১৭ আগস্ট ২০১৯

জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে সমঝোতার আভাস

জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে সমঝোতার আভাস - ছবি : সংগৃহীত

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মরহুম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছোটভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে (জি এম কাদের) আনুষ্ঠানিকভাবে পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়েছে। দলীয় চেয়ারম্যান চূড়ান্ত হলেও বিরোধী দলের নেতার পদটি এখনো অমীমাংসিতই আছে। কে আসছেন এই পদে তা নিয়ে দলে চলছে নানামুখী তৎপরতা। তবে রওশনই হতে যাচ্ছেন বিরোধী দলের নেতা এমন ধারণা প্রবল। অন্যথায় ‘ভারপ্রাপ্ত’ থেকে পুরো দায়িত্ব নিয়ে জি এম কাদেরকেই এখন দল ঐক্যবদ্ধ রাখার বড় চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে, একই সাথে সামলাতে হবে পার্টির কো-চেয়ারম্যান এরশাদপতœী রওশন এরশাদকেও। 
তবে সর্বশেষ অবস্থায় জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে সমঝোতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করেন সচেতন মহল। জি এম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান মনোনীত হওয়ায় সংসদে বিরোধী দলের নেতা হতে যাচ্ছেন রওশন এরশাদ। এভাবেই দলের নেতৃত্ব ভাগাভাগি করে জাতীয় পার্টি পরিচালিত হবে বলে জানা গেছে। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার আসনে কে বসবেন, এ নিয়ে জাপার অভ্যন্তরে দুই পক্ষ থাকলেও উভয় অংশের নেতারাই জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত সরকারের সবুজসঙ্কেত যার দিকে থাকবে, তাকে অপজিশনের সিটে বসার অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর করতে হবে পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে।

একাধিক সূত্র জানায়, কয়েক দিনের মধ্যে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্যদের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। তবে দলটির একাধিক শীর্ষ নেতা জানান, আলোচনা হলেও চূড়ান্ত-অর্থে সরকারের মনোভাব জানার পরই বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

জাপার প্রভাবশালী নেতারা জানিয়েছেন, নেতৃত্ব ও বিরোধীদলীয় নেতা ইস্যুতে দু’টি ভাগ রয়েছে দলে। একটি অংশ রওশন এরশাদকে চাইছে বিরোধীদলীয় নেতার পদে। এই পক্ষটি এরশাদের জীবদ্দশায় তার বিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিল। রওশনপন্থীদের যুক্তি হচ্ছে, এরশাদ জীবিত অবস্থায়ই রওশনকে দশম সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নির্বাচন করেছেন। এ ছাড়া, প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই রওশনকে গুরুত্বসহ পার্টিতে জায়গা দিয়েছেন এরশাদ। আর জি এম কাদের জাপায় যুক্ত হয়েছেন অনেক পরে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত জি এম কাদের মহাজোটের মন্ত্রিসভায় থাকলেও ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন করেন। বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে এখনো আপত্তি থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে রওশন এরশাদকেই নিরাপদ মনে করা হতে পারে। 

অন্য দিকে রওশন-বিরোধীরা এ যুক্তি ও অবস্থানের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, মৃত্যুর আগেই এরশাদ জি এম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার পাশাপাশি তার অবর্তমানে চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করেন। একইসাথে গত ২৩ মার্চ জি এম কাদেরকে সরিয়ে জাপার সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদকে সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে মনোনীত করেন। যেভাবে এরশাদের অবর্তমানে জি এম কাদের দলের নেতৃত্ব পেয়েছেন। সেভাবেই বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও তিনিই থাকবেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জাপার মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে রওশন এরশাদতো আছেনই। তিনি উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আগামী ১০ দিনের মধ্যে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের সভা করে এই বিষয়টির সমাধান করা হবে। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে রওশন এরশাদের অভিজ্ঞতা তো আছেই। তবে তিনি হবেন কি না, সে বিষয়ে আমি কিছু জানি না। কারণ এ বিষয়ে পার্টিতে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, আমরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করে নেবো। দলের গঠনতন্ত্র মোতাবেক বিরোধীদলীয় নেতা ঠিক করা হবে বলেও তিনি জানান। আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য এ প্রসঙ্গে বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনের বিষয়টি জাপাই ঠিক করবে। রওশন এরশাদ আগেও এ দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ভালোই চালিয়েছেন।

এ দিকে রওশনঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, রওশন ও জি এম কাদেরের মধ্যে ইতোমধ্যে এক ধরনের সমঝোতা হয়ে গেছে। রওশন নাকি কাদেরকে বলেছেনÑ তুমি (কাদের) পার্টি সামলাও আর আমি সংসদ সামলাই। রওশন যদি বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন তাহলে বিরোধী দলের উপনেতার পদটি আবার শূন্য হবে। সে ক্ষেত্রে পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোজ রশীদ, ফখরুল ইমাম প্রমুখ আলোচনায় রয়েছেন। এ দিকে পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে পেতে মরিয়া তার অনুসারীরা। তারাও সরকারের নানামহলে দেন-দরবার শুরু করে দিয়েছেন। 

জি এম কাদেরকে জাপার চেয়ারম্যান ঘোষণা
জাপা চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জি এম কাদেরকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা এমপি বলেন, অসুস্থ হওয়ার আগে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সাংগঠনিক নির্দেশে জি এম কাদেরকে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং তার অবর্তমানে পাটির চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেছেন। জি এম কাদের পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এখন থেকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদেরের নাম উল্লেখ করার জন্য তিনি গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান। সংবাদ সম্মেলনে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, সুনীল শুভ রায়, এস এম ফয়সাল চিশতী, আজম খান, এ টি ইউ তাজ রহমান, মেজর (অব:) খালেদ আখতার, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া, ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, জাফর ইকবাল সিদ্দিকী, উপদেষ্টা ড. নুরুল আজহার, ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজু, মোস্তাকুর রহমান মোস্তাক, জহিরুল আলম রুবেল, আহসান আদেলুর রহমান আদেল এমপি, যুগ্ম মহাসচিব গোলাম মোহাম্মদ রাজু, হাসিবুল ইসলাম জয়, আমির উদ্দিন আহমেদ ডালু, সুলতান আহমেদ সেলিম, শাহজাহান মানসুর, এম এ রাজ্জাক খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। তবে রওশন এরশাদসহ তার অনুসারী বলে পরিচিত ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, সাবেক মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, ফখরুল ইমাম এমপি, মজিবুল হক চুন্নু এমপি প্রমুখকে সংবাদ সম্মেলনে দেখা যায়নি। 

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে দলের নতুন চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, জাতীয় পার্টিতে কোনো দ্বন্দ্ব বা বিভেদ নেই। সবাই ঐক্যবদ্ধ আছেন। পল্লীবন্ধুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দলকে আরো শক্তিশালী করব। আরো শক্তিশালী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি এগিয়ে যাবে। বিরোধীদলীয় নেতার শূন্য আসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচন করে স্পিকারকে জানিয়ে দেয়া হবে। এ ছাড়া এরশাদের শূন্য আসনে মনোনয়ন দিতে গঠনতন্ত্র মোতাবেক দলীয় ফোরামে আলোচনা করেই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। তিনি বলেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সুদক্ষ ব্যবস্থাপক বলা হয়। উনি বেঁচে থাকলে বন্যাদুর্গতদের পাশে ছুটে যেতেন। আমরা জাতীয় পার্টিসহ সর্বস্তরের জনগণকে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানাই। জি এম কাদের ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান। 

প্রসঙ্গত, জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ গত ১৪ জুলাই ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মারা যান।


আরো সংবাদ