২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

জ্ঞানের কদর নেই; জ্ঞানীরও গুরুত্ব নেই!

-

পৃথিবীর বহু নেতা উপলব্ধি করেছেন যে, বর্তমান দুনিয়ায় জ্ঞানের কোনও বিকল্প নেই। ‘জ্ঞানই শক্তি, জ্ঞানই সুপার পাওয়ার’ এ স্লোগানটি বুদ্ধিমানরা আজ অন্তরে ধারণ করতে পেরেছেন। শুধু বাংলাদেশের নেতাদের কাছে যুগ যুগ ধরে এ বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে। এ দেশের নেতারা জ্ঞানের পরিবর্তে ধারণ করেছেন মাসলকে। সে জন্য নেতাদের আশপাশে দেখা যায় হৃষ্টপুষ্ট পেশিবহুল মানুষের দল। শিক্ষা যে জ্ঞানের দরজা আর জ্ঞান যে মানুষের মৌলিক অধিকার এই বিষয়টি এ দেশের নেতারা এবং তাদের চার পাশে ঘুরঘুর করা মাসলম্যানরা উপলব্ধি করতে বরাবর ব্যর্থই হয়েছে।

চায়ের টেবিলে আলোচনা হয় এ দেশে জ্ঞানের কদর নেই, জ্ঞানীরও গুরুত্ব নেই। কিন্তু জ্ঞানের যে বিকল্প নেই সেই জিনিসটাকে অন্য সবার আগে বুঝতে হতো রাষ্ট্রকে। রাষ্ট্র কী করে বুঝবে? রাষ্ট্র তো আর মানুষ নয়। রাষ্ট্র যারা চালায় তাদেরই আগে উপলব্ধি করতে হতো জ্ঞান জিনিসটা কী? তাহলেই জ্ঞানের গুরুত্ব বাড়ত। রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করেন তারা জ্ঞানের মাহাত্ম্য না বুঝতে পেরে বুঝলেন মাসলের মাহাত্ম্য। কেননা মাসল ব্যবহার করে ক্ষমতা অল্প সময় হলেও টিকিয়ে রাখা যায়। জ্ঞানের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারীরা এই স্বল্প সময়টাকেই বেশি পছন্দ করে ভুল করেছেন। এখন উপায় কী? উপায় একটাই, সেটা হচ্ছে জ্ঞানের দিকে ফিরে যাওয়া। এই ফিরে যাওয়ার দায়িত্বও রাষ্ট্রকেই পালন করতে হবে। সে জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্বে রয়েছে অশিক্ষিত জনগণকে শিক্ষা দেয়া। কেননা শিক্ষাই জ্ঞানের একমাত্র আধার। সংবিধানে শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগ, ১৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে ‘শিক্ষা হবে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক। একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রদানের জন্য রাষ্ট্র সচেষ্ট থাকবে এবং সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে যথাযথ নাগরিক সৃষ্টির জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের জন্য নিরক্ষরতা দূরীকরণে কার্যকর ব্যবস্থা রাষ্ট্র গ্রহণ করবে।’ দুঃখের সাথে লক্ষ করা গেছে রাষ্ট্র সংবিধানের এই ধারাটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারেনি। পারেনি তার বড় প্রমাণ বিগত বাজেটগুলো। দেশ স্বাধীনের পর থেকে এখন পর্যন্ত বাজেট প্রণীত হয়েছে অসংখ্যবার, তার কোনো একটি বাজেটে শিক্ষা খাত গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হতে পারেনি। তার মানে জ্ঞানকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি।

অথচ শিক্ষা সংবিধান স্বীকৃত নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের বাজেটে সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়া বিষয়গুলো শিক্ষার চেয়ে একেবারেই অনুজ্জ্বল। যেমন প্রতিরক্ষা খাতের ভারী অস্ত্রশস্ত্রের চেয়ে জ্ঞান আরো মূল্যবান ভারী অস্ত্র। এ জন্য স্লোগান হয়েছে 'শহড়ষিবফমব রং চড়বিৎ' জ্ঞানই শক্তি। একটি দেশের পারমাণবিক শক্তি পৃথিবীকে জয় করতে না পারলেও জ্ঞান সে কাজটা সহজেই করে দিতে পারে। কোনো একটি দেশের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তি প্রদর্শনের পরীক্ষায় বিশ্বের অন্য কোনো পরমাণু শক্তিধর একটি দেশের আগ্রাসন থেকে নিজ দেশের সার্বভৌত্ব রক্ষা করতে ব্যর্থই হতে পারে। চার পাশের আরো অনেক দেশই এখন পরমাণু শক্তি প্রদর্শনে ব্যস্ত সময় পার করছে। এই প্রতিযোগিতার মোকাবেলা করতে যাওয়াও অত্যধিক ব্যয়বহুল। এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন ছাড়া অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হতে পারে। এ কারণে জ্ঞান জরুরি। জ্ঞানের মাধ্যমে অর্জিত প্রজ্ঞা ছাড়া সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা মুশকিল। যদি সেটিই হয় তাহলে প্রতিরক্ষা খাতে বজেটের সর্বাধিক বরাদ্দ দিয়ে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করে নিজেদের আভিজাত্য ধরে রাখা অসম্ভবই হতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশ নিজেদের সভ্য প্রমাণ করতে জ্ঞান শক্তিকেই বেছে নিয়েছে এবং শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ রয়েছে অনেক দূর পেছনে।

