১৮ জুলাই ২০১৯

আফগানের জন্য ভালোবাসা

-

‘আমি আফগান ছিলাম, আফগান আছি এবং আফগান থাকব।’ এ কথাগুলো আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টি বা এএনপি প্রধান ইস্ফান্দিয়ার ওয়ালী ২০১৬ সালে বলেছিলেন। এটাকে কেন্দ্র করে কিছু দেশপ্রেমিক মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং তার বিরুদ্ধে গাদ্দারি তথা দেশদ্রোহীর অভিযোগ আরোপ করে তাকে ‘আফগানিস্তান চলে যাওয়া’র নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু এএনপি প্রধান এ নির্দেশের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপই করেননি। তিনি তার পার্টির প্রাদেশিক পরিষদের সাবেক সদস্য শুয়াইব খানের স্মরণে আয়োজিত সভায় কথাগুলো বলেছিলেন। শুয়াইব খান তার এলাকায় বাবায়ে সোয়াবি ও মালাঙ্গ বাবা নামে খ্যাত ছিলেন। যখন সোয়াত থেকে উত্তর ওয়াজিরিস্তান ও বান্নু থেকে পেশাওয়ার পর্যন্ত প্রতি দ্বিতীয় দিনে বোমা হামলা হচ্ছিল, তখন এএনপিই পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। বশির বিলৌর থেকে শুয়াইব খান পর্যন্ত সাত শতাধিক সদস্যকে এএনপি পাকিস্তানের জন্য কোরবান করেছে, কিন্তু ‘পাকিস্তানকে ভালোবাসা’র দাবিদারদের এ কোরবানি নজরে পড়ে না। তারা ইস্ফান্দিয়ারকে ‘গাদ্দার’ বলে, কেননা তিনি নিজেকে আফগান হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। কিছুকাল আগে ইসলামাবাদে ১০ বছরের নিষ্পাপ কন্যাশিশু ফেরেশতাকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছে। অপহরণের পাঁচ দিন পর ওর লাশ পাওয়া গেলে স্বজনরা পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন। কেননা ইসলামাবাদ পুলিশের সদস্যরা ওই শিশুর বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা নথিভুক্ত করার পরিবর্তে মজলুম পিতাকে দিয়ে থানা পরিষ্কার করার কাজ করিয়ে নেয়। স্বজনদের সে বিক্ষোভে কিছু সামাজিক সংগঠনও শামিল হয়েছিল। একটি টিভি চ্যানেল দাবি করে, ফেরেশতার পরিবার পাকিস্তানি নয়, বরং আফগান। এরপর যা হওয়ার তাই হলো। সোস্যাল মিডিয়ায় পাকিস্তান ও ইসলামের নাম নিয়ে গালিগালাজকারী দেশপ্রেমিক পাকিস্তানি ও ‘ইসলামি’ যোদ্ধারা ময়দানে নেমে পড়ল। তারা সেøাগান দেয়া শুরু করল, ‘আফগান ভাগাও, পাকিস্তান বাঁচাও’। জবাবে শিশু ফেরেশতার জন্য ন্যায়বিচারের প্রার্থীরা বলা শুরু করল, ‘আমরাও আফগান’। যখনই কোনো পাখতুন নিজেকে ‘আফগান’ বলে, তখন পাঞ্জাবের অধিবাসী এবং পাকিস্তান জাতীয়তাবাদের কিছু ধ্বজাধারী তাকে গাদ্দার আখ্যায়িত করে আফগানিস্তান চলে যাওয়ার নির্দেশ দিতে থাকে। এটা সেই মানসিকতা, যার কারণে ১৯৭১ সালে বাঙালিরা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে গেছে। কিন্তু আফসোস, সময় বয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রতি ভালোবাসার নামে দেশের প্রতি এ ধরনের শত্র“তা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। আমরা সন্তানদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সঠিক ইতিহাস পড়াই না। এর কারণ হচ্ছেÑ যদি নিউ জেনারেশন জেনে যায় আমাদের আসল হিরো ও ভিলেন কারা, তাহলে পাকিস্তানে এক বিশেষ শ্রেণীর একচেটিয়া আধিপত্য শেষ হয়ে যাবে।
