০৮ ডিসেম্বর ২০১৯

মায়াজাল

-

অরণী বিরক্তিতে কপাল কুঁচকালো। বিদ্যুৎ আছে, তবে তা থেকেও নেই। দিনের বেশির ভাগ সময় লোডশেডিং। একেবারে অজপাড়াগাঁ।
দাদীমা।
কিছু বলবে?
তোমরা এই অজপাড়াগাঁয়ে থাকো কী করে? এখানে তোমাদের সময় কাটে কী করে?
কেন?
নেট কানেক্ট পায় না। ফেসবুক দেখা যায় না। ইউটিউব দেখা যায় না। ডিসলাইন নেই। টিভিতে ইন্ডিয়ার সিরিয়াল দেখা যায় না।
দাদীমা হাসলেন। ওহ, এই কথা। তারপর বললেন, আচ্ছা দিদিভাই, তুমি আমাকে একটা কথা বলো তো।
কী কথা?
আজ থেকে ৩০ বছর আগে ইন্টারনেট, ডিশলাইন, ইন্ডিয়ার সিরিয়াল ছিল?
নাহ। ছিল না।
তাহলে তখন লোকেরা সময় কাটাত কী করে?
থমকে গেল অরণী। তাই তো! তখন লোকেরা সময় কাটাত কী করে?
দাদীমা অরণীর আরো কাছে এলেন। ডান হাতে চিবুক ধরে স্নেহার্দ্র গলায় বললেন, তখন লোকদের সময় কাটত বড় বড় গল্পের বই আর উপন্যাস পড়ে। গান শুনে, খেলাধুলা করে আর পুকুর বা নদীতে মাছ ধরে।
অরণী উৎসাহিত হলো। বিছানায় বসে বালিসটা টেনে কোলে নিয়ে থুতনিতে হাত রেখে বলল, তুমি সময় কাটাতে কী করে দাদীমা?
দাদীমা হেসে বললেন, আমার শখ ছিল ছবি তোলার। আমি শুধু ছবি তুলতাম। ছবি তুলে সেগুলো যতœ করে অ্যালবামে ভরে রাখতাম। অবসর সময়ে অ্যালবাম নিয়ে বসতাম। পৃষ্ঠা উল্টিয়ে নিজের ছবি দেখতাম। গল্পের বই পড়তাম। বিকেলে খালি পায়ে নরম দূর্বাঘাসের ওপর হাঁটতাম। হেঁটে হেঁটে চলে যেতাম রেললাইনের ধারে। বিকেলে রেললাইন দিয়ে একটা ট্রেন যেত। কু ঝিকঝিক করে। আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই ট্রেন যাওয়া দেখতাম। ট্রেন চলে গেলে মাঠে গোল্লাছুট খেলতাম। কানামাছি আর বউচিও খেলতাম। এভাবে কখন যে সময় পেরিয়ে যেত টেরই পেতাম না।
মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল অরণীর। দাদীমা, তোমার সেই ছবির অ্যালবামগুলো কি এখনো আছে?
হ্যাঁ, আছে তো। দেখবে? দাদীমা চারটা অ্যালবাম বের করে অরণীর হাতে দিয়ে বললেন, দেখো। এরপর গল্পের বই এনে দিচ্ছি। শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ো। তারপর বিকেলে আমরা খালি পায়ে মেঠোপথের নরম দূর্বাঘাসের ওপর হাঁটব। দেখবে তোমার ভালো লাগছে। মনের ভেতর নতুন একটা জগৎ সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যরকম এক জগৎ। অনুভূতি আর ভালো লাগায় ভরপুর জগৎ। ভালোবাসার জগৎ।
দুই
ভরদুপুর। বাইরে ঠাঠানো রোদ। জানালার পাশে বসে অরণী অ্যালবামে দাদীমার ছবি দেখছে। দাদীমার শিশুকালের ছবি। শৈশবের ছবি। স্কুলে যাওয়ার ছবি। কলেজে পড়ার ছবি। দাদীমার বিয়ের ছবি। বাবার শিশুকালের ছবি। শিশু বাবাকে কোলে নিয়ে দাদীমা বসে আছেন। ছবি দেখে অরণী হাসে। ছবি দেখা শেষ হতে না হতেই দাদীমা ওইঘর থেকে এত্তগুলো গল্পের বই নিয়ে আসেন। সেখান থেকে অরণী সমরেশ মজুমদারের সাতকাহন বইটি হাতে নিয়ে পড়তে থাকে। দীপাবলি নায়িকা। তারই সমবয়সী মেয়ে। এইটুকু মেয়ের জীবনে এত গল্প! ঘটনা! সে পড়তে লাগল মন্ত্রমুগ্ধের মতো। যতই পড়ে মনে শুরু হয় উথালপাথাল। নানান অনুভূতি। আত্মবিশ্বাস, জেদ। দীপাবলি জীবনের নানা ঘাতপ্রতিঘাত ডিঙিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারলে আমি কেন পারব না? অবশ্যই পারব। আমাকেও পারতে হবে।
