১৮ আগস্ট ২০১৯

একটি রেইনট্রির আত্মকথা

-

আমার ডাক নাম কড়ই গাছ, পোশাকি নাম রেইনট্রি এবং বৈজ্ঞানিক নাম অষনরুরধ ষবননবশ. আমাদের রয়েছে নানা প্রজাতি, যাদের বৈজ্ঞানিক নামও নানা রকম যেমনÑ ঋষবধ ঞৎবব, ঋৎুড়িড়ফ, কড়শড় এবং, ডড়সধহ'ং ঞড়হমঁবং ঞৎবব ইত্যাদি। সব প্রজাতির সাধারণ নাম শিরীষ। স্থানীয়ভাবে শীল কড়ই নামেও সমধিক পরিচিত। ইংরেজি জধরহ ঞৎবব শব্দ থেকেই রেন্ডি গাছ নামকরণ হয়ে থাকতে পারে। অপরাহ্ণে ও বর্ষণমুখর অবস্থায় গাছের পাতা পরস্পরকে আলিঙ্গন করে রাখে। ঞযব হধসব ড়ভ ধ ৎধরহ ঃৎবব ধৎরংবং ভৎড়স রঃং নবযধারড়ৎং, ধং ঃযব ষবধাবং রিষষ নব পষড়ংবফ ঁঢ় রহ ঃযব বাবহরহম ধহফ রহ ৎধরহু বিধঃযবৎ.
চৈত্রের ভরদুপুরে রেইনট্রির শীতল ছায়ায় বসে বিশ্রাম নেয়ার সময় ওপরে তাকিয়ে অনেকেই একে বটবৃক্ষ বলে ভুল করেন। আসলে আমরা রেইন ট্রি বা বৃষ্টি গাছ। আমরা মূলত মেক্সিকো, ইন্দোমালয়, নিউগিনি ও উত্তর অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলের উদ্ভিদ। আমাদের আদিপুরুষ কখন কিভাবে পাক-ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তা অজ্ঞাত। অনেকের বিশ্বাস, প্রথম মোগল সম্রাট বাবরের আমলে মধ্য এশিয়ার সাথে ভারতবর্ষের যোগাযোগ বৃদ্ধির সময় আমাদের আগমন হয়ে থাকতে পারে।
ব্রিটিশ শাসনামলে বড় বড় শহর, সড়কের ধার, কালেক্টর অফিসের সামনে ও সরকারি রেস্ট হাউজের আঙিনায় অনেক যতœ করে রেইনট্রি রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো। বছর কয়েক আগেও নারায়ণগঞ্জের বন্দরে বর্তমান ইস্পাহানি ঘাট এলাকায় রেইনট্রির কিছু প্রাচীন বংশধর ছিল। ইস্পাহানি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা হাজী মোহাম্মদ হাসিম (১৭৮৯-১৮৫০) ১৮২০ সালে ইস্পাহানি গ্রুপ অব কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে এ এলাকায় বেশ কিছু রেইনট্রি গাছ রোপণ করেন। সত্তরের দশকে ইস্পাহানির অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এরপর নব্বইয়ের দশকেও গাছগুলো দেখা গেছে। একেকটা গাছ এক একর জায়গাজুড়ে মহীরুহের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। আবাসিক সমস্যা বৃদ্ধির কারণে সবার নজর পড়ে পরিত্যক্ত ভূমির ওপর। এক সময় গাছগুলো কর্তন করার পর তদস্থলে এখন দালান-বাড়িঘর।
আরো জানা যায়, ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলাকে তিনটি তালুকে ভাগ করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেন। এক ভাগ পেলে রাজনারায়ণ চক্রবর্তী (ময়মনসিংহের ত্রিশালের জমিদার)। তিনি খাজনা আদায়ের জন্য গফরগাঁও উপজেলার দত্তেরবাজার ইউনিয়নের কন্যামণ্ডলে একটি কাচারি স্থাপন করেন, যা পরবর্তী সময়ে ‘যোগেশ বাবুর কাচারি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। তিনি ১৭৯৫ সালের দিকে ভারত থেকে চারটি কড়ই গাছ (রেইনট্রি), দু’টি বট, পাঁচটি আম ও শিমুল গাছ এনে কাচারির আঙিনায় রোপণ করেন। দু’টি কড়ই, একটি আম ও একটি বটগাছ এখনো জীবিত আছে।