জ্ঞানের পরিচর্যাটা শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করতে পারলে ভালো হতো। আর্থিক বরাদ্দও সেখানে বেশি করে দেয়া জরুরি ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে যে যৎসামান্য বরাদ্দ দেয়া হয় তারও বেশির ভাগ চলে যায় উচ্চশিক্ষা চালু রাখতে। উচ্চ শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রয়োজন যে নেই তা নয়। তবে সেখানে গবেষণা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

শিক্ষায় সরকারের উদাসীনতার ভেতর দিয়েও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরকে এগিয়ে নিয়ে এসেছেন বেসরকারি শিক্ষকরা। এ দেশে যত প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে সবই প্রথম প্রথম শুরু হয়েছিল শিক্ষানুরাগী সাধারণ মানুষের প্রচেষ্টায়। সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেয়ে-না-খেয়ে বিনা বেতনে কিংবা নামমাত্র বেতনে শিক্ষকরা কাজ করে রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে এসেছেন। এখনো ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষার দায়িত্ব বহন করে আসছে তারা। তবুও তাদের মূল্যায়ন হচ্ছে না। অন্যান্য পেশাজীবীদের আর্থিক সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে শুধু প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে মানুষ তৈরির কারিগররা থেকে যাচ্ছেন অবহেলিত। এসব শিক্ষকের বঞ্চনার কথা শোনার অনুভূতিও সরকারের হয়নি বরং নিজেদের দাবিদাওয়ার কথা সরকারকে বলতে গিয়ে পুলিশি লাঠিচার্জের শিকার হয়েছে, মিছিলে গরম পানিতে ঝলসে গিয়েছে, কুকুর তাড়ানো পিপার স্প্রে সহ্য করেছে। কী অপরাধ রয়েছে শিক্ষকদের? তাদের অপরাধ দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে কুঁজো পিঠে বহন করে জ্ঞান তৈরির রাস্তাটাকে সচল রাখতে চাওয়া। এভাবে শিক্ষাব্যবস্থা চলতে থাকলে আলোকিত মানুষ তৈরির পরিবর্তে প্রতিবন্ধীই তৈরি হতে পারে বেশি। সেটিই বোধ হয় হয়েছে।

সময় বদলেছে। সরকারগুলো বলছে, দেশ উন্নত বিশ্বের সমকক্ষ হতে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে বেসরকারিভাবে ফেলে রাখা হবে নির্বুদ্ধিতার পরিচয়। সব নাগরিকের সমান অধিকার। অথচ কিছু শিক্ষার্থী সরকারি স্কুল-কলেজে সাশ্রয়ী মূল্যে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে আর অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা গ্রামগঞ্জে, মফস্বল শহরে থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। এটিও জ্ঞান চর্চার অন্তরায়। সবার আগে জ্ঞানী হতে হয় নারীদেরকে। সে জন্য নারী শিক্ষার গুরুত্ব বেড়েছে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা থাকলেও সরকারীকরণের জন্য মহিলা কলেজগুলো কেনো যেন সরকারি তালিকায় অগ্রাধিকার পায়নি। এ দেশের অধিকাংশ অভিভাবক মেয়ে সন্তানের পেছনে অর্থকড়ি ব্যয় করতে দ্বিধাবোধ করেন এবং সংসারের ব্যয় সঙ্কুলানের নিমিত্তে মেয়েদের আগেভাগে বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। মহিলা কলেজগুলো সরকারীকরণের পর্যায়ে পড়লে কম খরচে নারী শিক্ষার অগ্রগতি লক্ষ করা যেত। এ বিষয়টিও সরকার স্মরণে রাখার প্রয়োজন মনে করেনি।

অন্য দিকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে, তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশ্ব এগিয়েছে। নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। সেসব কর্মক্ষেত্রে দক্ষ লোকবলের চাহিদা রয়েছে। যুগের চাহিদা মাথায় রেখে বিশ্ব যেভাবে কর্মমুখী শিক্ষার দিকে এগিয়ে গেছে সেভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারেনি। কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব বাংলাদেশ এখনো অনুধাবন করতে পারেনি। পারেনি বলেই বাংলাদেশে হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার থাকা সত্ত্বেও বিদেশী ছেলেমেয়েরা বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রগুলোতে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে। সংবিধানে বলা রয়েছে ‘সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করা এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে যথাযথ নাগরিক সৃষ্টির জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে।’ এখানেও রাষ্ট্রের সফলতা লক্ষ করা যায়নি। রাষ্ট্র সমাজের বাস্তব চাহিদামাফিক কর্মমুখী শিক্ষা প্রবর্তন করতে কেন পারল না, সে কৈফিয়তও কেউ তলব করেনি। এখন রাষ্ট্রের উচিত হবে শিক্ষাকে সরকারীকরণ করে একমুখী শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়ে নতুন নতুন জ্ঞানের অনুসন্ধান চালানো। শিগগির এ কাজটি করতে না পারলে বাংলাদেশ পেছনের দিকেই হাঁটতে পারে।

[email protected]


আরো সংবাদ