১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

‘আমরা’ ও ‘তারা’র বারুদ

-

আবারো রক্ত ঝরাল শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ওয়ালমার্টের একটি দোকানে ৩ আগস্ট ‘বন্দুকধারীদের’ গুলিতে ঝরে গেল ২০টি প্রাণ। আহত ২৪ জন। টেক্সাসের মেয়র গ্রেগ অ্যাবট এই ঘটনাকে সেখানকার ‘ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ দিন’ বলে বর্ণনা করেন।
এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওর ডেটনে বন্দুকধারীর গুলিতে ৯ জন নিহত, আহত হন ১৬ জন। ডেটনের হামলাকারীরা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে। টেক্সাসের হামলার জন্য গ্রেফতার করা হয় ২১ বছর বয়সী প্যাট্রিক কুসিয়াসকে। হামলার ২১ মিনিট আগে অনলাইনে সে একটি ইশতেহার প্রকাশ করেছে। দুই হাজার তিন শ’ শব্দের এই ইশতেহারে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, বিদ্রƒপ ও তাচ্ছিল্য এবং তাদের আক্রমণের হুমকি দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের রিপোর্ট অনুযায়ী কুসিয়াস নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলাকারী ব্রেন্টন ট্যারান্টের অনুসারী।
এই ট্যারান্ট প্রবল এক আঘাতে কাঁপিয়ে দিয়েছিল নিউজিল্যান্ডকে। ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে ১৫ মার্চে জুমার নামাজে মগ্ন মুসল্লিদের ওপর চালিয়েছিল পৈশাচিক হামলা। এতে শহীদ হন ৫০ জন মুসলিম, আহত ৪০ জনের অধিক। হামলা চালানোর আগে ৮৭ পৃষ্ঠার এক ম্যানিফেস্টো অনলাইনে প্রকাশ করেছিল ট্যারান্ট। এতে ছিল অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও হুমকি। মুসলিমরা ইউরোপে শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এ নিয়ে তার খুব ক্ষোভ। ট্যারান্ট লিখেছেÑ ‘ইউরোপীয়রা দাস ছিল মুসলিমদের। মুসলিমরা তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে শত বছর ধরে। ওদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিচ্ছে ব্রেন্টন ট্যারান্ট।’ এ ক্ষেত্রে ট্যারান্টরা যেকোনো মূল্যে বিজয়ী হতে চায়। যেকোনো নৃশংস পদ্ধতি অবলম্বনে তাদের আপত্তি নেই। ট্যারান্টের কথা হলো, ‘তুমি যদি পরাজিত হও তবে ইতিহাস তোমাকে দানব বলবে, সেখানে পদ্ধতি কোনো ব্যাপার নয়। প্রথমে জয়ী হও, তার পর না হয় ইতিহাস রচিত হবে।’ ৪৭ পৃষ্ঠার এই ম্যানিফেস্টোকে সে ও তার অনুসারীরা বলেছে ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’।
এ হচ্ছে বর্ণবাদী ও ঘৃণামূলক একটি তত্ত্ব, যার জনক জঁ রেঁনো ক্যামু। তিনি একজন প্রভাবশালী সাহিত্য ও শিল্পতত্ত্ববিদ। শিল্প-সাহিত্যের নামকরা সমালোচক। তিনি তার লেখায়ও বক্তব্যে প্রচার করছেন ‘ডেঞ্জারাস আইডোলজি’ সম্পর্কে ঘৃণা। পশ্চিমা বিশ্বে ‘ডেঞ্জারাস আইডিওলজি’ নাম দিয়ে ইসলামকে খাড়া করা হয় আসামির জায়গায়।