এক তথ্য থেকে জানা যায়, প্রায় চার শ’ বছর আগের রেইনট্রি বংশধরের কয়েকটি আজো রয়েছে ফেনীতে। পুরাতন সোনাগাজী বাসস্ট্যান্ডের পাশের প্রাচীন গাছটি নিয়ে রয়েছে অনেক উপকথা, গল্প ও কল্পকাহিনী। এখানে সন্ধ্যা হলেই শুরু হয় পাখিদের মিলনমেলা। ওদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এ গাছের বয়স ৩০০ ও ৩৫০ বছর যে যাই বলুক, বয়স অন্তত আড়াই শ’ বছরের ঊর্ধ্বে। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা বলেছেন, ‘জন্মের পর থেকে গাছটিকে এভাবেই দেখে আসছি।’ গাছের বেড় চার থেকে সাড়ে পাঁচ মিটার। বাকল কিছুটা কালচে মসৃণ। এসব গাছের কাঠ খুবই শক্ত, ওজনে ভারী। প্রতি ঘনমিটার কাঠের ওজন প্রায় সাড়ে সাত কেজি। বাড়িঘর, আসবাবপত্র, নৌকা, ঘরের খুঁটি তৈরি হয় এই কাঠ দিয়ে।
ব্রিটিশ আমলে আদালত এলাকায় উকিলদের বসার তেমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই প্রত্যেক আদালতের মাঠে ছিল প্রকাণ্ড বট, অশ্বত্থ, কড়ই কিংবা পাকুড় গাছ। সে সময় উকিলদের মধ্যে যারা মামলার সব কাজকর্ম এসব গাছের ছায়ায় বসে করতেন, তাদের পরিচয় ছিল ‘বটতলার উকিল।’
এতক্ষণ রেইনট্রি গাছের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে বলা হলো। এখন আত্মকথায় ফিরে আসি। আমার জন্ম ঈশাখাঁর রাজধানী সোনারগাঁওয়ে। বীজসহ শুকনো ফল উড়তে উড়তে মাটিতে পতিত হয়েছিল। মাটির আর্দ্রতায় জন্ম (অঙ্কুরিত) হয় আমার। আশপাশে আমার মতোই আরো অনেকের জন্ম। সেখান থেকে ১৯৯০ সালের দিকে আমাদের কয়েকজনকে নিয়ে আসা হয় এই দ্বীপে। দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে শত প্রতিকূল অবস্থায়ও টিকে ছিলাম। আমার আগে এ জমিতে দ্বীপের বয়সের সমবয়সী একটি তালগাছ ছিল। মেঘনার উজান-ভাটির মাঝিরা ভৈরব পার হয়ে তালগাছের মাথা দেখে, ‘ওই দেখা যায় প্রধান বাড়ির তালগাছ’ বলে আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন। বর্ষাকালে পানি চলে আসত তালগাছের গোড়ায়। তখন কোনো কোনো রাতে কুমির উঠে তালগাছের গোড়ায় শুয়ে থাকার কথাও শোনা যায়। গাঁয়ের পশ্চিম দিকে ছিল আরো কয়েকটি কড়ই গাছ। তালগাছের পর কড়ই গাছ দেখে মাঝিরা দূর থেকে গ্রাম চিহ্নিত করত। নদীভাঙনে, যে স্থানে কড়ই গাছটি ছিল সে স্থানটি আজ মাঝনদীতে।
