২২ নভেম্বর ২০১৮

কার্যকর নির্বাচন : নেপাল থেকে বাংলাদেশের পাঠ

কার্যকর নির্বাচন : নেপাল থেকে বাংলাদেশের পাঠ - ছবি : নয়া দিগন্ত

দক্ষিণ এশিয়ার দু’টি গুরুত্বপূর্ণ দেশ নেপাল ও বাংলাদেশ। দু’টি দেশই কয়েক দশক ধরে নানা ধরনের অস্থির অবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। নেপালে বছরখানেক আগে অনুষ্ঠিত হয়েছে নতুন সংবিধান ও নির্বাচনব্যবস্থার অধীনে প্রথম কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচন। আর বাংলাদেশে ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর আরেকটি নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। আগামী ডিসেম্বরে এই নির্বাচন হতে পারে।

বাংলাদেশ যে নির্বাচনপদ্ধতি অনুসরণ করে, সেটি ব্রিটিশ পদ্ধতির অনুরূপ। প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানও একই পদ্ধতি অনুসরণ করে। নতুন সংবিধান গ্রহণের পর নেপাল এই নির্বাচনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে। দেশটি ইউরোপের জার্মানিসহ অনেক দেশে যে আনুপাতিক ব্যবস্থা রয়েছে তার সাথে ব্রিটিশ পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি মিশ্র প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করেছে, যাকে একটি অনন্য পদ্ধতি বলা যায়। এই ব্যবস্থা অনুসারে নেপালে ২৭৫ আসনবিশিষ্ট সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে (১৬৫) ব্রিটিশ পদ্ধতি অনুসারে নির্বাচন হয়, যেখানে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত ভোটে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আর বাকি এক-তৃতীয়াংশ আসনে (১১০) দলের পক্ষে যে ভোট পড়েছে, তার ভিত্তিতে আগে জমা দেয়া তালিকা থেকে ক্রমানুসারে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়েছে। তুরস্ক, জার্মানিসহ কিছু দেশ রয়েছে, যেখানে দলের প্রাপ্ত ভোটের বিপরীতে দেয়া তালিকা থেকে পার্লামেন্টে আসন বরাদ্দ দেয়া হয়। আসন প্রাপ্তির জন্য দলের ন্যূনতম ভোট প্রাপ্তির সীমারেখা দেয়া আছে। তুরস্কে এই সংখ্যা হলো ১০ শতাংশ। নেপালে প্রত্যক্ষ ভোট আর আনুপাতিক ব্যবস্থার সমন্বয় করা হয়েছে। সেখানে আনুপাতিক ব্যবস্থায় আসন প্রাপ্তির ন্যূনতম ভোট প্রাপ্তির শর্ত ঠিক করা হয়েছে ৩ শতাংশ।

এ ব্যবস্থার ফলে প্রত্যক্ষ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের তুলনায় আসন প্রাপ্তির যে অস্বাভাবিক ব্যবধান থাকে, তা আনুপাতিক আসন দিয়ে বেশখানিকটা সমন্বয় হয়ে যায়। নেপালে গত সংসদ নির্বাচনে ৩২.৭৮ শতাংশ ভোট পেয়েও নেপালি কংগ্রেস প্রত্যক্ষ নির্বাচনে আসন পায় মাত্র ১৩.৯৪ শতাংশ। অন্য দিকে নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি- ইউএমএল ৩৩.২৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ৪৮.৪৮ শতাংশ আসন লাভ করেছে। মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ১৩.৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে ২১.৮১ শতাংশের মতো আসন লাভ করে ইউএমএলের সাথে জোট করার সুবাদে। কিন্তু এক-তৃতীয়াংশ আসন দলের প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে বরাদ্দ করার ফলে সেখানে ইউএমএল ৪১টি, নেপালি কংগ্রেস ৪০টি এবং মাওবাদীরা ১৭টি আসন লাভ করেছেন। এর ফলে দুই ক্ষেত্রের আসন মিলিয়ে কেন্দ্রীয় সংসদে ইউএমএলের ১২১, কংগ্রেসের ৬৩ এবং মাওবাদীদের আসন ৫৩টিতে দাঁড়ায়। ৩২ শতাংশ ভোট পেয়ে কংগ্রেস যেভাবে প্রত্যক্ষ নির্বাচনে তিন নাম্বার দল হয়ে গিয়েছিল, আনুপাতিক আসনের কল্যাণে শেষ পর্যন্ত দলটি উঠে আসে দুই নাম্বারে। ইউরোপের বেশির ভাগ দেশের মতো দলভিত্তিক আনুপাতিক নির্বাচন হলে ইউএমএল এবং কংগ্রেসের আসন কাছাকাছি থাকত। সেসব দেশে দলের পক্ষে ভোটার যত শতাংশ ভোট দেয়, ঠিক সেই অনুপাতে আসন লাভ করে থাকে।

