২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ডেল্টা প্লানের সংশোধন অপরিহার্য

-

গত ১১-১২ জানুয়ারি ঢাকায় ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়, ৪১টি সংগঠন ও দেশের প্রতিনিধিরা মিলিত হয়েছিলেন ‘কনফারেন্স অন ডেল্টা প্লান ২১০০ অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক একটি সম্মেলনে। এই সম্মেলন থেকে তারা একটি ৪০ দফা প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বিইএন) ঢাকাস্থ রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে ৪০ দফা প্রস্তাব প্রকাশ করে গত ২৮ জানুয়ারি।

এই পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞরা তাদের এসব প্রস্তাবে দাবি করেন, ‘বাংলাদেশে ডেল্টা প্লান ২১০০’ (বিডিপি ২১০০) অধিকতর সংশোধন না করা হলে এ পরিকল্পনার মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন সফল হবে না। যদিও তারা বিডিপি ২১০০-কে স্বাগত জানিয়েছেন, তবে তারা মনে করেন এই পরিকল্পনায় অনেক দুর্বলতা বিদ্যমান রয়েছে। এই প্রস্তাবে বলা হয়Ñ এটি অবাক বিস্ময়ের ব্যাপার যে, এ পরিকল্পনার অধীন ১২৩টি প্রকল্পের মধ্যে ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০১৮-২০৩০ সময় পরিধির মধ্যে। এই সময় নির্ধারণ করেছে বাস্তবায়ন অ্যাজেন্সিগুলোর একটি গোষ্ঠী।

সংবাদ সম্মেলনে বাপা সাধারণ সম্পাদক আবদুল মজিদ বলেছেন, আমরা সরকারের পরিকল্পনার সাথে দ্বিমত পোষণ করি না। তবে এই পরিকল্পনা অসম্পূর্ণতা, ত্রুটি-বিচ্যুতি ও সীমাবদ্ধতাগুলো সারানোর কথা বলছি। যদি বাস্তবায়ন অ্যাজেন্সিগুলোর দেয়া তালিকাই বাস্তবায়নের জন্য গৃহীত হয়, তবে এ পরিকল্পনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তারা এই পরিকল্পনাটি আবারো যাচাই-বাছাই করার আহ্বান জানান সরকারের প্রতি।

অপর দিকে উল্লিখিত সম্মেলনে ‘ন্যাশনাল রিভার কনজারভেশন কমিশন’-এর চেয়ারম্যান অভিযোগ করেছেন, এই ডেল্টা প্লান তৈরি করা হয়েছে পর্যাপ্ত সমীক্ষা ও পরামর্শ না করেই। গত মধ্য জানুয়ারিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এ আভিযোগ করেন। তিনি আরো বলেছেন, এই মেগা প্রকল্পের লক্ষ্য যদি হয়ে থাকে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা ও বন্যা মোকাবেলা নিশ্চিত করা, তবে প্রত্যাশিত এই লক্ষ্য অর্জিত হবে কি না, সে ব্যাপারে তিনি সন্দিহান। তার অভিযোগ, এই পরিকল্পনাটি গৃহীত হয়নি এর সাথে সংশ্লিষ্ট লোকদের সাথে পরামর্শ করে, যদিও এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী এই প্রকল্প অনুমোদন করেছেন।

এদিকে একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনে জানা যায়- অনেক ভূতত্ত্ববিদ ও পানি বিজ্ঞানীও এই প্রকল্পের নানা দিক নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। তারা বলছেন, বাংলাদেশের এই ডেল্টা পরিকল্পনা প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। এর ফলে দেশের উপকূল অঞ্চলে পরিবেশ-প্রতিবেশসংশ্লিষ্ট ভারসাম্য বিনষ্ট হতে পারে। কারণ, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে উপকূল অঞ্চলে পানি ও পলির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এমনটি মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের লক হেভেন ইউনিভার্সিটির জিওলজির অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান। মোটামুটিভাবে ধরে নেয়া যায়, এই প্রকল্পটি নিয়ে চার পাশের বিভিন্ন মহল থেকে বিপ্রতীপ কিছু সমালোচনা আসছে, যদিও তারা বলছেন না এই পরিকল্পনা বাদ দিতে হবে। তবে তাদের দাবি হচ্ছে, এই পরিকল্পনার ব্যাপারে আরো পর্যালোচনা দরকার। পর্যালোচনা শেষে এর ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন দরকার। না হলে এই প্রকল্প দেশের জন্য পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পর্কিত বড় ধরনের ক্ষতি বয়ে আনতে পারে।

