১৪ ডিসেম্বর ২০১৯

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে একদিন

-

বিশাল অরণ্যে আপনি বের হয়েছেন প্রকৃতির সান্নিধ্য লাভের আশায়, হঠাৎ ক্ষুধার্থ কয়েকটি হিংস্র বাঘ বা সিংহ আপনার ওপর আছড়ে পড়ল শিকারের আশায়, কিন্তু না পারল না, কাচের দেয়াল থাকার কারণে ২ ইঞ্চির জন্য আপনাকে গ্রাস করতে পারল না। আপনি ভয়ে তো অজ্ঞান, এমন সব রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আপনাকে পাইয়ে দেয়ার জন্যই থাইল্যান্ডের সাফারি ওয়ার্ল্ডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের গাজীপুরে নির্মিত হয়েছে এশিয়ার সর্ববৃহত্তম বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক। অনেক দিন ধরে শুধু পরিকল্পনাই করে যাচ্ছিলাম এশিয়ার সর্ববৃহত্তম বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক ঘুরে দেখার জন্য কিন্তু বেটে বলে না হওয়ার কারণে যাওয়াই হচ্ছিল না। শেষমেশ আমি আর মা বের হলাম এশিয়ার সর্ববৃহত্তম সাফারি পার্ক ঘুরে দেখার জন্য। ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৯টা বাজি বাজি আমরা বেরিয়ে পরলাম নতুন গন্তব্য পানে। রাজধানী থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তরে গাজীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহসড়কে পাশেই অবস্থিত বাঘের বাজার। ওই দিকেই এগিয়ে চলছি আমরা। প্রথমে নাম শুনে আমি আনন্দিত হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এই বাঘের বাজারেই আপনি বাঘের দেখা পেয়ে যাবো। কিন্তু না আমাদের বাঘের দেখা পেতে হলে আরো একটু কষ্ট তো করতেই হবে। বাঘ দেখা বলে কথা তাই যেতে হবে আপনাকে আরো তিন কিলোমিটার পশ্চিমে। বারে শুক্রবার তাই মহাসড়কে রাজাদের ভিড় কিছুটা কম আমাদের চার চাকার মাইক্রবাস চলছে এগিয়ে। দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছলাম বাঘের বাজারে। সময় লাগল প্রায় ২ ঘণ্টার মতো। বাঘের বাজার থেকে স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা এসে উপস্থিত হলাম বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের দৃষ্টিনন্দন ফটকের সামনে। বিশাল আকৃতির হাতি দাঁড়িয়ে আছে। টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম সেই কাক্সিক্ষত সাফারি পার্কে। সারি সারি ফুলগাছ আমাদের স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করছিল। আগে থেকেই সাথে ছিলে বাঘ, সিংহ, বাজপাখি, ক্যাঙ্গারু। এমনকি বহু আগে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত ডাইনোসরও। তবে এগুলো প্রাণহীন, মাটি বালু ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর ভাস্কর্য। আমরা এগিয়ে চললাম পার্কের প্রথমেই অবস্থিত বঙ্গবন্ধু স্কয়ার। দেখা পেলাম আমাদের জাতির পিতার ম্যুরাল। হাতের ডানে দেখতে পেলাম পার্ক সম্বন্ধে যেকোনো তথ্য জানার জন্য এখানে রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও শিক্ষাকেন্দ্র। সেখানে আছে পার্কের পুরো ম্যাপ। এখানে আরো রয়েছে পার্ক অফিস। বামে এগিয়ে যেতেই দেখতে পেলাম জীববিজ্ঞানের নানা তথ্য ও গবেষণার জন্য ন্যাচার হিস্ট্রি মিউজিয়াম। এই মিউজিয়ামে প্রায় দুই হাজার প্রজাতির মেরুদণ্ডী ও অমেরুদণ্ডী প্রাণীর দেহাবশেষ, স্পেসিমেন ও স্টাফিং সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে এখানে। একে একে