২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আওয়ামী লীগের ৭০ বছর

-

ব্রিটিশরা ‘জুয়েল ইন দ্য ক্রাউন অব ব্রিটিশ এম্পায়ার’ ভারতবর্ষকে ১৯৪৭ সালে মুসলমান অধ্যুষিত কাশ্মিরকে ঘিরে একটি প্যাঁচ লাগিয়ে এবং দুই রাষ্ট্রে ভাগ করে পরস্পরকে চির বৈরীভাবাপন্ন করে গেল। পাকিস্তান অর্জনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন এবং ঢাকায় ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ভূমিকা ছিল মুখ্য। মুসলিম লীগ ১৯৪৯ সালে ভাগ হয়ে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। ১৯৫৪ সালে দলটি এ কে ফজলুল হক ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করে নির্বাচনে জিতে পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং সরকার গঠন করে। কিছু দিনের মধ্যেই দলটির নেতৃত্ব দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিলে সাধারণ অমুসলিমরা এ দলের একনিষ্ঠ সমর্থকে পরিণত হন। ভারতও এ দলটির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। ১৯৫৬ সালে দলটির সভাপতি (১৯৫৬-৫৭) পাশ্চাত্যপন্থী নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেন। অল্প ক’দিনের মধ্যেই পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি এবং পূর্ববঙ্গের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে মতভেদের কারণে ‘চীনপন্থী’ মওলানা ভাসানী এ দল থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন।
আওয়ামী লীগের দাবি ছিল পূর্ববঙ্গে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা। সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ঘোষণা দিলেন, পূর্ববঙ্গের ৯৮ ভাগ স্বায়ত্তশাসন হাসিল হয়ে গেছে। এদিকে ১৯৫৭ সালেই মওলানা ভাসানী পূর্ববঙ্গের পক্ষে পাকিস্তানকে ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’ বলে বিদায়ের বাণী উচ্চারণ করেছিলেন। এর মধ্যে পূর্ববঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এত অবনতি ঘটে যে, প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার শাহেদ আলী পাটওয়ারী ১৯৫৮ সালে পরিষদের অধিবেশন চলাকালে কিছু সদস্য কর্তৃক আহত হয়ে দু’দিন পর হাসপাতালে মারা যান। এই প্রেক্ষাপটে সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খান দেশে সামরিক আইন জারি করেন। এরপর মুসলিম লীগের নবসংস্করণ ‘কনভেনশন মুসলিম লীগ’ গঠন করে প্রেসিডেন্ট হয়ে দেশ শাসন করতে থাকেন। স্বৈরশাসনের অভিযোগে ১৯৬৯ সালে দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানের মুখে সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খানের হাতে তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দেন। ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালে সামরিক শাসনের অধীন পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন দিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দুই ইউনিটের পাকিস্তানকে ছয় দফার ভিত্তিতে একটি ফেডারেল রাষ্ট্রের রূপ দেয়ার ঘোষিত লক্ষ্যে সে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে তো বটেই, সামগ্রিকভাবে সারা পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। তবে অঞ্চল হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)। এরপর রাজনৈতিক ঘটনাবলি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পরপরই অত্যুৎসাহী কিছু উগ্র কর্মী পাহাড়তলী, পার্বতীপুর, সৈয়দপুর প্রভৃতি অবাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় লুটপাট ও হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং তারাও সীমালঙ্ঘন করে। এ প্রেক্ষাপটে এবং ঢাকায় ১৯৭১-এর ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে ভুট্টোর যোগদানে অনীহার কারণে ১ মার্চ ১৯৭১ সালে অধিবেশন স্থগিত করা হয়। এতে সারা পূর্ব পাকিস্তান বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এরপর ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে শেখ মুজিব ঢাকার রেসকোর্সে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক বিশাল জনসভায় বাংলাদেশের ‘মুক্তি ও স্বাধীনতা’র ইঙ্গিত দেন। সেদিন থেকে বাংলাদেশ কার্যত মুজিবের নির্দেশে চলতে থাকার পাশাপাশি ১৬ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিবের সাথে জেনারেল ইয়াহিয়া ঢাকায় নিষ্ফল আলোচনায় বসেন।
