২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বাজেট নিয়ে কিছু কথা

বহমান এই সময়ে
-

এবারের বাজেট নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনায় অংশ নেয়ার এক পর্যায়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, এবারের বাজেটটি হচ্ছে ‘আগামী দিনের স্বপ্ন পূরণের ফাউন্ডেশন’। এই বাজেট প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রণীত হয়েছে। এবারের বাজেট শুধু আগামী এক বছরের বাজেট নয়, এর সুফল পাওয়া যাবে ২০৪১ সাল পর্যন্ত। আমরা জানি না, ২০৪১ সাল পর্যন্ত সেই সুফল দেখার জন্য আমরা কতজন বেঁচে থাকব? তবে চলতি অর্থবছরের বাজেটে এমন অনেক দুর্বলতা ধরা পড়ে, যাতে সেই ‘স্বপ্ন পূরণের ফাউন্ডেশন’ আমরা কতটুকু গড়তে সক্ষম হবো, তা নিয়ে আমাদের সন্দিহান হওয়ার অবকাশ আছে বৈকি। এ ধরনের সব বিষয়ে আলোচনা করা হয়তো এখানে সম্ভব হবে না, তবে দু-একটি বিষয়ের ওপর হলেও আলোকপাত করা প্রয়োজন।
০১.
আমাদের অনেকের হয়তো মনে আছেÑ গত বছর ১১ অক্টোবর বিশ্বব্যাংক প্রকাশ করেছে ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স’ (এইচসিআই)। এই সূচকে সংজ্ঞায়িত করা হয় সে পরিমাণ ক্যাপিটালকে (জ্ঞান, দক্ষতা ও স্বাস্থ্য), যা একজন শিশু তার ১৮ বছর বয়সের সময়ে অর্জনের সম্ভাবনা রাখে। সে সূচকে ভালো অবস্থান পাওয়ায় বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে এর দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীদের চেয়ে এগিয়ে গেছে। যেমনÑ বাংলাদেশের ১৫ বছর বয়সী শিশুদের ৮৭ শতাংশই ৬০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আছে। ভারতের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনার হার ৮৩ শতাংশ, পাকিস্তানের ৮৪ শতাংশ এবং নেপালের ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশ। বাংলাদেশের একজন মেয়েশিশুর অধিকতর ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ রয়েছে একজন বালকশিশুর চেয়ে। এর থেকে প্রমাণ মেলে, নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য অবসানে বাংলাদেশ অনেকটা এগিয়ে গেছে। তবে উল্লিখিত সূচকে প্রকাশিত সব তথ্যই বাংলাদেশের জন্য সুখকর নয়, সুখবর নয়। এইচসিআই প্রতিবেদন মতে, আসলে হিউম্যান ক্যাপিটালের অনেক দিক থেকে আমরা এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশে শিক্ষার নিম্নমান আমাদের সন্তানদের বাধাগ্রস্ত করছে তাদের পরিপূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানের নিম্নমানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতির মধ্যে জন্ম নেয়া একজন বাংলাদেশী শিশু হবে ৪৮ শতাংশ উৎপাদনক্ষম, যদিও এই শিশু পরিপূর্ণ প্রবেশাধিকার পায় বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবায়। এর অর্থ, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের শিশুরা জীবনের শুরু থেকেই ৫২ শতাংশ উৎপাদনশীলতার সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত হবে। এই অবস্থার কারণ কী?