ফ্রান্স ও ইরানসহ বেশ কিছু দেশে নির্বাচনী আসনে কম ভোট পেয়ে জয় ঠেকাতে, নির্বাচিত হওয়ার জন্য ৫০ শতাংশ ভোট প্রাপ্তির শর্ত বেঁধে দেয়া হয়েছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে দুই দফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দফায় ৫০ ভাগ বা এর বেশি ভোট পেলে সরাসরি নির্বাচিত হওয়া যায়। তা না হলে সর্বোচ্চ ভোট প্রাপ্ত দুই প্রার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় দফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশে জার্মান-তুরস্কের দলভিত্তিক আনুপাতিক নির্বাচনব্যবস্থা অথবা ফ্রান্স-ইরানের মতো ন্যূনতম ৫০ শতাংশ ভোট প্রাপ্তির বাধ্যবাধকতা না থাকায় কম ভোট পেয়েও সরকার গঠন সম্ভব হতে পারে। একই ধরনের ব্যবস্থার অধীনে মালয়েশিয়ায় ২০০৮ সালে ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েও ক্ষমতাসীন বারিসান ন্যাশনাল আবার সরকার গঠন করতে পেরেছে; আর বিরোধী ন্যাশনাল ফ্রন্ট ৫২ শতাংশ ভোট পেয়েও ক্ষমতার বাইরে থেকেছে। এবারের নির্বাচনে বিরোধী জোট পাকাতান হারাপান আগের বারের চেয়ে ৩ শতাংশ কম ভোট পেয়ে ১২২ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। বারিসান ন্যাশনাল এবং ইসলামিস্ট দল-পাসের মধ্যে বাকি ভোট ভাগ হওয়ার কারণে তারা সম্মিলিতভাবে বেশি ভোট পেলেও আসন পেয়েছে কম। ভারতের বিগত নির্বাচনে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও তাদের প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা ৪০ শতাংশের কম ছিল। দলভিত্তিক আনুপাতিক নির্বাচনে এটি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের বিগত দু’টি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ফলাফল সামনে রাখলে এ দেশে নির্বাচনে কী ঘটে থাকে, সেটি দেখা যাবে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়ে ৭৬.৬৬ শতাংশ আসন পেয়েছে। জাতীয় পার্টি ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ৯ শতাংশ আসন পেয়েছে। অন্য দিকে বিএনপি এই নির্বাচনে ৩৩.২ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন লাভ করেছে মাত্র ১০ শতাংশ আর জামায়াতে ইসলামী ৪.৬ শতাংশ ভোট পেয়ে ১ শতাংশেরও কম আসন পেয়েছে।

এই নির্বাচনে মহাজোট ৫৭.২ শতাংশ ভোট পেয়ে ৮৭.৩ শতাংশ আসন পেয়েছে; আর চারদলীয় জোট ৩৭.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে সাড়ে ১০ শতাংশ আসন পেয়েছে। অন্য দিকে, ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৪০.০২ শতাংশ ভোট পেয়ে ২০ শতাংশ আসনে জিতেছিল, আর বিএনপি ৪১.৪ শতাংশ ভোট পেয়ে ৬৪.৩৩ শতাংশ আসনে জয়ী হয়েছিল। এ সময় জাতীয় পার্টি ৭.২২ শতাংশ ভোট পেয়ে ৪.৬৬ শতাংশ আর জামায়াতে ইসলামী ৪.২৮ শতাংশ ভোট পেয়ে ৫.৬৬ শতাংশ আসনে জয়ী হয়।

