২১ নভেম্বর ২০১৯

লজ্জার আবরণে বাংলাদেশের ক্রিকেট

-

জাতীয় দলের সিনিয়র-জুনিয়র ক্রিকেটারসহ সব পর্যায়ের ক্রিকেটারদের ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিন অতিবাহিত। কিন্তু এতে বাস্তবিক অর্থেই সুরাহার কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না। এক দিকে ক্রিকেটাররা যেমন অনড়, অন্য দিকে বোর্ডও এটিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে। এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে কোন পথে যাচ্ছে এ আন্দোলনের গতিবিধি। ইতোমধ্যে ভারত তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। বিসিসিআইয়ের দায়িত্ব নিতে যাওয়া সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলী প্রকাশ্যেই তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সমস্যার সুরাহার আশা করে যথারীতি সফর অনুষ্ঠিত হবে বলে আশাপোষণ করেছেন।
ভারত বাংলাদেশের সাথে ২০০০ সালে অভিষেক টেস্ট খেললেও অদ্যাবধি পূর্ণাঙ্গ কোনো সফরের আমন্ত্রণ জানায়নি। আগামী ৩ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া সফরটাই বাংলাদেশের প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ সফর ভারতে। আইসিসির সব টেস্ট প্লেয়িং দেশ একাধিকবার বাংলাদেশকে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে ভিত্তিতে খেলে গেলেও ভারত বরাবরই তাদের হোম সিরিজ এসে বাংলাদেশে খেলে গেছে। এর প্রধান কারণ একটাই ভারতীয় ক্রিকেট নির্ধারকরা মনে করেন, বাংলাদেশ তাদের দেশে সফরে গেলে কোনো স্পন্সর পাবেন না তারা। ফলে গোটা সিরিজটা বড় অর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে যাবে। এ থেকেই তাদের ওই উপেক্ষা করে যাওয়া। বরং তারা বিসিবিকে বুঝিয়ে বাংলাদেশে খেলে গিয়ে বাংলাদেশকে আর্থিকভাবে সহায়তা করে গেছেন বলেই তাদের দাবি। ক্রিকেটাররা এ নিয়ে লজ্জায় ছিল। মুশফিকসহ সিনিয়র সব ক্রিকেটার বলে আসছেন, এটা অন্যায়। আমরা ভারতের মাটিতে খেলার অভিজ্ঞতা নিতে পারছি না। আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। বিরাট কোহলি সর্বশেষ বাংলাদেশে যখন এসেছিলেন, তখন ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ টেস্ট সিরিজ না হওয়ার বিষয়টা জেনে বিস্মিত হন। এবং তাদের বোর্ডের উদাসীনতা লজ্জার বিষয় বলে উল্লেখ করেন। এ নিয়ে ভারতীয় মিডিয়ায়ও লেখালেখি হওয়ার পর এবার দীর্ঘ দিনের আশা পূরণ হতে যাচ্ছে। কিন্তু সেটিও এখন অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে বিসিসিআইও অবাক। সিরিজ না হলে ভারতেরই বড় আর্থিক ক্ষতি।
ইতোমধ্যে আসন্ন এ সিরিজ সামনে রেখে দুই দেশেই কিছুটা উৎসব ভাব পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে কলকাতার ইডেনে শেষ টেস্টম্যাচ ঘিরে সৌরভ গাঙ্গুলী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এমন কি বাংলাদেশের অভিষেক টেস্ট স্কোয়াডে থাকা ক্রিকেটারদেরও তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেট, ক্রিকেটার ও দেশের জন্য সম্মানেরও বিষয়। এমন সময়ে ন্যায্য দাবির লক্ষ্যে ক্রিকেটারদের আন্দোলন এসব উদ্যোগ লজ্জায়ও ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। কারণ এটা ঠিক, ২০০০ সাল থেকে টেস্ট ক্রিকেট খেলা একটি দেশের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে (চার দিনের ম্যাচ) মান সম্মত বল, মান সম্মত বাস, হোটেল, ভাড়া, ম্যাচ ফি, মান সম্মত উইকেট, মাঠ এসব নিয়ে যদি আন্দোলন করতে হয় ক্রিকেটারদের তাহলে ক্রিকেট বিশ্ব কী ম্যাসেজ পেল বিসিবি সম্পর্কে? কিছু লোকের জন্য দেশের ক্রিকেটের অর্জিত মান সম্মান লজ্জায় পড়ে গেছে। এর সাথে ক্রিকেটারদের রুটি-রুজির যে ঘরোয়া লিগ সেখানেও বিসিবির কেরামতিও প্রকাশ পেয়ে গেছে। ক্লাব থেকে স্বার্থ উদ্ধারের জন্য যে বিশেষ সুবিধা প্রদান করন এবং সেখানে খেলোয়াড়দের বঞ্চিতকরণের যে নীতি, সেটি লজ্জার কারণ। সাকিব বলেছেন, তারা ক্রিকেটারদের রুটি-রুজির জায়গাটা মানসম্মত করে রেখে যেতে চান। যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্রিকেট খেলার প্রতি আগ্রহ না হারিয়ে ফেলে। যে চিন্তা হওয়ার কথা বিসিবির সেটি করছেন ক্রিকেটাররা। এবং এসবই দাবি-দাওয়া। বিসিবি কোথায় মুখ লুকাবে? অথচ সরকার ক্যাসিনোর সাথে সংযুক্ত থেকে যে অবৈধ অর্থ হাতিয়ে নিত তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে থেকে দুর্নীতিমুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সেখানে বোর্ডের সাথে যুক্ত প্রভাবশালী পরিচালক ও গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাও ছিলেন। পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছেন। একই সাথে ক্যাসিনোর মতো ক্রিকেট বোর্ড থেকে অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জনের হঠাৎ ফুলে ফেঁপে ওঠা একটি চক্র যুক্ত এ কথা বহু দিন থেকেই ক্রিকেটপাড়ার গুঞ্জন। যাদের মাধ্যমে কলঙ্কিত হচ্ছে ক্রিকেট ও ক্রিকেটের সব অর্জন। প্রধানমন্ত্রী একজন ক্রিকেটপ্রেমী এটি গোটা বাংলাদেশের মানুষই জানেন। ফলে ক্রিকেটকে আরো মর্যাদার স্থানে নিয়ে যাওয়ার যে প্লান সেটি যেন ব্যাহত না হয় সে জন্য সরকার হয়তো এদিকেও সুদৃষ্টি দিয়ে ক্রিকেটকে রাহুমুক্ত করবেনÑ এটি এখন সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রাণের দাবি। কারণ ক্রিকেটই একমাত্র খেলা, যেখানে একাকার হয়ে যান দেশের সব মানুষ সব ভেদাভেদ ভুলে। যার মাধ্যমে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা অনেক উপরে নিয়ে গেছে এটি তো দিবালোকের মতোই সত্যি।

 


আরো সংবাদ