১১ ডিসেম্বর ২০১৯
পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধিতে সংসদে তীব্র ক্ষোভ

‘পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধিকারীদের মারা হোক সন্ত্রাসীদের মতো’

‘পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধিকারীদের মারা হোক সন্ত্রাসীদের মতো’ - ছবি : সংগৃহীত

পেঁয়াজের দাম লাফিয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় সংসদে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সরকার ও বিরোধী দলীয় সিনিয়র সংসদ সদস্যরা। তারা অভিযোগ করে বলেছেন, বাজারে পেঁয়াজের ঘাটতি না থাকলেও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কারসাজির মাধ্যমে মূল্য বাড়ানো হচ্ছে। তাই কারসাজির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা জরুরী। এক্ষেত্রে মাদক কারবারিদের মতো দু’এক জনের বন্দুকযুদ্ধে যাওয়া দরকার। এটি কোনো ষড়যন্ত্র কি-না তা খতিয়ে দেখে এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি তারা পেঁয়াজ আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ অধিবেশনে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে এ অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সাবেক চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু ও বিএনপির মো. হারুনুর রশীদ।

সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিষয়টির ওপর আলোচনার অবতারণা করেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। এরপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিষয়টি নিয়ে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এত সুদক্ষ একটি মন্ত্রিসভা, তার দু’জন মন্ত্রী এখানে আছেন। তাদের অনুরোধ করতে চাই। পেঁয়াজের ঝাঁজ বেশি হয়ে গেছে। জনগণের মধ্যে একটা রি-অ্যাকশন হচ্ছে। আজকে পর্যন্ত যে খবর আছে প্রায় ২০০ টাকা হয়ে গেছে পেঁয়াজের কেজি। তিনি বলেন, আমরা এতো জনপ্রিয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কাজ করে যাচ্ছি। কি কারণে পেঁয়াজের দাম প্রতিদিন বেড়ে যাচ্ছে? বাণিজ্যমন্ত্রী যখন সংসদে বলেন, ১০০ টাকার নিচে নামবে না, তখন তো ব্যবসায়ীরা সুযোগ পেয়ে যান। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে আমদানি করছেন বলেছেন। তারপরেও কেন দাম বাড়ছে? ব্যাপারটা বোধগম্য নয়। এতে আমাদের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ভারতে গিয়ে বলেছিলেন পেঁয়াজের ঝাঁজ বেড়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেছিলেন পেঁয়াজের রফতানি বন্ধ না করতে। পেঁয়াজের ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত। তাই অনুরোধ করব, বাণিজ্যমন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষের মধ্যে রিঅ্যাকশন খারাপ হবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, কয়েকদিন আগে ঘুর্ণিঝড় বুলবুল হয়েছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দাম একটু বেড়েছে। একটু না আজকে পত্রিকায় দেখলাম ২০০ টাকা কেজি। এটা কোনো দিন আমরা ভাবিনি। বর্ষার কারণে ভারতে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়নি। সাধারণত এগুলো আমরা আগেই মূল্যায়ন করি। আমাদের বাৎসরিক চাহিদা কতো আছে। আর যেটা ঘাটতি সেটা আগেই তুরস্ক বা মিসরসহ মিয়ানমার থেকে আগেই আমদানি করার ব্যবস্থা করি। টিসিবি সে ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীকে বলবো যারা পেঁয়াজ আমদানি করে তাদের সুযোগ-সুবিধা দেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের যখন কোনো একটা পণ্যের দাম বাড়ে, আমরা তার উপর ডিউটি কমিয়ে দেই। আমি মনে করি এই মুহুর্তে পেঁয়াজ আমদানি করার জন্য অন্ততঃ কিছু দিনের জন্য পেঁয়াজের ডিউটি শূণ্য করে দেন। অতীত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমি যখন শিল্প বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলাম, তখন লবণের দাম বেড়েছিল। তখন অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াকে অনুরোধ করার পর লবণ আমদানি ডিউটি ফ্রি করে দিয়েছিলেন। এই খবর পরিবেশিত হওয়ার সাথে সাথে লবণের মূল্য স্বাভাবিক হয়ে যায়। এরকম একটা ঘোষণা দেন ‘পেঁয়াজ আমদানি করতে কোনো শুল্ক বা ডিউটি লাগবে না,’ তাহলে দেখবেন এর একটা প্রভাব পড়বে। মূল্য নিয়ন্ত্রণে আসবে।

সাবেক চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ বলেন, আসলেই বাজারে প্রচুর পেঁয়াজ আছে। এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নাই। প্রধানমন্ত্রী এর আগে অনুরোধ করেছিলেন পেঁয়াজ কম খেতে। সেটাতে মানুষ সাড়া দিয়েছেন। পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি সরকারের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র। সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। এজন্য দুর্নীতিবাজরা এটা করতে পারে। এটা মানা যায় না। এব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। প্রধানমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আমি আহবান জানাই। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন, যাতে পেঁয়াজের দাম কমে। মানুষের দুর্ভোগ দুর হয়।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, দুইদিন আগে বাণিজ্যমন্ত্রীর পক্ষে শিল্পমন্ত্রী বললেন, পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে আছে। একথা বলার পরদিনই পেঁয়াজের কেজি দেড়শ টাকা হয়ে গেলো। এখন দুইশ টাকা কেজি। নিউজে দেখলাম পেঁয়াজের দাম না পাওয়ায় ভারতের কৃষকরা কাদঁছে। প্রতিবেশী দেশের সাথে আমাদের এত ভালো সর্ম্পক। প্রধানমন্ত্রী যদি নিজে ব্যক্তিগত ভাবে উদ্যোগ নিতেন, তাহলে হয়তো এ সমস্যাটা থাকতো না। বাজারে প্রচুর পেঁয়াজ আছে। তারপরেও দাম বাড়ছে। এখন একটি অভিযান চালানো দরকার। তাহলে এই সমস্যাটা আর থাকবে না। তিনি বলেন, মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীরা ধরা পড়ে। পরে বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়। যারা পেঁয়াজের দাম বাড়াচ্ছে, তাদের একজন মারা যাক না, এমনি বন্দুকযুদ্ধে। তিনি বলেন, আমি মনে করি পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি সরকারের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র। এটা দেখা দরকার। জরুরী ভিত্তিতে এর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো দরকার।

 

 

সরকারী দলের সদস্যদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, ছোট বেলায় আমরা বিস্কুট দৌড় খেলতাম। দৌড়ে গিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বিস্কুট ধরতাম। এখন পেঁয়াজ নিয়ে সেই অবস্থা তৈরি হয়েছে। তাই মূল্য নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

 


আরো সংবাদ