২৬ মার্চ ২০১৯

বাতাসীর মন খারাপ

-

এযাবৎকালে বাতাসীর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে সাকুল্যে দুইবার। প্রথমবার তার সাথে যখন আমার দেখা হলো তখন তার মায়াভরা মুখ, ডাগর ডাগর আঁখি এবং চঞ্চল অভিব্যক্তি আমাকে বিমোহিত করল। সবচেয়ে বেশি বিমোহিত হলাম তার মুখের ‘নানা’ ডাক শুনে। কারণ, বাতাসীর আগে কোনো ছোট ছেলেমেয়ে আমাকে কোনোকালে নানা সম্বোধন করেনি। কাজেই তার মুখে নানা ডাক শুনে কিছুটা বিহ্বল হয়ে তাকে কাছে ডেকে নিলাম। সে তার দুরন্ত স্বভাব নিয়ে আমার কাছে এলো এবং নতুন পরিচয়ের জড়তা ত্যাগ করে আমাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল- ওমা, নানা তো মানুষ! আমি বাতাসীর মায়ের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই সে যে কাহিনী বলল, তাতে বাতাসী সম্পর্কে আমার আগ্রহ বহু গুণে বেড়ে গেল।

বাতাসীর মা-বাবা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল তথা আমার নির্বাচনী এলাকার দারিদ্র্যপীড়িত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। তারা উভয়ে অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী মিলে ঢাকার একটি গার্মেন্টে খুবই কম বেতনে চাকরি করে। অন্যান্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মতো তারাও খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছে এবং যথানিয়মে অল্প সময়ের মধ্যে পিতা-মাতা হয়ে গেছে। আমি বাতাসীর দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, মেয়েটির বয়স ছয় কিংবা সাত বছরের বেশি হবে না। অন্য দিকে, তার বাবা-মায়ের বয়স বাইশ কিংবা বড়জোর তেইশ বছর হবে। তারা আমাকে ‘চাচা’ সম্বোধন করে বিধায় বাতাসী বুদ্ধি করে আমাকে ‘নানা’ সম্বোধন করে বসেছে। একাদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বাতাসীর বাবা-মা গার্মেন্টের চাকরি ছেড়ে দিয়ে গ্রামে এসেছে ‘ভোটের উৎসব’ করার জন্য। তারা যখন দেখা করার জন্য আমার কাছে আসছিল, তখন ছোট্ট বাতাসীও আবদার করে বসল, সে-ও আমাকে দেখবে। তার বাবা-মা তাকে নিবৃত্ত করার জন্য এমপি, ভোট ইত্যাদি হাবিজাবি নানা শব্দে বাতাসীকে অনেক কিছু বোঝাল, যার ফল হলো উল্টো। সে মনে করল- নিশ্চয়ই এমপি অদ্ভুত কিছু হবে। কিন্তু সে আমার কাছে পৌঁছে আমাকে মানুষরূপে দেখে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

বাতাসীর মনের অবস্থা বুঝলাম। তাকে সুখী করার জন্য তার হাতে এক শ’ টাকার একটি নতুন নোট গুঁজে দিতেই সে পরম আনন্দে ফিক করে হেসে দেয় এবং হঠাৎ করেই লজ্জা পাওয়ার ভান করে তার মায়ের আঁচলে মুখ লুকায়। ঘটনাটি ঘটেছিল বিগত ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে যখন আমি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সমগ্র বাংলাদেশের মতো আমার পটুয়াখালী-৩ সংসদীয় আসন তথা গলাচিপা-দশমিনায় উৎসবের বন্যা বইছিল। ১২ ডিসেম্বর যখন নির্বাচনী এলাকায় প্রবেশ করলাম তখন দেখলাম, রাস্তাঘাটে, গ্রামগঞ্জে এবং শহর-বন্দরে মানুষের ঢল নেমেছে। একেকটি পথসভা মানুষের ভারে বিশাল জনসভায় পরিণত হতে থাকে। মানুষের আবেগ-অনুভূতির জবাব দিতে দিতে আমি যখন আমার সে দিনের শেষ গন্তব্য অর্থাৎ গ্রামের বাড়ি পৌঁছলাম, তখন প্রায় মধ্যরাত্রি হয়ে গিয়েছিল। প্রচণ্ড শীত এবং আবহমান গ্রামবাংলার প্রিয় ঘুমকে উপেক্ষা করে তখনো প্রায় ২০ হাজার লোক আমার বাড়ির সামনে ভিড় করছে।

সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ডিসেম্বর মাসের ২০ থেকে ২২ তারিখ পর্যন্ত আমার এলাকায় মানুষের মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা, আবেগ ও অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছিল, তা আমার ক্ষুদ্র জীবনে কোনোকালে দেখিনি। বাতাসীর বাবা-মায়ের মতো অন্তত হাজার পঞ্চাশেক খেটে খাওয়া মানুষ রয়েছে আমার এলাকায়, যারা রুটি-রুজির জন্য দেশের বিভিন্ন শহর-বন্দর, হাটবাজার ও গ্রামগঞ্জে সারা বছর নিদারুণ কষ্টের প্রবাস জীবন কাটায়। তাদের কেউ কেউ ঈদ উপলক্ষে কোনো কোনো বছর এলাকায় আসে এবং অন্যরা হয়তো মাঝে মধ্যে আসে বিয়ে, প্রিয়জনের মৃত্যু কিংবা জায়গাজমি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য। কিন্তু এবারের নির্বাচনী উৎসবে যোগ দেয়ার জন্য তারা সবাই গ্রামে এসেছিল। ফলে পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা-দশমিনার প্রতিটি এলাকা যেকোনো ঈদের চেয়েও বেশি লোকের সমাগমে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। হাটবাজারে বেচাকেনা বেড়ে গিয়েছিল। বাড়িতে বাড়িতে ভোজ উৎসব; চায়ের দোকানে গভীর রাত পর্যন্ত ভোটারদের আড্ডা এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মিছিল-মিটিং দেখে মনে হচ্ছিল, উৎসবের আমেজ ভরা পূর্ণিমা জোছনার আকারে ধরাধামে নেমে এসেছে।

আমি এবারের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বহুবার ভেবেছি, কেন হাজার হাজার প্রান্তিক মানুষ যাদের মধ্যে কেউ কেউ বাতাসীর বাবা-মায়ের মতো ছিল, তারা নিজেদের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ভোটের উৎসবে যোগ দিতে গিয়েছিল! প্রতিটি ঈদে যেভাবে মানুষ লঞ্চ-স্টিমার, রেলগাড়ি ও বাসভর্তি করে অশেষ দুর্ভোগ-দুর্দশা পার হয়ে মাটির টানে এবং শিকড়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে জন্মস্থানে যায়, তার চেয়েও অনেক বেশি মানুষ এবারের সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গ্রামে গিয়েছিল। এসব দরিদ্র মানুষ যদি যাতায়াত ও খানাপিনা বাবদ একেকজনে গড়ে ১০ হাজার টাকাও খরচ করে থাকে, তবে ধরে নেয়া যায়- আমার এলাকার প্রবাসীরা মোট ৫০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। অন্য দিকে, স্থানীয় ভোটার, নেতাকর্মীদের মোট ব্যয় হয়তো শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর খাইখরচার বাইরে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার সাধারণ খেটে খাওয়া ভোটার, কর্মী ও সমর্থকেরা এবারের ভোটে গড়ে দেড় শ’ কোটি টাকা খরচ করেছে। এই হিসাবে সমগ্র বাংলাদেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের ১১ কোটি ভোটার এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল ছোট ছেলেমেয়েরা ভোটের জন্য নিজেদের রক্ত পানি করা সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে।