এই পরিস্থিতিতে ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালের মধ্যরাতে সেনাবাহিনী বাংলাদেশে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে সামরিক অভিযান চালায়। ফলে পাকিস্তানের অখণ্ড অস্তিত্ব ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্নে’ চলে যায়। সে রাতেই শেখ মুজিব সেনবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। বাদবাকি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা পরবর্তী কিছু দিনের মধ্যে একে একে ভারতে আশ্রয় নেন। ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম বেতারের কালুরঘাট সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবের পক্ষে তদানীন্তন মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সর্বাত্মক ভারতীয় সহযোগিতার মাঝে ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বিজয় অর্জন করেন। জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে শেখ মুজিব সোজা লন্ডন চলে যান। এরপর দিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে প্রথমে রাষ্ট্রপতি এবং দু’দিন পরেই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
১৯৭২ সালে ঢাকার রেসকোর্সে জনসভায় শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘তিন বছর আমি কিছু দিবার পারমু না’। বাস্তবে দেখা গেল, ‘এ সময়ে সরকার আশ্রিত কিছুসংখ্যক লোকের হাতে ব্যবসায় বাণিজ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণভার ন্যস্ত করায় এই গোষ্ঠী অক্টোপাসের মতো সমস্ত দেশের অর্থনীতিকে নিজেদের কবলে এনে শোষণ করে যাচ্ছে। বস্তুত গত দুই বছরে সমাজকে শোষণহীন করার নামে বাংলাদেশে যে লুণ্ঠন চলেছে, তার নজির ইতিহাসে নেই। অল্প কিছু দিনের মধ্যে দেশের সম্পদের এক বৃহৎ অংশ এমন সব ব্যক্তির হাতে গিয়ে পৌঁছেছে এবং আজও ক্রমাগত যাচ্ছে, যারা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার কাজে কোনোদিন আত্মনিয়োগ করেনি। দুই বছর আগে যারা ছিল নিরন্ন, আজ তারা লাখোপতি। দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। রাজনৈতিক নেতারা শত লাখোবার দুর্নীতি উচ্ছেদ করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা জনসাধারণকে জ্ঞাপন করেছেন। দুনীতি যাদের ব্যবসায়, তারাও এই কোরাসে যোগ দিয়েছেন। অথচ দুর্নীতি উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে’ (অর্থনীতিবিদ ড. মাজহারুল হক, পলিটিক্যাল ইকোনমি, ভলিউম ১, সংখ্যা ১, ১৯৭৪, পৃষ্ঠা-৭)। অধিকন্তু ছিল যুদ্ধোত্তর লুণ্ঠন প্রক্রিয়া। ‘আমরা আমাদের অর্থনীতিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত বললেও ১৬ ডিসেম্বর (১৯৭১) পর্যন্ত আমাদের সমস্ত ফ্যাক্টরিগুলো অটুট ছিল। ফ্যাক্টরি থেকে যে সব জিনিস উধাও হয়েছে, সেটা ১৬ ডিসেম্বরের (১৯৭১) পর’ (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৫)।
