২১ নভেম্বর ২০১৯

নোবেল প্রাইজ ও নরমাংস ভক্ষণ

-

প্রতি বছরের শেষ দিকে ‘বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম পুরস্কার’ হিসেবে গণ্য, নোবেল প্রাইজে ভূষিত করা হয় চিকিৎসা বিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, শান্তি, সাহিত্য এবং (পরবর্তীকালে সংযোজিত) অর্থনীতির ক্ষেত্রে অনবদ্য অবদানের জন্য। এবারও এই পুরস্কারের ঘোষণা দেয়া হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। বিশেষ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার ও সাহিত্যকর্মের জন্য কে কে নোবেল প্রাইজ পেলেন, সে দিকে দুনিয়ার সবার থাকে দৃষ্টি ও মনোযোগ। এবার শান্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে আলোড়ন তোলা, সুইডিশ স্কুলছাত্রী গ্রেটা থুনবার্গ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যে প্রত্যাশা ছিল বিশ্ববাসীর, তা পূরণ হয়নি। পুরস্কারটি পেয়েছেন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী। সাহিত্যের ক্ষেত্রে পুরস্কার পেলেন ২০১৮ সালের জন্য পোল্যান্ডের নারীবাদী লেখিকা ও প্রায় অনালোচিত, ওল্গা তোকারচুক এবং অস্ট্রিয়ার লেখক পিটার হ্যান্ডকে ২০১৯-এর জন্য। বিভিন্ন মহাদেশের যে ক’জন প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিকের নাম সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ীদের তালিকায় প্রায় এক দশক ধরে স্থান পেয়ে আসছে, তাদের কেউ এবারও নোবেল প্রাইজ পাননি। সর্বোপরি, অস্ট্রীয় সাহিত্যিক হ্যান্ডকের গণহত্যাকে সমর্থন আর ফ্যাসিস্ট আচরণের দরুন তার এই পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে ধরে নেয়া হয়েছিল। যা হোক, নোবেল প্রাইজ প্রবর্তক এবং এর তহবিলের যোগানদার আলফ্রেড নোবেলের দেশ সুইডেনের হাতেগোনা ক’জন গত ১১৮ বছরে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। দেশটি এ পুরস্কার পাওয়াকে হয়তো মান ইজ্জতের ব্যাপার মনে করে তা অর্জনের লক্ষ্যে উঠেপড়ে লেগেছে। তবে এদিক দিয়ে, ‘শান্তিবাদী’ সুইডেনের কর্মকাণ্ড বিশ্বে ও মানবসমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার কতটা অনুকূল, সে বিষয় কম গুরুত্ব বহন করে না। এ প্রসঙ্গে নিউ ইস্টার্ন আউটলুক সাময়িকীতে গত ৯ অক্টোবর ভøাদিমির ওদিন্তসভ্ যে নিবন্ধ লিখেছেন, এর ভাষান্তর করেছেন মীযানুল করীম।
এবার নোবেল প্রাইজবিজয়ীদের নাম ঘোষণার দিন যতই ঘনিয়ে এসেছে, এই বিরাট পুরস্কারের আকাক্সক্ষা পোষণকারী সুইডিশ নাগরিকরা একটা বড় ধরনের মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। এটা বিস্ময়কর নয় যে, (নোবেল পুরস্কার প্রদানের) শতবর্ষের ইতিহাসে দেশটির মাত্র ৩০ জনের বেশি এ পুরস্কার পাননি। সর্বশেষ, সুইডেনের যিনি এ পুরস্কার অর্জন করেছিলেন, তিনি হলেন, ২০১১ সালের সাহিত্যে নোবেলজয়ী টমাস গোস্টা ট্রান্সট্রোমে। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, তিনি নোবেলবিজয়ী সুইডিশদের মধ্যে সপ্তম। এই বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয় যে, সুইডেন সাহিত্যিক নৈপুণ্য আর ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে কেন্দ্রে অবস্থান করছে। এমন একটি দেশও প্রত্যেক বছর বিশ্বমানের সাহিত্য প্রতিভা সৃষ্টি করতে পারছে না। তদুপরি, সুইডেনে সাহিত্য সম্পর্কিত কয়েকটি কেলেঙ্কারির জন্ম হয়েছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য স্টকহোম থেকে কয়েকটি প্রকাশ্য পরিকল্পনা বা প্রকল্পের সূচনা হয়েছে।