এর প্রতিফলন রয়েছে “ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০১৮ : লার্নিং টু রিয়ালাইজ এডুকেশন’স প্রমিজ” শীর্ষক রিপোর্টে। এই রিপোর্ট মতে, তৃতীয় শ্রেণী পাস করার পরও আমাদের ছাত্রছাত্রীদের ৩৫ শতাংশই মাতৃভাষা বাংলা ভালোভাবে পড়তে পারে না। শুধু ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অর্জন করে টার্মিনাল কম্পিটেন্সি। আর এই টার্মিনাল কম্পিটেন্সি বলতে আমরা বুঝি এমন কিছু দক্ষতার একটি তালিকাকে, যা একজন ছাত্র বা ছাত্রী সাধারণত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করার পর অর্জন করার প্রত্যাশা করে থাকে। এ রিপোর্ট মতে, আমাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ছাত্রছাত্রীরা প্রথম ১১ বছরের স্কুলজীবনের সাড়ে চার বছর হারিয়ে ফেলে নিম্নমানের প্রাথমিক শিক্ষার কারণে। পরিণামে যখন এসব ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষা শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করে, তখন তাদের ৩৮.৬ শতাংশই থাকে বেকার। এসব পরিসংখ্যান নির্দেশ করেÑ নিকটভবিষ্যতে শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা বড় ধরনের সঙ্কটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সর্বসাম্প্রতিক নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি রয়েছে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে তোলার মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের ব্যাপারে। শিক্ষাসম্পর্কিত গবেষণা উদ্যোগ জোরদার করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে এই ইশতেহারে। এর আগের নির্বাচনী ইশতেহারেও দলটি শিক্ষা উন্নয়নের ব্যাপারে অভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তা সত্ত্বেও চলতি বছরের বাজেটে সে প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন মেলেনি। সর্বশেষ বাজেটে সরকার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রেখেছে ৬১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের বাজেট থেকে এই বরাদ্দ ১৭ শতাংশ বেশি। তা সত্ত্বেও শিক্ষা খাতের এই বরাদ্দ মোট বাজেট বরাদ্দের মাত্র ১১.৫৩ শতাংশ, যা গত বছরের মতো প্রায় একই। জিডিপি বা মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের বিবেচনায় শিক্ষা খাতে আমাদের বরাদ্দ দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় খুবই কম। চলতি বছরের বাজেটে আমরা জিডিপির মাত্র ২.১ শতাংশ বরাদ্দ দিতে পেরেছি এ খাতে। অপর দিকে, প্রতিবেশী ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা তাদের নিজ নিজ দেশের জিডিপির যথাক্রমে ৩.৮, ৩.৭ ও ৩.৬ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ রেখেছে শিক্ষা খাতের জন্য। এ দিকে, বাংলাদেশ হচ্ছে ইউনেস্কোর ‘এডুকেশন ২০৩০ ফ্রেমওয়ার্ক ফর অ্যাকশন’-এর একটি স্বাক্ষরদাতা দেশ। এই ফ্রেমওয়ার্ক ফর অ্যাকশনের দাবি হচ্ছে, একটি দেশের জাতীয় বাজেটে মোট বাজেট বরাদ্দের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ কিংবা জিডিপির কমপক্ষে ৬ শতাংশ বরাদ্দ থাকতে হবে শিক্ষা খাতে। আমাদের বাজেটে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ এর ধারে-কাছেও যে নেই, তা ওপরে উল্লিখিত তথ্য থেকে প্রমাণিত।
অপর দিকে, সরকারের দাবি হলোÑ শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে মোট বরাদ্দ হচ্ছে ৭৯ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা। কিন্তু এ খাতে সরকার কৌশলে অন্তর্ভুক্ত করেছে ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র প্রকল্পকেও। অথচ এ প্রকল্পটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন। আর এ প্রকল্পের জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। অপর দিকে, শিক্ষা খাতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতেÑ যেমন বৃত্তিমূলক শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং মাদরাসা শিক্ষার জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এই নবসূচিত ‘প্রযুক্তি’ অংশের বরাদ্দের তুলনায় অনেক কম। সরকার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ রেখেছে ৯ হাজার কোটি টাকা; বৃত্তিমূলক ও মাদরাসা শিক্ষার জন্য সম্মিলিত বরাদ্দ হচ্ছে মাত্র ৭ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা। আর গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য রাখা হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি টাকা। গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দের এই চরম দৈন্যের কারণে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার টেবিল ছেড়ে খণ্ডকালীন চাকরি করতে হয় বিভিন্ন এনজিওতে। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। মোট কথা, এভাবে সরকার শিক্ষা খাতকে ক্রমেই গুরুত্বহীন খাতে পরিণত করে তুলছে। বাজেট বরাদ্দের বিস্তারিত তুলে ধরা হলে এর প্রতিফলন সুস্পষ্টভাবে মেলে।
০২.
