২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

নিশীথ ভোট এবং ভোটের প্রতি অনাস্থা

বাংলাদেশের নির্বাচন এখন হাসি-তামাশার বিষয়ে পরিণত হয়েছে; সেটা জাতীয় নির্বাচন হোক কিংবা হোক স্থানীয় পরিষদ নির্বাচন বা ডাকসুর মতো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন। ভোটের অধিকার এমনভাবে হরণ করা হচ্ছে, যা বোঝানোর জন্য নতুন কোনো শব্দ বা বিশেষণও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভোট চুরি, ভোট ডাকাতি, ভোট কারচুপি, পাতানো নির্বাচন, প্রহসনের নির্বাচন, সাজানো নাটক, ভোট জালিয়াতি, ভুয়া ভোট, বিনা ভোট, সূক্ষ্ম কারচুপি, স্থূল কারচুপি, কলঙ্কিত নির্বাচন, নিকৃষ্ট প্রহসন, শতাব্দীর ট্র্যাজেডি, ভোট কলঙ্ক, নিশীথ ভোটের দেশ- এসব শব্দ গণমাধ্যম ব্যবহার করে ফেলেছে। ডিকশনারি খালি। সামনে হয়তো গণমাধ্যমকে নতুন শব্দ সৃষ্টি করতে হবে।

যত দিন যাচ্ছে, বাংলাদেশের নির্বাচন খারাপ থেকে খারাপের দিকেই যাচ্ছে। এ অবস্থায় দেশের মানুষও নির্বাচন নিয়ে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর তাদের আর আস্থা নেই। ভোট দিতে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাওয়া বন্ধ করে দিচ্ছেন। বলা যায়, ভোটের প্রতি মানুষের এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়ে গেছে।

দেশব্যাপী চলছে উপজেলা নির্বাচন। এই নির্বাচন নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই মানুষের। অথচ স্থানীয় নির্বাচন সব সময়ই গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচন জমজমাট পরিবেশে সব সময় হয়েছে। সেই অবস্থা কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে।

চার ধাপে চলমান উপজেলা নির্বাচনের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রগুলো বিরান। কোনো ভোটার আসছে না। এই ভোট খরার বিবরণ গণমাধ্যমে উঠে আসছে। প্রথম ধাপের নির্বাচনের একটি কেন্দ্রের বর্ণনা দৈনিক প্রথম আলো থেকে দেয়া যাক : জয়পুরহাট সদর উপজেলার একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট পড়েছে ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ভোটের দিন সকাল থেকেই ওই কেন্দ্রে বসে আছেন ২২ জন নির্বাচনী কর্মকর্তা। নিরাপত্তায় নিয়োজিত আছেন ১৪ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। ভোট গ্রহণের সময় শুরু হয়েছে। সবাই প্রস্তুত। ভোট দেয়ার জন্য আগ্রহী মানুষের সারি তো দূরের কথা, প্রথম দেড় ঘণ্টায় ভোট দিতে এলেন মাত্র তিনজন। সারা দিনে ভোট পড়েছে ৬৭টি। অথচ এই কেন্দ্রে মোট ভোটার রয়েছেন দুই হাজার ৫৯১ জন। যদিও নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, প্রথম ধাপে ৪৩.৩২ শতাংশ ভোট পড়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের নির্বাচনেও ছিল একই চিত্র।

এবার একেবারে নিরুত্তাপ পরিবেশে উপজেলা নির্বাচনটি হচ্ছে। গত জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো উপজেলা নির্বাচন বর্জন করেছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নিজেরা নিজেরাই নির্বাচন করছে। কিন্তু তাদের মধ্যেও উৎসাহ নেই। চার ধাপে হওয়া ৪৬০টি উপজেলার মধ্যে ২৪ শতাংশ উপজেলায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হচ্ছেন বিনা ভোটে। কোনো পদেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় ভোটহীন হয়ে পড়ে ওই পদ। বিনা ভোটে ১১০ জন চেয়ারম্যান এবং শতাধিক ভাইস চেয়ারম্যান উপজেলা পরিষদে ‘নির্বাচিত’ হচ্ছেন। ভোটের ওপর অনাস্থা প্রকাশেরই নজির এটা।

