২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষমতাসীন আ’লীগে

বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষমতাসীন আ’লীগে - ছবি : সংগ্রহ

জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্য হয়ে পড়ছে। দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ছে এক আসন থেকে অন্য আসনগুলোতে। আওয়ামী লীগ ঘোষিত বিভিন্ন প্রার্থীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বিভিন্ন স্থানে সড়ক-মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করছেন দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। কোথাও কোথাও অনশন কর্মসূচিও পালন করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দলের হাইকমান্ডের কঠোর হুঁশিয়ারির তোয়াক্কা না করে কোনো কোনো আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকার ঘোষণাও দিচ্ছেন কেউ কেউ। বিষয়টি নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছেন দলটির নীতিনির্ধারকেরা। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী নির্বাচনে দলীয় অনেক প্রার্থীর ভরাডুবিও হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

এ দিকে নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের মুখে অবশেষে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চেধুরীকে প্রার্থী তালিকায় ফেরানো হয়েছে। ফরিদপুর-২ আসনে নৌকার প্রার্থী হিসেবে চিঠি দেয়া হয়েছে দলের দুঃসময়ের এ কাণ্ডারিকে। এর আগে এ আসনটি মহাজোট শরিক জাকের পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তফা আমীর ফয়সলের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল বলে জানানো হয়। 
এর আগে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রোববার থেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি প্রদান শুরু করে আওয়ামী লীগ। এ পর্যন্ত ২৩১ জনকে নৌকার প্রার্থী ঘোষণা করে চিঠি দেয়া হয়। এর মধ্যে কোনো কোনো আসনে দু’জন প্রার্থীকে চিঠি দেয়া হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও যাদের চিঠি দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে বেশির ভাগই পুরনো। তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন কয়েকজন হেভিওয়েট কেন্দ্রীয় নেতা। প্রার্থী তালিকার বেশির ভাগই বর্তমান এমপি। এর মধ্যে বিতর্কিত এমপি ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন। আওয়ামী লীগের এই মনোনয়ন নিয়ে দল এবং শরিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

দলটির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কার্যনির্বাহী সভায় ৭০ জন এমপি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল বলে আলোচনা হয়েছিল। ওই সভা থেকে শতাধিক এমপি এবার ‘লাল কার্ড’ পেতে পারেন বলে আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছিলেন। তবে চূড়ান্ত মনোনয়নে যেসব এমপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, হাইব্রিডদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া, বহিরাগতদের লালন করা এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির অভিযোগ ছিল তাদের নাম তালিকায় দেখে হতাশ হয়েছেন নেতাকর্মীরা। এসব প্রার্থীর অনেককে প্রত্যাখ্যান করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন দলের মাঠ নেতাকর্মীরা। সময়ের সাথে সাথে এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন আসনে। 

ফেনী-১ (পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া) আসনে জাসদ সাধারণ সম্পাদক বর্তমান সংসদ সদস্য শিরিন আক্তারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমকে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দিয়ে মহাজোটের প্রার্থী ঘোষণার দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার সড়ক অবরোধ করেন নেতাকর্মীরা। 
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, সকাল থেকে ফেনী-পরশুরাম, ফেনী-ফুলগাজী ও ফেনী-ছাগলনাইয়া সড়ক অবরোধ করে দলীয় নেতাকর্মীরা টায়ার জ্বালিয়ে, গাছ ফেলে সড়ক অবরোধ ও ঝাড়– মিছিল করে। 

শিরিন আক্তারকে ‘বাম-নাস্তিক’ আখ্যায়িত করে ফেনীতে তা চলবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন তারা। প্রার্থী পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। 
ঢাকা-২ (কেরানীগঞ্জ) আসনে দলের মনোনয়ন পাওয়া খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামকে অবাঞ্ছিত করে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান মো: শাহীন আহমেদের অনুসারীরা। তারা কামরুলকে জনবিচ্ছিন্ন ও দলের ইমেজ ক্ষুণœকারী আখ্যায়িত করে মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানান। 

নরসিংদী-৪ (মনোহরদী-বেলাব) আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান এমপি নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুনকে পরিবর্তন করে এএইচ আসলাম সানীকে মনোনয়ন দেয়ার দাবিতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। 
এ সময় মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে সড়কে অবস্থান করে স্লোগান দেন কয়েক হাজার দলীয় সমর্থক ও নেতাকর্মীরা। দুই ঘণ্টা সড়ক অবরোধের ফলে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে দুর্ভোগে পড়েন দূরপাল্লার যাত্রীরা। 