ঘুরে দেখতে লাগলাম আমরা। গভীর শালবনের ভেতর তৈরি করা হয়েছে সুবিশাল ইটের সীমানাপ্রাচীর। ভেতর দিয়ে অসংখ্য সরু পিচঢালা সড়ক। দু’দিকে শাল, গজারিগাছসহ নানা প্রজাতির গাছে আচ্ছাদিত। কোর সাফারি পার্ক, সাফারি পার্ক কিংডম, বায়োডাইভারসিটি পার্ক, এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারি পার্ক ও বঙ্গবন্ধু স্কয়ারসহ মোট পাঁচটি অঞ্চলের সমন্বয়ে, তিন হাজার ৬৯০ একর ভূমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে এশিয়ার সর্ববৃহৎ বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক। আমরা পদব্রজে প্রবেশ করলাম সাফারি কিংডমে। শুরুতেই দেখা পেলাম ম্যাকাও ল্যান্ড, এখানে আফ্রিকা থেকে আনা প্রায় ৩৪ প্রজাতির বিভিন্ন রকম পাখি রয়েছে। অনেকেই দেখলাম পাখি হাতে নিয়ে ছবি তুলছে আমি ও গেলাম হাতে নেয়ার জন্য ৩০ টাকার বিনিময়ে। ম্যাকাও ল্যান্ডের পাশে রয়েছে প্রায় ২০ প্রজাতির মাছ সমৃদ্ধ মেরিন অ্যাকুরিয়াম। টাইগার ফিস, ক্রোকোডিল ফিস, অস্কার, ব্ল্যাক গোস এবং ২০ সেকেন্ড অন্তর অন্তর রঙ পরিবর্তনকারী চিকলেট মাছ আরো কত মাছ। সব মাছের নাম মনে পড়ছে না। সামনে গেলেই দেখা পেলাম থ্রি ডি মুভির দেখার ব্যবস্থা ১০০ টাকার বিনিময়ে দেখা যায় অনেক দেখেছি থ্রি ডি মুভি তাই আর ঢুকলাম না ঐদিকে। সামনে পেলাম প্রজাপতি পার্কের দেখা হরেক রকম প্রজাপতি কাচের জারে বন্দী প্রদর্শনীর জন্য দেখে খারাপই লাগল কিন্তু কিছু দূরেই দেখতে পেলাম প্রজাপতির দল উড়ে বেড়াচ্ছে মনের আনন্দে। কিছু দূরে দেখা পেলাম রঙিন মাছের। এর পাশেই আছে কুমির, ময়ূর, বকের আবাসস্থল। একে একে ঘুরে দেখলাম আমরা। বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের আকর্ষণ বাড়িয়েছে বিশাল আকারের টাইগার রেস্তোরাঁ ও সিংহ পর্যবেক্ষণ রেস্তোরাঁ। এখানে খাবার টেবিলে বসেই কাচের অন্য পাশে সিংহ কিংবা বাঘের ঘুরাঘুরি দেখতে পারবেন। আমরা কোর সাফারি পার্ক ঘুরে দেখার জন্য বাসে চেপে বসলাম। সাফারি পার্কের এক হাজার ৩৩৫ একর এলাকায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে কোর সাফারি পার্ক। এখানে বন্য পরিবেশে বন্যপ্রাণীরা স্বাধীনভাবে বিচরণ করে। আমরা পার্কের গাড়িতে চড়ে বেষ্টনীর ভেতরে প্রবেশ করে দেখতে পেলাম বাঘ, সিংহ, ভাল্লুক, আফ্রিকান চিতা, চিত্রা হরিণ, সাম্বার ও গয়াল, হাতি, জলহস্তি, নীল গাই, বারো সিংগা, বন্য মোষ। কোর সাফারি পার্ক অঞ্চলে আছে আফ্রিকান সাফারি পার্ক। এখানে রয়েছে আফ্রিকান বন্যপ্রাণীর বিশাল সংগ্রহ। বিশাল দেহ আর লম্বা গলার জিরাফ আপনাকে স্বাগত জানানোর জন্য সদা প্রস্তুত। এখানে আরো বিচরণ করে বন্যপ্রাণী জেব্রা। বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে এশিয়া বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণীর মধ্যে আছে ক্ষুদ্রকায় ঘোড়া, আল পাকা, ওয়ালাবি, মান্ডারিং ডাক, ক্রাউন ক্রেইন ইত্যাদি। বৃক্ষরাজিসমৃদ্ধ প্রায় ১৫০ একর জায়গায় তৈরি করা হয়েছে হাতির আশ্রম। সেখানে দেখতে পেলাম অনেকেই হাতি মশয় এর পিঠে চেপে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আমি ও চেয়েছিলাম কিন্তু বাদ সাধলেন মাতৃদেবী। হাতির ওপর ওঠা যাবে না পড়লে হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে...। অগত্যা মাতৃদেবীর আদেশ মানতেই হলো। দেখতে দেখতে কিভাবে যে সময় গেল পেরিয়ে টেরই পেলাম না।