কেন এমন হচ্ছে? কারণ, বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ পরবর্তী নির্বাচন, অর্থাৎ ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন থেকেই। সেটিও ছিল কারচুপির নির্বাচন। কিন্তু কারচুপি সত্ত্বেও বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনটি মেনে নিয়েছিল দেশে গণতন্ত্র পুনরায় চালু হবে, সেই আশায়। পরের ইতিহাস আরো হতাশার। গণতন্ত্রের পরিবর্তে জাতির ঘাড়ে চেপে বসে স্বৈরতন্ত্র। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য সংবিধান থেকে কৌশলে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাদ দেয়া হলো। বিরোধী রাজনীতিকে টুঁটি চেপে ধরা হয়। সুশাসন চলে যায় নির্বাসনে। তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়া হয় গণতন্ত্র। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়, যাতে কোনো দল নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে। ফলে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিনা ভোটে আবার ক্ষমতা কব্জা করা হয়। সংসদের ওই নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪ জনকে ‘নির্বাচিত’ বলে ঘোষণা দেয়া হয়। বাকি ১৪৬টি আসনে ৫ শতাংশও ভোট পড়েনি।

বিনা ভোটের সরকার টানা পাঁচ বছর দমনপীড়ন চালিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে সব দল অংশ নিলেও এমন নীলনকশা বাস্তবায়ন করা হয়, যা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। ৩০ ডিসেম্বরের আগে ২৯ ডিসেম্বরেই নির্বাচনটি হয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্যাডার দিয়ে ভোটের আগের রাতেই নৌকায় সিল মেরে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে রাখা হয়। ৩০ ডিসেম্বর সকাল থেকেই জানাজানি হয়ে যায়, ভোট হয়ে গেছে। সন্ধ্যায় পরিকল্পিত নির্বাচনের ফল ঘোষণার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে মাত্র। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকদের বিজয়ী বলে ঘোষণা দেয়া হয়।

দেশ-বিদেশে এ নির্বাচনটি ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ নির্বাচন’ হিসেবে চিহ্নিত হলেও এ নিয়ে এ দেশের ক্ষমতাসীনদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আলজাজিরা টেলিভিশনের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা বাংলাদেশে একদলীয় শাসন চালাচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের বার্ষিক মানবাধিকার রিপোর্টে সম্প্রতি বলা হয়, গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ‘অভাবনীয় রকম একপেশে একটি নির্বাচনের’ মাধ্যমে টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় এসেছে আওয়ামী লীগ। নানা অনিয়মে ভরা ওই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখা, বিরোধী প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট ও ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নির্বাচনে অসংখ্য অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক নির্বাচনপর্যবেক্ষকেরা তাদের পর্যবেক্ষণ মিশন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সময়সীমার মধ্যে বাংলাদেশে যাওয়ার অনুমতিপত্র ও ভিসা পাননি। রিপোর্টে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানে একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা বলা থাকলেও বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের মধ্যেই বেশির ভাগ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত।

গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত খুলনা, গাজীপুর, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে রিপোর্টে বলা হয়, ওই সব নির্বাচনেও বিরোধী প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকদের হয়রানি, গ্রেফতার, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। একইভাবে এসব নির্বাচনেও ভোট কারচুপি এবং নানা অনিয়ম হয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনের পর অনেকটা তড়িঘড়ি করেই ঘোষণা দেয়া হয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের। ফলে নির্বাচনটি নিয়ে কোনো আগ্রহই নেই মানুষের। এরই মধ্যে গত ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু এবং ১৮টি হল সংসদের নির্বাচন হয়ে গেল। এ নির্বাচনটি হলো দীর্ঘ ২৮ বছর ১০ মাস পর।

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩ হাজার ছাত্রছাত্রীই শুধু নয়, সারা দেশের শিক্ষার্থী এবং দেশের জনগণের মধ্যেও উৎসাহ-উদ্দীপনা ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল। এটি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী একটি আদর্শ নির্বাচন হবে বলে সবার আশা ছিল। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক সময় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ নামে খ্যাত ছিল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দুর্গ হিসেবে সব সময় ভূমিকা রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অন্যায় এবং অনিয়ম কোনোভাবেই সেখানে প্রশ্রয় পাওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া, ডাকসু নির্বাচনের দায়িত্বে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা, সেখানে কোনো অনিয়ম হবে সেটা কারো কল্পনাতেও ছিল না।

