২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০

পরিবেশ দূষণ

-

পৃথিবীর প্রাণিকূল বর্তমানে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের শিকার। অব্যাহত দূষণের প্রতিক্রিয়া প্রাণিজগতের ওপর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা।

পরিবেশ দূষণের কারণে ভারসাম্যহীনতার শিকার হয়ে পৃথিবীর অনেক প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিছু প্রজাতির প্রাণী বিপন্নের তালিকায় স্থান লাভ করেছে। প্রাণিকুলের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব জাতিও বর্তমানে এর ভয়াবহতার শিকার। মূলত, তিনটি মাধ্যমে পৃথিবীতে দূষণের প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ছে। সাধারণত বায়ুবাহিত অক্সিজেন গ্রহণ করে চলমান প্রাণিকুল জীবন ধারণ করে। চলমান প্রাণিকুলের নিঃসরিত কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে উদ্ভিদ-তরুলতা জীবনীশক্তি সঞ্চার করে। তরুলতা কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন নিঃসরণ করে। সে কারণে প্রাণিকুল ও তরুলতা জীবন ধারনের জন্য পরস্পরের সহায়ক শক্তি। পবিত্র কুরআনের ভাষ্যনুসারে, বেহেশত বনজ ও ফলদ বা বৃক্ষরাজি দ্বারা সুশোভিত। পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষায় বনায়নের বিকল্প নেই। বৃক্ষ প্রাণিকুলের জন্য জীবন ধারণের সর্বোত্তম উপাদান অক্সিজেন সরবরাহ করে। আবার প্রাণিকুলের জীবন ধারণের সর্বাপেক্ষা ক্ষতিকর উপাদান কার্বন-ডাই অক্সাইড শোষণ করে। মূলত বনজসম্পদ প্রাণিকুলের বসবাসের পরিবেশ সৃষ্টি করা ও বিষাক্ত আবহাওয়াকে নির্মল বা বিশুদ্ধ আবহাওয়ায় পরিণত করার অন্যতম মাধ্যম। কালামে পাকে বর্ণিত হয়েছে- ‘তিনি যিনি সৃষ্টি করেছেন, আসমান ও জমিন এবং আকাশমণ্ডলী থেকে তোমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করেন; অতঃপর তা দিয়ে মনোরম উদ্যান সৃষ্টি করেন, ওর বৃক্ষাদি উদগত করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। আল্লাহর সাথে অন্য কোনো উপাস্য আছে কি? তবুও ওরা সত্য বিচ্যুত জাতি বা কওম’ (সূরা-নামল, আয়াত-৬০)। কালামে পাকের এ আয়াতের আলোকে বলা যায়, আল্লাহ পাক পৃথিবীকে বৃক্ষরাজি দিয়ে সুশোভিত করার জন্য আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে থাকেন, যার মাধ্যমে বৃক্ষ, তরুলতা সজীবতা লাভ করে। সে কারণে বলা যায়, বনজসম্পদ মানবজাতির জন্য স্রষ্টার সর্বোত্তম আশীর্বাদ। বনজসম্পদ লালন করা মানব ও প্রাণিকুলের অস্তিত্বের জন্যই একান্ত প্রয়োজন। আমরা জানি, সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকে মানবজাতি আদিম অস্ত্র, জ্বালানি ও আবাসন খাতে বৃক্ষের ব্যবহার করে আসছে। ধাতব যুগ শুরু হওয়ার পর অস্ত্র ও আবাসন খাতে বনজ সম্পদের ব্যবহার হ্রাস পেলেও তার গুরুত্ব এখনো অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানি খাতে বাষ্পীয় শক্তি, বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ফলে জ্বালানি খাতে বনজ সম্পদের ব্যবহার ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। তার পরও সমগ্র পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আবাসনের প্রয়োজনে বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে। তদুপরি কলকারখানা স্থাপন, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সড়ক ব্যবস্থার আধুকায়নের প্রয়োজনে বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে। এ ছাড়াও প্রাকৃতিকভাবে প্রতি বছর নিবিড় বনভূমিতে দাবানলের মাধ্যমে লাখ লাখ একর বনভূমি ভস্মীভূত হচ্ছে। সম্প্রতি কৃত্রিম দাবানল সৃষ্টি করে পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত আমাজনসহ অনেক নিবিড় অরণ্যের লাখ লাখ একর বনভূমি উজাড় করা হয়েছে। ফলে পৃথিবী থেকে ক্রমাগত বনভূমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশবিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে সোচ্চার হয়েছেন। তারা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বনভূমির ওপর গুরুত্বারোপ করছেন।

