১৮ আগস্ট ২০১৯

বাংলাদেশ কি এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছে?

-

ভারতের এনআরসি মানে ‘ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স’। কিন্তু এর ঘটনাস্থল আসামের এক ইস্যু। ভারতের নর্থ-ইস্টে সাত রাজ্যের বড়টা হলো আসাম, নানান ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর ভিত্তিতে এই রাজ্যকে ভেঙেই মূলত ১৯৭২ সালে ভাগ করে মোট সাতটি আলাদা রাজ্য হয়েছিল। সেই আসামে এনআরসির সোজা মানে হলো, নাগরিকদের জাতীয় তালিকার রেজিস্টার। ‘জাতীয়’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও এটা দিয়ে সারা ভারতের নাগরিক তালিকা বুঝানো হয়নি, কেবল ‘আসামের নাগরিকদের তালিকা’ বুঝতে হবে। কিন্তু কেবল আসামে কেন?
এনআরসির ফাইনাল তালিকা বহু মোচড়ামুচড়ির পরে ঘোষণা করার সর্বশেষ তারিখ ৩১ জুলাই। কিন্তু আবার গড়িমসি করা শুরু হয়ে গেছে। আবার আদালতে তারিখ পেছানোর দরখাস্ত পেশ আর খুবসম্ভবত এবার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘মুসলমানেরা দায়ী, মুসলমান অনুপ্রবেশকারীরা দায়ী’Ñ এ কথাগুলো প্রবল করার বিজেপি-আরএসএসের জল্পনা-পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। এ দিকে, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপেশাদার আচরণও ইস্যুটিকে বিপজ্জনক করে তুলছে। এমনিতেই ভারতের কিছু মিডিয়া বলা শুরু করেছে যে, এনআরসির তালিকা তৈরি করার কাজটা শেষে ত্রুটিপূর্ণ হয়ে ব্যর্থ হবে। ভারতের এমন মিডিয়ার তালিকায় যুক্ত হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার নাম। এদের সর্বশেষ রিপোর্টের শিরোনাম ‘এনআরসি বিপর্যয় : প্রক্রিয়ার ত্রুটি স্বীকার করে নিয়েছে কেন্দ্র ও আসাম’Ñ এটা প্রকাশিত হয়েছে ১৭ জুলাই।
কেবল আসামে কেনÑ সেই প্রশ্ন থেকে শুরু করতে প্রথমে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়ে রাখি। নাগরিক তালিকা তৈরির কাজটা অবশ্যই প্রশাসনিক, মানে নির্বাহী সরকারের। আসামে এই এনআরসি কাজটা চলছে মোদি বা তার আগের কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছা বা আদেশে নয়। তাহলে কি এটা রাজ্য বা প্রাদেশিক সরকারের আদেশে বা ইচ্ছায় হচ্ছে? না, তা-ও নয়। এটা চলছে বিচার বিভাগের নির্দেশে। না, এনআরসি তৈরিতে কাজে নেমে পড়ার আদেশ বলতে, একটা আদালতের রায় যেমন হয়, এটা ততটুকুই নয়। রায় তো দিয়েছেনই, সেই সাথে খোদ আদালতই এনআরসি কাজের তদারককারী, তত্ত্বাবধায়ক। তা-ও আবার ‘আদালত’ বলতে আসাম রাজ্যের হাইকোর্ট নয়, একেবারে কেন্দ্রের সুপ্রিম কোর্ট, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে। তবে ‘সমন্বয়কারী’ নামে বুরোক্র্যাট (প্রতীক হাজেলা) আছেন বটে, কিন্তু তিনি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের কাছে জবাবদিহির অধীনে। অর্থাৎ তিনি কেন্দ্রের মোদির (বা আসাম রাজ্যের) নির্বাহী সরকারের