১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আমাদের পররাষ্ট্রনীতি

-

যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হলো, সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্যের ভিত্তি মজবুত না হলে সে লক্ষ্য অর্জন সহজ হয় না। আমাদের দেশের রাজনৈতিক অনৈক্যের বিষয়টি কারো কাছেই অজানা নয়। এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে দেশ ও জাতিসত্তার ওপর। সঙ্গত কারণেই আমাদের পররাষ্ট্রনীতিও আটকা পড়েছে একটা সঙ্কীর্ণ বৃত্তের মধ্যে। আমাদের দেশে ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে পররাষ্ট্রনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে ক্ষমতার হাতবদল হলেও পররাষ্ট্রনীতিতে তেমন হেরফের হয় না। আমাদের বিদেশনীতির বিচ্যুতিটা এ কারণেই।
পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ‘একদেশদর্শী নতজানু’ পররাষ্ট্রনীতির সূচনা হয়েছে বলে জোরালো অভিযোগও রয়েছে। ফলে পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে মহল বিশেষের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। তদুপরি গত ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের বড় ধরনের বিপর্যয়ও ঘটেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি একটি বৃত্তকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে চীন-ভারত, যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া, চীন-জাপান এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের বিষয় খুবই স্পষ্ট। ইতঃপূর্বে বাংলাদেশ এই পাঁচটি প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে সংহত অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে, কৌশলগত সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু এখন সে অবস্থার বিচ্যুতি হয়েছে বলে জনমনে ধারণা বদ্ধমূল। বর্তমানে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সাথে আমাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক ‘গভীর’ বলে দাবি করা হয়। আবার অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীনের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা বেশি। কিন্তু ভারতের সাথে আমাদের যে চমৎকার সম্পর্কের কথা ফলাও করে প্রচার করা হয়, তা শুধুই বাচনিক বলতে হবে। কারণ, দেশটির সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যার আজো সমাধান করা যায়নি।
এমনকি গত সাত-আট বছর যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসির) বৈঠকও হয়নি। বন্ধ হয়নি সীমান্ত হত্যা, তথা ফেলানীদের আহাজারি। মূলত এই বৃহৎ প্রতিবেশীর সাথে আমাদের কোনো অমীমাংসিত সমস্যারই সম্মানজনক সমাধান হয়নি। এটি আমাদের কূটনৈতিক ব্যর্থতা এবং বৃত্তাবদ্ধ পররাষ্ট্রনীতিরই কুফল। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো সম্পর্কের দাবি করলেও দেশটির কাছ থেকে জিএসপি সুবিধা আদায় করতে পারেননি।
বিশেষত ২০০৯ সাল থেকেই আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে উড়ণচণ্ডী ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছিল, পরবর্তী সময়ে তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি। ১৯৯৮ সালে ভারত ও পাকিস্তান পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালালে আমাদের সরকারপ্রধান দিল্লি ও ইসলামাবাদ ছুটে গিয়েছিলেন ‘শান্তির বার্তা’ নিয়ে। অন্যদিকে, বিশেষ রাষ্ট্রের ইচ্ছায় এখন সার্ক প্রায় অকার্যকর হলেও আমরা তা সচল করতে কোনো উদ্যোগ নিতে পারছি না। একদেশদর্শী ও অপরিণামদর্শী পররাষ্ট্রনীতির কারণেই আমরা এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছি না। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতার এটি একটি বড় প্রমাণ।
আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা শুধুই এককেন্দ্রিক নয় বরং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ও কূটনীতির সব ক্ষেত্রে। ১৯৭১ সালে ভারতে বাংলাদেশের এক কোটি মানুষের আশ্রয় নেয়াকে ভারতের ইন্দিরা সরকার যেভাবে আন্তর্জাতিকীকরণ করতে পেরেছিল, আমরা রোহিঙ্গা সমস্যা সেভাবে উপস্থাপন করতে পারিনি বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যে তিনটি দেশ (রাশিয়া, ভারত ও চীন) মিয়ানমারকে অধিক চাপ সৃষ্টি করতে পারত, তাদের কূটনৈতিক সমর্থন পেতেও আমরা পুরোপুরি ব্যর্থ। অথচ, মিয়ানমার দুই প্রতিবেশী ভারত ও চীনের পাশাপাশি রাশিয়ার সমর্থনও আদায় করতে পেরেছে।