কিন্তু মানুষের সব আশার গুড়েবালি। আরেকটি কলঙ্কেরই জন্ম দিয়েছে এবার ডাকসু নির্বাচন। আর ভোট কারচুপির কলঙ্কজনক ঘটনার সাথে জড়িয়ে গেলেন স্বয়ং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উপাচার্য ও হলের প্রভোস্টরা। ভোট চুরিতে সাহায্য করে এই শিক্ষকেরা প্রায় শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছেন। এ ঘটনা শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।

১৯৭৩ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থকদের দ্বারা অস্ত্রের মুখে ডাকসু নির্বাচনের ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছিল। এবারের ঘটনা সে ঘটনাকেও হার মানিয়েছে। কারণ, এবারের বিতর্কিত নির্বাচনের সাথে জড়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও শিক্ষকেরা।

ডাকসু নির্বাচন ঘোষণার পর থেকেই এ নির্বাচনটি যাতে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয় তার দাবি উঠেছিল। বিশেষ করে তফসিল ঘোষণার পরপরই একমাত্র ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ ছাড়া বাকি সবাই দাবি করেছিল, ভোট প্রক্রিয়াকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য আবাসিক হলগুলোর বাইরে একাডেমিক ভবনে যেন ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এ দাবির পক্ষে যুক্তি ছিল, ১০ বছর ধরে আবাসিক হলগুলোতে ছাত্রলীগের একক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাদের একাধিপত্যের কারণে অন্য কোনো ছাত্রসংগঠন সেখানে ঢুকতে পারেনি, কমিটি গঠন করতে পারেনি। ভিন্নমতের শিক্ষার্থীদের জন্য সেখানে পরিসর খুব সীমিত। তাই আবাসিক হলে ভোটকেন্দ্র স্থাপিত হলে ভোট সুষ্ঠু হবে না। ছাত্রদের আরো দাবি ছিল, ভোট হতে হবে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে এবং নির্বাচনের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ থাকতে হবে।

তাছাড়া, নির্বাচনী দায়িত্বে সব মতের শিক্ষকদের রাখতে হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব দাবির একটিও মেনে নেননি। আবাসিক হলগুলোতেই ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের পরিবর্তে স্টিলের অস্বচ্ছ বাক্সে ভোট নেয়া হয়। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা হয়নি। যেসব শিক্ষককে নির্বাচনী দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তারা সবাই ক্ষমতাসীন দলের শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের সদস্য। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।

নির্বাচনের দিন ভোট কারচুপির সব আলামত একে একে স্পষ্ট হয়ে যায়। ব্যালটে সিল মেরে রাখা, বাক্স ভর্তি অবৈধ ব্যালট, প্রার্থীদের মারধর ও বাধা, হলে হলে ছাত্রলীগের কৃত্রিম লাইন তৈরি করে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ভোটদানে বাধাসহ নানা অনিয়ম সৃষ্টি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে ভোটের আগের রাতে ‘সিল মারা’ ব্যালট দিয়ে ভোটের বাক্স ভরে রাখা হয়। হলের ছাত্রীরা হাতেনাতে এ ঘটনা ধরে ফেলেন। তাদের প্রতিবাদের মুখে ভোট গ্রহণের আগেই বাক্স খোলা হলে ‘সিল মারা’ গাদা গাদা ব্যালট পাওয়া যায়। এ ঘটনায় হলের প্রভোস্টকে সরিয়ে এবং ভোট গ্রহণ কিছুক্ষণ স্থগিত রেখে পরিস্থিতি সামাল দেয়া হয়। নিরপেক্ষভাবে ভোট গ্রহণের পর দেখা যায়- ছাত্রলীগ জিততে পারেনি।