গণতন্ত্রের জন্য পাকিস্তান ভাগ হলো এবং শেখ মুজিব ১৯৭০-এর আগ পর্যন্ত এ জন্যই লড়াই করেছেন। অথচ ১৯৭৫ সালে তিনি নিজ দল আওয়ামী লীগসহ দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে বিলুপ্ত করে একদলীয় ব্যবস্থা বাকশাল কায়েম করে সেই গণতন্ত্র বিসর্জন দিলেন। সে বছরই ১৫ আগস্ট তিনি সপরিবারে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। বিদেশে অবস্থানরত তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা তখন প্রাণে বেঁচে যান। সে সময়ে তারই দলের এক সিনিয়র নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসন জারি করেছিলেন। তিন বছর পর প্রেসিডেন্ট জিয়া নিজ দল বিএনপি গঠন করে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দল পুনরুজ্জীবিত হয়। এদিকে শেখ হাসিনা ভারতে প্রায় ছয় বছর নির্বাসিত জীবন যাপন করে ১৭ মে ১৯৮১ সালে দেশে ফেরেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া ৩০ মে ১৯৮১ সালে সেনাবাহিনীর কয়েকজন অফিসারের হাতে মর্মান্তিকভাবে চট্টগ্রাম রেস্ট হাউজে নিহত হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তার প্রেসিডেন্ট হন। তিনি বিএনপি শাসনকে ২৪ মার্চ ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এগিয়ে নেন। সেদিনই সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটালেন। তিনি ১৯৮৩ সালে নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দিয়ে পরে জাতীয় পার্টি গঠন করেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরশাসনের অভিযোগে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এর পর থেকে দেশে চলতে থাকে নানা কূটকৌশলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদলের অধ্যায়।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্র“য়ারির নির্দলীয় নিরপেক্ষ কেয়ারটেকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরে যায় এবং বিএনপি জেতে। তখন আওয়ামী লীগ অভিযোগ করল, নির্বাচনে ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’ হয়েছে। ১৯৯৬ সালে বিএনপি নিজ দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন করে জিতেছিল। তবে আওয়ামী লীগ প্রচণ্ড আন্দোলন করে দ্রুত নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বিএনপিকে বাধ্য করে এবং ’৯৬ সালের সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করে বিএনপি জিতলে, আওয়ামী লীগ এবার বলল, নির্বাচনে ‘স্থূল কারচুপি’ হয়েছে। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জেতার জন্য এমনই মরিয়া হয়ে ওঠে যে, দেশের আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে ঢাকার রাজপথে গ্রাম্য কায়দায় লগিবৈঠা দিয়ে লাশ ও রক্ত ঝরানো হয়। ফলে যে সেনাসমর্থিত সরকার ক্ষমতায় এলো তা দুই নেত্রীকেই জেলে ঢোকায়। তবে আওয়ামী লীগের দাবি, সে সরকার তাদেরই ‘আন্দোলনের ফসল’। সেনাসমর্থিত সরকার দুই বছর পর ২০০৮ সালে নির্বাচন দেয়। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধান থেকে মুছে দিলো কয়েক বছর পরে। অতঃপর আওয়ামী লীগ নিজ দলীয় সরকারের অধীনে পরপর দু’দুটি নির্বাচনেÑ একটি ২০১৪ সালে, অপরটি ২০১৮ সালেÑ ‘জয়ী’ হয়। প্রথমটিতে প্রতিদ্বন্দ্বীহীন ও দ্বিতীয়টিতে ভোটারহীন নির্বাচনে ‘জয়ী’ হয়ে অন্য দলগুলোর তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে।
দীর্ঘ দিন একাধারে ক্ষমতায় থাকা দোষের কিছু নয়। আদর্শ গণতান্ত্রিক দেশ যুক্তরাজ্যের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার ১৯৭৯-১৯৯০ সময়কালে বিংশ শতাব্দীর দীর্ঘস্থায়ী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এবং ১৯৭৫-১৯৯০ সময়কালে রক্ষণশীল দলের নেতা ছিলেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৬৬-১৯৭৭ মেয়াদে এবং আবার ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ সালে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার পিতা জওয়াহের লাল নেহরু ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ১৭ বছর। একাধারে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও তারা জনগণকে পাশ কাটিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেননি। তাই এহেন পন্থায় ক্ষমতায় কেউ টিকে থাকার রহস্যটা অনুসন্ধানের বিষয়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ইন্দিরা