অরণীর স্মার্টফোনে আসক্তি ছিল। পড়ালেখায় মন বসাতে পারত না। সারাক্ষণ ডুবে থাকত ফোনে। গেমস খেলত, ফেসবুক আর ইউটিব দেখত। বাবা-মা অনেক চেষ্টা করেও তাকে স্মার্টফোনে আসক্তি থেকে মুক্ত করতে পারছিল না। শেষে অরণীর বাবা তার মাকে ফোন দিলেন। সব শুনে দাদীমা বললেন, চিন্তা করিস না খোকা। ওকে কিছু দিনের জন্য আমার এখানে পাঠিয়ে দে। দেখি আমি।
তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে মা?
কেন? বলো তো?
ও কি গ্রামে গিয়ে থাকতে পারবে? ছিল কখনো?
সেটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। বললাম তো আমার ওপর ছেড়ে দে। সেটা আমি বুঝব।
তিন
একদিন বাবা অরণীকে অনেক বুঝিয়ে গ্রাম দেখানোর কথা বলে নিয়ে এলেন। গ্রামে পা রেখেই অরণী নাক ছিটকাল। কী অজপাড়াগাঁরে বাবা! এই গ্রামে মানুষ থাকে? আমি থাকতে পারব না। ইমপসিবল।
দাদীমা হেসে বললেন, তোমাকে থাকতে হবে না। এসেই যখন পড়েছ, শুধু দুটো দিন থেকে যাও। ঘুরে ঘুরে গ্রামের সবুজ মাঠ দেখো।
বাবা বলল, লক্ষ্মী মা আমার, দাদীমা যখন এত করে বলছে, থেকে যা না দুটো দিন। আমি ঠিক জোর করছি না। বলছি একটু ভেবে দেখতে।
বাবার দিকে তাকিয়ে অরণী বলল, বাবা! তুমিও?
ঠিক আছে, আমি থাকবÑ বলে অরণী মুখ থমথম করে ব্যাগটা বিছানার ওপর রাখল।
কয়েক দিনে অনেক বদলে গেছে অরণী। এখন সে স্মার্টফোন হাতে নেয় না। অবসরে দাদীমার অ্যালবাম বের করে ছবি দেখে। বই পড়ে। দাদীমার মুখে গল্প শোনে। বিকেলে খালি পায়ে মেঠোপথের দূর্বাঘাসে হাঁটে। মাঠে শিশুদের সাথে গোল্লাছুট, বৌচি, কানামাছি খেলে। এতে তার মনে ভালো লাগার আলাদা এক অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে। যে অনুভূতি কখনো ফোন বা টিভি দেখে হয়নি। সব কিছু সে এখন নিজের মতো করে ভাবতে পারে। কল্পনা করতে পারে।
বিকেলে উঠোনে পেয়ারা গাছের নিচে বসে দাদীমার কাঁথা সেলাই করা দেখে অরণী বলল, সত্যিই দাদীমা, তোমাদের যুগই ভালো ছিল। কত আনন্দ আর হইচই ছিল। দুরন্ত শৈশব ছিল। আর আজ আমাদের সব অনুভূতি খেয়ে ফেলছে স্মার্টফোন। আমাদেরকে করে ফেলছে ঘরকুনো। দিয়েছে একাকিত্ব। সব শুনে দাদীমা বললেন, এবার বলো তো, সত্যিই কি আমার অজপাড়াগাঁটা বসবাসের জন্য অনুপযোগী?
ফিক করে হেসে দিলো অরণী। বলল, না বুকভরে নির্মল বাতাসে নিঃশ্বাস নেয়ার নামই হলো দাদীমার অজপাড়াগাঁ।
আজ বিকেলে অরণী চলে যাবে শহরে। তার মন ভার। মন খারাপ করা মনে বসে আছে সে।
দাদীমা বললেন, কিরে মন খারাপ কেন?
আমার শহরে যেতে ইচ্ছে করছে না দাদীমা। আমি তোমার কাছেই থাকতে চাই। স্মার্টফোনে সেলফি নয়, ছবি তুলে অ্যালবামে ঢুকিয়ে রাখতে চাই। অবসরে নেট বা ফেসবুক নয়, অ্যালবামের ছবি দেখে আর গল্পের বই পড়ে সময় কাটাতে চাই। প্রতিদিন বিকেলে রিকশায় চড়ে নয়, খালি পায়ে হাঁটতে চাই মেঠোপথের নরম দূর্বাঘাসে।
দাদীমা হেসে বললেন, ঠিক আছে কিন্তু লেখাপড়াও তো করতে হবে। আজ যাও, ছুটি পেলে আবার চলে আসবে আমার কাছে। এই অজপাড়াগাঁয়ের মাটিতে।
ভ্যান ছুটে চলছে উঁচু-নিচু মেঠোপথে। অরণী বাবার হাত ধরে দুই পা ঝুলিয়ে বসে আছে ভ্যানের পেছনে। অজপাড়াগাঁয়ের সব কিছুই এখন তার বন্ধু। সব কিছু ছেড়ে যেতে তার বুকটা হু হু করে ওঠে। চোখ ভিজে আসে। সে ডান হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মোছে। সবাই যেন তাকে বেঁধে ফেলেছে ভালোবাসার মায়াজালে।
সেতাবগঞ্জ, দিনাজপুর


আরো সংবাদ