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতির অগ্রগতিতে বনায়ন মানব জাতির প্রভূত কল্যাণ সাধন করতে পারে। আমরা অপ্রয়োজনে বনভূমি উজাড় না করে নিজেদের বাঁচার তাগিদেই বনভূমি সৃষ্টি করি। তাহলে বায়ুম-ল দূষণমুক্ত হবে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে। বর্তমানে বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। প্রতিক্রিয়ায় অব্যাহতভাবে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের বিস্তার ঘটে চলেছে। এ সব কলকারখানার নিঃসরিত বর্জ্য ও কার্বন বায়ুমণ্ডলে প্রতিনিয়ত মিশে যাচ্ছে। ফলে বায়ুদূষণ বেড়েই চলেছে। অবিলম্বে কলকারখানার বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিশেষত, জনবহুল স্থান থেকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কলকারখানা নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিতে হবে। সমগ্র পৃথিবীতে কয়লাভিত্তিক কলকারখানা আধুনিকায়ন করে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কয়লার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে নতুন নতুন কয়লাভিত্তিক কলকারখানা স্থাপনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের সন্নিহিত স্থানে কয়লাভিত্তিক শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। সুশীল সমাজ ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা এ ধরনের কারখানা স্থাপনের বিরোধিতা করছেন। আমাদের এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। পৃথিবীতে জ্যামিতিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিক্রিয়ায় শহরায়ন ও নগরায়নের পরিধি বেড়েই চলেছে। আবাসন সঙ্কট বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবাসন সঙ্কট নিরসনের লক্ষ্যে মানুষ প্রতিনিয়ত নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বৃদ্ধি করছে। নির্মাণাধীন স্থাপনাগুলোতে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর ধূলিকণা প্রতিনিয়ত বায়ুমণ্ডলে মিশে দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে চলেছে। চলমান জীবনযাত্রার প্রয়োজনে গৃহায়ন ও সড়ক ব্যবস্থা উন্নয়নের বিকল্প নেই। তবে পরিকল্পনামাফিক নগরায়ন ও সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন করে যতদূর সম্ভব দূষণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আমাদের রাজধানী ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ দূষণের নগরে পরিণত হয়েছে। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ঢাকা শহরে আবাসন খাত ও সড়ক জনপথ বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে ঢাকা শহরকে দূষণমুক্ত করতে হবে।

পানির অপর নাম জীবন। আল্লাহ পাক প্রাণিকুলের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে পৃথিবীতে পানির আধিক্য সৃষ্টি করেছেন। মানুষ পরিণামের কথা চিন্তা না করে যথেচ্ছ পানি ব্যবহার করছে। বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমুদ্রের পানি পরিশোধনের মাধ্যমে পান উপযোগী করা সম্ভব। তবে তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দরিদ্র জাতি-গোষ্ঠীর পক্ষে এ ধরনের ব্যয়বহুল পরিকল্পনা গ্রহণ করা কষ্টসাধ্য।

বর্তমানে কলকারখানার বর্জ্য পানিতে মিশ্রিত হচ্ছে। প্লাস্টিকসহ অন্যান্য অপচনশীল দ্রব্য মানুষ অব্যাহতভাবে নদী ও সমুদ্রে নিক্ষেপ করছে। ফলে নদী ও সমুদ্রের পানিতে দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীতে ও সমুদ্রের পানিতে অক্সিজেন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। প্রতিক্রিয়ায় নদীনালা ও সমুদ্র থেকে অনেক প্রজাতির মাছ অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছে। সমুদ্রের লতাগুল্ম ও জলজ উদ্ভিদ অক্সিজেনের অভাবে বিবর্ণ হচ্ছে বা মারা যাচ্ছে। পানি দূষণের এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে পৃথিবীর প্রাণী জগতের জীবন ধারণ হুমকির সম্মুখীন হবে।

শব্দ বা ধ্বনি প্রাণিজগতের অন্যতম অনুষঙ্গ। বিশেষত, মানুষ ধ্বনি বা শব্দের সাহায্যে তাদের মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে। পৃথিবীতে যত ভাষা প্রচলিত আছে, সেসব ভাষার প্রাণশক্তি শব্দ বা ধ্বনি। এমনকি প্রাণিকুলও বিভিন্ন প্রকার শব্দের মাধ্যমে তাদের মনের ভাব বা আবেগ ব্যক্ত করে থাকে। সে কারণে বলা যায়, শব্দ বা ধ্বনি ব্যতিরেকে প্রাণিকুলের জীবন অচল। তবে প্রত্যেক জিনিসেরই ভালো ও মন্দ দু’টি দিক আছে। প্রাণিকুলের জীবন ধারণের জন্য শব্দের ব্যবহার অপরিহার্য। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, অতিরিক্ত শব্দের ব্যবহার প্রাণিকুলের সুস্থ জীবন ধারণের অন্তরায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- অতিরিক্ত শব্দদূষণের ফলে মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্র বিশেষত মস্তিষ্কের ক্রিয়ার ব্যাঘাত ঘটে। শব্দদূষণের ফলে গর্ভস্থিত ভ্রূণের ওপরে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে শব্দদূষণ মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। সুস্থ জীবন যাপনের লক্ষ্যে ও প্রাণিকুলের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে শব্দদূষণের মাত্রা এখনই নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। সর্বশেষে বলা যায়, পৃথিবীতে প্রায় ৭০০ কোটি মানুষের বসবাস। এ বিপুল মানব জাতির দৈহিক বর্জ্য অবিরত পৃথিবীর পরিবেশকে দূষণ করছে। স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা থেকে পৃথিবীর ব্যাপকসংখ্যক মানুষ বঞ্চিত। ফলে প্রতিনিয়ত মানবসৃষ্ট ও অন্যান্য প্রাণী নিঃসৃত দৈহিক বর্জ্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কার্বনের পরিমাণ বৃদ্ধি করছে। বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করছে। তদুপরি বিভিন্ন প্রকার যুদ্ধাস্ত্রের পরীক্ষা-নীরিক্ষার দূষণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল দূষিত করছে। সব কিছু মিলিয়ে প্রাণিকুলের জন্য পৃথিবী ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংস যথার্থ বলেছেন, এই পৃথিবী জনসংখ্যা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। মানুষের বসবাসের জন্য নতুন কোনো বসতি খোঁজা একান্ত প্রয়োজন।


আরো সংবাদ