হুকুমের অধীনস্থ কেউ নন। সোজা কথায় বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগের কাজকাম কিছু নিজের দখলে নিয়েছে। যেমন আমাদের ন্যাশনাল আইডি তৈরির কাজ নির্বাচন কমিশনের অধীনে সম্পন্ন হয়েছে। আর নির্বাচন কমিশন শেষ বিচারে নির্বাহী বিভাগের অন্তর্গত। কারণ এটি কনস্টিটিউশনে উল্লেখ থাকা প্রতিষ্ঠান বলে রাষ্ট্রপতির অধীনে, আর সেই সূত্রে সে রাষ্ট্রপতির অফিস ঘুরে সেই নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর অধীনে। এখন বাংলাদেশে এটা সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি তদারকিতে সম্পন্ন হলে যা হতো, তাই হচ্ছে আসামের এনআরসিতে।
এতে একটা অসুবিধা বললাম যে, রাষ্ট্রের ক্ষমতা নির্বাহী আর বিচার বিভাগের মধ্যে ভাগ করা থাকে, সে নিয়ম এখানে ভঙ্গ করা হয়েছে। ফলে, নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন নির্বাহী ক্ষমতা মানে তো সরকার, মানে রাজনীতিবিদদের কাজ বা দায়িত্বের এরিয়া। কিন্তু সেই এরিয়ায় বিচারপতিরা কেন ঢুকবেন? সমাজের রাজনৈতিক তর্ক-ঝগড়া রাজনীতির মাঠে সমাধান হতে হবেÑ সঙ্ঘাত, আপস ইত্যাদির মাধ্যমে। এ জন্য রাজনীতিকদের এরিয়ায় বিচার বিভাগ কখনো আসবে না, সমাজকে রাজনৈতিক ফয়সালার এবং একে কাজ করার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। এনআরসি করাটাই আসাম সমাজের রাজনৈতিক সমাধান কি নাÑ এ নিয়ে রায় দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। এটাই সবেচেয়ে বড় ব্লান্ডার। এরপর আবার তা বাস্তবায়নের কর্তৃপক্ষ হয়ে গেছেন আদালত নিজেই, যা আরেক ব্লান্ডার। এটা বিশাল অকাজ, অনধিকার চর্চা। নিজের সীমা না বুঝে কাজ করা হয়েছে। এখন যদি মিডিয়ার আশঙ্কা অনুসারে এনআরসি প্রকল্প সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয় [যেমন চলতি মাসে আসাম রাজ্য ও কেন্দ্র যৌথভাবে (যার দুটোই বিজেপির দলের সরকার) সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে, যাতে ফাইনাল তালিকা প্রকাশ করার শেষ তারিখ ৩১ জুলাই থেকে পিছিয়ে অনির্দিষ্টকাল করা হয়।] যার অর্থ এটা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় কোর্টের। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট নিজেই যেন একটা রাজনৈতিক পক্ষ হয়ে উঠবেন, যার বিরুদ্ধে অন্য রাজনৈতিক পক্ষ বা স্বার্থগুলো সোচ্চার হবে। অথচ এটা অকল্পনীয় যে, আদালত নিজেই এক রাজনৈতিক পক্ষ হবেন! এ কারণেই আদালত সব সময় বুদ্ধিমানের মতো [জুরিসপ্রুডেন্সের] প্রুডেন্স বা দূরদর্শিতা দেখিয়ে আগাম কোনো রাজনৈতিক পক্ষ বা বিপক্ষ হওয়া থেকে দূরে থাকেন।
