১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

খবরগুলো পড়তে ভালো লাগে না

-

বাংলাদেশকে নিয়ে পরিবেশিত খবরগুলো মন খারাপ করে দিচ্ছে। দেশের নাগরিক হিসেবে এই খবর পড়তে কিংবা শুনতে অনেকের ভালো লাগছে না। কারণ খবরগুলো সুখবর নয়, স্রেফ মন্দ খবর। গত ৯ জানুয়ারি বিবিসি খবর দিয়েছে, ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্সের গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় নেই বাংলাদেশ। খবরটিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) এক রিপোর্টে বলেছে, বাংলাদেশের স্থান এখন স্বৈরতান্ত্রিক এবং ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক অবস্থার মাঝামাঝি ‘হাইব্রিড রেজিম’ তালিকায়। গণতন্ত্র সূচক পরিমাপ করতে ইআইইউ পাঁচটি মানদণ্ড ব্যবহার করে থাকে। এগুলো হচ্ছে- নির্বাচনী ব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান, নাগরিক অধিকার, সরকারে সক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। প্রতিটি মানদণ্ডকে ০ থেকে ১০ স্কোরের মধ্যে হিসাব করে গড় করা হয়। প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে দেশগুলোকে ভাগ করা হয় চারটি স্তরে- স্বৈরতন্ত্র, হাইব্রিড রেজিম, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র এবং পূর্ণ গণতন্ত্র। এর মধ্যে পূর্ণ গণতন্ত্র ৯-১০ স্কোর, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র ৭-৮ স্কোর, ‘হাইব্রিড রেজিম’ ৫-৬ স্কোর এবং স্বৈরতন্ত্র ০-৪ স্কোর। বাংলাদেশ পেয়েছে ৫.৫৭ স্কোর।

এর আগে, গত বছর ২২ মার্চ বিবিসির আরেকটি খবরে বলা হয়েছিল, জার্মান একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলেছে, বাংলাদেশ এখন স্বৈরশাসনের অধীন এবং সেখানে গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানদণ্ড পর্যন্ত মানা হচ্ছে না। জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান বেরটেলসম্যান স্টিফটুং তাদের ওই রিপোর্টে বলেছিল, ১২৯টি দেশের মধ্যে ৫৮টি দেশ এখন স্বৈরশাসনের অধীনে। এই দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮০ নম্বরে। তাদের মতে, নতুন যে পাঁচটি দেশ ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। অন্যগুলো হচ্ছে- লেবানন, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া ও উগান্ডা। এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান ২০০৬ সাল থেকে নিয়মিত এ ধরনের রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে। নতুন এসব দেশের তালিকা প্রকাশের জন্য ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি সমীক্ষা চালায়।

গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়ে গেল। মানুষ আশা করেছিল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে এবং নির্বাচনে জনগণ তাদের ভোটাধিকার স্বাধীন ও নির্বিঘেœ প্রয়োগ করবে। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে মানুষ এখন হতাশ। খুশির বদলে মানুষ কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেছেন, নির্বাচন কমিশন এবার সাংবিধানিক দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করেছে।’ তার মতে, এবারের নির্বাচনের মতো নাকি সুন্দর সমন্বয় ও শৃঙ্খলা আগে কখনো হয়নি। সামনের নির্বাচনগুলোতেও এমন শৃঙ্খলা ধরে রাখা হবে বলে তিনি জানিয়ে দেন। প্রতিদিনই নির্বাচন নিয়ে যেসব খবর বের হচ্ছে, তাতে এইচ টি ইমামের বক্তব্য অনুযায়ী, সেটা কি সুন্দর নির্বাচন এবং শৃঙ্খলার কথা প্রমাণ করে? নিশ্চয়ই নয়। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি) ১৫ জানুয়ারি নির্বাচন নিয়ে তাদের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

