২৬ জুন ২০১৯

ফাঁসি দিয়ে মারা হচ্ছে হরিণ!

সুন্দরবনের চিত্রা হরিণ - ছবি : সংগ্রহ

পাঁচ মণ হরিণের গোশত, দুটি হরিণের খুলি, আর চামড়া শনিবার উদ্ধার হয়েছে বরগুনা থেকে। হরিণ খুব একটা বড় প্রাণী নয়, তাই পাঁচ মণ গোশতের জন্য সংখ্যায় দুটি নয় বরং আরো অনেক বেশি হরিণ মারা হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বরগুনার পাথরঘাটার পদ্মা-বনফুল গ্রামের একটি খালে ট্রলারে করে এসব গোশত নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো বলে জানিয়েছেন পাথরঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হানিফ সিকদার। শিকারিদের কাউকে ধরা সম্ভব হয়নি।

যেভাবে কাজ করে চোরা শিকারীরা

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বলেন কীভাবে এই চোরা শিকার করা হয়।

তবে তিনি তার নাম প্রকাশ করতে চাননি। টেলিফোনে তিনি বলছিলেন তার যেখানে বাড়ি সেই গ্রামের সাথেই লাগোয়া নদী।

সেই নদীর ওপারেই সুন্দরবনের গহীন জঙ্গল।

তিনি বলছিলেন, "মাছ ধরার পার্মিট-পাস নিয়ে এখান থেকে অনেকেই জঙ্গলে যায়। তবে হরিণ শিকারিরা রাতের বেলায় গোপনে ঢোকে।"

নাইলনের দড়ির এক ধরনের ফাঁদ ব্যবহার করেন তারা।

সেই ফাঁদের বর্ণনা দিয়ে বলছিলেন, "হরিণের নিয়মিত যাতায়াতের পথে এগুলো পাতা হয়। যাতায়াতের সময় হরিণগুলো আটকে যায়। এক রাতে পেতে আসা হয়। পরের রাতে গিয়ে আবার দেখা হয়।"

অনেক সময় একবারেই হরিণগুলো গলায় ফাঁস লেগে মারা পরে। আবার অনেক সময় পায়ে বেঁধে আটকে থাকে।
এই ফাঁদের পদ্ধতির নামই স্থানীয়ভাবে ফাঁসি দিয়ে হরিণ মারা।

স্থানীয় বাজারে কিছুটা রাখঢাক রেখে হরিণের গোশত বিক্রি হয় বলে জানান তিনি।

কিন্তু তাদের চোখ থাকে আরো দূরে সুদূর ঢাকা শহর পর্যন্ত। ছয় থেকে সাত শ' টাকা কেজি দরে হরিণের গোশত অগ্রিম অর্ডারও নেয় শিকারীরা।

কোথায় এর নেটওয়ার্ক?

মোঃ জাহিদুল কবির বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক।

তিনি বলছেন, মূলত চিত্রা হরিণই শিকার করা হয়। এই প্রজাতির হরিণই বাংলাদেশে সবচাইতে বেশি আছে।

হরিণের গোশত মূলত সুন্দরবন সংলগ্ন জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পিরোজপুর এসব জেলা থেকে অথবা এই জেলার উপর দিয়ে আসে বলে জানালেন তিনি। নোয়াখালীর হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপে সরকারিভাবে হরিণ ছাড়া হয়েছে।

তাদের সংখ্যাও বেড়েছে। নোয়াখালী থেকেও হরিণের মাংসের নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। নৌ ও স্থলপথ দুভাবেই এটি বড় শহরে যায়।

কী পরিমাণে হরিণ মারা পরছে?

তিনি বলছেন, সরকারি হিসেবে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ হরিণ আছে সুন্দরবনে।

ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ (বর্তমানে ওয়াইল্ড টিম) নামের একটি বেসরকারি সংস্থা ২০১১ সালে একটি জরিপ চালিয়েছিল।

তখন তাদের হিসেবে দেখা গেছে বছরে ১১ হাজারের বেশি হরিণ নিধন হচ্ছে। কিন্তু এর পর নতুন করে কোনো জরিপ হয়নি।

তবে এই হিসেব মানতে রাজি নন বন অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা।

তিনি বলছেন, "এভাবে হরিণ মারা হলে এতদিন সুন্দরবনে হরিণ থাকতো না। সব শেষ হয়ে যেত।"

তিনি জানিয়েছেন, ২০১৮ সালে শুধু সুন্দরবনের ভেতর থেকে প্রায় ৫০০ কেজির মতো হরিণের গোশত জব্দ করা হয়েছে।

মামলার রেকর্ডের ভিত্তিতে এই তথ্য দিয়েছেন তিনি।

আনুমানিক দুই শ' হরিণ এভাবে মারা পরে বলে তিনি বলছেন। কিন্তু পাঁচটি জেলা থেকে আসে এর সরবরাহ।

সবগুলো জেলা মিলিয়ে মাংসের পরিমাণ কত হবে সেই হিসেব পাওয়া যায়নি।

একজন স্বেচ্ছাসেবক যা বলছেন

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সাথে যুক্ত বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের একজন স্বেচ্ছাসেবক বলছেন, "উৎসবের সময় হরিণ শিকার বেড়ে যায়। যেমন আসছে ঈদকে কেন্দ্র করে অনেক অর্ডার বাড়বে। আর সেগুলো বেশিরভাগই যাবে ঢাকার মানুষের ফ্রিজে। তবে স্থানীয় অনেক মানুষের বাড়িতেও পাওয়া যাবে।"

তিনি বলছেন, এই পুরো ব্যবসার সাথে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালীরা যাদের ভয়ে তিনিও নিজের নিরাপত্তার জন্য নাম প্রকাশ করতে চাইলেন না।

তিনি বলছেন, "আগে বন্দুক ব্যবহার করা শিকারি বেশি ছিল। এখন সেটা আর সেভাবে সম্ভব হচ্ছে না।"

হরিণের গোশত খাওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ

বাংলাদেশে আপনি হরিণের গোশত খাওয়ার জন্য অথবা শুধু ফ্রিজে রাখার জন্যেই জেলে যেতে পারেন অথবা বড় অংকের জরিমানা গুনতে হতে পারে আপনাকে।

বন সংরক্ষক মোঃ জাহিদুল কবির বলছেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের ধারা ছয় অনুযায়ী শিকারি, বিক্রেতা ও ক্রেতা সবাইকে শাস্তি দেয়া সম্ভব।

তিনি বলছেন, লাইসেন্স ও পার্মিটপ্রাপ্ত ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারো কাছ থেকে কোনো বন্য প্রাণী, বন্যপ্রাণীর অংশ, অথবা তা থেকে উৎপন্ন দ্রব্য ক্রয়, বিক্রয়, আমদানি-রপ্তানি করেন, আর যদি অপরাধ প্রমাণিত হয় তাহলে সর্বোচ্চ এক বছরের, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে।

একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে তিন বছরের সাজা। অথবা সর্বোচ্চ দুই লক্ষ টাকা জরিমানা।

এই কর্মকর্তা বলছেন, বাংলাদেশে হরিণ পালতে গেলেও সরকারি লাইসেন্স নিতে হয়।
সূত্র : বিবিসি

 


আরো সংবাদ