এনআরসি করার দাবিকে কেন আসাম সমাজের ‘রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব’ বলেছি? ভৌগোলিকভাবে এই নর্থ-ইস্ট এবং বাকি ভারতের মাঝখানে আছে বাংলাদেশ। যদি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সরাসরি যাওয়া হয় তবে কলকাতা থেকে আসামের সবচেয়ে কাছের জেলার দূরত্ব ৩৫০ কিলোমিটার। কিন্তু বাংলাদেশ অনুমতি না দিলে ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ হয়ে ঘুরে কলকাতা আসতে সেই দূরত্ব বেড়ে হয়ে যায় এক হাজার ৭০০ কিলোমিটার। ১৯৪৭ সালের পর থেকে এটাই আসামের দুঃখের মূল উৎস। আসামের সাথে বাকি ভারতের সহজ যোগাযোগ ‘নাই’ হয়ে যায়, মানে ‘মানি সার্কুলেশন’ নাই, অর্থনীতি নাই, অবকাঠামো নাই, এভাবে সব কিছু নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিল। তবু ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতের নেহরু সরকার এভাবেই আসামকে স্থবির ফেলে রাখতে চেয়েছিল। কেন? কারণ তার ভয় আসামের উত্তরে হলো চীন সীমান্ত। ভারত বাংলাদেশের সাথে কোনো ‘ফেয়ার ডিল’, উপযুক্ত বিনিময় করে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আসাম-কলকাতা যোগাযোগ সহজ করা যায় অবশ্যই। কিন্তু সেই সাথে এবার বৃহত্তর আসাম সীমান্তের লাগোয়া চীনের প্রদেশগুলোও আসামের ওপর দিয়ে, বাংলাদেশ হয়ে কোনো সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানো সহজ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ বা চীন সেই প্রবেশাধিকার ভারতকে দেয়া সুবিধার বিনিময়ে শর্ত হিসেবে হাজির করতে চাইবে। কিন্তু চীনকে এর ভেতরে ঢুকতে দিতে চায় না ভারত, যেন চীন আসামের ওপর দিয়ে করিডোর পেয়ে না যায়। সম্ভবত ভারতের মনে ভয়, নর্থ-ইস্ট কখনো ভারতের সাথে একই রাষ্ট্রে যদি না থাকতে চায়, তাহলে কী হবে? সারকথা হলো, ভারত থেকে কারো বেরিয়ে যাওয়ার ভয়। ভারতের শাসকদের এই ভয়কে ঠেকাতে চেয়েছে তারা। কিন্তু তাতে ব্যাপারটা হলো অনেকটা নিজের সন্তানকে হাত-পা ভেঙে পঙ্গু করে রাখার মতো, যাতে সে পালিয়ে না যায়, তাকে দিয়ে ভিক্ষা করানো যায়। আর সে জন্য পুরো নর্থ-ইস্টকে ভারত যোগাযোগ অবকাঠামোর দিক দিয়ে প্রায় অচল করে রেখেছে।
কিন্তু এতে মানুষের জীবনযাপনে যে গরিবি হাল এটাকে আড়াল বা দায়ী করার জন্য বয়ান তৈরি করা হয়েছে যে, এর জন্য বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তানের) অনুপ্রবেশকারী, বিদেশীরা দায়ী। কথাটা উল্টোভাবে সত্য। কারণ ব্রিটিশ আমলে ধান ফলাতে বৃহত্তর রংপুর বা টাঙ্গাইল থেকে দক্ষ বাঙালি গৃহস্থকে আসামে জমি দেয়ার লোভ দেখিয়ে নিয়েছিল ব্রিটিশরা, যাতে সেখানে ধানের উৎপাদন বাড়ে। বিশেষত চল্লিশের মহাযুদ্ধের সময়ে খাদ্যশস্যের খুবই বাড়তি চাহিদা হয়েছিল। সেটি অভাবে পড়ে মাইগ্রেশন নয় এই অর্থে যে, এটা একই ব্রিটিশ কলোনির মধ্যেই ছিল। আর শাসকেরা নিজে কর্মসূচি নিয়ে এটা ঘটিয়েছিল। কিন্তু ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে এ ব্যাপারটাকে দেখানো হলো আসামের ‘সব দুঃখের মূল কারণ’ হিসেবে। আসামের মূল জনগোষ্ঠী হলো অসম (বা অহমীয়), বাঙালি আর ট্রাইবাল বোড়ো। এ ছাড়া সাথে ছোট ছোট অনেক ট্রাই