২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

রোমান সানা এখন ল্যান্স নায়েক

আরচার রোমান সানার সাথে বাংলাদেশ আনসার ও বিওএর কর্মকর্তারা : সৌজন্য -

‘আট বছর আনসারে চাকরি করছি। আরো পাঁচ বছর করলেও পদোন্নতি হবে কি না কে জানে। এই আট বছরে কত ঘণ্টা ডিউটি করেছি তার হিসেব কে রাখে। ইস যদি খেলাটা শিখতাম। তাহলে এতটা পরিশ্রম মনে হয় করতে হতো না। আমি পারিনি তো কি হয়েছে, আমার ছেলেমেয়েকে খেলাধুলা করতে আর নিষেধ করব না। রোমান সানা আনসারের জন্য একটা উদাহরণ হয়ে থাকল।’ একজন আনসার সদস্য গতকাল এভাবেই মনের ভাব প্রকাশ করলেন। উনি একা নন। বেশ কয়েকজনের একই আফসোস।
বিশ্ব আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ জিতে ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছেন আরচার রোমান সানা। এশিয়া আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক জিতেছেন। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে নেপালে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান (এসএ) গেমসে রিকার্ভ পুরুষ একক, পুরুষ দলগত ও মিশ্র দলগতে তিনটি স্বর্ণপদক জিতেছেন বাংলাদেশের সেরা এই তীরন্দাজ। এরই পুরস্কারস্বরুপ বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি বাহিনী তাদের কৃতী এই ক্রীড়াবিদকে ল্যান্স নায়েক পদে পদোন্নতি দিয়েছে।
আনসারের ক্রীড়াবিদদের সবার গায়ে ছিল ছিল আনসার ও ভিডিপির ট্র্যাক স্যুট। রোমান সানার গায়ে ছিল আনসার বাহিনীর পোশাক। হঠাৎ করেই কেমন যেন অচেনা লাগছিল বর্ষসেরা এই ক্রীড়াবিদকে। জিজ্ঞেস করতেই জানালেন, আজ (গতকাল) তাকে পদোন্নতি দেয়া হবে। সৈনিক থেকে হবেন ল্যান্স নায়েক। সাথে দেয়া হবে নেপাল সাফ গেমসে পদক জয়ীদের সম্বর্ধনা ও আর্থিক পুরস্কার। খিলগাঁওস্থ আনসার ও ভিডিপির সদর দফতরের সভাহলের মঞ্চে রোমান সানা এলেন সৈনিকেরা যেভাবে প্যারেড করেন ঠিক সে কায়দায়। তাকে ব্যাজ পরিয়ে দিলেন আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল কাজী শরীফ কায়কোবাদ।
নেপালে অনুষ্ঠিত এসএ গেমসে এই বাহিনীর ১৪৪ জন ক্রীড়াবিদ বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের হয়ে অংশ নেন। যার মধ্যে একক ও দলগতে ৮টি স্বর্ণ (আরচারিতে রোমান সানা তিনটি, সোমা বিশ্বাস দু’টি, শ্যামলি রায় একটি, ভারোত্তোলনে মাবিয়া আক্তার একটি এবং কারাতেতে হুমায়রা আক্তার অন্তরা একটি), ১৩টি রুপা ও ৪৭টি ব্রোঞ্জপদক জেতেন। পদকজয়ী ক্রীড়াবিদদের ৩৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার প্রাইজমানি দেয়া হয়। একক ইভেন্টের সোনাজয়ীদের এক লাখ, রুপা জয়ীদের ৭৫ হাজার এবং ব্রোঞ্জপদক জয়ীদের ৫০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়। এদের মধ্যে সর্বোচ্চ এক লাখ ৮০ হাজার টাকা পান রোমান সানা।
পদোন্নতি ও আর্থিক পুরস্কার পেয়ে রোমান সানা বলেন, ‘আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই প্রাইজমানি অনেক প্রেরণার। এখন থেকে আমি ল্যান্স নায়েক পদে পদোন্নতি পেয়ে ভালো বেতন পাবো। এই দিয়ে আমার মাকে আরো ভালো চিকিৎসা করাতে পারব এবং সংসারে দিতে পারব। প্রতিটি সংবর্ধনা কিংবা পুরস্কার প্রেরণা দেয়। আনসার শুরু থেকেই আমার সাথে ছিল। সংসারে বাবা-মা যখন অসুস্থ ছিল আমি খেলার জন্য দেশের বাইরে ছিলাম, তখনো আনসারের স্যারেরা আমার বাবা-মায়ের চিকিৎসা করিয়েছেন। আমি আনসার বাহিনীর কাছে কৃতজ্ঞ। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন, আমি যেন দেশকে আরো ভালো কিছু দিতে পারি। অলিম্পিকে যেন ভালো একটা কিছু করতে পারি। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের পতাকা যেন ওড়াতে পারি। পদোন্নতি পেয়ে যেন ল্যান্স নায়েক থেকে পিসি (প্লাটুন কমান্ডার) হতে পারি।’
আনসারের ডিজি মেজর জেনারেল কাজী শরীফ কায়কোবাদ বলেন, ‘আমরা প্রতি বছরেই ক্রীড়াবিদদের সাফল্যের স্বীকৃতি দিয়ে থাকি। এসএ গেমসেও সাফল্য অর্জন করায় আমরা সংবর্ধনা দিলাম। বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে বেশ ক’বার বাংলাদেশকে সম্মানিত করায় তীরন্দাজ রোমান সানাকে আমরা ল্যান্স নায়েক পদে পদোন্নতি দিয়েছি। সামনেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গেমস। ওই গেমসে আনসার ফের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে আশাকরি। যারা পদক জিতবে তাদের জন্যও সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে।’
এসএ গেমসের সেফ দ্য মিশন আসাদুজ্জামান কোহিনুর বলেন, ‘এক সময় আনসারে ক্রীড়াদল গঠনের সময় আমিও ছিলাম। ফলে এই সাফল্যের কিছুটা হলেও আমি দাবিদার। এমন অর্থ পুরস্কার পেলে ক্রীড়াবিদরা আরো উৎসাহিত হয়।’
আরেক উপ-মহাসচিব আশিকুর রহমান মিকু বলেন, ‘এসএ গেমসে কৃতিত্ব অর্জন করা ক্রীড়াবিদদের সিংহভাগ আনসার ও ভিডিপির। ৬০টি ডিসিপ্লিনের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার নড়াইলের সংগঠক হিসেবে আমি বলতে পারি, ক্রীড়াঙ্গনের দুঃসময়ের সঙ্গী আনসার। কারণ তৃণমূল থেকে ক্রীড়াবিদরা এসে প্রথমেই আশ্রয় পায় আনাসরে। তাই আমি তাদের সাধুবাদ জানাচ্ছি।’

 


আরো সংবাদ