উল্লেখ্য, এই পরিকল্পনার আওতায় সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে তিন হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার প্রত্যাশা করছে, উপকূলে খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং মোকাবেলা করবে প্রাকৃতিক দুর্যোগও। সরকার এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে নেদারল্যান্ডস সরকারের সহায়তায়। বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি গত বছরের সেপ্টেম্বরে ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্লান ২১০০’ শীর্ষক পরিকল্পনা অনুমোদন করে। পরিকল্পনা কমিশনের মতে, তিন স্তরে আগামী ১০০ বছরে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে। আর মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে ২০৫০ ও ২১০০ সালের মধ্যে।

এই পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে এর পানিসম্পদ সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে ছয়টি হট স্পটে বিভক্ত করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায়, এসব হট স্পটে ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। এই হট স্পটগুলো হচ্ছে : উপকূলীয় অঞ্চল, বরেন্দ্র অঞ্চল ও খরাপীড়িত অঞ্চল, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকা, প্রধান প্রধান নদী ও সংলগ্ন এলাকা, শহুরে এলাকা এবং চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল।

এই ডেল্টা পরিকল্পনার উল্লেখযোগ্য দিক হলো- উপকূল সম্পর্কিত সব খাত ও নীতিমালার সমন্বয় সাধান করে ‘ডেল্টা ভিশনে’ অন্তর্ভুক্ত করা হবে, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায়। এটি পরিবর্তন আনবে খাতবিশেষের প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনায়। তা কার্যত পরিণত হবে বহুপাক্ষিক সমন্বিত উদ্যোগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি ব্যবস্থাপনায়। এই প্রকল্প সরকারকে পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেয়ায় সক্ষম করে তুলবে। তখন বাংলাদেশ আরো কার্যকরভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করতে পারবে। বলা হচ্ছে, ডেল্টা প্লান সরকারকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জোরদার করবে অধিকতর কৌশলী ও জ্ঞানভিত্তিক ও অব্যাহত উপায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম করে তুলবে। এই পরিকল্পনা বিভিন্ন সরকারি বিভাগে ও বেসরকারি স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে তহবিলায়ন প্রক্রিয়ায় সমন্বয় সাধন জোরদার করবে। এর ফল সীমিত তহবিল ও বিনিয়োগ কার্যকরভাবে সম্ভব হবে। আরো বলা হয়েছ- ডেল্টা প্লান কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও প্রতিবেশ সম্পর্কিত বিষয়, শহরায়ন, পর্যটন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য বিধানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

এই পরিকল্পনা যেসব উপকার বয়ে আনবে, বলা হচ্ছে তার মধ্যে আছে- সীমিত সম্পদ দিয়ে সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়াবলি সমন্বিত উপায়ে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে পারবে। এটি হচ্ছে ভবিষ্যৎ বদ্বীপের জন্য একটি পরিকল্পনা, যা নিশ্চিত করবে পানি, খাদ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নিরাপত্তা।

অনেকেই মনে করেন এগুলো হচ্ছে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। যেসব নিরাপত্তার কথা বলা হচ্ছে তাও সঠিক নয়। এই পকিল্পনা বিষয়ে বিজ্ঞানী, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতর্কের আয়োজন করা উচিত। সমালোচকদের মতে, এই পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে নেদারল্যান্ডসের লোক দিয়ে। নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশের ভৌগোলিক প্রকৃতি এক নয়। প্রশ্ন আছে, নেদারল্যান্ডসের লোকেরা বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান কতটুকু বোঝেন, তা নিয়ে। অতএব এ কারণেই তাদের পরামর্শে প্রণীত ডেল্টা পরিকল্পনা সফলতা পাবে না।

অধ্যাপক খালিকুজ্জামান জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূল অঞ্চলকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য নতুন পোল্ডার (সমুদ্র থেকে উদ্ধার কার নিচু জমি) নির্মাণের পাশাপাশি পুরনো পোল্ডার শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পোল্ডার হচ্ছে বদ্বীপ ভূমি গঠনের জন্য একটি হুমকি। তার ব্যাখ্যা মতে, প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টির অর্থ হচ্ছে পলিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা। আর বদ্বীপ গঠনের মৌলিক প্রক্রিয়া হচ্ছে এই পলিপ্রবাহ। তিনি মনে করেন- বিগত ১১ হাজার বছর ধরে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ডেল্টা সমুদ্রের দিকে গড়ে উঠতে পেরেছে পলিপ্রবাহের মাধ্যমে, একে সমুদ্রের পানির উচ্চতার উপরে রাখার কারণে। ১৭৮০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে বদ্বীপের পূর্বাঞ্চলের তটরেখা ৫০ মাইল এগিয়ে গেছে। কিন্তু পোল্ডার এই প্রাকৃতিকভাবে পলি পড়াকে বাধাগ্রস্ত করবে।