বা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীও আছে। ‘বিদেশী’ বা কথিত পূর্ব বাংলার লোক, এদেরকে বের করে দিতে হবেÑ এই অছিলায় সেকালে কংগ্রেস আন্দোলন করেছিল। এর ফলাফল হিসেবে প্রথম ১৯৫১ সালে নাগরিক তালিকা বা প্রথম এনআরসি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা ছিল আসামে বসবাসকারী সব বাসিন্দার আনুষ্ঠানিক তালিকাভুক্তি। অর্থাৎ এ থেকে কাউকে কী পদ্ধতিতে বের করে দেয়া হবে, সেই পর্যন্ত আর আগানো হয়নি। এর ক্ষোভ থেকেই পরে ১৯৭৯ সালে মূলত উগ্র ‘অসমীয় জাতীয়তাবাদী’রা বোড়োদের সমর্থনে মূলত বাঙালিদের বিরুদ্ধে ‘বাঙালি খেদাও’ বলে আন্দোলন শুরু করেছিল। এটাই একপর্যায়ে আসামের ভারত থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অবস্থা তৈরি করলে তা ঠেকাতে রাজীব গান্ধীর সরকার আপসে ১৯৮৫ সালে ‘আসাম অ্যাকর্ড’ নামে ছাত্রদের সাথে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। সেখানেই বলা ছিল, ১৯৫১ সালের এনআরসিকে বিদেশী চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে আপডেট করা হবে। তাতে কে বিদেশী তা চিহ্নিত করে ওদের বের করে দেয়া হবে। এর পর থেকে ওই ছাত্ররাই দল খুলে বসে ‘অহম গণপরিষদ’ নামে বা ‘বোড়োল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট’ নামে। ১৯৮৫ সালের ‘আসাম অ্যাকর্ড’ চুক্তি হলেও এর বাস্তবায়ন ২০০৯ সাল পর্যন্ত কিছু না হওয়াতে একটি স্থানীয় এনজিও ‘আসাম পাবলিক ওয়ার্কস’ ইস্যুটিকে সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যায়, তারা রিট পিটিশন করে। আর তা নিষ্পত্তি করতে গিয়ে সবশেষে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই হয়ে গেলেন আসাম সমাজের রাজনৈতিক বিরোধ ও বিতর্কের নিষ্পত্তির নির্বাহী বাস্তবায়ক। বিচারকদের পা-পিছলানির ঐতিহাসিক ঘটনা এটা। কিন্তু এটা কেন রাজনৈতিক ইস্যু, যাতে বিচারকেরা পা পিছলে ঢুকে পড়ার কথা বলছি?
মাইগ্রেশন বা স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে অন্য দেশে গিয়ে বসবাস; এর মূল কারণ বা চালিকাশক্তি হলো অর্থনীতি। কেউ চাইলে এটাকে ক্যাপিটালিজমের গ্লোবাল হয়ে ওঠা, এমন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ফেনোমেনা বলতে পারেন। একটা দেশে যেকোনো কারণে ব্যাপক উদ্বৃত্ত বাড়তি সঞ্চয় ঘটে গেলে আর সেই সঞ্চয় অর্থনীতিতে বিনিয়োজিত হতে চাইলে তাতে এবার ওই দেশে প্রাপ্ত জনসংখ্যার চেয়ে লেবারের চাহিদা বেশি হয়ে গেলে কী হবে? ওই দেশে তখন অন্য দেশ থেকে মাইগ্রেশন হবেই। আর সেই দেশের আইনকানুন ও সীমান্তও চাইবে বিদেশী লেবার বা শ্রমিক আসুক, তারা খুবই স্বাগত। কিন্তু কোনো কারণে যদি অর্থনীতি ভালো না চলে এবার, সেখানে বিদেশীবিরোধী আন্দোলন শুরু হবে, মাইগ্রেশনবিরোধী দল ক্ষমতায় আসবে ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, বিদেশীরা কত খারাপ, কত বেশি বেশি পয়দা