ফ্রান্সে ক্যামুর আছে একটি রাজনৈতিক দল। Parti de L’In-Nocence বা No Nuisance নামের এ দল কম ‘জনপ্রিয়’ নয়। কয়েক বছর আগে তিনি ঘোষণা করেছিলেন ‘মুসলিম মানেই দুর্বৃত্ত ও সশস্ত্র; এরা যেকোনো সময় ফ্রান্স দখল করে নেবে’। এমন প্রচার ফ্রান্সেই সীমিত থাকেনি। ইউরোপ-আমেরিকার দেশে দেশে বহু ক্যামু সক্রিয় আছে। তার অনুরূপ ভাবধারার প্রচারক অগণিত। এমন প্রচারণার ফসল ইসলামবিরোধী উগ্র তরুণরা। যাদের সাম্প্রতিক আদর্শ হচ্ছে আনডেয়ারস বেরিং ব্রেইভিক যে ২০১১ সালের ২২ জুলাইয়ে নরওয়েতে ভয়াবহ এক সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছিল। সে হামলায় ৭৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। তার ‘যুক্তি’ ছিল, মুসলিমরা যেহেতু দুর্বৃত্ত ও বিপজ্জনক দুশমন, তাদেরকে শক্ত বার্তা দিতে এমন হামলা একান্তই দরকার ছিল।
মুসলিমদের দুশমন বা পর হিসেবে দেখা ও দেখানো, এটা হত্যার এক প্রকল্প। যখন পশ্চিমা বুদ্ধিজীবিতা কাজটি করে, তখন একে ‘সাদা মনের চিন্তাচর্চা’ হিসেবে দেখা হয়। ভাবা হয় না এই চিন্তার তলে লুকিয়ে আছে গণহত্যাকারী ব্রেইভিক বা ট্যারান্টরা। পশ্চিমা মিডিয়া, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বুদ্ধিজীবিতা যুগ যুগ ধরে ইসলাম প্রশ্নে যে ইউরোপীয় মন গঠন করেছে, তার অবধারিত ফসল এসব সন্ত্রাসী কর্ম; যা প্রতিনিয়ত ইসলাম ঘৃণা ও মুসলিম হত্যার ‘যুক্তি’ তৈরি করে।
এটি স্যামুয়েল পি হান্টিংটনের দুনিয়া কাঁপানো ‘দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন অ্যান্ড দ্য রিমেকিং অব ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ নামক গ্রন্থের প্রভাব নয়; বরং গ্রন্থটিই ছিল এই প্রভাবের ফসল। বস্তুত ইসলামকে ঘৃণা করার যে দীর্ঘ ধারা ইউরোপে চলমান, তার প্রতি নজর দিলে মধ্যযুগে চলে যেতে হয় যখন ক্রুসেডের বন্যায় ইউরোপ ভেসে গিয়েছিল। সেই প্রভাব থেকে গেছে পরবর্তীতে এবং তা এতই বলবান যে, পশ্চিমাদের খুব কম বুদ্ধিজীবী নিজেকে এর আওতা থেকে মুক্ত রাখতে পেরেছেন। দান্তে তার ‘ডিভাইন কমেডি’তে ইসলামের উপাদান থেকে বিস্তর ঋণ নিয়েও আক্রমণ করেছেন ইসলামের নবীকে, শেকসপিয়রও ইউরোপের মধ্যযুগীয় প্রবণতার অনুসরণে ইসলামের নবীকে বলেছেন ‘জাদুকর’! সম্মানজনক কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বুদ্ধিজীবীরা ইসলাম ও মুসলিমদের দেখিয়েছেন ‘পর‘ ও ‘প্রতিপক্ষ’ হিসেবে; যা বারবার কাজ দিয়েছে দখলে, লুণ্ঠনে, দাস বানানোতে, শোষণে, গণহত্যায়! গণহত্যার প্রয়োজনে মুসলিমদের দেয়া হয়েছে বিভিন্ন বিপজ্জনক অভিধা। কারণ যখন তুমি কাউকে হত্যা করতে চাও, তাদেরকে খারাপ নাম দিয়ে দাও এবং যত বেশি সম্ভব, ’আমরা’ ও ‘তারা’র ব্যবধান দেখিয়ে দাও। অতএব, ১৯৯২ সালের এপ্রিলে বসনিয়ায় মুসলিম গণহত্যার আগে যুগোশ্লাভ সামরিক জার্নালের পক্ষ থেকে সার্বীয় বুদ্ধিজীবী ও ’ইসলাম বিশেষজ্ঞ’ ডারকো তানাসকোভিককে দায়িত্ব দেয়া হলো ‘তাদের’ ও ‘আমাদের’ পার্থক্যগুলো ধরিয়ে দিতে। ডারকো দেখালেন তারা কত বর্বর ও উচ্ছেদযোগ্য, আমরা কত মহান ও পবিত্র। ‘ তারা নোংরা, ঘৃণ্য। ‘তাদের ‘পরিষ্কার’ করা দরকার। আর তা পানি ঢেলে নয়, প্রস্রাব করে।’ প্রথম শ্রেণীর পণ্ডিতরা ইসলামকে দেখালেন রক্তপিপাসু, স্বৈরাচারী, উদ্ভট ও ভয়ঙ্কর ধর্ম হিসেবে। মুসলিমরা উপস্থাপিত হলেন অসমঝোতা ও অশান্তির নিদর্শন এবং গ্রহণঅযোগ্য বারুদরূপে, যা ইউরোপীয় সমাজ ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অতীতে বিস্ফোরিত হয়েছিল, এখনো বিস্ফোরিত হবে! এই প্রচারপর্বের পরে মুসলিমদের জাতিগত নিধনের জমি তৈরি হয়ে গেল।
সরকারি বাহিনী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ছিল এই গণহত্যার এক অংশ, আরেক অংশে ছিলেন সেই সব ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিকর্মী, যারা হত্যার কুযুক্তি তৈরি করছিলেন, প্রচার করছিলেন।
বিপর্যয় থামাতে বসনীয় নেতা আলিয়া ইজেতবেগোভিচ যখন শান্তি প্রয়াসে সক্রিয় হলেন, কোনো কোনো সার্বীয় পণ্ডিত বললেনÑ ‘আলিয়া আসলে শান্তি চান না। কারণ যদি তিনি শান্তির পক্ষে যান, ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন।’ মানে, ইসলাম মানার অর্থ সন্ত্রাস ও অশান্তিকে মানা। যারাই ইসলাম মানছে, তারা অশান্তির প্রতীক। সার্বরা বসনিয়ার জাভোরনিকা শহরে গণহত্যা চালিয়ে চল্লিশ হাজার মানুষ হত্যা করল। নিউ ইয়র্ক টাইমসের কাছে এটা ছিল ‘আবর্জনা পরিষ্কার’ করা। ৭ মার্চ ১৯৯৪-এর নিউ ইয়র্ক টাইমস সংবাদ শিরোনাম করলÑ ‘সার্বীয়রা বসনিয়ার জাভোরনিকা শহর থেকে ৪০ হাজার মুসলমান পরিষ্কার করেছে।’ বসনীয়রা যখন প্রতিরোধ শুরু করল, সার্বীয় নেতা বললেন, ‘অতীতের শয়তান আবারো জেগে উঠেছে।’ বলতে হচ্ছে না, সেই শয়তান কে; সেটা হলো ইসলাম! রাজনীতিক, পণ্ডিত, সাংবাদিক এখানে হত্যার পক্ষে ভূমিকা রাখলেন; যা একেবারে নগ্ন। এই ভূমিকা গণহত্যার মতো অপরাধকে স্বাভাবিকতা ও মহত্ব দিতে প্রয়াসী।
এমন প্রয়াস ইউরোপ-আমেরিকায় পরে নানাভাবে বেড়েছে। হান্টিংটনের সভ্যতার সঙ্ঘাত থিওরি একে দেয় নতুন মাত্রা। পরে নাইন-ইলেভেনের জোড়াবিল্ডিং ধ্বংসকাণ্ডের পরে এই প্রচার যুদ্ধ বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রচার করা হয় সব মুসলমান সন্ত্রাসী নয়, তবে সব সন্ত্রাসীই মুসলমান। ইউরোপ-আমেরিকার সর্বত্র ইসলামোফোবিয়ার ঝড় বইতে থাকে। বাড়তে থাকে মুসলিমবিদ্বেষী ও মুসলিমবিরোধী ক্রাইম। ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, ব্রিটেন, গ্রিস, যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি দেশে চরম ডানপন্থী সহিংস খ্রিষ্টবাদের উত্থান হয়। ক্ষমতায় আসতে থাকেন এমন নেতৃত্ব, যাদের রাজনীতির মূল জমি হচ্ছে ‘আমরা’ ও ‘তারা’র ব্যবধানজাত আবেগ। ক্যামুর মতো বুদ্ধিজীবীরা নতুন নতুন বোতলে সরবরাহ করতে থাকেন ঘৃণার পুরনো মদ। মতলবি মিডিয়া এই প্রয়াসে বাতাস দিতে থাকে। কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে সেন্টারের রেস অ্যান্ড জেন্ডারের ২০১৬ সালের এক রিপোর্ট অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩২টি সংগঠন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অথবা ইসলাম ও মুসলিম ঘৃণা প্রচারের প্রাথমিক উদ্দেশ্য নিয়ে একটি ‘অভ্যন্তরীণ কোর’ গঠন করেছে।
২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে এই সংস্থাগুলো ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি পরিমাণে অর্থ পেয়েছিল। নাথান লিয়ানের গবেষণা মতে, ইসলামোফোবিয়া ইন্ডাস্ট্রি (২০১২), ‘বিশেষজ্ঞদের’ একটি আদর্শগত বিষয়ে পরিণত হয়। ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকটি নিউজ এজেন্সি দ্বারা নিয়মিতভাবে মুসলিম এবং ইসলামের সহিংস, নেগেটিভ ও গৎবাঁধা প্রতিচ্ছবি প্রচার করা হতে থাকে। ফলত জন্ম নিতে থাকে ব্রেইভিকরা, ট্যারান্টরা। তাদের অপরাধের মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। ইউরোপীয় নেতারা এসব অপরাধের বিরুদ্ধে নমনীয় সতর্কতায় সক্রিয় হয়েছেন। হামলাকারীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, দেয়া হচ্ছে শাস্তি। কিন্তু এতে কি কমে যাবে ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’পন্থীদের সন্ত্রাস? অবশ্যই নজর দিতে হবে সেই সব উপাদানে, যা তাদেরকে এ পথে চালিত করেছে। ইসলামবিরোধী ঘৃণার বুদ্ধিবৃত্তিক অনুঘটকগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। বিশেষ করে দায়িত্বশীল হতে হবে মিডিয়াকে যে মিডিয়ায় মুসলিম হত্যা ‘আবর্জনা পরিষ্কার’ করা হয়ে ওঠে! বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেনের (এমসিবি) সহকারী জেনারেল মিখাদাদ ভারসি আল জাজিরাকে বলেছেনÑ ‘ইসলামোফোবিয়ার একটি প্রধান কারণ হচ্ছে মুসলিমদের নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু মিডিয়ার নেতিবাচক প্রতিবেদন।’ তিনি বলেন, যখন এসব মিডিয়ার প্রতিবেদনে ‘মুসলিম সমস্যা’র মতো শব্দ ব্যবহার করা হয়, তখন এই বর্ণনা সেই সব পার্থক্যকে পুনরুজ্জীবিত করে, যা অপরাধীকে মুসলিমবিরোধী হামলার জন্য অনুপ্রাণিত করে।
হামলাকে প্ররোচিত করার মতো পার্থক্যকে পুনরুজ্জীবিত করা, এ কাজ চিন্তাবিদ, পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে হয়ে আসছে। তাদের হাতে তৈরি করা ‘আমরা’ ও ‘তারা’র বারুদ একের পর এক বিস্ফোরিত হচ্ছে। মানবঘাতী এসব বিস্ফোরণে কি তাদের ঘুম ভাঙবে? হ

 


আরো সংবাদ