সাধারণ ভোটাররা তাদের কাক্সিক্ষত ভোট উৎসব পালন করার জন্য স্বেচ্ছায় যে বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করেছে, তা তারা ব্যাংক লুট করে জোগাড় করেনি। কোনো রাষ্ট্রীয় অর্থ তসরুফ, ঘুষ-দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতি করে কিংবা বিদেশী দোসরদের কাছ থেকে পায়নি। নিজেদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা অর্থ তারা খরচ করেছে মনের মতো একজন নেতাকে নিজেদের ভোটে নির্বাচিত করার অভিলাষ নিয়ে। কারণ তারা জানে, জনগণের ভোটে যদি কেউ নির্বাচিত না হয়, জনগণকে সেই তথাকথিত নেতা মূল্যায়ন তো করেনই না- উল্টো জনগণের সাথে তারা সুযোগ পেলেই অশোভন ও নিষ্ঠুর আচরণ করে থাকেন। তারা জনগণের জান-মাল-ইজ্জত ও অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলেন এবং সুযোগ পেলেই ওসব নিয়ে ক্রীড়া-কৌতুক করেন। কোনো অভাগা মানুষ যদি তার সমস্যা নিয়ে সিল পেটানো, ব্যালট চুরি বা বিনা ভোটে ভৌতিকভাবে নির্বাচিত হওয়া কথিত নামধারী এবং ভুয়া কোনো জনপ্রতিনিধির কাছে যায়, তবে সেই অভাগার ভাগ্যে কী ঘটে, তা কেবল আবহমান বাংলার খেটে খাওয়া দরিদ্র ও নির্যাতিত জনগণই ভালো বলতে পারবে।

জনগণ খুব ভালো করেই জানে, ভোটচোরদের স্বভাব-চরিত্র সব সময় গণবিরোধী হয়ে থাকে। ভোটডাকাতরা সব সময় দুনিয়ার নিকৃষ্টতম অপরাধীর পর্যায়ে নিজেদের নামিয়ে আনে। ভোটবাক্স লুট এবং জাল-জালিয়াতির ভোটের হোতারা যেকোনো ভণ্ড, প্রতারক ও মুনাফেকের চেয়েও বেশি জঘন্য কাজ করতে পারে। তাদের পক্ষে গরিবের ধন হরণ, গরিবের সুন্দরী মেয়ে বা স্ত্রীর জীবন বিপর্যস্ত করে তোলা, গরিবের জায়গা-সম্পত্তি দখল ইত্যাদি কুকর্ম ভাত-মাছের মতো। ফলে কোনো এলাকায় শত-সহস্র ইবলিশ মিলে যা না করতে পারে তা অনায়াসে করে দিতে পারে ভোট ডাকাতরা, আর সে কারণেই ভোট এলে বাতাসীর বাবা-মায়েরা পাগল হয়ে যায় মনের মতো প্রার্থীকে গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত করার জন্য।

বাংলাদেশে গত পাঁচ বছর ধরে নির্বাচনের নামে যা হচ্ছে, তার প্রতিক্রিয়া বোঝা যেত যদি এবারের নির্বাচনে মানুষ ভোট দেয়ার সুযোগ পেত। এই সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনের প্রাক্কালে যে রসায়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিরঙ্কুশভাবে বিশ্বাস করেছিল, ভোট মোটামুটিভাবে নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। আওয়ামী লীগের শত-সহস্র অঙ্গীকার, আশ্বাস-প্রবোধবাক্যের পাশাপাশি রাজপথের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল এবং দেশের সম্মানিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অভূতপূর্ব ঐক্যের কারণে মানুষ নির্বাচনের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর দেশপ্রেমের স্লোগান, বেসামরিক প্রশাসনের শিক্ষাদীক্ষা, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সুমিষ্ট কথাবার্তার ওপরও জনগণ নির্ভর করেছিল। সর্বোপরি নির্বাচন কমিশনের কর্তাব্যক্তিদের নির্বাচনপূর্ব হম্বিতম্বি, ‘মেরুদণ্ড সোজা রাখা’র মহড়া এবং ভাবসাবে একেকজনের ভারতীয় কিংবদন্তি প্রধান নির্বাচন কমিশনার টি এন সেসন হওয়ার প্রচেষ্টার দ্বারাও নিরীহ জনগণ বিভ্রান্ত হয়ে বানের পানির মতো সুতীব্র স্রোত সৃষ্টি করে ভোটের মাঠে দৌড়ে গিয়েছিল।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসনটি বিভিন্ন কারণে সব সময় আলোচনার শীর্ষে ছিল। আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে যখন বিএনপিতে যোগ দিলাম তখন তা সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে আমার মনোনয়নপত্রটি যখন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা বাতিল ঘোষণা করলেন, তখনো তা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিলো। পরবর্তী সময়ে আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়া এবং আমার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাগিনার মনোনয়ন নানা রকম গুঞ্জন সৃষ্টি করে। আমার মতো বোকাসোকা লোকজন মনে করলেন, সারা দেশে যা-ই হোক না কেন, পটুয়াখালী-৩ আসনের নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের। কারণ, সিইসি এবং সরকার নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য আমার আসনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করে সবাইকে দেখিয়ে দেবেন যে, তারা সিইসির আপন ভাগিনাকেও ছাড় দেননি।

