২২ আগস্ট ২০১৯

হাটে গরু আছে ক্রেতা নেই

আর ৫ দিন পরেই পবিত্র ঈদ-উল-আজহা। ঈদকে সামনে রেখে এখনও জমতে শুরু করেনি সীমান্তবর্তী জেলা দিনাজপুরসহ এ অঞ্চলের পশু হাটগুলো। হাটগুলোতে পশুর আমদানী যথেষ্ট হলেও কঙ্খিত ক্রেতার দেখা মিলছে না। যে সব ক্রেতা আসছেন তারা বেশী দাম বলে পশু ক্রয় করছেন না। সেজন্য তারা অপেক্ষা করতে চান শেষ পর্যন্ত। কেননা, শেষের দিকে দাম কমতে পারে তাদের আশা। আবার বিক্রেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে- কমদামে এখনই তারা কোন পশুা ছাড়বেন না। শেষের দিকে দাম বাড়তে পারে বলে মূল্য ছাড়ছেন না ব্যবসায়ীরা। ফলে হাটে পশুর আমদানী থাকলেও বেচাকেনা হচ্ছে না।

দিনাজপুরে বিভিন্ন পশু হাটে সরেজমিনে দেখা গেছে, মুখে পান চিবুতে চিবুতে খোশ গল্পে মেতে আছেন গরু ব্যবসায়ী মজিবর। আশে পাশের অন্য ব্যবসায়ীরাও যোগ দিয়েছে সেই গল্পের আসরে। সেখান থেকে থেমে থেমে ভেসে আসছে চিল্লা-হল্লা ও অট্টহাসির শব্দ। ব্যবসায়ীদের অনেকেই মাঝে মধ্যে ঘাড়ে থাকা গামছা দিয়ে গরুর শরীরের মাছি তাড়াচ্ছেন। সাথে সাথে চলছে পরস্পরের গল্প-গুজব।

গতকাল (মঙ্গলবার) দিনাজপুরের খোসালডাঙ্গা হাটে গিয়ে দেখা গেছে এমন দৃশ্য। হাটে প্রচুর গরুর আমদানী হয়েছিল। রাস্তাগুলোও ভরে উঠেছিল গরু-ছাগলের পদচারনায়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার এসব গরুর শতভাগই দেশী গরু। হাট ভর্তি এই গরুর সমারহ থাকলেও ক্রেতা ছিল খুবই নগন্য। এবার দিনাজপুরের হাটগুলোতে কোরবানীর পশু উঠেছে প্রচুর। প্রতি বছর এ সময় কোরবানীর ঈদের বাজার অনেক সরগরম থাকলেও এ বছরে এখনও জমে উঠেনি পশুর বেচা-কেনা। দিনাজপুরের পশু হাটগুলোতে প্রতি বছর এই সময় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে প্রচুর গরুর আমদানী ঘটে। কিন্তু এইবার এর ব্যত্যয় ঘটেছে।

এখন পর্যন্ত হাটগুলোতে কোন ভারতীয় গরুর প্রবেশ ঘটেনি। মূলত গরু প্রবেশে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কড়াকড়িতে এমনটি ঘটেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। সে কারণে এখন কোরবানীর পশু হাটের পুরোটাই দখলে রেখেছে দেশী গরু। গ্রামের কৃষক পরিবারের পালিত গরুতে ছেয়ে গেছে দিনাজপুরের হাটগুলো। এমনভাবে অন্যান্য হাট বিরল হাট, সদরের গোয়াল হাট, চেরাডাঙ্গী হাট, ফাসিলাডাঙ্গা হাট, চিরিরবন্দরের কারেন্ট হাটসহ জেলার প্রতিটি হাট দেশী গরুর দখলে। ভারতীয় গরু না আসায় কিছুটা উচ্চ মূল্য ধরে রেখেছে ব্যবসায়ীরা। আর এজন্য যে ক’জন ক্রেতা হাটে গেছেন তারা তা ক্রয় করতে পারছেন না। বাজার ঘুরে দেখা গেছে-মাঝারি আকারের আড়িয়া গরু ৪৫ থেকে ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম হাকা হচ্ছে। আর একটু বড় গরু হলেই তা ৭৫ হাজার বা লাখ টাকা দাম ডাকা হচ্ছে। তাই ক্রেতারা শেষ মূহুর্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। এদিকে ভারতীয় গরু না আসায় গরু ব্যবসায়ীরা অনেকটা উদ্বেগে রয়েছেন। কেননা ভারতীয় গরুতে লাভের পরিমান থাকে দ্বিগুণ। অনেক ক্ষেত্রে তা দ্বিগুনেরও বেশী। সীমান্ত থেকে ক্রয় করে দেশের অভ্যন্তরে যে কোন হাটে উঠাতে পারলেই এই লাভ। ফলে গরু ব্যবসায়ীরা ভারতীয় গরু ঢোকার আশায় প্রহর গুনছেন।