মূলত আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতিতে সবকিছু গোপন রাখার যে প্রবণতা, পররাষ্ট্রনীতিও সে মুদ্রাদোষ থেকে মুক্ত নয়। প্রায় সব দেশেই পার্লামেন্টে ও সংসদীয় কমিটিতে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার অপরিহার্য রেওয়াজ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কূটনীতিকদের মতামত নেয়া হয়। সাবেক কূটনীতিকদের নিয়ে ‘থিংক ট্যাংক’ গঠিত হয়ে থাকে। সবার মতামতের ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশল নির্ধারিত হয়। এ বিষয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতও গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে সব কিছু চলে অস্বচ্ছতা ও স্বেচ্ছাচারিতার মধ্য দিয়ে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি বা সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয় অস্থায়ী ভিত্তিতে। সমস্যা মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি বা টেকসই কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় না। অনেক সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানে না, এসব নীতি কিভাবে নির্ধারিত হয় বা কারা নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখেন।
এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ভৌগোলিক অবস্থান, স্বল্প পরিসরের ভূখণ্ড, সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পুরোপুরি স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগকে কিছুটা সীমাবদ্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বহিঃশক্তির প্রভাব থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডকে রক্ষা করার মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। বিষয়টির যৌক্তিকতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। এখনকার পররাষ্ট্রনীতি ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতারক্ষা ও তোষণের ঘূর্ণাবর্তেই আবর্তিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বিধান আমাদের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।
এই নির্দেশনাগুলো বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়েছে, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসঙ্ঘের সনদে বর্ণিত নীতিগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাÑ এসব নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এসব নীতির ভিত্তিতেÑ রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থেকে সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে; এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।
আমাদের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান মূলনীতি হলো, সবার প্রতি বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বিদ্বেষ নয়। বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘের সদস্য। জাতিসঙ্ঘ সনদের ২(৪) ধারায় বলা হয়েছে, ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল সদস্য-রাষ্ট্র আঞ্চলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের ভীতি প্রদর্শন থেকে এবং জাতিসঙ্ঘের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো উপায় গ্রহণ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে।’
জাতিসঙ্ঘ সনদের ২(৭) ধারায় বলা হয়েছে, ‘বর্তমান সনদ জাতিসঙ্ঘকে কোনো রাষ্ট্রের নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার দিচ্ছে না বা সে রূপ বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য কোনো সদস্যকে জাতিসঙ্ঘের দ্বারস্থ হতে হবে না; কিন্তু সপ্তম অধ্যায় অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে এই নীতি অন্তরায় হবে না।’ জাতিসঙ্ঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই মূলনীতির ওপর তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছে, যা অন্য রাষ্ট্রের কাছে, বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রকাশিত। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমরা এসব বিষয়ের প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলেও এ ক্ষেত্রে ব্যত্যয়টাও চোখে পড়ার মতো। কারণ, এসব ক্ষেত্রে আমাদের তাকিয়ে থাকতে হয় বিশেষ বন্ধুরাষ্ট্রের গতিবিধি ও অবস্থানের দিকে। আর এ ধরনের পররাষ্ট্রনীতি কোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