সুইডেনের প্রভাবশালী মহল হাতে নিয়েছে ‘গ্রেটা থুনবার্গ প্রকল্প’। এই কিশোরী অ্যাক্টিভিস্ট নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন লাভ করেছিলেন এবার। কৌতূহলের বিষয় হলো, সুইডেনের শিশুকল্যাণে নিয়োজিত সমাজকর্মীরা তার মা-বাবার ব্যাপারে তদন্ত করে দেখছেন। ডেইলি ডট নামের পত্রিকা জানায়, এবার জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে গ্রেটার ভাষণের পর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ‘তার কল্যাণের জন্য উদ্বিগ্ন’। গ্রেটা থুনবার্গকে নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে উত্তপ্ত আলোচনা চলছে। কারণ, কিছু ব্লগার দাবি করছেন, মেয়েটির মা-বাবাকে অবশ্যই দায়ী করতে হবে শিশুর অপব্যবহারের অভিযোগে। এর কারণ, তারা জর্জ সরোসের মতো ‘গ্লোবালিস্ট’কে সুযোগ দিয়েছেন সম্ভাব্য পরিবেশ বিপর্যয়ের ব্যাপারে প্রচারণার জন্য এই শিশুটিকে নিয়ন্ত্রণের কাজে।
সুইডেনের কেউ যাতে নোবেল প্রাইজ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় থাকেন, সে জন্য এটাই একমাত্র উদ্যোগ নয়। এর সম্ভাবনা বাড়াতে অন্যান্য ‘প্রকল্প’ও হাতে নেয়া হয়েছে।
ইন্টারনেটে পরিবেশ নিয়ে উন্মাদনা চলছে। সুইডেন এ সুযোগে দাঁও মারার মতলবে খাদ্য নিরাপত্তার সম্ভাবনার বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছে শিশুদের সচেতনতা বাড়াতে। এ জন্য ছোট ছোট শিশুকে শেখানো হয় ছারপোকা ও বর্জ্য খাবার কিভাবে খেতে হয়। এটা করা হয়েছে ত্রিমাত্রিক মুদ্রিত পুতুলের সাহায্যে। যারা ভবিষ্যতের খাদ্য নিয়ে এই খেলায় মেতে উঠেছেন, তারা নিশ্চিত, ভবিষ্যতে আমাদের পোকামাকড়, শ্যাওলা, খাদ্যবর্জ্য, পাউডার, প্রভৃতিসহ পুষ্টিকর ও পরিবেশবান্ধব খাবার খেতে হবে। এই মতের প্রবক্তারা এ যাবৎ বেশ প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছেন। তবে তাদের কামনা হলো, অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ নোবেল প্রাইজে ভূষিত হওয়া। কিছু প্রকাশনায় বলা হয়েছেÑ তাদের প্রয়াস ও স্বীকৃতি খুবই টেকসই।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির উপস্থাপিত, ‘গ্রিন নিউ ডিল’-এর যুগান্তর সৃষ্টিকারী অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলোকে গুরুত্ব দেয়ার বদলে সুইডেনের বিজ্ঞানী ম্যাগনাস সোডারলুন্ডের গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বেশি। অবাক হবেন না এ কথা জেনে যে, তার কর্মসূচি শিক্ষা দেয় মানুষকে মানুষের গোশত খেতে। পরিবেশবাদীরা গোশত বা মাংস এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পকে অনেকটা দায়ী করে থাকেন বিশ্বে উষ্ণতার জন্য। সোডারলুন্ডের মতে, লাশের মাংস ভক্ষণ করা এ সঙ্কটের একটি পরিবেশ-অনুকূল সমাধান। তার বক্তব্য, মৃতদেহ নিয়ে ‘ট্যাবু’ প্রচলিত আছে এবং এর মাংস খাওয়াকে অনেকে মনে করেন, মৃত মানুষের অমর্যাদা করা। এটাই প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। তিনি বলেছেন, ‘অভ্যস্ত নয়, এমন কিছু খেতে গিয়ে মানুষ অল্প হলেও রক্ষণশীল হয়ে যায়।’
বিজ্ঞানী সোডারলুন্ড এ ব্যাপারে নিশ্চিত, নিজ প্রজন্মের অন্য কারো মাংস খাওয়ার ব্যাপারে আমাদের ট্যাবু রয়েছে। তবে এতে প্রথম কামড় বসানোর সাথে সাথে এই ট্যাবু বিদায় নেবে বলে তার বিশ্বাস। এটা আরো কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার যে, তাকে যখন প্রশ্ন করা হলো- তিনি কোনো দিন মানুষের মাংস খাওয়ার চেষ্টা করে দেখবেন কি? তার জবাব ছিল : ‘আমি এ ব্যাপারে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত; যদিও পুরো রক্ষণশীল নই। বলতে হবে, অন্তত এটা চোখে দেখার ব্যাপারে আমার মনোভাব খোলামেলা।’ সোডারলুন্ড আরো পরামর্শ দিয়েছেন সম্ভাব্য উপায় হিসেবে পোষা পাখি আর কীটপতঙ্গ খাওয়ার জন্য।
‘দি নিউ আমেরিকান’ সাময়িকী মানবজাতির এই নতুন সুযোগের মূল্যায়ন করেছে। তাদের ভাষায়, এটা আসলে অবাক করার মতো কিছু নয়। নর্ডিক দেশটি (সুইডেন) মানুষ খেয়ে শুরু করতে পারে। এটা ‘বিষাক্ত পুরুষালিভাব’ কার্যকরভাবে দূর করতে পারে। ২০০৪ সালে পুরুষদের ওপর কর বসিয়ে কিংবা নারীবাদীদের উদ্ভট পরামর্শে এটা বেশি করা যায়নি।