এ সম্পর্কে বিবিসির খবরে বলা হয়, বাংলাদেশের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ৫০টি আসনের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর সমীক্ষার ফলাফলে ৪৭টিতেই অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে টিআইবি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিবিসিকে বলেছেন, এটা তাদের প্রাথমিক রিপোর্ট। এ সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণের পেছনে যথাযথ তথ্যপ্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে। নির্বাচনী আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘনে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং এ ধরনের অভূতপূর্ব নির্বাচন হয়েছে। ফলে এই নির্বাচন দেশের মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। বড় কী কী অনিয়ম তারা দেখেছেন- বিবিসির এ প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান একটি তালিকা তুলে ধরেন। এগুলো হচ্ছে- নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল দেয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে, প্রতিপক্ষের এজেন্টদের কেন্দ্রে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হয়নি, অনেক ভোটার ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারেননি, বুথ দখল করে প্রকাশ্যে সিল মারার দৃষ্টান্ত আছে, জোর করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে, ভোট শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট পেপার ‘শেষ’ হয়ে যায়, গণমাধ্যমের জন্য অভূতপূর্ব কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল, নির্বাচন কমিশন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারেনি এবং পুলিশ ও প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে দমন করার ব্যাপারে সরকারের সাথে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

আর নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই বলেও টিআইবির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। প্রথম আলোর রিপোর্টে বলা হয়, টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি সুলতানা কামাল বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এবং পরিচালনায় অনেক ত্রুটি ছিল বলে তাদের গবেষণায় তথ্য পাওয়া গেছে। টিআইবি ৫০টি আসন এবং এসব আসনের ১০৭ জন প্রার্থীর ওপর গবেষণা চালাচ্ছে। ৩০০ আসনের মধ্যে দৈবচয়নের ভিত্তিতে এই ৫০টি আসন ঠিক করা হয়েছে। এই ৫০টি আসনের মধ্যে ভোটের আগের রাতে ৩৩টি আসনেই ব্যালটে সিল মেরে রাখা হয়েছিল। বুথ দখল করে প্রকাশ্যে জাল ভোট দেয়া হলো ৩০টি আসনে। ২৬টি আসনে ভোট দিতে বাধা দেয়া হয়। নির্বাচনের দিন ৪৭টি আসনে কোনো-না-কোনো নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে টিআইবি। ওই ৫০টির মধ্যে ৪১টি আসনেই জাল ভোট দেয়া হয়েছে।

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনকে ‘ভোট ডাকাতির নির্বাচন’ হিসেবে উল্লেখ করে এটা প্রত্যাখ্যান এবং নতুন নির্বাচন দাবি করেছে। তারা প্রতিটি আসনের নির্বাচনের ফলাফলের বিবরণ চেয়েছেন এবং প্রার্থীরা নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, এ সরকারের অধীনে দলটি আর নির্বাচনে যাবে না। উপজেলা নির্বাচনেও অংশ নেবে না। বাম গণতান্ত্রিক জোট ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ১১ জানুয়ারি ‘গণশুনানির’ আয়োজন করেছিল। দিনব্যাপী এই শুনানিতে ৮২ জন প্রার্থী নিজেদের অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ তুলে ধরেন। পত্র-পত্রিকা রিপোর্টে বলা হয়, প্রার্থীদের অনেকেই বলেছেন, এটি ছিল এক কলঙ্কিত নির্বাচন। ১৩১টি আসনে বাম গণতান্ত্রিক জোটের ১৪৭ জন প্রার্থী ছিলেন। তাদের অভিযোগ, পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা, প্রশাসন মিলে ‘ভুয়া ভোটের মেগা প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করেছে। নির্বাচনের আগের দিন রাতেই কেন্দ্রভেদে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোট সিল মেরে ব্যালট বক্স ভরে ফেলা হয়।

বাম নেতা জোনায়েদ সাকি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এর মতো কলঙ্কজনক নির্বাচন আর হয়নি। ভোটের দিন নির্বাচনী এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেয়া হয়। কেন্দ্রে ভোটার না থাকলেও ব্যালট বাক্স ভোটে ভরা ছিল। ইসলামী আন্দোলন ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। ১৬ জানুয়ারি সমাবেশ করে তারা নতুন নির্বাচন দাবি করে বলেছেন, নির্বাচনে আমাদের ধোঁকা দেয়া হয়েছে। এ নির্বাচন ছিল সরকারের পাতানো খেলা। ভোটের আগের রাতেই ভোটকেন্দ্রে ৪০-৬০ শতাংশ ভোট কেটে নিয়েছে সরকার। ভোটের দিন ১০টা থেকে কেন্দ্র দখল করে আমাদের এজেন্টদের বের করে দিয়ে একতরফা নৌকায় সিল মারা হয়েছে।

