১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণবাদ

-

নৃবিজ্ঞানীরা জন্মগতি নির্ণয়ের মাধ্যমে জাতি বা গোষ্ঠীর পরিচিতি নির্ধারণ করেন। সমাজবিজ্ঞানীরা ভৌগোলিক অবস্থান, ভাষা, ধর্ম, বর্ণ ও পারিপার্শ্বিকতার ওপর ভিত্তি করে জাতি বা গোষ্ঠীর পরিচয় নির্ণয় করে থাকেন। বর্তমানে ভৌগোলিক, ধর্মীয়, ভাষা ও বর্ণের পরিচয়ে জাতি গোষ্ঠীর পরিচিতি প্রকট রূপ ধারণ করেছে। জাতি, গোষ্ঠী, বর্ণ ও ভৌগোলিক এলাকাভিত্তিক সংঘর্ষ ও সঙ্ঘাতের বিষবাষ্প সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা মানুষের মেধাকে সৃজনশীলতার চরম শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে সন্দেহ নেই। অথচ নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে আশানুরূপ সাফল্য অর্জিত হয়নি। আজো সাদা, কালো, মুসলিম, অমুসলিম, এশীয় ও ইউরোপীয় নারী-পুরুষের অধিকারের ন্যায় আন্তর্জাতিকমানের পরিচিতি নিয়ে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত অব্যাহত রয়েছে।
অথচ মহানবী সা: ১৪ শ’ বছর আগে বিদায় হজের ভাষণে এসব বিষয়ের সুন্দর সমাধান দিয়ে গেছেন। যেমন, তিনি বলেছেন, সাদার ওপরে কালোর এবং কালোর ওপরে সাদার কোনো প্রাধান্য নেই। নারী জাতির মর্যাদা রক্ষার্থে তিনি বলেছেন, স্ত্রীর ওপর স্বামীর যেমন অধিকার, স্বামীর ওপর স্ত্রীরও তেমন অধিকার। ভৌগোলিক বা আঞ্চলিকতার বিপক্ষে তিনি বলেছেন, আরবের ওপরে অনারবের এবং অনারবের ওপর আরবের কোনো প্রাধান্য নেই। শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার রক্ষায় তিনি বলেছেন, শ্রমিকের ঘাম শুকাবার আগে তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও। তুমি যা খাবে বা পরিধান করবে, তোমার অধীনস্থদেরও তাই খাওয়াবে ও পরিধান করাবে। দাসত্ব প্রথার বিলুপ্তির লক্ষ্যে দাসমুক্তির পথ উন্মুক্ত করেছেন। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে দাসত্ব প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায়।
মুসলিম জাতি মূলত অসাম্প্রদায়িক জনগোষ্ঠী। মহানবীর মহান আদর্শে উজ্জীবিত মুসলমানেরা কোনো কালেই অমুসলিমদের প্রতি সাম্প্রদায়িক আচরণ করেনি। ভারতবর্ষে ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে মোহাম্মদ বিন কাশিম সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে মুসলমানদের জয়ের ধারার শুভ সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীকালে ১৭৫৭ সালে পলাশীর বিপর্যয়ের আগ পর্যন্ত মুসলমানেরা কমবেশি ভারতের শাসনভার পরিচালনা করেছেন। কিন্তু এ দীর্ঘ কালেও ভারতীয় উপমহাদেশে আধিপত্য বিস্তারের সঙ্ঘাত ব্যতীত কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘাত বা সংঘর্ষের নজির খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি পলাশী বিপর্যয়ের পরও ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণœ ছিল। ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপর্যয়ের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ভারত বর্ষে ব্রিটিশ শাসন স্থায়ী করার লক্ষ্যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন শুরু করে। পরে ভারত বর্ষের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের মাধ্যমে ভারতীয় জনসাধারণ স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনের দিকে ধাবিত হয়। তা পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনে রূপ লাভ করে। ভারতবাসী পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হয়। ব্রিটিশ প্রশাসন তাদের ঔপনিবেশিক শাসনের সুবিধার্থে এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্থায়িত্বের লক্ষ্যে কৌশলগত ভাবে ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে। হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ ভারতে ব্রিটিশরা বিভিন্ন কৌশলে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূচনা ঘটায়। বিশেষত স্বাধিকার আন্দোলন যখন তুঙ্গে এবং ব্রিটিশ সরকারের পতন যখন আসন্ন, তখন ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশদের উসকানিতে ভারতবর্ষে সর্বকালের সবচেয়ে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিস্তার লাভ করে। তবে ভারতবাসী স্বাধীনতার আন্দোলনের দাবি থেকে সরে আসেনি। ক্রমাগত এ দাবি জোরালো হতে থাকে। উপায়ন্তর না দেখে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারতবর্ষে পাকিস্তান নামক একটি মুসলিম রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করে। ১৫ আগস্ট ভারতের অবশিষ্ট বৃহৎ অংশকে নিয়ে ইন্ডিয়া বা ভারত নামক অপর রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এভাবে চিরতরে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। পরবর্তীকালে পাকিস্তানের পূর্বাংশে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধিকার আন্দোলন শুরু হয়। প্রচুর রক্তক্ষয় ও ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়। ব্রিটিশ শাসকেরা ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতির প্রয়োগ তাদের সাম্রাজ্যের স্থায়িত্বের কৌশল হিসেবে করেছিল। পরবর্তী সময়ে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর কালের রাজনীতিবিদেরা ব্রিটিশের সেই পচা ও পুরনো অপকৌশলকে ক্ষমতায় আরোহণের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। ভারতে এ পর্যন্ত হাজার হাজার বার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সঙ্ঘটিত হয়েছে। পাকিস্তান আমলেও কমবেশি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল। স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য রাষ্ট্র হিসেবে নজির স্থাপন করেছে।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে বিক্ষিপ্ত ভোটারেরা জাতি, গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণ পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়। যা কৌশলে রাজনীতিবিদেরা নিজেদের দলের ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করেন। বিক্ষিপ্ত মানসিকতার ভোটারদের ঐক্যবদ্ধ করতে অনেক শ্রম, মেধা ও অর্থের প্রয়োজন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মাধ্যমে ভোটব্যাংক সৃষ্টি হলে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য অধিক শ্রম বা মেধার প্রয়োজন হয় না। এ কারণে বিভিন্ন খোঁড়া অজুহাতে অনেক সময় দাঙ্গার সৃষ্টি করা হয়। এদিকে, পাশ্চাত্যের সবাই আজ মুসলিম বিরোধিতায় ঐক্যবদ্ধ। প্রকৃত অর্থে সারা বিশ্বে মুসলমানেরা অমুসলিম শক্তি কর্তৃক অমানবিক আচরণের শিকার।
আদিকাল থেকে ‘বর্ণবাদ’ বলতে মানুষ সাদা-কালোর ব্যবধানকে বুঝে থাকে। অধুনা নতুন ব্যাখ্যা শুরু হয়েছে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে অভিবাসী লোকদের অন্য বর্ণের লোক হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। জাতিগত পরিচয়ের মধ্যে, এমনকি অভিবাসীদের মধ্যেও বর্ণবাদের বিভাজন শুরু হয়েছে। বর্ণবাদের চেতনায় অভিবাসী বিবেচনা করলে ভারতবর্ষের আদিবাসী ছিলেন অনার্যরা। তারা সিন্ধু, মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্সমুলারের মতে, আর্যরা ১২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ভারতবর্ষে আগমন শুরু করে। আনুমানিক ১৫ শত খ্রিষ্টপূর্বাব্দে আর্যদের হাতেই সিন্ধু, মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা সভ্যতার পতন ঘটে। মুসলমানেরা সপ্তম শতাব্দী থেকে ভারতবর্ষে আগমন শুরু করে। বর্তমানে ভারতবর্ষে আর্যরা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। অথচ ‘যাদের ভারত ভূমি’ সে অনার্যরা এখনো অবহেলিত। তাদের অচ্ছুৎ, নিম্নবর্ণ, হরিজন, দলিত নামে আখ্যায়িত করা হয়। ভারতের আদি ভূমি যাদের, তারা আজ ভূমির অধিকার থেকেও বঞ্চিত। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে আত্মত্যাগী জাতীয় বীরদের কাতারে বীরসা মুন্ডার নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে। অথচ ভারতের উত্তর প্রদেশের আমেথি এলাকা কয়েক দিন আগে ভূমি বিরোধের জেরে তার মতো নিম্ন বর্ণের মানুষদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশেও উত্তরবঙ্গসহ অনেক এলাকায় বুনো ও মুন্ডসহ নিম্ন বর্ণের মানুষেরা অদ্যবধি তাদের ভূমির অধিকার বুঝে পায়নি। তারা যেন আপন ঘরে পরবাসী অবস্থায় সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
সম্প্রতি প্রিয়া সাহা হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিষয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। প্রিয়া সাহা উচ্চশিক্ষিত মহিলা। অথচ তিনি বাংলাদেশের আদিবাসী দলিত, হরিজন বা মুন্ডা সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে কিছুই বলেননি। সমাজসেবা অধিদফতরের পরিসংখ্যান অনুসারে বাংলাদেশে প্রায় ৪৪ লাখ দলিত জনগোষ্ঠী বসবাস করে। আছে প্রায় ১৩ লাখ হরিজন জনগোষ্ঠী এবং প্রায় আট লাখ বেদে জনগোষ্ঠী। প্রিয়া সাহা একজন শিক্ষিতা ও রাজনৈতিক সচেতন মহিলা। তিনি যদি নিরপেক্ষ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর চালচ্চিত্র সম্পর্কে জানাতেন, তাহলে তার মন্তব্যের নিরপেক্ষতা প্রমাণিত হতো। অথচ তিনি তা করেননি। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক বলয়ে, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি করেছে, ঠিক সে সময়ে প্রিয়া সাহারা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু দমনপীড়নের বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপন করলেন। এর হেতুটা কী? প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব জনমতকে রোহিঙ্গা ইস্যু থেকে দৃষ্টি পরিবর্তনের এটা এক হীন ষড়যন্ত্র। হ

 


আরো সংবাদ