নির্মম পরিহাস দেখুন, আফগানরা মূলত পাকিস্তানের অংশ। কিন্তু নিজেদের আফগান অভিহিতকারীকে গাদ্দার আখ্যায়িত করছে পাকিস্তানিত্বের ধ্বজাধারী। এ অজ্ঞতার কারণ হচ্ছে, আমরা ‘পাকিস্তান’ শব্দের ইতিহাসও বিশ্বস্ততার সাথে আমাদের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করিনি। আমরা পাঠ্যসূচিতে এ কথা অবশ্য বলছি, দ্বিজাতিতত্ত্বের সূচনা করেছিলেন স্যার সৈয়দ আহমদ খান, যিনি মুসলমান ও হিন্দুদের দু’টি আলাদা জাতি হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিন্তু জামালুদ্দিন আফগানিকে আমাদের পাঠ্যসূচিতে গুরুত্ব দিইনি, যিনি মধ্য এশিয়া থেকে উত্তর-পশ্চিম ভারত পর্যন্ত একটি আলাদা মুসলিম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। এরপর ১৮৯০ সালে আব্দুল হালীম শরর ভারতকে হিন্দু ও মুসলিম জেলায় ভাগ করার প্রস্তাব করেছিলেন। আকবর এলাহাবাদী, মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহার, মাওলানা হাসরত মোহানি ও মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ: ১৯০৫ ও ১৯২৮-এর মাঝামাঝি সময়ে বারবার পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের প্রস্তাব পেশ করেছেন। ১৯২৮ সালে কুপওয়ারা অঞ্চলের হান্দওয়ারা এলাকার অধিবাসী, কাশ্মিরি সাংবাদিক গোলাম হাসান শাহ কাজেমি ‘সাপ্তাহিক পাকিস্তান’ নামে পত্রিকার ডিক্লারেশনের জন্য অ্যাবোটাবাদে আবেদন করেছিলেন। আল্লামা ইকবাল ১৯৩০ সালে তার এলাহাবাদের ভাষণে বিস্তারিতভাবে পাঞ্জাব, সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্তানকে নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেন। আমাদের পাঠ্যসূচিতে ‘পাকিস্তান’ শব্দের স্রষ্টা হিসেবে চৌধুরী রহমত আলীকে স্বীকৃতি দেয়া হয়ে থাকে। তিনি ১৯৩৩ সালে NOW OR NEVER নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন, যেখানে ‘পাকিস্তান’ শব্দের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পুস্তিকাটি ‘পাকিস্তান মুভমেন্ট’ নামের একটি সংগঠন প্রকাশ করে, যার প্রেসিডেন্ট ছিলেন আসলাম খাটাক ও সেক্রেটারি ছিলেন চৌধুরী রহমত আলী। এ পুস্তিকার তথ্য মতে, পাকিস্তান শব্দের পে বা পি (P) নেয়া হয়েছে পাঞ্জাব থেকে, আলিফ বা এ (A) নেয়া হয়েছে আফগান থেকে, কাফ বা কে (K) নেয়া হয়েছে কাশ্মির থেকে, সিন বা এস (S) নেয়া হয়েছে সিন্ধু থেকে এবং তান (Tan) নেয়া হয়েছে বেলুচিস্তান থেকে। ওই সংগঠনে খাজা রহিমও যুক্ত ছিলেন, যিনি আল্লামা ইকবালের কাছ থেকে এ নামের অনুমোদন গ্রহণ করেন। ড. জাহাঙ্গীর তামীমীর ‘ইকবাল, সাহেবে হাল’-এর তথ্য মতে ইকবাল ২২ নভেম্বর ১৯৩৭ সালে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভীর সামনে ব্যবহার করেন এবং বলেন, ‘এটাই মুসলমানদের সমস্যার একমাত্র সমাধান।’ আল্লামা ইকবালকে ‘পাকিস্তান ধারণার স্রষ্টা’ও বলা হয়। আফসোস, পাকিস্তানিত্বের ধ্বজাধারীদের বেশির ভাগই আফগানদের ব্যাপারে প্রাচ্যের কবির চিন্তাভাবনা সম্পর্কে সম্যক অবহিত নয়। ইকবালের আফগানিস্তান ও পশতু ভাষা সম্পর্কে বেশ গভীর জ্ঞান ছিল।
আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর শায়খ আতাউল্লাহ পরিশ্রম করে আল্লামা ইকবালের সাড়ে চার শতাধিক পত্র অনুসন্ধান এবং ‘ইকবালনামা’ নামে তা প্রকাশ করেছেন। এ গ্রন্থ সর্বপ্রথম ১৯৪৪ সালে প্রকাশ করা হয়েছিল। সম্প্রতি ইকবাল একাডেমি পাকিস্তান তা পুনঃপ্রকাশ করেছে। এ গ্রন্থে খালেদ খলিলের নামে ইকবালের একটি পত্র রয়েছে, যেখানে প্রাচ্যের কবি পশতুভাষী আফগান ও পাঠানকে একই বলে অভিহিত করে বলেছেন, আফগান মূলত ইহুদি বংশোদ্ভূত জাত। এ কারণে পশতু ভাষায় হিব্র“ ভাষার কিছু শব্দ রয়েছে। এ পত্রে খোশহাল খান খাটাকের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। আল্লামা ইকবাল ‘খোশহাল খানের উপদেশ’ নামে তার এক কবিতায় বলেছেনÑ কাবায়েল হোঁ মিল্লাত কী ওয়াহদাত মেঁ গুম/ কে হো নাম আফগানিউঁ কা বোলান্দ/ মুহাব্বাত মুঝে উন জাওয়ানুঁ সে হ্যায়/ সেতারুঁ পে জো ডালতে হেঁ কামান্দ- অর্থাৎ, জাতির একতায় অন্যরা হারিয়ে যাও, আফগানদের নাম হোক সমুচ্চ। ওই জোয়ানদের প্রতি আমার ভালোবাসা, যারা তারকারাজির ওপর ফাঁদ নিক্ষেপ করে।’
অন্যত্র তিনি বলেছেনÑ অসিয়া এক পেইকারে আবও গেলাস্ত/ মিল্লাতে আফগান দারান পেইকারে দিলাস্ত। [এশিয়া একটি কাদা-পানির দেহ/ আফগান জাতি সেই দেহে হৃৎপিণ্ডসম]। অর্থাৎ এশিয়া একটি দেহ আর আফগান ওই দেহের মাঝে হৃৎপিণ্ডসম গুরুত্বের দাবিদার। ইকবাল বলেন, আফগান বাকী, কোহসার বাকী/ আলহুকমু লিল্লাহ, আলমুলকু লিল্লাহ। -এর মানে, ‘আফগান অবিনাশী, পর্বতমালা অবিনাশী। হুকুম আল্লাহর, রাজত্ব আল্লাহর।’ আফগান শুধু তারাই নয়, যারা আফগানিস্তানে থাকেন, বরং আফগান পাকিস্তানেও বসবাস করেন, যাদেরকে পাখতুন ও পাঠান বলা হয়। ড. মুহাম্মদ নওয়াজ খান মাহমুদ তার ‘ফিরাঙ্গী রাজ আরো গাইরাতমান্দ মুসলমান’ গ্রন্থে লিখেছেনÑ আফগান, পশতুন বা পাঠানের বংশধারা বনি ইসরাইল তথা হজরত ইয়াকুব আ: থেকে এসেছে। তাদের পূর্বপুরুষের নাম ছিল আফাগেনা, যিনি বনি ইসরাইলের বাদশাহ তালুতের পৌত্র ছিলেন। যদি কোনো পাকিস্তানি পশতুন নিজেকে ‘আফগান’ বলেন, তাহলে কারো ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা এটাই তার পরিচয়। ভারতে যেমন পাঞ্জাবি আছেন, পাকিস্তানেও আছেন। সিন্ধিভাষী ভারতেও আছেন। বেলুচিভাষী আফগানিস্তান ও ইরানে বসবাস করছেন। অনুরূপভাবে, পশতুভাষী পাকিস্তানি নিজেকে যদি আফগান বলে প্রকাশ করেন, তাহলে হাসিমুখে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরুন এবং বলুন, আমিও আফগান। কেননা আজকের পাকিস্তানে বসবাসকারীদের বেশির ভাগ পূর্বপুরুষদের মুসলমান বানিয়েছেন হজরত দাতা গঞ্জবখশ রহ:, হজরত কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী রহ:, হজরত মুঈনুদ্দীন চিশতী রহ: এবং লাল শাহবাজ কলন্দর রহ:। তারা সবাই ছিলেন আফগান। হ
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ২৭ মে,
২০১৯ সংখ্যা থেকে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
[email protected]
হামিদ মীর : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট,
পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক
প্রেসিডেন্ট জি নিউজ নেটওয়ার্ক (জিএনএন)


আরো সংবাদ