তিনি আরো বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে পোল্ডার-সুরক্ষিত এলাকা এর বাইরের এলাকার তুলনায় ইতোমধ্যেই এক থেকে দেড় মিটার নিচে চলে গেছে। কারণ, পোল্ডারের বাইরের এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে পলি পড়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল। পোল্ডার সংরক্ষিত এলাকা পরিণত হচ্ছে একটি বাওলে। পোল্ডার বা সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা নিচু জমি ভাঙনের মুখে পড়লে পোল্ডার সংরক্ষিত এলাকার মানুষ প্লাবনে দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগের শিকার হয়। কারণ, পোল্ডার সংরক্ষিত এলাকা থেকে পানি সেচে সহজেই বের করা সম্ভব হয় না।

ডেল্টা পরিকল্পনায় প্রস্তাব করা হয়েছে উড়িরচরে উপকূল বরাবর ভূমি সংযোজনের জন্য মেঘনায় ক্রস-ড্যাম নির্মাণের। অধ্যাপক খালিকের অভিমত, যখন কৃত্রিম ভূমি সংযোজনের জন্য একটি নদী যখন ব্লক করে দেয়া হয়, তখন এটি সৃষ্টি করে নতুন পরিবেশ পরিস্থিতি। প্রস্তাবিত এই ক্রস-ড্যাম মেঘনার স্রোতপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করবে। আর এর সাথে সংশ্লিষ্ট রয়েছে জলজ প্রাণীর জীবনচক্র। যে জায়গাটিতে এই ড্যাম নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, সেটি হচ্ছে ডিম পাড়ার সময়ে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র। এই ড্যামের মাধ্যমে নতুন ভূমি ভেসে উঠবে সত্য, তবে এর ফলে উপকূল অঞ্চলের পুরো প্রতিবেশব্যবস্থা বিনষ্ট হয়ে যাবে। তখন মানুষ ও তার জীবনযাপনের ওপর ক্রস-ড্যামের সম্ভাব্য প্রভাব আবিষ্কার করতে হবে এমন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে, যে সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না।

গঙ্গার (যা বাংলাদেশে পদ্মা ও যমুনা নামে প্রবাহিত) মতো প্রধান প্রধান নদীতে ব্যারাজ বা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে ডেল্টা প্লানের মাধ্যমে। সরকার আরো বলছে, পরিকল্পনা আছে যমুনাকে সরু করার এবং নদীতীর কংক্রিট দিয়ে বাঁধানোর। অধ্যাপক খালিকের মতে, গঙ্গা নদীতে আরেকটি বাঁধ নির্মাণের কোনো প্রয়োজন নেই। পদ্মায় পানিপ্রবাহ এরই মধ্যে অনেক কমে গেছে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর থেকে, যার মাধ্যমে পদ্মাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। ফারাক্কা বাঁধের ফলে পদ্মা নদীসহ বাংলাদেশের অনেক নদীর বুকে পলি জমে চর জেগে নদীর নাব্যতা হারিয়েছে। অনেক নদী খাল বিল এরই মধ্যে অস্তিত্ব হারিয়েছে। বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলেই এখন বলতে শোনা যায় ‘এই খানে এক নদী ছিল’। এই অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের নদীমাতৃক বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে পরিণত হবে মরা নদীর দেশে। আর নদীগুলো মরে যাওয়ার ফলে এর পরিবেশিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতিকর প্রভাব হবে অপরিসীম। এখন ডেল্টা পরিকল্পনার আওতায় পদ্মার ওপর ড্যাম তৈরি করলে বাংলাদেশের ওপর ফারাক্কার নেতিবাচক প্রভাব দ্বিগুণে পৌঁছবে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বাংলাদেশের আরো ভেতরের দিকে প্রবেশ করবে। এতে করে ফসল উৎপাদন ও বিশুদ্ধ পানির নিরাপত্তা বিনষ্ট হবে।