২০১৯-২০ অর্থবছর শুরু হতে না হতেই জানা গেল, অর্থবছরটি শুরু হওয়ার প্রথম দুই দিনেই সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়েছে দুই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে, প্রথম দিন নেয়া হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা। আর দ্বিতীয় দিনে দেড় হাজার কোটি টাকা। এ ঋণের বিপরীতে সুদ দিতে হবে শতকরা ৭ টাকা ৯৪ পয়সা হারে। দেশের ১৫টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে এই ঋণ নিয়েছে সরকার। বলার অপেক্ষা রাখে না, এবারে বাজেটে বিশাল অঙ্কের ঘাটতি মেটাতেই ব্যাংক থেকে সরকারের এই ঋণ নেয়া। ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতির কারণেই ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আমরা সবাই জানি, এখনকার ক্ষমতাসীন সরকারের একটি প্রবণতা হচ্ছে, চমকতুল্য রেকর্ড পরিমাণ অঙ্কের বাজেট ঘোষণা। কিন্তু সরকারের আয়ের সাথে এই বাজেটের অঙ্কের সামঞ্জস্য না থাকায়, ঘাটতির পরিমাণ ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে রয়েছে বিপুল অঙ্কের ঘাটতি। পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকার এই বাজেটের ২৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। বিরাট অঙ্কের এই ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যাংক খাত থেকে সরকারকে ধার নিতে হবে ৫৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। আর ঋণের সুদের জন্য চলতি অর্থবছরে সরকার ব্যাংককে দিতে হবে ৫৭ হাজার কোটি টাকা। যা হোক, ব্যাংক খাত থেকে নেয়া ঋণের অংশ হিসেবে হয়তো আমরা দেখলামÑ অর্থবছরের প্রথম দুই দিনে সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে দুই হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছে।
শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাতের ঋণের মধ্যেই বর্তমান সরকারের ঋণ নেয়া সীমাবদ্ধ নয়; আছে বিদেশী ঋণও। চলতি বছরের শুরুতেই বাংলাদেশের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ২০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। সে মতে, চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ২০৪.৮৫ ডলার। এদিকে গত ১৭ জুন সরকারের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ একটি কর্মশিবিরে সাংবাদিকদের জানিয়েছে, বাংলাদেশের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ২০৪ ডলার বা ১৭ হাজার টাকার ওপরে। এর অর্থ, এ মুহূর্তে বাংলাদেশের একেকজন শিশুকে ১৭ হাজার টাকার বৈদেশিক ঋণের বোঝা নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়াও রয়েছে অভ্যন্তরীণ ঋণের বোঝা।
সবচেয়ে বড় কথা, ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়ে বাজেটের ঘাটতি পূরণে সরকারের যে পরিকল্পনা, তা সঠিক নয়। কারণ, সরকারি ঋণের বহর ব্যাংকগুলোর সঙ্কট আরো বাড়িয়ে তুলবে। এমনিতেই তীব্র তারল্য সঙ্কট আছে দেশের ব্যাংকগুলোতে। অথচ এ সময়টাতেই ব্যাংকগুলো থেকে সরকার বিপুল অঙ্কের ঋণ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক খাত থেকে বেশি অর্থ ধার করলে বেসরকারি খাত বঞ্চিত হবে ঋণ থেকে। কেননা, সব টাকা সরকার নিয়ে গেলে বেসরকারি খাতে ঋণ দেয়ার মতো টাকা ব্যাংকগুলোর কাছে অবশিষ্ট থাকবে না। এ ক্ষেত্রে, সরকারের জন্য দ্বিতীয় পথ হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ধার নেয়া। তা হলে, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে টাকা ছাপিয়ে দিতে হবে। এতে অবশ্য দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।
০৩
চলতি অর্থবছরে বাজেটের খড়গ সবচেয়ে বেশি নেমে এসেছে কোটি কোটি মধ্যবিত্তের ওপর। কালো টাকার মালিকসহ ঋণখেলাপি ও বড়লোকদের জন্য নানা ধরনের ছাড় থাকলেও ভ্যাট ও শুল্ক কর বাড়ানো হয়েছে বেশ কিছু নিত্যপণ্য ও সেবা খাতে। ভ্যাটে রেয়াত সুবিধার পরিবর্তে স্বপ্নবিলাসী বাজেটের অর্থের জোগান দিতে, উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোগ পর্যন্ত তিন স্তরে রাজস্ব দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এর ফলে ভীষণ চাপের মুখে পড়বে নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষ। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাটের জাল ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা। ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষাপটে ভ্যাট আইন সংশোধন করা হলেও এর আওতা কমানো হয়নি, বরং প্রকারান্তরে বাড়ানো হয়েছে। আগে অব্যাহতি পাওয়া বিভিন্ন সেবা ও পণ্যকে নতুন আইনে এর আওতায় আনা হয়েছে, তেমনি অনেক খাতে ভ্যাটের হার বাড়ানো হয়েছে। নতুন করে শতাধিক পণ্যে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। নিচের তিন স্তরের ভ্যাট হারের ক্ষেত্রে ভিত্তিমূল্য প্রত্যাহার কিংবা আগে পরিশোধিত ভ্যাট সমন্বয়ের সুযোগ রহিত করায় কার্যকর ভ্যাটের পরিমাণ অনেক বাড়বে। কোনো কোনো পণ্যের ভ্যাটের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। এর ফলে দেশীয় শিল্প মুখ থুবড়ে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কাই করছেন ব্যবসায়ীরা।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা খাতে ভ্যাট বাড়ানোর দরুন কম আয়ের মানুষের আয়-ব্যয়ে এমনিতেই ফারাক বেড়েছে। এর ওপর, নতুন করে জ্বালানি গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রভাব পড়বে জীবনধারণের নানা পর্যায়ে। কারণ গ্যাসের ওপর কৃষি, পরিবহন ও শিল্পকারখানাসহ অনেক কিছুই নির্ভরশীল। গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়লেও সীমিত আয়ের মানুষের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়ে যাবে। তা ছাড়া, দেশে রয়েছে চার কোটি বেকার। প্রবাসীদের মাধ্যমে বিদেশী মুদ্রা এলেও তা বিনিয়োগ করা হচ্ছে না। বাজেটে ভ্যাট ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে এরই মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য পেঁয়াজ, রসুন, শিশুখাদ্য ও গুঁড়ো দুধের দাম বেড়ে গেছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা ভ্যাটের খড়গের নেতিবাচক প্রভাব আরো বেশি করে বুঝতে পারবেন মাস দুয়েক পর থেকে। গ্রামের কৃষকেরা তা উপলব্ধি করবেন আরো বেশি করে। কারণ, সাম্প্রতিক খবর হচ্ছে, কৃষকের উৎপাদিত প্রধান ফসল ধানের দাম আরো কমে গেছে। আবার গ্যাস-বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাথে সার উৎপাদনের বিষয়টিও নির্ভরশীল। গ্যাসের দাম শতকরা ৬৫ ভাগ বাড়ানো হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব তাই পড়বে কৃষি উৎপাদনেও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করার যে কৌশল অবলম্বন করতে চাচ্ছে, এর ফলে কৃষি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে গেলে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা ব্যর্থ হবে। অন্যথায় কৃষকদের অতিরিক্ত দাম দিয়ে সার কিনতে বাধ্য করা হবে। এতে চলতি বছরের মতো কৃষকের উৎপাদন খরচ না উঠলেও মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা কৃষকের ওপর পড়বে।
এক লাফে শিল্প খাতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম প্রায় ৩৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৭.৭৬ টাকা থেকে ১০.৭০ টাকা করা হয়েছে। ফলে শিল্পকারখানার পরিচালনা ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে সেসব কলকারখানায় উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে; বিশেষ করে রড উৎপাদনে। গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর প্রতি টনে উৎপাদন খরচ বাড়বে ১৪০০ টাকা।
এই বাজেটে আয়-বৈষম্য নিরসনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা সংস্থা সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, সরকার যে নীতি অবলম্বন করে আসছে, তা দেশে মানুষের আয়-বৈষম্য বাড়িয়ে তোলার জন্য দায়ী। সরকারের অবলম্বিত নীতির কারণে দেশের অর্থ চলে যাচ্ছে মুষ্টিমেয় কিছু লোকের কাছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি করার পেছনে সরকারের যেসব ভুল নীতি কাজ করছে তার মধ্যে আছে : বারবার ঋণখেলাপি হওয়া যাদের স্বভাব, তাদের কর রেয়াত ও যখন-তখন ঋণ তফশিলীকরণের সুযোগ দেয়া। তিনি আরো বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এই আয়-বৈষম্য নিরসনের কোনো পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষমতাও এ সরকার রাখে না। প্রতিটি বাজেট আসার আগে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি ওঠে সামাজিক অর্থবৈষম্য দূর করার জন্য বাজেটীয় পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে। কিন্তু বিষয়টি আমলে নেয়া হয় না; বরং কালো টাকা সাদা করার সুযোগসহ টাকাওয়ালাদের নানা ধরনের সুবিধা দিয়ে এই বৈষম্য আরো বাড়িয়ে তোলার পথটাই করে দেয়া হয়। সেই সাথে নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বাজেটীয় পদক্ষেপ যেন হয়ে উঠেছে এক মারণফাঁদ। হ


আরো সংবাদ