১৯ আগস্ট ২০১৯

বনের পশু নয়, মনের পশু কোরবানি হোক

সলিম বিশ্বের একটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো ঈদ। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান এই শ্রেষ্ঠ উৎসবটি মহাসমারোহে উদযাপন করে থাকে। বাংলাদেশে ঈদ-উৎসব এখন শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; বিরাট বহুমাত্রিক জাতীয় সামাজিক উৎসব বটে। এর ধর্মীয় দিকটি অন্তঃসার হিসেবে কেন্দ্রে আছে, কিন্তু পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে বিরাটভাবে। যেমন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও বিনোদনমূলক নান্দনিক নানা বিষয়।

ঈদ আরবি শব্দ। এর অর্থ খুশি বা আনন্দ। ঈদ উৎসব মানে খুশি বা আনন্দের উৎসব। ঈদুল আজহা আরবি শব্দ। এর বাংলা অর্থ উৎসর্গের বা ত্যাগের উৎসব। একে কোরবানির ঈদও বলা হয়ে থাকে। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সারা বিশ্বের মুসলমানরা প্রতি বছর আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ বা কোরবানি করেন উৎসর্গের আনন্দোৎসবের মাধ্যমে।

জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়ে থাকে। মহান আল্লাহকে খুশি করার এবং তার নির্দেশ পালন করার উদ্দেশ্যে তারই নামে নির্দিষ্ট তারিখে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট পশু জবেহ করাকে কোরবানি বলে। কোরবানিতে পশু জবেহ করা হয়। তবে পশু জবেহ কোরবানির মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং তা শুধু প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ পশু কোরবানি মূলে রয়েছে মহান আল্লাহর প্রতি পরম আনুগত্য ও ত্যাগের চরম পরীা। আর এর মধ্যে লুকিয়ে আছে মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম আ: ও হজরত ইসমাইল আ:-এর পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

ইসলামি বিধান মতে, সামর্থ্যবান মুসলমানদের প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে পশু জবেহর মাধ্যমে নিজেকে মহান আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণভাবে সমর্পণ করতে হয়। তবে শুধু পশু জবেহ করার নাম কোরবানি নয়, বনের পশু জবেহের আগে মনের পশু জবেহ করতে হয়। অর্থাৎ মনের মধ্যে লুকায়িত হিংসা-বিদ্বেষ, কাম-ক্রোধ, লোভ-লালসাসহ সব প্রকার অসৎ, পাপচিন্তা নির্মূল করতে হয়। তাই কোরবানির মাধ্যমে মানুষের ষড়রিপুর পাশবিক শক্তির বিনাশ করে মানসিক শক্তির বিকাশ সাধন করতে হয়। এভাবেই মানবাত্মা বিশুদ্ধ, নির্মল, পবিত্র ও উন্নত হয়।

কোরবানির ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, আল্লাহ রাব্বুুল আল-আমিন স্বপ্নের মাধ্যমে হজরত ইবরাহিম (আঃ) কে তার প্রিয় বস্তু কোরবানি করার নির্দেশ দেন। হজরত ইবরাহিম আ: প্রভুর নির্দেশ পালনে প্রাণপ্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল আ:কে কোরবানি করতে উদ্যত হন। কিন্তু খোদাপ্রেম, দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রভুভক্তিতে অটুট মনোবল দেখে বিধাতা হজরত ইসমাইল আ:-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি করার গায়েবি নির্দেশ দেন। খোদাপ্রেমের পরীায় তুমি জয়ী-পুত্রের পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়।

এই উজ্জ্বল মহান দৃষ্টান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানের আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি প্রথা প্রচলন করেন। বিশ্ব বিধাতা মহান রাব্বুল আল আমিনের উদ্দেশ্যে। এই মহান ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের মাধ্যমে হজরত ইসমাইল আ: হলেনÑ ‘আল্লাহর উদ্দেশ্যে জবেহকৃত বন্ধু।’

অর্থাৎ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ইসমাইলু জাবিহুল্লাহ ।’কোরবানি দেয়া ওয়াজিব। রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোরবানি দেবে না, সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে।’ আল্লাহপাক পবিত্র কুরআন মাজিদে ঘোষণা করেছেন, ‘সুতরাং তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ কায়েম করো এবং কোরবানি করো।’ মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ সা: মদিনা শরিফে ১০ বছর অবস্থানকালে প্রতি বছরই কোরবানি দিয়েছেন।

কোরবানির মূল উদ্দেশ্য সর্বাধিক প্রিয় বস্তু ত্যাগের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও আত্মা বিশুদ্ধকরণ। আর এ উদ্দেশ্য সাধনে পশু জবেহ উপল মাত্র। কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি বান্দার আনুগত্য-নিষ্ঠা ও ত্যাগের পরীা হয়। মুমিনের মাঝে জেগে ওঠে পূর্ণ তাকওয়া, ভালোবাসা আর পবিত্রতা। কোরবানি খুব বড় রকমের নেক কাজ। হাদিস শরিফে আছেÑ ‘কোরবানির জানোয়ারের রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহ তা কবুল করে নেন।’

ত্যাগের উজ্জ্বলতায়, উৎসব-উৎসর্গে ঈদ আনন্দে এই পবিত্র দিনে সব ধর্মপ্রাণ মুসলমান জামাতে ঈদুল আজহা নামাজ আদায় করেন। সঙ্গতিপূর্ণ মুসলমানেরা উট, গরু, দুম্বা, ছাগল, মহিষ মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে জবেহ করেন এবং নিময়মাফিক গরিব, মিসকিন ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিতরণ করেন। ঈদের এই দিনে ধনী-গরিব ভেদাভেদ ভুলে সবাই উৎসবে মেতে ওঠে। দুঃখীরা পেটপুরে খেতে পারে। ছেলে-বুড়ো সবাই নতুন পোশাকে আনন্দ-উৎসবে পার¯পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়। সাম্য-মৈত্রীর মেলবন্ধন রচনা করে। কোরবানিতে যে মহান ত্যাগের দৃষ্টান্ত রয়েছে, তা থেকে আমরা শিা নেবো। কোরবানির আলোতে আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে মানবতার দীপ জ্বালিয়ে মধুর বসন্তে উদ্ভাসিত করুক সারা বিশ্ব। প্রাপ্তি ও প্রত্যাশায় আলোকিত জীবন ছুঁয়ে দিক সবার হৃদয়, ঈদ আনন্দধারায় ঈদ মোবারক।


আরো সংবাদ