অল্পদিনের মধ্যেই লকলক করে বাড়তে শুরু করি। ডাগর হয়ে উঠতে না উঠতেই পাখপাখালি এসে বাসা বুনতে শুরু করে। সকাল-সন্ধ্যায় পাখির কলকাকলি আমার ভালো লাগত। একসময় আশপাশের সব গাছ ছাড়িয়ে অনেক ওপরে চলে যায় আমার চূড়া। গ্রীষ্মকালে লোকজন আমার ছায়ায় বসে যখন আরাম করত, তখন কী যে ভালো লাগত! নদীপথের যাত্রীরা দূর থেকে আমার চূড়া দেখে গ্রাম দেখার সাধ মেটাত। তখন গর্বে আমার বুকটা ভরে উঠত। যিনি আমাকে এ দ্বীপে এনেছেন, তার বাবা-মায়ের সমাধিও আমার ছায়াতলে। আমার ফুল-পাতায় সমাধি সব সময় ঢেকে থাকত। আমার ছায়ায় বসে লোকজন পুরনো গাছের গল্প করে। তাদের কাছ থেকে জানতে পারি, এক সময় এলাকায় অনেক পুরনো গাছ ছিল। পাশের গাঁয়ে ছিল কয়েকটি শতবর্ষী শিমুল গাছ। কোনো কোনো গাছের গোড়ার বেড় ছিল ৩০ ফুটের বেশি। শত শত টিয়াপাখিসহ হাজার পাখির বাস ছিল ওই গাছে। ছিল শকুনের বাসাও। একবার এক সুফি আশ্রম করেছিলেন শিমুল গাছের দুই শিকড়ের ফাঁকে।
ছিল অনেক পুরনো তালগাছ। তালগাছে উপুড় করা কলসির মতো ঝুলত বাবুইয়ের বাসা। রাত-বিরাতে হাঁটার সময় শিশুর কান্নার মতো শকুনছানার কান্নার শব্দ কানে আসত। বসন্তের শুরুতেই শিমুলের ফুলে সারা গাছ লালে লাল হয়ে উঠত। কোনো কোনো গাছ এত বড় ছিল যে, অনেক সময়ই শিমুলের বিচি সংগ্রহ করা সম্ভব হতো না। তা ফেটে তুলা ছড়িয়ে পড়ত সারা এলাকায়। বড় গাছ ছাড়াও প্রত্যেক বাড়ির পাশে ছিল ঝোপঝাড়। ঝোপঝাড়ে ডাহুক-ঘুঘুসহ বাস করত হরেক রকম পাখপাখালি। নদীর ঢালে মাটিতে গর্ত করে ডিম দিত মাছরাঙা। চার দশক আগেও প্রকৃতির সবুজের মাঝে ছিল নানা রঙ, প্রকার ও আকারের পাখপাখালি। স্থানীয় ও শীতের পাখি মিলে এলাকা হয়ে উঠত যেন চিড়িয়াখানা।
এখন ঝোপঝাড় কিংবা বট, অশ্বত্থ, কড়ই, পাকুড় তাল-তমাল, শিমুল ইত্যাদি বড় গাছ চোখে পড়ে না। যেখানে এসব গাছ ছিল, সেখানে এখন হয়তো বাড়িঘর, নয়তো রয়েছে হাইব্রিড ফলফলাদির গাছ। হাতের নাগালের ছোট হাইব্রিড গাছ পাখপাখালি বাসের যোগ্য নয়। গাছগাছালি ছাড়া যেমন পাখির চলে না, তেমনি পাখপাখালি ছাড়াও গাছের চলে না। পাখির কিচির-মিচির ও কলকাকলি ছাড়া প্রকৃতি যে কারণে বিরূপ, সবুজ প্রকৃতি ছাড়া পাখপাখালিও সে কারণে বিরূপ। সবুজ, প্রকৃতি ও পাখপাখালি একে অন্যের পরিপূরক।
এ কথার সমর্থন পাওয়া যায় পবিত্র কুরআনুল কারিমের সূরা জুুখরুফের ৩২ নম্বর আয়াতে। পাখি এবং সবুজ শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বাস্তুসংস্থান চক্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে পাখির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ডেস্ক থেকে, ‘দ্য সায়েন্স অব ন্যাচার’ নামে একটি জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় জানা যায়, বছরে ৫০ কোটি মেট্রিক টন ক্ষতিকর পোকামাকড় পাখিরা খায়। সুইজারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এ তথ্য উপস্থাপন করেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ১০৩টি গবেষণা পর্যালোচনা করে তারা এ সংখ্যা বের করেছেন। প্রতিবেদনে প্রকাশ, প্রতি বছর সারা বিশ্বের পাখিরা ৪০ থেকে ৫০ কোটি মেট্রিক টন ক্ষতিকর পোকামাকড় খায় পাখি।