এই ডেল্টা পরিকল্পনার আওতায় হাওর এলাকায় আরো বাঁধ ও মহাসড়ক নির্মাণের কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। এর ফলে এ এলাকায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে গবেষণা কাজে আরো ব্যাপক বিনিয়োগ। এসব গবেষণার মাধ্যমে জানা যাবে, হাওর এলাকার ধরন পাল্টানো হলে বন্যার আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার কী করে উন্নত করা যায়। ‘জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ’-এর পরিচালক আবদুল বাকি খান মজলিশ বলেন, প্রকৃতির বিরুদ্ধে না যাওয়াটাই হবে জ্ঞানের কাজ। প্রকৃতির সাথে মানিয়ে চলাটাই উত্তম হবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে ব্যাপক পানি নিষ্কাশন-প্রবাহ ব্যবস্থার ওপর। অবকাঠামো তৈরি করে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সব সময় সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যেসব নদী প্রবাহিত হয়েছে, এগুলো এতটাই প্রবল যে, এগুলো বাধা ঠেলে তাদের প্রবাহের পথ করে নেবে। কৃত্রিমভাবে ভূমি সংযোজনের ফলে নদীর প্রশস্ততা কমে আসবে। তখন অনেক স্থানে নদীভাঙন বেড়ে যাবে। উড়িরচরের বাঁধের কারণে সন্দীপ আংশিক কিংবা পুরোপুরি নদীভাঙনের কবলে পড়তে পারে। আমাদের জানা উচিত, প্রকৃতি নিয়ে আমরা কতদূর পর্যন্ত ইচ্ছেমতো খেলতে পারি। প্রকৃতি নিয়ে খেলার নিশ্চয় একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা বিশ্বের দিকে তাকালে দেখতে পাবো বাঁধের কারণে অনেক দেশে ধ্বংসাত্মক বন্যার প্রকোপ বেড়ে গেছে। প্রাকৃতিক বন্যার ফলে অনেক এলাকা শুধু পানিতে তলিয়ে যায়। এ ধরনের বন্যা তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতি করে। কিন্তু বাঁধ ভেঙে সৃষ্টি হওয়া বন্যায় বাড়িঘরসহ সবকিছু ভাসিয়ে নেয়। এর ফলে জান-মালের ক্ষতির পরিমাণ অনেক গুণ বেড়ে যায়। গত মাসে ব্রাজিলে বাঁধ ভেঙে যে বন্যা হয়েছে, তা কয়েক শ’ মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এদের অনেকেই মারা গেছেন। অতএব ডেল্টা পরিকল্পনা বাঁধ নির্মাণের বিকল্প ভাবতে হবে বৈকি!

পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেছেন, প্রাযুক্তিকভাবে এই ডেল্টা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আমাদের বিদ্যমান প্রযুক্তি যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে। উল্লেখ্য, এই বিশেষজ্ঞকে বাংলাদেশ সরকার আরো অনেকের সাথে কাজে লাগিয়েছেন এই পরিকল্পনা সূত্রায়নে। যেসব উন্নত দেশ ব্যারাজ ও ড্যাম নির্মাণ করে যেসব উন্নত দেশ সাফল্যের সাথে এগুলো ব্যবস্থাপনা করছে, সেসব দেশের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, এগুলো সঠিকমতো পরিচালনা করা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তা ছাড়া এমনটিও বলা হচ্ছে, এই ডেল্টা প্লান টেকসই
উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন হচ্ছে, এই ডেল্টা পরিকল্পনা নিয়ে এখন আমাদের করণীয় কী হবে? বিশেষজ্ঞরা যেসব প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছেন, সে মতে আমাদের করণীয় হবে উপকূল ব্যবস্থাপনায় কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা থেকে সরে আসা। বাংলাদেশ আরো ১৯৪টি দেশের সাথে কাজ করে যাচ্ছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য। এই লক্ষ্যমাত্রা আগামী ১৫ বছরে বাস্তবায়নের জন্য প্রণয়ন করেছে জাতিসঙ্ঘ। বাংলাদেশের প্রয়োজন এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য জাতীয় সক্ষমতা বাড়িয়ে তোলার ব্যাপারে আত্মনিয়োগ করা।

তাই বাংলাদেশের উচিত হবে বাংলাদেশের ভূমি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা করা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আলোকে। একই সাথে বাংলাদেশের জন্য সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে উজানের দেশের সাথে অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন চুক্তির ওপর জোর দেয়া। উচ্চাকাক্সক্ষী ডেল্টা প্লান গ্রহণের আগে ভেবে দেখা দরকার, শুষ্ক মওসুমে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে না পারলে এই ডেল্টা পরিকল্পনাও সফল হবে না।


আরো সংবাদ