নির্বাচনের দিন ৩০ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে বিবিসির সাংবাদিক শাহনেওয়াজ রকি একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এর শিরোনাম ছিলÑ ‘চট্টগ্রামে বিবিসি সংবাদদাতার ক্যামেরায় যেভাবে ধরা পড়ল ভোটের আগেই পূর্ণ ব্যালট বাক্স।’ এতে শাহনেওয়াজ যে বর্ণনা দেন, তা হলো : ‘‘৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সময় সকাল সোয়া ৭টা থেকে পৌনে ৮টা। চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের গেটের বাইরে ভোটার এবং রাজনৈতিক কর্মীদের ভিড়। এমন দৃশ্য বাংলাদেশ মহিলা সমিতি উচ্চবিদ্যালয়, নাসিরাবাদ বয়েজ হাইস্কুল, লালখান বাজারের শহীদ নগর সিটি করপোরেশন বালিকা বিদ্যালয়সহ সব কেন্দ্রের সামনে ছিল। সকাল সকাল ভোট দিয়ে বাড়ি যাবেন; লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হবে না অথবা প্রাতঃভ্রমণে বের হয়েছেন, ভোট দিয়ে একবারে বাসায় যাবেন- এই ভেবে চট্টগ্রামের অনেক কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শুরুর আগেই ভোটাররা জড়ো হয়েছেন। অথচ ভোট গ্রহণ শুরু হতে তখনো খানিকটা দেরি আছে। সকাল ৭টা ৫২ মিনিটের দিকে লালখান বাজার এলাকায় যাই। বিভিন্ন কেন্দ্রের সামনে দেখা ভিড়ের তুলনায় চট্টগ্রাম-১০ আসনের শহীদ নগর সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে লোকজনের জটলা বেশি মনে হওয়ায় অনেকটা উৎসুক হয়েই ওই কেন্দ্রের সামনে যাই ভোটকেন্দ্রে আসা লোকজনের সাথে কথা বলব বলে। যেহেতু এখনো ভোট গ্রহণ শুরু হয়নি, তাই ক্যামেরা, মাইক্রোফোন এসব গাড়িতে রেখে শুধু মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে বের হই। গলায় নির্বাচন কমিশন থেকে দেয়া পরিচয়পত্রটিও ছিল, যা দেখিয়ে আমি ভোটকেন্দ্রের ভেতর সংবাদ সংগ্রহের জন্য যেতে পারি।

গাড়ি থেকে নেমে দেখি, ভোটাররা স্কুলের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন আর রাজনৈতিক দলের কর্মীরা ভেতরে-বাইরে আসা-যাওয়া করছেন। গেটের দিকে যেতেই তারা আমার জন্য গেট খুলে দেন। তারা ধরে নিয়েছেন, আমিও হয়তো রাজনৈতিক দলের কর্মী। সময় সকাল ৭টা ৫৪ মিনিট। যেহেতু কয়েক মিনিট পরই ভোট গ্রহণ শুরু হবে, তাই ব্যালট বাক্সগুলো বিভিন্ন বুথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু অবাক হয়ে দেখি, সবগুলোই ভর্তি! দোতলায় প্রিজাইডিং অফিসারের কক্ষে গিয়েও সেখানে ব্যালট বাক্স ভর্তি দেখতে পাই। তাই বিবিসির জন্য মোবাইল ফোনেই ছবি ও ভিডিও ধারণ করি। প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে জানতে চাই, ভোটের আগে ব্যালট বাক্স ভর্তি কেন? তিনি এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে পারবেন না বলে জানান। এমনকি কিভাবে এসব ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হলো, তা-ও তিনি জানেন না বলে জানান। ওই সময় কেন্দ্রের ভেতরে থাকা রাজনৈতিক দলের কর্মীরা বুঝতে পারেন যে, তারা কোনো দলের কর্মীকে নয়, বরং না জেনে বিবিসির একজন সংবাদদাতাকে তাদের কর্মী ভেবে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দিয়েছেন। এরপরই তারা আমাকে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে যেতে বলেন।’’