খবর পেয়ে দুপুর ১২টায় বেলাব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা, সহকারী পুলিশ সুপার রায়পুরা- বেলাব সার্কেল বেলাল হোসেন ও বেলাব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাবেদ মাহমুদ অবরোধকারীদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে নিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনে আওয়ামী লীগের দেয়া প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে মনোনয়ন বঞ্চিত বর্তমান এমপি সিরাজুল ইসলাম মোল্লা ও তার অনুসারীরা। 
কুমিল্লা-৪ আসনের সাবেক এমপি গোলাম মোস্তফা এবারো আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন। সেখানে মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুল। এর প্রতিবাদে জেলার ক্ষুব্ধ নেতারা গত সোমবার দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সাথে দেখা করেন। বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে অত্যাচার-নির্যাতন করেছেন অভিযোগ করে তারা অবিলম্বে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানান।
নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মানু মজুমদারের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিল করেন মনোনয়ন বঞ্চিতের সমর্থকেরা। দুপুরে কলমাকান্দা উপজেলার গুতুরা বাজার এলাকায় বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করে রাস্তায় শুয়ে পড়েন। তারা মানু মজুমদারকে জনবিচ্ছিন্ন আখ্যায়িত করে এ আসনে দলের কাণ্ডারি হিসেবে সাবেক এমপি মোশতাক আহমেদ রুহীকে মনোনয়ন দেয়ার দাবি জানান।

মেহেরপুর-২ (গাংনী) আসনে দল ঘোষিত প্রার্থী সাহিদুজ্জামান খোকনকে অবাঞ্ছিত ও রাজাকারের সন্তান আখ্যায়িত করে মেহেরপুর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ খালেককে মনোনয়নের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও গণ-অনশন হয়েছে। গতকাল বেলা ১টায় গাংনী উপজেলা শহরের বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। পরে উপজেলা শহীদ মিনারে গণ-অনশন করা হয়।

মেহেরপুর-২ (গাংনী) আসনে দলের মনোনয়ন না পাওয়ায় বর্তমান এমপি মকবুল হোসেনের বাড়ির সামনে স্থাপিত কাঠের নৌকা নামিয়ে ফেলেছে তার ক্ষুব্ধ সমর্থকেরা। দলীয় নেতাকর্মীরা মকবুলকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার দাবি জানান। এ ব্যাপারে তিনি সবার সাথে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন।।
শেরপুর-১ (সদর) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া বর্তমান এমপি ও সংসদের হুইপ আতিউর রহমান আতিক গতকাল শেরপুরে মোটরসাইকেল ও গাড়ি নিয়ে শোডাউন করেছেন।
অন্য দিকে মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে আমরণ অনশন শুরু করেছেন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ছানুয়ার হোসেন ছানুর নেতৃত্বে দলের আরেকটি অংশ। দুপুরে জেলা শহরের খড়মপুরে আওয়ামী লীগের অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে এই অনশন পালন করেন তারা।
এ সময় উপজেলা চেয়ারম্যান ছানু বলেন, শেরপুর সদরের ভোটাররা এবার মনোনয়নের পরিবর্তন চায়। আমরা আশা করি জননেত্রী শেখ হাসিনা ভোটারদের মনোভাব বুঝতে পেরে মনোনয়ন পরিবর্তন করবেন।

এ দিকে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো: আশরাফুর রহমান পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।

ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এমদাদুল হক নৌকা প্রতীকে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তিনিও পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার এম রায়হান শাহের কাছ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।
এর আগে ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) জামালপুর-৫ (সদর), কুড়িগ্রাম-২ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ), ময়মনসিংহ-৮, কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর), ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা-সালথা-কৃষ্ণপুর), চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ এবং কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু) আসনসহ বিভিন্ন আসনে দল ও মহাজোট প্রার্থীদের বিরোধিতা করে ব্যাপক বিক্ষোভ, ঝাড়– মিছিল, সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

দেশের বিভিন্ন স্থানে নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, একটি আসনের বিপরীতে গড়ে ১৩ জন করে মনোনয়ন তুলেছেন। এক আসনে মনোনয়ন পাবেন মাত্র একজন। সবাইকে তো খুশি করা যাবে না। তবে কিছু আসনে আমরা এখনো জরিপ করছি। যদি এমন যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীর ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায় তবে নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমাদান ও প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত তা পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে দলের সিদ্ধান্ত কি হবেÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আজীবন বহিষ্কার করা হবে। তাকে আর দলে নেয়া হবে না।’  

 


আরো সংবাদ