২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

পরাজয় নিয়ে বিএনপির বিশ্লেষণ

পরাজয় নিয়ে বিএনপির বিশ্লেষণ - সংগৃহীত

ভোটের আগের দিন রাত ১০টায় নয়া পল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন নিয়ে বিএনপির আশঙ্কা ছিল- ‘ভোটের আগের রাতেই আওয়ামী লীগ ৩০-৪০ শতাংশ-ভোট ব্যালট পেপারে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে বাক্সে রাখবে। আর এটি করা হবে র্যাব, পুলিশ ও প্রশাসনের সহযোগিতায়।’ নির্বাচনের ফলাফল দেখে স্তম্ভিত বিএনপি সেই আশঙ্কাকেই এখন সত্য বলে মনে করছে। 

বগুড়া-৬ আসন থেকে বিজয়ী বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচনের পর পুরো বিষয়টি মূল্যায়ন করেছেন এভাবে- ‘কিভাবে শক্তি ব্যবহার করতে হয় রাষ্টযন্ত্রকে, তার এক নতুন নমুনা দেখলাম আমরা। আমরা কখনোই এ রকম নির্বাচন অতীতে দেখিনি। যেখানে পুলিশ, র্যাব ও প্রশাসনসহ সবাই মিলে নির্বাচন করছে। আওয়ামী লীগ তো গৌণ। মূল কাজ করছে পুলিশ আর র্যাব।’ তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক ব্যাপারটা হচ্ছে, এখানে একটি ইনস্টিটিউশন হিসেবে নির্বাচন জিনিসটাকেই ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। একদম ধ্বংস হয়ে গেল। মানুষের আস্থা পুরোপুরি চলে গেল।’
বিএনপির কমপক্ষে ১০ জন প্রার্থীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনের ফল কী হতে যাচ্ছে তা ভোটের দিন সকালের দিকেই বুঝে গিয়েছিলেন তারা। দুপুরের আগে ও পরে এ কারণেই কমপক্ষে তাদের ৮০ জন প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেন। ধানের শীষের প্রার্থীদের ভাষায়- ‘নির্বাচন উৎসবের বদলে র্যাব-পুলিশ দিয়ে পুরো পরিবেশটাই চরম ভীতিকর করে ফেলা হয়। বেশির ভাগ প্রার্থীই ছিলেন অবরুদ্ধ। নেতাকর্মীরা ভোটকেন্দ্রের আশপাশেই ভিড়তে পারেননি। দিনভর কেন্দ্রের বাইরে যাদের জটলা ছিল, তারা সবাই নৌকার সমর্থক। নিজেরাই নিজেদের সিল মেরে বিজয়ী করেছে।’

সম্ভাব্য ফল জেনেও কেন্দ্রীয়ভাবে কেনো নির্বাচন বর্জন করা হয়নি এ প্রশ্নের উত্তরে দলের শীর্ষ এক নেতা বলেছেন, কেবল বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকই নয়; ফলাফলের পার্থক্য দেখে পুরো দেশবাসী স্তম্ভিত ও বাকরুদ্ধ। দলীয় ক্যাডার আর প্রশাসনিক কারচুপির মাধ্যমে কিভাবে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে, নির্বাচন বর্জন করলে সেটি সামনে আসত না।’

এক চরম বৈরী পরিবেশে এবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দলটি নির্বাচন বর্জন করেছিল নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি পূরণ না হওয়ায়। এবার দলটি ঐক্যফ্রন্ট নামে নতুন একটি জোট করে নির্বাচনে অংশ নেয়ার শর্ত হিসেবে সাত দফা দাবি দিয়েছিল। কিন্তু এর একটি দাবিও মানেনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিএনপি নির্বাচনে আসবে, সেই বার্তা আগেই ছিল আওয়ামী লীগের কাছে। এজন্য বিএনপির কোনো দাবির প্রতি ন্যূনতম কর্ণপাত করেনি তারা। বিগত নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় বিএনপি ‘ভুল’ করেছে, এমন সমালোচনা এবং দেশী-বিদেশী বিভিন্ন পক্ষের চাপ এবার অনেক বেশি ছিল বিএনপির ওপর। যার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো দাবি আদায় না হলেও কেবল আশ্বাসের ওপর ভর করে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় দলটি। 

সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়ে বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল শেষ পর্যন্ত ছিল ‘রক্ষণাত্মক’। আন্দোলনের টাইমলাইন ঠিক করেও বারবার কৌশল পাল্টেছে দলটি। গেল বছরের মাঝামাঝিতে দলটির কৌশল ছিলÑ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ। অক্টোবর ও নভেম্বরে একটি বড় আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেটি হয়নি নানামুখী চাপে। তৃণমূল নেতৃত্ব আন্দোলনের কর্মসূচি চাইলেও দলটির ভেতরের একটি পক্ষ আন্দোলনের পক্ষে ছিল না। এরই মধ্যে ২০ দলীয় জোটকে ‘গুরুত্বহীন’ করে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা হয়। ঐক্যফ্রন্ট গঠনের ক্ষেত্রেও দলের ভেতরে মতপার্থক্য ছিল। তবুও খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে ড. কামালকে সামনে নিয়ে আসায় ‘কিছু একটা হবে’ ভাবা হয়েছিল। কিন্তু সরকারের আচমকা সংলাপের ডাকে অংশ নিয়ে কোনো দাবিই আদায় করতে পারেনি তারা।

বিএনপি নেতারা বলেছেন, সেপ্টেম্বরে দেশজুড়ে প্রতিটি থানায় বিএনপি কমিটির তালিকা ধরে ধরে মামলা করা হয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এই মামলাই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে মাঠছাড়া করেছে তাদের। নির্বাচনের প্রচারণাপর্বও ছিল একতরফা। ধানের শীষের অর্ধশত প্রার্থী হামলার শিকার হয়েছেন। যথাযথভাবে প্রচারণায় নামতে পারেননি কেউ। শেষ ১৫ দিনে কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। গ্রেফতার ছিল প্রতিদিনই। এমন পরিস্থিতিতে দলের অভ্যন্তরে অনেকের মত ছিল, শেষ দুই দিন তারা মাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখবেন। নেতাকর্মীরা ‘ডু অর ডাই’ ভেবে মাঠে নেমে আসবে। কেন্দ্র পাহারা দিয়ে ফল বুঝে নিয়ে আসবে। কিন্তু সেটিও হয়নি। সাংগঠনিক এমন শক্ত তৎপরতা নির্বাচনের মাঠে খুব একটা দেখা যায়নি। নির্বাচনের দুই দিন আগেও বিএনপি নীরব ছিল। অন্য দিকে, প্রার্থীরা যেখানেই গিয়েছেন মার খেয়েছেন। তবে সব কিছু ছাপিয়ে নির্বাচনের ফল তাজ্জব করেছে বিএনপিকে। দলটির এক নেতা বলেছেন, ‘প্রশাসনিক ম্যাকানিজমের এমন নির্বাচনে একদিন মাঠে নেমেও কি কোনো লাভ হতো?’


আরো সংবাদ

সকল