বিষয়টি নিয়ে যখন আমার যুক্তিগুলো আমার এক দুর্মুখো আঁতেল বন্ধুর কাছে বলছিলাম তখন তিনি উচ্চস্বরে হো হো করে হেসে বললেন- ‘ওরে নির্বোধ! মোগল হেরেমের দুনিয়া কাঁপানো প্রেমের কাহিনী লিখছ, নারী-পুরুষের কামনা ও কামরস নিয়ে গবেষণা করছ, অথচ কামনাকাতর মানুষের লজ্জাহীনতা ও বস্ত্রত্যাগের মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে একটুও ভাবছ না। মানুষ যখন লোভ-লালসার দ্বারা মোহগ্রস্ত হয়ে কোনো কিছু পাওয়ার চিন্তায় উন্মাদনা শুরু করে, তখন তাদের মস্তিষ্ক থেকে একধরনের রস নিঃসৃত হয় যেগুলো প্রথমেই মানুষের বিবেকবুদ্ধি ও লজ্জাশরম রহিত করে দেয়। মস্তিষ্কের সেই রসের প্রভাবে মানুষের মুখে লালা, বুকে জ্বালা এবং বিশেষ অঙ্গে কামরসের সঞ্চার হয়। এ অবস্থায় মানুষ তার পোশাক খুলে, উদোম হয়ে লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে পাশবিকতা না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হয় না। আর তাই দুনিয়ার লোভ-লালসা, পদ-পদবি ও কামনা-বাসনার খপ্পরে পড়া মানব-মানবীর কাছে মানবতা আশা করার মতো নিবুর্দ্ধিতা দ্বিতীয়টি নেই!

আমার দুর্ভাগ্য, আমি দুর্মুখ আঁতেল বন্ধুটির সাথে নির্বাচনের পরে কথা বলেছিলাম এবং লোভী মানুষের স্বরূপ সম্পর্কে ধারণা পেয়েছিলাম। যদি নির্বাচনের আগে তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলাপ করতে পারতাম, অবশ্যই নির্বাচনে প্রার্থী হতাম না। ফলে আমাকে বাতাসীর সাথে দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের দুর্বিষহ স্মৃতি বয়ে বেড়াতে হতো না। কারণ, দ্বিতীয়বার সাক্ষাতে বাতাসীকে যে রূপে দেখেছি তা মানসপট থেকে কোনো দিন মুছে ফেলতে পারব না। একধরনের অসহায়ত্ব এবং মনোবেদনা আমাকে কিভাবে তাড়া করে বেড়ায়, তা বোঝানোর জন্য আপনাকে বাতাসীর সাথে আমার দ্বিতীয় সাক্ষাতের ক্ষণ এবং আগের কাহিনী জানতে হবে।