এদিকে দিনাজপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শাহিনুর আলম জানান, জেলার ১৩ উপজেলায় সর্বমোট ৬০ হাজার ৫২০টি গবাদি পশু ও ছাগল/ভেড়া হৃষ্টপুষ্টকারী খামারি/পালনকারীর কাছ থেকে আসন্ন কোরবানীর জন্য ১ লাখ ৯১ হাজার ২১৪টি কোরবানীযোগ্য পশুর একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে গরু/ মহিষ ১ লাখ ১৯ হাজার ৯৬৫টি ও ছাগল/ভেড়া ৭১ হাজার ২৪৯টি। কুরবানীর জন্য প্রস্তুত গবাদি পশুর মধ্যে ৮৯ হাজার ৩৮০টি ষাঁড়, ১২ হাজার ১৩৩টি বলদ, ১৮ হাজার ৩৮৩টি গাভী ও ৬৩টি মহিষ রয়েছে। পাশাপাশি ৭১ হাজার ২৪৯টি ছাগল/ভেড়ার মধ্যে ৬৮ হাজার ২৪২টি ছাগল ও ৩ হাজার ৭টি ভেড়া রয়েছে।

তিনি জানান, প্রস্তুতকৃত (মোটাতাজা/ হৃষ্টপুষ্ট) গবাদি পশুগুলো সার্বক্ষনিক তদারকি করছেন জেলা প্রাণি সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা। প্রতিটি খামারে নিরাপদ উপায়ে গবাদি পশু হৃষ্টপুষ্ট করার জন্য তদারকি করা ও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিকর ওষুধের ব্যবহার প্রতিরোধে পশু খাদ্য নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।

প্রাণী সম্পদ বিভাগের হিসাব মতে, দিনাজপুর জেলায় আসন্ন কুরবানি ঈদে ১ লাখ ৮ হাজার ১১৭ গবাদি পশু চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন করা হয়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার ২১৪টি গবাদি পশু। অপরদিকে ২৬ হাজার ৮৭টি ছাগল/ভেড়ার চাহিদার বিপরিতে উৎপাদন করা হয়েছে ৭১ হাজার ২৪৯টি। ফলে উদ্বৃত্ত থাকবে ৮২ হাজার ৭৯৭টি গবাদি পশু ও ৪৫ হাজার ১৬২টি ছাগল/ভেড়া।

দিনাজপুর জেলায় ছোট-বড় মিলে ২ শতাধিক পশুর হাট রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় হাট রয়েছে ডজন খানিকেরও অধিক। এসব হাটে স্থানীয় গরুর ব্যাপক আমদানী হলেও গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত বেচা-কেনা ছিল না। এই বেচা-কেনা আগামী দু’একদিনের মধ্যে জোরেসোরে শুরু হয়ে যাবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। সে ক্ষেত্রে ভারতীয় গরুর প্রবেশসহ মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পারলে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ আনন্দের সাথে ঈদ উদযাপন করতে পারবে।


আরো সংবাদ