গান্ধীর জ্ঞাতসারে এবং ভারত সরকারের বিশেষ তত্ত্বাবধানে মুজিব বাহিনী গঠিত হয়। অভিযোগ আছে, মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে মুজিব বাহিনী যতটা আগ্রহী ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি তৎপর ছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের করণীয় বা ভূমিকা নিয়ে। হাবভাবে মনে হতো, স্বাধীনতার পরে দেশে যে সরকার গঠিত হবে, সেই সরকারের নিরাপত্তা দেয়াই তাদের মূল উদ্দেশ্য, যাতে বামপন্থীরা নতুন সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করতে না পারে। সে জন্য ‘বাহিনী’টি যাতে সংগঠিত থাকে এবং যুদ্ধোত্তর নতুন সরকারের পক্ষে কাজ করতে পারে, সে দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো। ‘সেই বাহিনীকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে আসার জন্য একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করার পরিকল্পনাও তাদের ছিল বলে আমার মনে হয়েছে’ (এ কে খন্দকার, ১৯৭১ ভেতরে বাইরে, ২০১৪, পৃষ্ঠা-১৩৯)।
স্বাধীন বাংলাদেশে ভারতের এই স্কিম এখনো কি চালু আছে? ১৯৯৬ সালে বিএনপি নিজ সরকারের অধীনে নির্বাচন করে ক্ষমতায় এসে দু’দিনও টিকতে পারল না। অপর দিকে, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ নিজ দলীয় সরকারের অধীনে, দেশে-বিদেশে অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে ও ক্ষমতা পেয়ে নিরুদ্বেগে দেশের ভোট ও অধিকার বঞ্চিত জনগণের ওপর কর্তৃত্ব করে চলেছে। কোনো কোনো দেশের প্রভাববলয়ে থেকে মহল বিশেষ একটি সঙ্ঘবদ্ধ দল হিসেবে জনগণের সাথে স্বেচ্ছাচারী সরকারের মতো আচরণ করছে।
২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনে সংসদে বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রী চমৎকার কথা বলেছেনÑ ‘অবৈধভাবে যারা ক্ষমতায় আসে, তারা নিজেরা দুর্নীতি করে এবং তা তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়।’ বর্তমানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশী কিছু বিত্তশালীর অর্থের পরিমাণ টাকার অঙ্কে পাঁচ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। উপরন্তু দেশীয় ব্যাংকগুলো দেদার লুট হচ্ছে। বাকস্বাধীনতার বিষয়ে আওয়ামী লীগারদের মুখে সদা উচ্চারিত উদ্ভুত উক্তি, ‘দেশে যদি বাকস্বাধীনতা না থাকে, তবে সরকারের বিরুদ্ধে আপনারা এত কথা বলেন কী করে?’
মার্কিন কংগ্রেসম্যান ও এশিয়া প্রশান্ত উপকমিটির চেয়ারম্যান ব্র্যাডলি শেরম্যান ১৩ জুন ২০১৯ সালে সুদানের উদাহরণ টেনে রাখাইন রাজ্যকে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করলেন। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ১১ লক্ষাধিক রাখাইনবাসী মুসলমান বাংলাদেশের ক্যাম্পে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কিন্তু আমাদের সরকার জোরালো দাবি নিয়ে অদ্যাবধি এ সমস্যা সমাধানে এগোয়নি। ১৯৭১ সালে ভারত এমন সমস্যা শত্রুদেশকে সামরিক শক্তিবলে দ্বিখণ্ডিত করে সমাধান করেছিল। নেতারা বলেন, ‘কর্তব্যবোধ, দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা, ত্যাগ-তিতিক্ষা আছে বলেই আওয়ামী লীগ ৭০ বছর ধরে টিকে আছে।’ এরূপ যারা বলেন, তারা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিলাসী’ গল্প থেকে একটি উক্তি স্মরণ করুনÑ ‘টিকিয়া থাকাই চরম সার্থকতা নয়, এবং অতিকায় হস্তি লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।’ জনগণকে এত ভয় কেন? নেহরু, ইন্দিরা, থ্যাচার প্রমুখের মতো সুষ্ঠু নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় বসুন এবং হাজার বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকুন, দেশবাসী এ বিষয়ে টুঁ শব্দটি করবে না। হ
লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক,
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা কাডার


আরো সংবাদ