বরিশাল বিভাগের অন্যান্য বিএনপি প্রার্থীর মতো আমার ওপরও নানা রকম জুলুম-নির্যাতন শুরু হয়ে গেল ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ সালের পর দিন থেকেই। গায়েবি মামলায় বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, রাতের বেলায় বাড়ি বাড়ি হামলা, বাড়ির মা-বোন ও শিশুদের সাথে অশোভন আচরণ এবং রাস্তাঘাটে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মারধরের পাশাপাশি আমার বাড়িকে কেন্দ্র করে সরকারি-বেসরকারি জুলুমের যেন মহোৎসব শুরু হয়ে গেল। দিনরাতের ২৪ ঘণ্টা শত শত অচেনা যুবক আমার বাড়ির চার দিকে টহল দিয়ে বিভিন্ন অশ্লীল ও অশোভন স্লোগান ও কুৎসিত গালাগাল এবং বীভৎস অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে আমাদের জীবনকে জাহান্নামে পরিণত করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে। তারা চেয়েছে- আমি যেন নির্বাচনী মাঠ ছেড়ে ঢাকা ফিরে যাই। কিন্তু আমি যখন এলাকা না ছাড়ার ব্যাপারে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলাম, তখন দুর্বৃত্তরা তাদের অপকর্মের তীব্রতা বাড়িয়ে দিলো। তারা আমাকে আমার বাড়িতে অবরুদ্ধ করে রাখে। আমি যখন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের জানালাম তখন তারা উল্টো আমাকে দোষী সাব্যস্ত করে এমন সব কথাবার্তা বললেন, যা শুনে আমার শুধু বারবার কিয়ামতের পূর্বলক্ষণের কথা মনে হতে লাগল।

২২ ডিসেম্বরের পর থেকে আমার এলাকার দুর্বৃত্তরা মারাত্মক বেপরোয়া হয়ে পড়ে। তারা আমার বাসায় দেখা করতে আসা সবাইকে রাস্তায় পাওয়ামাত্র বেধড়ক মারধর করার পাশাপাশি তাদের টাকা-পয়সা, মোবাইল, মানিব্যাগ ও হোন্ডা ছিনিয়ে নিতে আরম্ভ করে। এরই মধ্যে একদিন বাতাসীর বাবা আমার সাথে দেখা করতে এলো। তাকে এভাবে ঝুঁকি নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে আসার জন্য ভর্ৎসনা করলাম এবং সাবধানে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিলাম। বাতাসীর বাবা যে দিন সকালবেলা আমার বাসায় হাসিমুখে এসেছিল, সে দিন বিকেলে কাঁদতে কাঁদতে বাতাসীকে নিয়ে তার মা আমার বাসায় এলো। সে জানাল, আমার বাসা থেকে বের হওয়ার পর বাতাসীর বাবাকে কয়েকজন রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত বেধড়ক মারধর করেছে এবং জাহেলিপনার পরাকাষ্ঠা দেখানোর জন্য পাপিষ্ঠরা বাতাসীর বাবার পাঁজরের হাড্ডিগুলো ভারী ইট দিয়ে গুঁতিয়ে ভেঙে ফেলেছে।

অনুশোচনা, গ্লানি আর বেদনায় আমার মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল, শিশু বাতাসীকে কাছে ডেকে তার মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলাম। নির্বাক বাতাসী তার মায়াভরা উদাস দু’টি চোখে হঠাৎ অশ্রুর অগ্নিবৃষ্টি ঝরাল। সে সবেগে আমার হাতখানাকে ঘৃণাভরে দূরে সরিয়ে দেয় যে আমাকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে চাইলো না। আমি বুঝলাম- প্রথম সাক্ষাতে বাতাসী আমাকে স্পর্শ করে বুঝেছিল যে, আমি এমপি নই, মানুষ। কিন্তু আজ এই দ্বিতীয় সাক্ষাতে সে হয়তো আমার বা আমাদের সম্পর্কে তার ধারণা পাল্টে ফেলেছে। সে ভেবেছে, আমিই হয়তো অমানুষ হয়ে গিয়েছি এবং তার বাবাকে মেরে বুকের পাঁজর ভেঙে দিয়েছি।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য


আরো সংবাদ