করে বা এরা তো স্থানীয় জনসংখ্যার চেয়েও বেশি হয়ে যাবে ইত্যাদি বলে এদের কুপিয়ে কেটে গণহত্যা করে ভাগাওÑ এই হবে পপুলার রাজনীতির বয়ান। সাম্প্রতিককালে নিউজিল্যান্ডের শুটিং গণহত্যা বা ফ্রান্সের উগ্রপন্থী লি-পেনের দলের কাণ্ডকারখানা অথবা আমেরিকায় ট্রাম্পের ইমিগ্রেশনবিরোধী বিদেশীবিরোধী বয়ান এই কারণে। এগুলোই বিদেশী বা মাইগ্রেশনবিরোধিতার আড়ালে নোংরা বর্ণবাদ। ১৯৭৯ সালের পর থেকে আসামের পুরো সমাজ এই ঘৃণাতেই ভেসে চলছিল। আসামের মূল সমস্যা কিন্তু ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগ করার সমস্যা এবং খুবই খারাপ ও অবকাঠামোহীন, বিনিয়োগহীন এক স্থবির জীবন। কথিত বাংলাদেশীরা যদি একই রকম থাকে, আর কালকেই যদি কোনো জাদুতে আসামের যোগাযোগ অবকাঠামো সহজ, বিনিয়োগের অভাব নেই, অর্থনীতি প্রবল চাঙ্গাÑ এমন এক অবস্থা হয় যাতে প্রাপ্ত লেবার যা আছে তা-ও কম পড়েছে দেখা যায়, তবে সেই আসামই আবার আরো মুসলমান ‘বিদেশীদের’কেও দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনবে। তাই বলছি, আসামের মূল সমস্যা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক। অথচ সবাই ভাবছে, বিশ্বাস করে বসে আছে আসামের প্রধান ইস্যু এখন এনআরসির ফাইনাল তালিকা কবে ঘোষণা হবে; যেন এটা হয়ে গেলেই অসমিয়াদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তা আসলে এক অলীক স্বপ্ন মাত্র। এরা আসলে চিন্তা করে দেখেনি যে, আসামের অর্থনীতি আরো খারাপ হলে তারা নিজেরাও অভিবাসী হতে ঘর ছাড়বে।
এ অবস্থায়, ৩১ জুলাই ফাইনাল তালিকা ঘোষণা হওয়ার আগে বিজেপি সভাপতি ও কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কী চাচ্ছেন? তিনি চাচ্ছেন মূলত অনির্দিষ্টকালের জন্য ফাইনাল তালিকা ঘোষণা পিছিয়ে দিতে। এই আবেদন আদালতে করা হয়েছে যৌথভাবে, কেন্দ্র ও রাজ্য মিলে। অমিতের কথিত যুক্তি হলো ২০ শতাংশ রি-ভেরিফিকেশন। মানে কেন্দ্র্রের অ্যাটর্নি জেনারেলকে (এজি) দিয়ে তিনি যুক্তি দেয়াচ্ছেন যে, আসামের পাবলিকের ধারণা, এই তালিকা সঠিক নয়। এতে আসামের প্রায় সাড়ে তিন কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি। আর অনেক রাজনীতিবিদ দাবি করছেন, এই ৪০ লাখের মধ্যে ২৫ লাখই হিন্দু। তবে সরকারি হিসাবে এতে ধর্মীয় ভাগের অনুপাত নিয়ে কিছু বলা হয়নি। এই সুযোগে অমিত শাহ এজিকে দিয়ে বলাচ্ছেন যে, ২০ পার্সেন্ট ডাটা আবার চেক করে দেখতে হবে। তা বিশেষ করে ঘটাতে হবে সীমান্ত জেলাগুলোতে। মানে বাংলাদেশের সীমান্তে। কারণ সেখানে (মুসলমান) জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার তাল-ঠিকানা নেই। এ নিয়ে বিচারকদের কিছু একটা বুঝ দিয়ে হলেও তারিখ পেছাতে এজি একেবারে মরিয়া। কিন্তু আদালত এখনো রাজি না হয়ে ২৩ তারিখ পর্যন্ত এটা মুলতবি রেখেছে।
