন্য তারা পবিত্র সংসদে শপথ নিয়ে থাকেন। শপথ গ্রহণের পর বেশির ভাগ সংসদ সদস্যের মানবসেবার আসল রূপ প্রকাশ পায়। অনেক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে কিভাবে ঢাকায় সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সরকারি প্লট হস্তগত করা যায় সে তদবিরে লেগে থাকেন। অনেক সংসদ সদস্য সরকারিভাবে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি করতে তৎপর হয়ে পড়েন। তা ছাড়া সরকারি নানাবিধ সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে অনেকে সদা তৎপর থাকেন। মূলত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বেশির ভাগ সংসদ সদস্য জনগণের কাছে প্রদত্ত ওয়াদার কথা ভুলে যান। আমাদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এসব কর্মকাণ্ড সহজাত হয়ে গেছে। নিজেদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণে বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত থাকায় তারা দেশের নানাবিধ সমস্যা, অন্যায়, অপরাধ ও অপকৌশল সম্পর্কে চিন্তা করার সুযোগ পান না। সে কারণে সুযোগসন্ধানী দুর্বৃত্তরা বিভিন্ন অপকৌশলের মাধ্যমে জনগণের অর্থ শোষণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। এ সব সুযোগসন্ধানী কখনো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কখনোবা ব্যবসায়ীর বেশে, কখনোবা সমাজসেবার নামে বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে, কখনোবা মাফিয়া চক্রের অধীনে মাদক পাচার করে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে থাকেন। অবৈধ সম্পদ ব্যয় করতে কোনো মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকে না।

প্রবাদ আছে, অবৈধ আয় অবৈধ ব্যয়। যে কারণে অবৈধ সম্পদের মালিকরা তাদের সম্পদ ব্যয়ের জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়ার অবৈধ পন্থা খুঁজে বের করেন। অবৈধ অর্থ ব্যয়ের অনেক পথের মধ্যে সহজ পথ তিনটি। জুয়া, মদ ও নারী। বাংলাদেশে আগেও জুয়া খেলার প্রচলন ছিল। তবে তা ছিল সীমিত পরিসরে। সমাজের শিক্ষিত রাজনীতিবিদ ও অভিজাত সম্প্রদায়ের মাঝে জুয়া খেলার প্রবণতা এর আগে খুব কমই শ্রুত হয়েছে। বর্তমানে জুয়া খেলার সর্বাধুনিক পদ্ধতির নাম ক্যাসিনো। বাংলাদেশে আগে ক্যাসিনো পদ্ধতিতে জুয়া খেলার কোনো রেকর্ড নেই। অতীব আশ্চর্যের বিষয় যে, রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক জাতীয় নেতা আদর্শের বুলি কপচান। বক্তৃতা বিবৃতিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য চোখের পানি ফেলেন। অথচ এ সব রাজনৈতিক নেতার অনেকে নামী দামি ক্লাবের কর্মকর্তা। যেসব ক্লাবে নিয়মিত ক্যাসিনোর মাধ্যমে অবৈধ অর্থের জুয়া খেলা সঙ্ঘটিত হয়। শত শত কোটি টাকার অবৈধ অর্থের লেনদেন হয়। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রীকে, তিনি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় পর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। বর্তমানে রাজধানী ঢাকা শহরসহ সারা দেশে শুদ্ধি অভিযান চলছে। ছাত্রসমাজ জাতির ভবিষ্যৎ।

অতীব আশ্চর্যের বিষয় এই যে, বর্তমানে ছাত্রসমাজের মাঝেও জুয়া খেলার প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে। সরকার উপযুক্ত সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে। যেকোনোভাবে দেশের ভবিষ্যৎ ছাত্রসমাজকে জুয়া, মদ ও অবৈধ নারীর সংস্পর্শ থেকে মুক্ত করতে হবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তায়ন রুখতে আমাদের পাশের রাষ্ট্র ভারতে ২০১৬ সালে ৫০০ ও ১০০০ টাকার ব্যাংক নোট বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। বিরোধী দলের চাপের মুখেও সরকার তার সিদ্ধান্তে অনড় ছিল। প্রতিক্রিয়ায় ভারতের অর্থনীতিতে সুফল দেখা দিয়েছিল। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু বড় অঙ্কের ব্যাংক নোট বাতিল ঘোষণা করেছিলেন। প্রতিক্রিয়ায় অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বহুলাংশে কমেছিল। বর্তমান বাংলাদেশ সরকার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তায়ন রোধে ১০০০ ও ৫০০ টাকার ব্যাংক নোট নির্ধারিত সময় সাপেক্ষে বাতিল ঘোষণা করতে পারে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এ ধরনের পদক্ষেপে শুদ্ধি অভিযানে সরকারের অগ্রগতি সাধিত হবে।

অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে ব্যাংকে তারল্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। অলস অর্থের পরিমাণ কমে গেছে। এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অবৈধভাবে অর্থ মজুদকারীরা অর্থের বৈধতা দিতে ব্যাংকে লেনদেন করতেন। ফলে ব্যাংকে অর্থের প্রবাহ বেড়ে যেত। সরকারি কোষাগারে অনেক ট্যাক্সের টাকা জমা হতো। আমরা জানি, অবৈধ অর্থের সাথে মদ ও নারী লিপ্সার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। উপরন্তু অবৈধ অর্থের কারণে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়।

শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে অবৈধ অর্থের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রেরও সন্ধান মিলছে। সহজে অনুমান করা যায়, এসব অবৈধ অস্ত্র আইনশৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হয়ে থাকে। অবৈধ অস্ত্রের মজুদ কমে গেলে সমাজে ও রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ঘটবে। অবৈধ অর্থের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হলে সমাজে জুয়া, মদ ও নারী নির্যাতনের পরিমাণ বহুলাংশে কমবে। বর্তমানে সরকার ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করছে। এ অভিযান দেশের সর্বস্তরের প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রয়োগ করতে হবে। এ চলমান শুদ্ধি অভিযান যেন সরকারবিরোধী অভিযানে পরিচালিত না হয়, নিরপেক্ষভাবে অভিযান পরিচালিত হয়, সে বিষয়ে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। তাহলে শুদ্ধি অভিযানের যথার্থ ফল অর্জিত হবে।


আরো সংবাদ