১৭ নভেম্বর ২০১৯

পঙ্খি মানব

-

অপু ক্লাসের ফার্স্ট বয়। লেখপড়ায় তুখোড়। তবে একটু মোটাসোটা আর ভীতু প্রকৃতির। খুব ধীরস্থির। শিক্ষকেরা তাকে খুব আদর করেন।
স্কুলের পাশে বিশাল এক ঢিবি। পাহাড়ের মতো উঁচু। ক্লাস শেষে দুরন্ত ছেলেরা মাঝেমধ্যে সেটির চূড়ায় উঠে যায়। হইহুল্লোড় করে। অপু শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে। কখনো ওঠার সাহস পায় না। তার ভয়, উঠলে আর নামতে পারবে না। একদিন ক্লাস শেষে রাজু অপুকে পাহাড়ে ওঠার জন্য খোঁচাতে লাগে। অপু প্রথমে রাজি হয় না। রাজু পীড়াপীড়ি শুরু করে। লোভ দেখায়। উপরে অনেক মজা। গমগমে বাতাস। অনেক দূর দেখা যায়। পূর্বদিকে একটি বয়ে চলা নদীও দেখা যায়। নদীতে পালতোলা নৌকা। জেলেরা মাছ ধরছে। উথাল-পাথাল ঢেউ। আরো কত কী ! রাজুর বর্ণনা শুনে আগ্রহ হয় অপুর। রাজুর দিকে লাজুক চোখে তাকিয়ে বলে,‘আমার ভয় করে। উঠলে আর নামতে পারব না।’ রাজু অভয় দেয়,‘আমি তোকে ধরে ধরে উঠাব। আবার নামাব।’ অনেক কষ্টে অপু চূড়ায় উঠল। দূরদিগন্ত দেখা যাচ্ছে। চার দিকে তাকিয়ে অপু আত্মহারা। বিড়বিড় করে বলল, ‘রূপবতী বাংলা আমার।’
হঠাৎ অপু তাকিয়ে দেখে পাশে রাজু নেই। কোন ফাঁকে তাকে রেখে নেমে গেছে। একা একা অপুর ভয় লাগে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। গাছের গা ঘেঁষে ডুব দিচ্ছে ক্লান্ত সূর্যটা। রাজুর দেখা নেই। আশপাশেও কেউ নেই। চারদিক বুনো নির্জন। হিজলের পাতা তিরতির করে কাঁপছে। অচেনা প্রাণীর ডাক শোনা যাচ্ছে। পাশেই ঝোপঝাড় নাড়িয়ে কী যেন দৌড় দিলো! ভয়ে কাঁদো কাঁদো অপু। মনে নানা ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। এখন যদি ভূত আসে! মা-বাবাও না জানি কত চিন্তা করছে!। তার ছোটবোন টুম্পার কথাও মনে পড়ল। হিজল গাছ ধরে দাঁড়িয়ে আছে অপু।
হঠাৎ কে যেন ডাকল। চমকে ওঠে অপু। ভয়ে জড়সড়। নিশ্চয় ভূতপ্রেত! কিন্তু গলাটা বেশ আদুরে। ভয়ে ভয়ে পেছন ফিরে তাকায় অপু। লিকলিকে লম্বা একটা ছেলে। গায়ের রঙ তামাটে। নাকটা অনেক লম্বা। মনে হয় মুখোশ পরে আছে। চুলও নীল রঙের। ছোট ছোট দু’টি সবুজ চোখ জ্বলজ্বল করছে। এ ভূত না হয়ে যায় না! কিন্তু কাঁধে ব্যাগ কেন? অপুর দিকে হাত বাড়ায়। অপুও বাড়ায়। হ্যান্ডশেক করার পর অপুর ভয় কমে অনেকখানি।
অপু জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার নাম কী?’
‘টিংটিং।’
‘এ আবার কেমন নাম! তোমার বাড়ি কোথায়?’
হাসে টিংটিং। ‘অনেক দূরে। তোমাদের পৃথিবী থেকে এক হাজার ৫০০ আলোকবর্ষ দূরে। আলোকবর্ষের হিসাব জানো তো? আলো এক সেকেন্ডে যায় তিন লাখ কিলোমিটার। এবার হিসাব করে বলো, এক হাজার ৫০০ বছরে কত কিলোমিটার যাবে। আমার বাড়ি তত দূরে।’ অপু উপরে-নিচে মাথা নাড়ে। তার বিস্ময় এখনো কাটেনি। তার কাঁধে হাত রাখে টিংটিং। বলে, ‘এদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে এসেছিলাম। দেখলাম তুমি বিপদে পড়েছ। তাই এলাম।’ এবার অপু খুশি হয়। বলে, ‘আমাকে এখান থেকে নামিয়ে দিলেই হবে।’ টিংটিং বলল, ‘তোমাকে পঙ্খি মানব বানিয়ে দেব নাকি, এক উড়ালে বাড়ি চলে যাবে!’ বলেই ব্যাগ থেকে বেলুনের মতো একটি জিনিস বের করে। কী যেন একটা সুইচে চাপ দিতেই দুটি পাখাঅলা জামা হয়ে যায়। পাখা দুটির ভেতর হাত ঢুকিয়ে জামার মতো পরিয়ে দেয় অপুকে। তারপর একটি সাদা বেল্ট কোমরে বেঁধে দেয়। বলে, ‘এই বেল্ট এবং জামা তোমাকে বাতাসে ভাসিয়ে রাখবে। পাখির মতো করে হাত ঝাপটালেÑ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। এবার লাফ দাও।’ অপু সাহস পায় না। টিংটিং হেসে এগিয়ে এলো। তার পেটে হাত দিয়ে শূন্যে ভাসিয়ে দিলো। অপু ভেসে রইল। টিংটিং হাত নাড়াতে বলল। অপু পাখির মতো ঝাপটা দিতেই অনেক সামনে চলে গেল। উপরের দিকে ঝাপটা দিতেই ওপারে উঠে গেল। প্রথম সাইকেল চালানো শিখে যেমন আনন্দ পেয়েছিল, আজকের আনন্দ তার চেয়েও বেশি। সূর্য তখনো ডোবেনি। একরাশ সবুজের উপর দিয়ে পাখির মতো ভাসছে অপু। অনেক সামনে চলে গেল। বাড়ি যেতে ইচ্ছ করছে না। ভাবছে কিছুক্ষণ নদীর উপর দিয়ে উড়ে বেড়ালে কেমন হয়। পেছনে তাকায় অপু। টিংটিংকে দেখতে পেল না। ধন্যবাদ দেয়ার আগেই অদৃশ্য হয়ে গেল ভিনগ্রহের ছেলেটি। অপুর ঘুম ভেঙে গেল।

 

 


আরো সংবাদ