গুবরে পোকা, মাছি, পিঁপড়া, মথ, জাবপোকা ইত্যাদি অনিষ্টকারক পতঙ্গ খায় পাখিরা। গবেষকেরা বলছেন, উদ্ভিদখেকো পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাখি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাখিরা সাধারণত চাষাবাদের মওসুমে পোকামাকড় শিকার করে। এ সময় তাদের প্রচুর প্রোটিন প্রয়োজন। এ ছাড়া ছানাদের খাবারের জন্যও তারা শিকার করে থাকে। গবেষণা দলের প্রধান ড. মার্টিন নিফেলার বলেন, পাখিরা প্রতি বছর পোকামাকড় খেয়ে যে পরিমাণ শক্তি সঞ্চয় করে, তা নিউ ইয়র্ক শহরের আকারের সমান হবে। বনে থাকা পাখিরাও ৭০ শতাংশ পোকামাকড় খেয়ে ফেলে। তা মোট হিসাব করলে প্রতি বছর ৩০ কোটির মতো হবে। তৃণভূমি, ফসলি জমি ও মরুভূমিতে থাকা পাখিরা বনে থাকা পাখির তুলনায় অনেক কম পোকামাকড় খায়। ড. নিফেলার বলেছেন, পাখিরা বিপন্ন হওয়ার হুমকির মধ্যে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ বড় গাছসহ বনের সংখ্যা কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিতে রাসায়নিকের তীব্রতা বৃদ্ধি, মানবসৃষ্ট কিছু দুর্যোগ প্রভৃতি।
আমারো গর্ব হতো, যখন এলাকার পাখপাখালি হারিয়ে যাওয়া দিন ফিরে পাওয়ার আশায় আমার শাখায় পাতার আড়ালে আশ্রয় নিত। আমার লকলক করে বেড়ে ওঠায় সুসংবাদের সাথে দুঃসংবাদও ছিল। এক শ্রেণীর কাঠব্যবসায়ী ঘুরঘুর করত আমাকে কেনার জন্য। আমার ফুল, পাতা ও ফল ছড়িয়ে পড়ত চারপাশে। এতে ঘরের চাল ও উঠান-বাড়িঘর ময়লা হওয়ায় আমাকে গঞ্জনাও কম সইতে হয়নি। এই বসন্তে আমার ফুল ফোটেনি, গজায়নি নতুন ডালপালা; বেরোয়নি কচিপাতা। অনেকের ধারণা, বিধাতা বিরূপ হয়ে আমার ওপর ‘বজ্রপাত’ ঘটিয়েছেন। আমার পূর্বপুরুষদের কেউ কেউ ৩০০ বছর পরও বেঁচে রয়েছেন, অথচ মূল্যবান আসবাবপত্র, জীব ও জগতের শোভাবর্ধন ও কল্যাণের পরিবর্তে ৩০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই আমাকে আগুনের চুল্লিতে প্রবেশ করতে হচ্ছে। হ
লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক


আরো সংবাদ

কলেজছাত্রীর শ্লীলতাহানির পর নগ্ন ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি নারায়ণগঞ্জ থেকে জিয়াউর রহমানের নাম মুছে ফেলতে চান সেলিম ওসমান কাশ্মির স্টাইল ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও প্রয়োগ? গ্রেফতার হয়নি রিফাত হত্যার এজহারভুক্ত ৪ আসামী, ২২ আগস্ট অভিযোগপত্র দাখিল ‘শান্তি’র আহবান নিয়ে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পদযাত্রায় শান্তি খুলনায় সহপাঠীকে ধর্ষণ মামলায় কর কমিশনারের ছেলে শিঞ্জন রিমান্ডে মন্ত্রণালয়গুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর শহিদুল আলমের মামলা স্থগিত রাখার নির্দেশ আপিল বিভাগের ছাত্রদলের মনোনয়ন ফরম শেষ! কিউইদের হারিয়ে লঙ্কানদের জয় অবশেষে পুলিশের হস্তক্ষেপে মুক্ত লোহাগড়ার সেই পরিবার

সকল