শাহনেওয়াজ রকির ভাগ্য ভালো, ‘রাজনৈতিক কর্মী’রা কেন্দ্র থেকে তাকে বের করে দিয়েছে এবং তার মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেয়নি। ঢাকায় কিন্তু সাংবাদিকেরা রেহাই পাননি। তিনজন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন। দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার কাফি কামাল ও ফটো সাংবাদিক জীবন আহমেদ এবং ডেইলি স্টারের ফটো সাংবাদিক তাহসিন শুধু মারই খাননি, দুর্বৃত্তরা তাদের মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়। মগবাজারে নিজের কেন্দ্রে ভোট দিতে এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কাফি কামাল হামলার শিকার হন। বিটিসিএল স্কুল কেন্দ্রের সামনে দুইজন ভোটারকে মারধর করার সময় ছবি তুলতে গেলে কাফির ওপর হামলা করা হয়েছে। সাংবাদিক পরিচয় দিয়েও রেহাই পাননি। তার আইফোনটিও হামলাকারীরা নিয়ে যায়। কাফি কামালের বাম চোখের ওপরে মারাত্মক জখম হয়েছে। সেখানে চারটি সেলাই দিতে হয়েছে। এখনো তিনি স্বাভাবিক হননি। ফটো সাংবাদিক জীবন আহমদের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং তাকে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল। শাজাহানপুরে হামলা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়ার শিকার হন ডেইলি স্টারের ফটো সাংবাদিক তাহসিন।

৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে দ্য ফ্রাইডে টাইমসে একটি নিবন্ধ লিখেছেন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং যুক্তরাষ্ট্র উইলসন সেন্টারের সিনিয়র স্কলার উইলিয়াম বি মাইলাম। তার এই নিবন্ধ থেকে দৈনিক ইনকিলাবসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। মাইলাম বলেন, “সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর পৃথিবীর গণতান্ত্রিক ইতিহাসের নিকৃষ্ট নির্বাচন হলো বাংলাদেশের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন; আর যারা নিজেদের সরকার বলে দাবি করছেন, তারা ‘অবৈধ’।’’ এ নির্বাচনে ৯৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ ফলাফল নিজের পক্ষে ভাগিয়ে নিতে ‘ভোট চুরির সব নোংরা কৌশল’ প্রয়োগ করা হয়েছে বলেও লেখায় উল্লেখ করা হয়।

নিউ ইয়র্ক টাইমস তার সম্পাদকীয়তে ‘শেখ হাসিনা এমন নির্বাচন না করলেও পারতেন’ বলে মন্তব্য করেছে। এতে বলা হয়, জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টিতেই জয় পেয়েছে তার দল। শতকরা ৯৬ ভাগ জয় পাওয়া এক অসম্ভব ব্যাপার! দিল্লির অন্যতম প্রধান দু’টি থিংকট্যাংক বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন এবং অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষক ও বিশ্লেষকেরা ১৬ জানুয়ারি বিবিসিকে বলেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হয়নি এবং এর ফলাফলও যে অবিশ্বাস্য, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। এ নির্বাচনে কারচুপি না হলেও বিরোধীরা কম আসন পেতেন, কিন্তু এর সংখ্যা মাত্র সাত হতো না। বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো শ্রীরাধা দত্ত বলছেন, বাংলাদেশ বিরোধী জোট হয়তো এমনিতেও ক্ষমতায় আসতে পারত না, কিন্তু নির্বাচনে কারচুপির কারণেই তাদের আসন সংখ্যা এত কম হয়েছে।’

নির্বাচন নিয়ে যখন এসব খবর পড়ছি, তখন প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি খবরে বিস্মিত না হয়ে পারছি না। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন পরিচালনার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে পুলিশ সদর দফতর থেকে পুলিশ সুপারদের (এসপি) চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে নির্বাচন ‘সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন’ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়েছে, এমপিরা তাদের ওপর অর্পিত গুরুদায়িত্ব ‘সুষ্ঠু পরিকল্পনার দ্বারা’ পালনে সক্ষম হয়েছেন।

নতুন সরকারের সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ১০ জানুয়ারি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে সড়ক ও পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরানোর কৌশল কী হবে, সে সম্পর্কে আলাপ করেন। এ সময় তিনি বলেন, প্রথম রাতেই বিড়াল মারতে চাই। তার এই মন্তব্য পড়ে অনেকে বলেছেন, ৩০ ডিসেম্বর ভোটের আগের রাতেই তারা বিড়াল মেরে ফেলেছেন। দেশের স্বার্থ নাগরিকদেরও স্বার্থ। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ এমন বদনাম কুড়াবে, এটা কেউ আশা করে না। নাগরিকেরা দেশের ভালো চান, দেশের সুখবর চান এবং একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবে সেটাই চান। সেই ভালো খবরই আমরা পড়তে চাই।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাতীয় প্রেস ক্লাব


আরো সংবাদ