মূলত ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভের আগে থেকেই আমাদের পররাষ্ট্রনীতির সূচনা। এই পর্যায়ে গৃহীত পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব স্বাধীনতার পরও পরিলক্ষিত হয়েছে। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে বিশ্ব রাজনীতিতে ইন্দো-সোভিয়েত অক্ষ এবং চীন-আমেরিকা অক্ষের মধ্যে বিরাজমান ক্ষমতার লড়াই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন এবং পরবর্তী সময়ে গৃহীত পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের যেমন প্রয়োজন ছিল, তেমনি অপরিহার্য ছিল অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বৈদেশিক ঋণ-সাহায্য লাভের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির সংস্কার।
স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম দশকে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের ভাবমর্যাদার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মূলত সে সময়ই বিশ্বের বেশির ভাগ রাষ্ট্রের কাছ থেকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এই বাংলাদেশ। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন কমনওয়েলথ, ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) এবং জোটনিরপেক্ষ সংস্থার সদস্যপদ লাভ করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্বও দান করে। উন্নত রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে সাহায্য এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা লাভ করা এ সময়ে পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম সাফল্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে জাপান, ব্রিটেন এবং আরো কিছু উন্নত রাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশ এইড কনসোর্টিয়াম গ্রুপ গঠন করে, যার যৌথ নেতৃত্বে ছিল বিশ্বব্যাংক এবং বাংলাদেশ সরকার।
এসব ছিল আমাদের অতীত দিনের পররাষ্ট্রনীতির উল্লেখযোগ্য অর্জন। কিন্তু ২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পররাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বাংলাদেশের ‘নিরাপত্তা’ ধারণা বিবেচনায় রেখে প্রায় তিন দশক পর ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা ঘোষণা করা। কিন্তু এর সুফল আমরা পাইনি বা পাচ্ছি না। অবশ্য কোনো রাষ্ট্রের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপনকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু ভারতের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব একেবারেই একতরফা বলেই মনে করা হয়। সমস্যাটা সেখানেই।
আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’। কিন্তু তা হতে হবে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণœ রেখে। দেশ ও জাতির স্বার্থে কোনো রাষ্ট্রের প্রতি বৈরিতাও যদি অপরিহার্য হয়, তা উপেক্ষা করার সুযোগ আছে কি? বন্ধুত্ব হতে হবে পরস্পর স্বার্থসংশ্লিষ্ট। আমাদের একদেশদর্শী ও তোষামুদে পররাষ্ট্রনীতি মহলবিশেষকে আনুকূল্য দিলেও তা দেশ ও জাতির জন্য স্বার্থহানিকর।
সরকার প্রতিবেশী দেশকে ‘অকৃত্রিম বন্ধু’ বলে মনে করলেও বাস্তবতা এর অনুকূলে যায় না। কারণ এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, প্রতিবেশী দেশ ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী, বিএসএফের গুলিতে গত ১৪ বছরে নিহত হয়েছে ৮৪১ জন বাংলাদেশী। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছে আটজন বাংলাদেশী। ২০০৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ২০০৬ সালে সীমান্তে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল। ওই বছর বিএসএফের গুলিতে নিহত হয় ১৪৬ জন বাংলাদেশী। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০০৫ সালে ১০৪ জন, ২০০৬ সালে ১৪৬ জন, ২০০৭ সালে ১২০ জন, ২০০৮ সালে ৬২ জন, ২০০৯ সালে ৯৬ জন, ২০১০ সালে ৭৪ জন, ২০১১ সালে ৩১ জন, ২০১২ সালে ৩৮ জন, ২০১৩ সালে ২৯ জন, ২০১৪ সালে ৩৩ জন, ২০১৫ সালে ৪৫ জন, ২০১৬ সালে ৩০ জন, ২০১৭ সালে ২৫ জনকে সীমান্তে হত্যা করা হয়। এসব কিছু বন্ধুরাষ্ট্রের পরিচয় বহন করে না।
এবার বাংলাদেশ সফর করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এই সফরে আমরা কী পেলাম, তা বড় কথা নয় বরং কী দিতে পেরেছি সেটাই যেন বড় কথা। এসব বিষয়ে অতীতের কোনো সুখস্মৃতি আমাদের নেই। মূলত একদেশদর্শী, তোষামুদে ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির কারণেই দেশ এখন ভয়াবহ সঙ্কটে। ফলে বহির্বিশ্বে যেমন আমাদের কূটনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও ব্যাপক সমস্যাসঙ্কুল। তাই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই এই অশুভ বৃত্ত থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। আত্মমর্যাদাশীল বিদেশনীতিই পারে এ জাতির হৃতগৌরব ফিরিয়ে আনতে। হ
[email protected]


আরো সংবাদ