প্রবেশ মূল্য ও অন্যান্য খরচ
সাফারি পার্ক প্রবেশ : সব বাংলাদেশীদের জন্য পার্কে প্রবেশ টিকিটের মূল্য ৫০ টাকা তবে ১৮ বছরের নিচে ছেলেমেয়েরা ২০ টাকায় পার্কে প্রবেশ করতে পারে। আর সাধারণ অথবা শিক্ষা সফরে আসা ছাত্রছাত্রীদের পার্কে প্রবেশ করতে ১০ টাকা দিতে হয়। বিদেশী দর্শনার্থীদের জন্য পার্কে প্রবেশ মূল্য ৫ ডলার। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা সফরে আগতদের জন্য স্পেশাল প্রবেশ ফি রয়েছে। যদি শিক্ষা সফরে আসা শিক্ষার্থীদের গ্রুপ ৪০-১০০ জন হয় তাহলে সবার প্রবেশ করতে ৪০০ টাকা লাগবে। যদি শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০০ এর বেশি হয় তাহলে প্রবেশ করতে ৮০০ টাকা লাগবে।
কোর সাফারি পার্ক প্রবেশ ফি : কোর সাফারি পার্ক যেখানে খোলা পরিবেশে জীবজন্তু ঘুরে বেড়ায় তার মাঝ দিয়ে জিপ ও মিনিবাসে ঘুরে দেখতে জনপ্রতি ১০০ টাকা প্রদান করতে হবে। ১৮ বছরের কম বয়সী এবং ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ৫০ টাকা। মিনিবাসে করে ২০ মিনিট ঘুরিয়ে দেখাবে।
পার্কের অন্যান্য জায়গাতে প্রবেশ করতেও টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হবে। সব স্পট দেখতে মোটামুটি ২০০-৩০০ টাকা লাগবে। একসাথে কয়েকটি স্পট দেখার প্যাকেজ ও পাওয়া যায়। এছাড়া প্যাডেল বোটে ৩০ মিনিট ভ্রমণ করতে জনপ্রতি ২০০ টাকা খরচ হবে।
পার্কিং ভাড়া : প্রতিটি বাস, কোচ বা ট্রাক এর পার্কিং ভাড়া ২০০ টাকা। মাইক্রোবাস বা মিনিবাসের পার্কিং ভাড়া ১০০ টাকা। জিপ, প্রাইভেটকার, অটোরিকশা বা সিএনজির পার্কিং ভাড়া ৬০ টাকা।
পরিদর্শনের সময় : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের ছয় দিন সকাল ৯ টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক বন্ধ থাকে। পুরোটা ঘুরে দেখতে চাইলে সারা দিন চলে যাবে। তাই সবচেয়ে ভালো হয় যদি সকাল সকাল চলে যান। তাহলে আরামে সারাদিন ঘুরে ঘুরে সব অংশ দেখতে পারবেন।
সাফারি পার্ক যাওয়ার উপায় : ঢাকার মহাখালী থেকে শ্রীপুর, ভালুকা কিংবা ময়মনসিংহগামী বাসে গাজীপুরের চৌরাস্তা অতিক্রম করে কিছুটা গেলে বাঘের বাজারে সাফারি পার্কের বিশাল সাইনবোর্ড দেখতে পাবেন। বাঘের বাজার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক যেতে রিকশা বা অটোরিকশা ভাড়া লাগবে ২০-৪০ টাকা। এছাড়া গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে বাঘের বাজার যাওয়ার জন্য কিছু হিউম্যান হলার রয়েছে। সেগুলোতে বাঘের বাজার গিয়ে রিকশা বা অটোরিকশাতে সাফারি পার্ক যেতে পারবেন। দেশের অন্য কোনো প্রান্ত থেকে আসতে চাইলে চলে আসুন গাজীপুর। তারপর উপরে উল্লিখিত জায়গায় চলে যান আপনার পছন্দমতো যাতায়াত ব্যবস্থা দিয়ে।


আরো সংবাদ