ওই দিকে আরেক কাণ্ড ঘটিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ভারতের স্ক্রোল পত্রিকা বলছে, তিনি নাকি কোনো স্থানীয় টিভিতে বলেছেন, ‘যদিও আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা নয়, তবু পত্রিকার রিপোর্ট দেখে আমাদের কিছু উদ্বেগ রয়েছে।’ আমাদের উদ্বিগ্নতা আছে, নাইÑ এমন কথা বলছি কেন? এ ছাড়া গত বছর তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ইনুর এক বিবৃতির রেফারেন্স দিচ্ছে ভারতের স্ক্রোল অন লাইন মিডিয়া। ইনু বলেছিলেন, ‘প্রথমত এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আসামের স্থানীয় সমস্যা।’ আরো বলেছিলেন, ‘এ নিয়ে তাই বাংলাদেশের কিছু করার নেই। ভারত সরকার আমাদের সাথে কখনো এ নিয়ে কথা বলেনি। তাই আমাদের কোনো অভিপ্রায় নেই বন্ধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ইস্যু নিয়ে তাদের সাথে কথা তোলার।’
ইনুর এই কথার পর এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের ‘আমাদের কিছু উদ্বিগ্নতা রয়েছে’ বলার দরকার পড়ল কেন? মোমেন বলছেন, ‘যারা দীর্ঘ ৭৫ বছর ধরে ওখানে আছে তারা ওদের নাগরিক, আমাদের নয়।’ এই কথা থেকে পরিষ্কার, এ কথার চেয়ে আগে ইনুরÑ ‘এটা আমাদের ইস্যু নয়, কোনো দায়দায়িত্ব নেই’Ñ বলা অনেক ভালো ছিল। সে তুলনায় এখন এক দুর্বল অবস্থান নেয়া হলো। কারণ, ভারতে কেউ ৭৫ বা ১০০ বছর ধরে আছে কি না তাতে আমাদের কী? আর তারা কোথাকার নাগরিক তা নিয়ে আমাদের বলারও কিছু নেই। এর চেয়ে বরং ‘ভারতের কোনো সরকার এ নিয়ে আমাদের সাথে কখনো কথা তোলেনি’Ñ এটাই সবচেয়ে ভালো যুক্তি ছিল। এক কথায় বললে মোমেনের কথা ইনুর কথা থেকে সরে গেছে। এ ছাড়া বোকা কিসিমের আরেক কথা বলেছেন মোমেন। তিনি বলেছেন, আমরা ইতোমধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে ঝামেলায় আছি। তাই আমরা আর নিতে পারব না। বাংলাদেশ দুনিয়াতে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ।
আমরা রোহিঙ্গা শরণার্থী নিছি তাই আর নিতে পারব নাÑ এটা কি কোনো ডিপ্লোমেটিক বক্তব্য? প্রথমত, তিনি যেচে শরণার্থী নেয়া-না নেয়ার কথা কেন তুলছেন? ভারত কি এ প্রসঙ্গ তুলেছে আমাদের সাথে? তোলেনি। এ ছাড়া আমরা যদি কোনো রোহিঙ্গা শরণার্থী না নিয়ে থাকতাম তাহলে কি এখন আসামের শরণার্থী নিতামÑ ব্যাপারটা কি এটাই? দুনিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ দেশ না হলে আমরা আসামের শরণার্থী নিতাম, তাই কি? সবচেয়ে বড় কথা, এ পর্যন্ত আমাদের সাথে কখনো ভারতের এ নিয়ে কথা হয়নিÑ এটা ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান। এখানে বলতে চাওয়া হচ্ছে, ‘এটা ভারত আগে কখনোই সমস্যা মনে করেনি, সে কারণেই তোলেনি। এখন তুলছে কেন? আর এ কারণেই আমরা মনে করি এটা আমাদের কোনো ইস্যুই নয়।’ অথচ অতিরিক্ত কথা বলা ও অকূটনীতিসুলভ কথা বলা নির্বুদ্ধিতা বটে। হ
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
মড়ঁঃধসফধং১৯৫৮@যড়ঃসধরষ.পড়স


আরো সংবাদ