২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

শীতের পোশাক

-

সেজান পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। ক’দিন আগেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে সে। তার পরীক্ষাও খুব ভালো হয়েছে। এ বছরটা তার খুব পরিশ্রমের মধ্যেই কেটেছে। সকালে বাবা-মায়ের সাথে ফজরের নামাজ আদায় করে বাবার সাথে বাইরে গিয়ে একটু বেরিয়ে এসে পড়তে বসা। এরপর ফ্রেশ হয়ে তড়িঘড়ি করে স্কুলে যাওয়া। সামান্য বিরতিতে অতিরিক্ত ক্লাসে অংশ নেয়া। এরপর বাসায় ফিরে এসে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার বই নিয়ে বসে যাওয়া। বিকেলে খেলার সময়ে মাঠে না গিয়ে মায়ের সাথে প্রাইভেট পড়তে স্যারের বাসায় যাওয়া। প্রাইভেট শেষে বাসায় ফিরে এসে একটানা রাত জেগে পড়া। এরকম টাইট সিডিউলের মধ্যেই বছরটা পার করেছে সে।
এখন পরীক্ষা নেই। নেই কোনো রুটিন ওয়ার্ক। মাও চোখে চোখে রাখেন না। ওর কাছে মনে হয়, পরীক্ষা নামক বন্দিশালা থেকে মুক্তি পেয়ে মুক্ত পাখির মতো চারদিক ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পেয়েছে সে।
সেজানের বাবা সোহেল চৌধুরী ইপিজেড এলাকায় অবস্থিত একটি বিদেশী ফ্যাক্টরির জেনারেল ম্যানেজার। বন্দরটিলা কাঁচা বাজারের পাশে তাদের বাসা। বিশালাকৃতির বাসাটি যেন ছোটখাটো একটি পার্ক। সেজান বাবা-মার কাছে কোনো কিছু চাইতেই পেয়ে যায়। অনেক দিন এমনো হয়েছে, সেজান কোনো কিছু চায়নি অথচ পেয়েছে।
ষড়ঋতুর বাংলাদেশে সেজানের প্রিয় ঋতু শীত। শীত এলে সেজান রঙবেরঙের মোটা-পাতলা কাপড়ের পোশাক পায়। বাবা কিনে দেয়। মা কিনে দেয়। নানা-নানি, মামা কিনে দেয়। এমনকি গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলে দাদা-দাদি ও কিনে দেয়। চাচা-ফুফুরা কিনে দেয়। ফলে প্রয়োজনের চেয়ে বেশিই হয়ে যায়। সেজান মনে মনে ভাবেÑ গত বছর সে গ্রামে তার বয়সী কিছু গরিব-অসহায় ছেলেমেয়েকে দেখেছে। যেখানে প্রচণ্ড শীতের দিনে গ্রামের লোকজন গায়ে চাদর কিংবা মোটা কাপড় পরে বের হয় সেখানে কিছু ছেলেমেয়েকে উদোম গায়ে কাঁপতে কাঁপতে পূর্বদিকে ছুটতে দেখেছে সে। এই চিন্তা থেকে সে নিজের ব্যাগের ভেতর তার বেশকিছু শীতের পোশাক যতœ করে নিয়েছে।
শীতকালীন অবকাশ যাপন উপলক্ষে গতকাল সেজানদের স্কুল ছুটি দিয়েছে। সেজানের বাবাও তার অফিস থেকে ছুটি নিয়েছেন। স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে তিনি গ্রামের বাড়ি আসেন। সেজান দাদা-দাদিকে কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। দাদা-দাদিও তাদের একমাত্র নাতিকে পেয়ে মহাখুশি হন। সারা দিন নাতিকে নিয়ে দাদা ঘুরে বেড়ান। শুধু খাবার সময় হলে সবাইকে একসাথে পাওয়া যায়। আর রাতে ঘুমুতে যাওয়ার সময় সবাই ঘরে থাকে।
সেজান দাদার হাত ধরে সবুজ গাঁয়ের ফসলের মাঠ, বনবীথিকা, হাট-বাজারসহ সর্বত্র চষে বেড়ায়। দাদা যখন গাঁয়ের সহজ সরল মানুষের কাছে সেজানকে পরিচয় করিয়ে দেন, তখন সে মুগ্ধ হয়ে দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। জীবনে যাদের সে কখনো দেখেনি তারাও পরিচিত হয়ে তাকে আপন করে নেয়। শহুরে জীবন সম্পর্কে জানতে তাকে কত কত প্রশ্ন করে। এটা-ওটা কিনে দেয়। সেজান তাদের কাছে যত আসে ততই মুগ্ধ হয়।
একদিন ভোরে দাদার সাথে ভূঞার হাটে আসে সে। বাজারে এসে দাদা-নাতি একসাথে চা-নাশতা খেয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে। দোকানটির পাশেই রয়েছে নলচিরা ভূঞার হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিশাল মাঠ। হাতিয়ার প্রধান সড়কসংলগ্ন। হঠাৎ সেদিকে সেজানের চোখ পড়ে। তখনো পুবাকাশে সূর্য হেসে ওঠেনি। কয়েকটি ছেলেমেয়ে শীতে জড়োসড়ো হয়ে সূর্যের আলোর জন্য অপেক্ষা করছে। ওদের কারো গায়ে মোটা জামা নেই। সবার পরনে জীর্ণশীর্ণ গেঞ্জি। তাও হাফহাতা। ওদের এভাবে দেখে সেজান দাদার কানে কানে বাড়ি যাওয়ার কথা বলে এক দৌড়ে বাড়ি চলে আসে। এরপর ব্যাগের ভেতর থেকে সব শীতের পোশাক নিয়ে ঘর থেকে বের হয়। ওর এমন কাণ্ড দেখে মা-দাদিসহ ঘরের সবাই অবাক হয়। কাউকে কিছু না বলে বড় বড় পায়ে হেঁটে এসে মাঠে পৌঁছে সে। এরপর সবার হাতে একটি করে শীতের পোশাক তুলে দেয়। সবাইকে দেয়ার পরও একটি পোশাক তার হাতে রয়ে যায়। সেটি সে নিজে পরে ওদেরকেও পরতে বলে। সবাই শীতের পোশাক পরল। মোটা কাপড়। সেজানের ব্যবহৃত হলেও ভালোভাবে ইস্ত্রি করা পোশাক দেখে মনে হচ্ছে একদম নতুন পোশাক। মুহূর্তে ছেলেমেয়েগুলোর মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
শীতের তীব্রতাকে হারিয়ে ওরা পরম কৃতজ্ঞতা ভরা চোখে সেজানের মুখের দিকে তাকায়। সেজানও মুগ্ধ চোখে ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ততক্ষণে সেজানের দাদা তার নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করেন।

 


আরো সংবাদ