১৫ নভেম্বর ২০১৯

দৃষ্টিপাত : নিষিদ্ধ পলিথিনের অপ্রতিরোধ্য ব্যবহার

-

বাংলাদেশে একটা সময় ছিল যখন বাজারে গেলে মানুষ হাতে করে একটা চটের ব্যাগ নিয়ে যেতেন। কিন্তু আশির দশকের দিকে বাজারে পলিথিনের ব্যবহার শুরু হয়। এর পর থেকে বাজারে যে দোকানেই যান না কেন, বিনা পয়সায় পলিথিনের ব্যাগ দেয়া শুরু হলো। পলিইথাইলিন, যা জনপ্রিয়ভাবে ‘পলিথিন’ নামে পরিচিত, তা আসলে এক ধরনের পলিমার। অপচনশীল এ ক্ষতিকর পদার্থ পরিবেশে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করেছে। পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশে অনেক পরে পলিথিন ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু তা এত বড় বিপর্যয় ডেকে আনে যে, ব্যবহার শুরু হওয়ার ১৫ থেকে ২০ বছরের মাথায় ২০০২ সালের জানুয়ারি থেকে এর উৎপাদন, পরিবহন, মজুদ ও ব্যবহারকে আইন করে নিষিদ্ধ করতে হলো। ২০০২ সালে ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫’ সংশোধন করা হয়। এতে যেকোনো প্রকার পলিথিন ব্যাগ অর্থাৎ পলিইথাইলিন, পলিপ্রপাইলিন বা এর কোনো যৌগ বা মিশ্রণের তৈরি কোনো ব্যাগ, ঠোঙা বা যেকোনো ধারক যা কোনো সামগ্রী ক্রয়বিক্রয় বা কোনো কিছু রাখার বা বহনের কাজে ব্যবহার করা যায় এর উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করার বিষয়ে বলা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে ৬ক ধারা সংযোজনের মাধ্যমে এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ওই আইনের ১৫ ধারায় শাস্তির বিধান রয়েছে। কেউ যদি পলিথিন সামগ্রী উৎপাদন, আমদানি বা বাজারজাত করে, শাস্তি অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। আর কোনো ব্যক্তি যদি নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন সামগ্রী বিক্রি বা সে উদ্দেশ্যে প্রদর্শন, গুদামজাত, বিতরণ ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন কিংবা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে, তবে সে ক্ষেত্রে তার শাস্তি অনধিক এক বছর কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। পরিবেশ সংরক্ষণ সংশোধিত ২০১০ সালের আইনের ৭(১) ধারায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তির কারণে পরিবেশ বা প্রতিবেশের ক্ষতি হলে সেই ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণপূর্বক তা পরিশোধ করতে হবে এবং সংশোধনমূলক ব্যবস্থা অর্থ বা উভয় প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমে বেশ কড়াকড়ি হলেও ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে যায় এই আইনের প্রয়োগ। আর এখন বাংলাদেশে এটি যে, নিষিদ্ধ তা বোঝার কোনো উপায় নেই। পলিথিনের ব্যবহার রোধের বিষয়টি দেশব্যাপী যে গুরুত্ব হারিয়েছে, সেটি বাজারে গেলে বা রাস্তায় সামান্য একটু হাঁটলেই বোঝা যায় সহজে। পলিথিন বা প্লাস্টিকের বর্জ্য যেখানে সেখানে ফেলে দিলে তা নর্দমায় আটকে পানির প্রবাহে বাধা দেয়। বাড়ির দরজা থেকে শুরু করে নদী, নালা, ড্রেন সবখানেই মিশে গিয়ে যেন পৃথিবীর শ্বাসরোধ করে ফেলেছে পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী। এগুলো দ্বারা ড্রেন, নালা-নর্দমা, খাল, ডোবা ইত্যাদি ভরাট হয়ে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার প্রকোপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পলিথিন থেকে সৃষ্ট ব্যাকটেরিয়া ক্যান্সার ও ত্বকের রোগের সৃষ্টি করে থাকে। তা ছাড়া ডায়রিয়া ও আমাশয় রোগও ছড়াতে পারে। রঙিন পলিথিন জনস্বাস্থ্যের জন্য আরো বেশি ক্ষতিকর। এতে ব্যবহৃত ক্যাডমিয়াম শিশুদের হাড়ের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে এবং বাড়ায় উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি। পলিথিনের কাপে চা পান করলে আলসার ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।
পলিথিন ব্যবহারে জনজীবন, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পাটের কদর কমে যাচ্ছে, কমছে পাট চাষ। বন্ধ হচ্ছে পাটজাত পণ্যের কারখানা। বেকার হচ্ছেন কুটির শিল্পের মালিক ও শ্রমিক-কর্মচারীরা। সারা বিশ্বে পাটের চাহিদা বাড়লেও আমাদের অবহেলা ও সচেতনতার অভাবে ‘সোনালি আঁশ’ পাট আজ বিলুপ্তির পথে। আমাদের এ শিল্পকে ফিরিয়ে আনতে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে করতে হবে। ক্ষতিকর পলিথিন থেকে বাঁচতে বিকল্প ব্যবস্থা ও পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা এবং ব্যাপকভাবে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণের বিকল্প নেই। পাটের ব্যাগ, কাপড়ের ব্যাগ, কাগজের ব্যাগ ও ঠোঙা সহজলভ্য এবং ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা জরুরি। পরিবেশ বাঁচাতে অবশ্যই পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পাট, কাগজ বা কাপড়ের ব্যাগ উদ্ভাবন এবং বহুল ব্যবহারের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
মো: সাইফুদ্দীন খালেদ
লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

 


আরো সংবাদ