শামসুন্নাহার হলের ছাত্রীরা ভোটকেন্দ্রে রাতভর পাহারা বসান। ফলে নির্বাচনে ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রার্থীরা সব পদে বিজয়ী হন। রোকেয়া হলে তিন বাক্স ভরা অবৈধ ব্যালট উদ্ধার করা হয়। তবে ছাত্রী হলে ছাত্রীরা প্রতিবাদ করতে পারলেও ছাত্রদের হলগুলোতে এ প্রতিবাদ করা যায়নি ছাত্রলীগের পেশি প্রদর্শন ও একক নিয়ন্ত্রণের কারণে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভোটের আগের রাতেই হলে হলে ব্যালট ও স্টিলের অস্বচ্ছ বাক্স পাঠিয়ে দেয় প্রার্থীদের আপত্তি সত্ত্বেও। দলীয় প্রভোস্টরা কর্তার ইচ্ছায় কর্ম সম্পাদন করে দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দলনিরপেক্ষ আটজন শিক্ষকের একটি পর্যবেক্ষণ টিম নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে ফল ঘোষণার আগেই এক বিবৃতি দিয়ে জানান, ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচনে কারচুপি ও নানা অনিয়ম হয়েছে। তারা নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করে অবিলম্বে নতুন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আহ্বান জানান। কিন্তু রাতেই ফল ঘোষণা করে দেয়া হয়। উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান সিইসি নূরুল হুদার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সব পক্ষ থেকে ভোট প্রত্যাখ্যান, এমনকি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচন নিয়ে ‘বিব্রত’ এবং উপ-উপাচার্য ড. সামাদ ‘অনিয়মের দায়দায়িত্ব আমরা অস্বীকার করতে পারি না’ বলা সত্ত্বেও উপাচার্য বলেন, ‘আমি আনন্দ উপভোগ করছি। অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হয়েছে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানা ব্যঙ্গ-কৌতুক ছড়িয়ে পড়ে। একটি ব্যঙ্গ ছড়া ছিল এমন- ‘ইসি ভিসি। ইসি বলে ভিসি, ভিসি বলে ইসি। এই বলে ইসি-ভিসি করে ইসিভিসি।’

ডাকসু নির্বাচন বাতিলের দাবিতে ছাত্ররা অবস্থান, অনশন, ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন এবং বিক্ষোভ অব্যাহত রাখে। ডাকসুর পুনর্নির্বাচন, ভিসির পদত্যাগ ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে উপাচার্যের অফিসের সামনে অবস্থানও নেয় ছাত্ররা। কিন্তু এখন পর্যন্ত কারচুপির ভোট বাতিল করা হয়নি; বরং প্রশাসন নানামুখী চাপ সৃষ্টি করে জালিয়াতির ভোটের ডাকসু সচল করেছে এবং সেই ডাকসুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আজীবন সদস্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচিতদের গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় সুন্দরভাবে চলুক। আমরা চাই তোমরা কোনো বাধা ছাড়াই রাজনীতি করে যাও।’

প্রশ্ন হলো, বাধা দিচ্ছে কে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের ছাত্রলীগের বাধার কারণে অন্য কোনো সংগঠন কি রাজনীতি করতে পারছে? সারা দেশে বিএনপিসহ সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাসীনদের বাধার কারণে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারছে না দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে। আর ভোট নিয়ে জনগণের সাথে রীতিমতো করা হচ্ছে উপহাস। ভোটাধিকার প্রয়োগের সামান্য সুযোগও পাচ্ছে না তারা। কারণ, ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা হচ্ছে। সিইসি প্রকাশ্যে বলেছেন, রাতের ভোট বন্ধের জন্যই ইভিএম চালু হওয়া প্রয়োজন। উপজেলায় যাতে রাতে বাক্স ভরা না হয়, নির্বাচন কমিশন নাকি পদক্ষেপ নিচ্ছে। সামান্য লজ্জাও নেই!

এই যে একতরফা নির্বাচন, এই যে রাতের ভোট, তা কি চলতেই থাকবে? ভোট হরণের সংস্কৃতির কী পরিবর্তন হবে না? না, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ এভাবে চলতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। দেশের মানুষকে গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে আন্দোলনের বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে বিশ্বসংস্থা জাতিসঙ্ঘেরও বিরাট দায়িত্ব রয়েছে। বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে দেশের জনগণ জাতিসঙ্ঘের হস্তক্ষেপ চায়। অন্যথায় নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক


আরো সংবাদ