১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

রাস্তার মানসিক রোগগ্রস্তদের পুনর্বাসন জরুরি

রাস্তার মানসিক রোগগ্রস্তদের পুনর্বাসন জরুরি - ছবি : সংগৃহীত

ওপরে উল্লিখিত বিষয়ে গত এপ্রিল মাসে যে অভিজ্ঞতা হয় তা পরে লিখছি। সে অভিজ্ঞতা ছিল হৃদয়বিদারক। সাধারণভাবে যারা রাস্তায় আছে, প্রথমে তাদের কথা বলব। তারা কয়েক শ্রেণীতে বিভক্ত। ০১. ছিন্নমূল শিশু, যাদের দেখার কেউ নেই। ০২. কোনো পুরুষ ছাড়া রাস্তার নারী, তরুণী ও কিশোরী, ০৩. ছিন্নমূল পরিবার; স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান। এরা ভাড়া করে বস্তিতেও থাকার সামর্থ্য রাখে না। ০৪. মানসিক রোগগ্রস্ত নারী ও পুরুষ। তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। ঢাকা শহরে সর্বোচ্চ পাঁচ শত হতে পারে, তবে এর পরিসংখ্যান নেই।

এসব লোক কিভাবে রাস্তায় এসেছে? কারণগুলো এভাবে উল্লেখ করা যায় : ০১. নদীভাঙনের শিকার যারা, তাদের একটি অংশ যারা অতি দরিদ্র, যারা নিজেরা পুনর্বাসিত হতে পারেনি বা সরকারও যাদের যথাযথভাবে পুনর্বাসন করতে পারেনি। এরা শেষ পর্যন্ত জীবন বাঁচাতে শহরে চলে আসতে বাধ্য হয়। গ্রামে তারা আশ্রয় ও কাজ পায় না। এদের মধ্যে রয়েছে পরিবার (স্বামী-স্ত্রী, শিশু) অথবা কেবল নারী বা পুরুষ। ০২. বিভিন্ন সময় মঙ্গা ও দুর্ভিক্ষের কারণে কিছু লোক শহরে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে। এসে ওরা রাস্তায় পড়ে থাকে। ০৩. দরিদ্র ও তালাকপ্রাপ্ত নারী, যারা স্বামীর নির্যাতন ও অবিচারের শিকার এবং তারাও শেষ পর্যন্ত শহরে চলে আসে। তাদের একাংশ ঘরের কাজ করে, কিছু রাস্তায় থাকে। ০৪. দালাল ধরনের কিছু লোক দ্বারা অপহৃত কিশোরীরা; তাদের অনেকেই আর বাড়িতে ফিরতে পারে না, রাস্তায় থাকে।

ওরা সবাই বিপদগ্রস্ত। তবে সবচেয়ে বেশি বিপদগ্রস্ত একা থাকা যুবতী-কিশোরী এবং মানসিক রোগগ্রস্ত নারী, যারা রাস্তায় থাকে। এরা অন্যান্য অসুবিধার অতিরিক্ত নিত্যদিন লম্পট দুর্বৃ্েত্তর যৌন নির্যাতনের শিকার। অসংখ্য লোক নৈতিকতা ও চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে এবং তারা রাতে এসব নরপশু রাস্তায় নারীর ওপর অত্যাচার চালায়।

মানসিক রোগগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কথা বলার আগে এদের সবার পুনর্বাসনের কথা বলব। এদের সবার পুনর্বাসন প্রয়োজন। সরকার, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, এনজিও মিলে এ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। প্রতি বছরের নদীভাঙনগ্রস্ত লোকদের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের একটি স্থায়ী কর্মসূচি থাকতে হবে।
এখন রাস্তার মানসিক রোগগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কথা বলছি। মাসখানেক আগে ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ দিকের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখলাম, এক যুবতী মহিলা (বয়স ৩০-৩৫ বছরের মধ্যে হবে) কিছু খাচ্ছে এবং রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে। তার কাপড়চোপড় খুবই পুরনো এবং সামান্য। তাকে এক শত টাকা দিতে চাইলাম; কিন্তু সে নিল না; দৌড়ে রাস্তার অপর পারে চলে গেল। লোকেরা বলল, সে ‘পাগল’।

এর কিছু দিন পর ঢাকা কোর্টে যাচ্ছিলাম। গাড়ি গুলিস্তানের কাছে জিরো পয়েন্টে থেমেছিল। গাড়ি অনেকক্ষণ আটকে ছিল। পাশে দেখলাম, এক মহিলা (বয়স ৩০-৩৫ হবে) কিছু একটা বলছে। তাকে আমি এক শত টাকা দিতে চাইলাম। বারবার বলা সত্ত্বেও সে নিল না। তার দেহ খুব ক্ষীণ হয়ে গেছে। গায়ে কাপড়চোপড় অতি সামান্য। বুঝতে পারলাম, তার মাথা ঠিক নেই। এ অবস্থা দেখে আমার কান্না এলো। তার হয়তো গার্জিয়ানও নেই। রাতে থাকার জায়গা নেই। এরপর আমি নিজে একটি চিঠি লিখে কর্তৃপক্ষকে জানাই। সিটি করপোরেশনের একজন মেয়রকে জানাই। বিষয়টি গুরুতর। এ রকম পুরুষও আছে, ছেলেমেয়েও থাকতে পারে। সরকারকে, সিটি করপোরেশনের মেয়রদের অনুরোধ করি যেন তারা এসব নারী-পুরুষকে উদ্ধার করে তাদের খরচে হাসপাতাল অথবা মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠিয়ে দেন; সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত দেখভাল করেন এবং পরে তাদের পুনর্বাসন করেন।

লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

 


আরো সংবাদ