এ দিকে, ফক্সনিউজ চ্যানেল নরমাংস ভক্ষণকে প্রতিহত করার জন্য উল্লেখ করেছে, মানুষ হয়ে মানুষের মাংস খেলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে। প্রসঙ্গক্রমে জানানো হয়, পাপুয়া নিউগিনির একটি গোত্র তাদের মৃতদেহগুলোকে কীটের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য নিজেরাই তা খাওয়ার চর্চা করেছিল। এর পরিণামে, কুরু নামের একটি রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এর অপর নাম লাফিং ডেথ বা হাসির মৃত্যু। যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসাসংক্রান্ত জাতীয় গ্রন্থাগার সূত্রে জানা গেছে, মানুষের দূষিত বা রোগাক্রান্ত মস্তিষ্কের টিস্যুতে প্রাপ্ত এক জাতের প্রোটিন এ রোগের কারণ। যা হোক, নিউগিনির মানুষের মাঝে প্রচলিত, নরমাংস ভক্ষণের চর্চা বন্ধ হয়ে গেছে ১৯৬০ সালে।
বিজ্ঞান ও মিডিয়া জগতের বহু ব্যক্তিত্ব এখন নরমাংস ভক্ষণের বিষয়ে আলোচনার সাথে সম্পৃক্ত। এটাকে ‘নতুন বিকল্প’ হিসেবে নেয়া যায় কি না, সে ব্যাপারে বিভিন্ন দেশে তারা দেখছেন। নিউজ উইক ম্যাগাজিন পড়ে এটা জানা যায়। ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির সমাজমনস্তত্ত্ব বিষয়ের দু’জন প্রভাষক জ্যারেড পিয়াজ্জা ও নীল ম্যাকল্যাচির অভিমত, মানুষ মানুষের মাংস খাওয়া অনৈতিক বা অযৌক্তিক নয়। তবে বিষয়টি আমাদের বিতৃষ্ণার উদ্রেক করে থাকে। এ কারণে পুষ্টিচাহিদা পূরণের একটি উপায় হিসেবে মানুষের মাংস ভক্ষণ করাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নরমাংস ভক্ষণকে সরাসরি ‘প্রেসক্রাইব’ করা হয় না। তবে দাবি করা হচ্ছেÑ অদূর ভবিষ্যতে মানুষ তার এই বিতৃষ্ণাকে জয় করার দরকার হবে না। তাদের বক্তব্য, মানুষ মানুষকে খাওয়ার ব্যাপারে যে নেতিবাচক মনোভাব দেখা যায়, দরকার হলে এর সুরাহা করতে মানুষ সক্ষম। সিলিয়া ফার্বার হলেন একজন সুইডিশ-আমেরিকান লেখক যার অভিজ্ঞতা আছে সাময়িকীতে প্রতিবেদন লেখা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার। দি ইপক টাইমস্-এ তার লেখায় বেশ রসালোভাবে ব্যঙ্গ করেছেন আগে উল্লিখিত একজন সুইডিশ প্রফেসর এবং সামগ্রিক অর্থে সুইডেনের। তিনি তাদের ‘উন্নাসিকতা ও পাগলামি’র সমালোচনা করেছেন। সুইডেন দেশটিতে লাশের অমর্যাদার বিরুদ্ধে অতীত থেকে বহাল থাকা নিষেধাজ্ঞা বাতিল এবং নরমাংস ভক্ষণ শুরু করার জন্য গত মাসে সরকারি পরিসংখ্যানের নিরিখে প্রস্তাব করা হয়েছে।
সুইডেন ক্যানিবালিজম বা নরমাংস ভক্ষণের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। এতে অবাক হওয়ার ব্যাপার নেই। কারণ ওয়েস্টেনফোর্স নামের একটি সুইডিশ নগরীতে একটি স্কুলের নবনির্মিত ব্যায়ামাগার উষ্ণ রাখা নিয়ে এক ঘটনা ঘটেছে। পাশেই আছে লাশ পোড়ানোর ক্রিমেটোরিয়াম। এর উত্তাপই ব্যায়ামাগারকে গরম রাখছে। ক্রিমেটোরিয়াম কর্তৃপক্ষের সাফাই, ‘এভাবে উত্তাপ যোগানো নৈতিকতার পরিপন্থী নয়। হ্যাঁ, লোকজন প্রশ্ন তোলে ঠিকই। তবে এ বিষয়ে একবার ব্যাখ্যা দিলেই তারা ব্যাপারটা বুঝে যায় এবং উপলব্ধি করে, এর মধ্য দিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।’
এভাবে সুইডেনের ‘অগ্রগতি’ হচ্ছে। কে জানে, হয়তো সুইডেন নোবেল প্রাইজ পেয়ে যাবে তাদের ঝোলার বুদ্ধির কারণে। সত্য হলো, নোবেল কমিটি ২০০৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করেছিল (তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট) ওবামাকে। এটা করা হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্যবার সশস্ত্র আগ্রাসন চালিয়ে হাজার হাজার বেসামরিক লোকজনকে হত্যা করার কারণে! হ

 


আরো সংবাদ