এই ভোট ও আসন প্রাপ্তির বৈসাদৃশ্যের কারণ হলো, নির্বাচনপদ্ধতির ত্রুটি। জোট গঠনের মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো কৌশলে নিজস্ব ভোটের সাথে অল্প ভোট যোগ করা গেলেই ফলাফলে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে যায়। কিন্তু এতে শাসনব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়।
বাংলাদেশের নির্বাচনে কার্যকর জনপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে নেপালের মতো দুটোর মিশ্র ব্যবস্থা অথবা ফ্রান্স-ইরানের মতো ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়ার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা দরকার। উভয় ব্যবস্থায় দলভিত্তিক আনুপাতিক ব্যবস্থার মতো যত ভোট পাবে, তত আসন নিশ্চিত করা যাবে না। তবে একটি ভারসাম্য অন্তত নিশ্চিত হবে।

গণতন্ত্র চর্চা নিয়ে বাংলাদেশ যে সঙ্কটে পড়েছে, তাতে সাংবিধানিক সংস্কার অনস্বীকার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোতে ইস্যু ছিল প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদে প্রতিনিধিত্ব না থাকা। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোট ছাড়াই সংসদ গঠনের। এই সংসদে ১৫৪ জন বা ৫১ শতাংশ এমপি নির্বাচিত হয়েছেন ভোট ছাড়া। আগের দৃষ্টান্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা যায়; কিন্তু শেষোক্ত উদাহরণ গণতান্ত্রিক বিশ্বে ডাইনোসরের মতোই বিরল। বাংলাদেশে এ ধরনের অরাজক ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এখানে দলানুপাতিক বা নেপালের মতো মিশ্র নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে, নয়তো ৫০ শতাংশ ভোট প্রাপ্তি জয়ী হওয়ার জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে। তা হলেই শাসনে জনপ্রতিনিধিত্ব যথাযথভাবে নিশ্চিত হবে।

স্থিতি নিশ্চিত করতে এর বাইরে নেপাল এককেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে যে যুক্তরাষ্ট্রীয় তথা প্রাদেশিক ব্যবস্থায় গেছে, সেটি বাংলাদেশের জন্য বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। নেপাল বা মালয়েশিয়ায় তিন কোটির মতো জনসংখ্যার দেশকে যথাক্রমে সাতটি ও ১৩টি প্রদেশে ভাগ করা হয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষকে পাঁচ-ছয়টি প্রদেশে ভাগ করে শাসনব্যবস্থায় বিকেন্দ্রীকরণ বাস্তবসম্মত বলে অনেকে মনে করেন।

প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানে প্রাদেশিক ব্যবস্থা থাকায় কেন্দ্রে এক সরকার আর প্রদেশে ভিন্ন সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেখা যায় সাধারণভাবে। এর ফলে ক্ষমতায় এক ধরনের ভারসাম্য বজায় থাকে। একতরফা দলীয় নিপীড়ন এই ব্যবস্থায় সম্ভব হয় না। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দল চাইছে তাদের ছক অনুসারে আরেকটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে। অন্য দিকে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অভিন্ন জোট গঠন করে মুক্ত, অবাধ ও অংশীদারিত্বমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে চাইছে। এ ধরনের নির্বাচনে বিরোধী পক্ষের বিজয় হবে বলে তাদের ধারণা। বিপরীতমুখী এ দুই ইচ্ছার কারণে রাজপথের সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ধরনের সঙ্ঘাত কোনো পক্ষের জন্য শেষ পর্যন্ত কল্যাণকর হতে পারে না।

তাই সময় এসেছে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে নির্বাচন ও শাসনব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার আনার। প্রয়োজন হলে, এ ব্যাপারে একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার অধীনে গণভোটের আয়োজন করে সংস্কার কার্যকর করা যেতে পারে। এ ব্যবস্থা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে একটি সময় পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারে। এ বিশেষ সময়ের বৈধতা দেয়া যেতে পারে সাংবিধানিক ঘটনা-উত্তর। তা না হলে মারাত্মক রাজনৈতিক সঙ্ঘাতে পড়ে রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক ভেঙে পড়তে পারে। এর একপর্যায়ে রাষ্ট্রের কার্যকর সার্বভৌমত্বও বিপন্ন হওয়া অসম্ভব নয়।
mrkmmb@gmail.com


আরো সংবাদ