২৬ আগস্ট ২০১৯

পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি : আগামীর দিকে দৃষ্টি

পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি : আগামীর দিকে দৃষ্টি - ছবি : সংগ্রহ

সমাজ ও রাজনীতির নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশের মানুষ গত ৪৮ বছরে বেশ কয়েকটি জিনিসের সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি। ঘুষ খাওয়া এবং ঘুষ দেয়া; ঘুষ খাচ্ছে না এমন সরকারি কর্মকর্তা বা পেশাজীবী পাওয়া মুশকিল। না খাওয়াটা যেন অপরাধ, খাওয়াটাই যেন আভিজাত্যের লক্ষণ। শুধু নিজে খাওয়া নয়, ওপরওয়ালাকে ঘুষ খেতে সাহায্য করাও যেন দায়িত্বের একটা অংশ। পুনশ্চ বলছি, এমন কোনো পেশা নেই যেখানে ঘুষ, চুরি-চামারি হচ্ছে না। খাদ্যসহ সর্বপ্রকার বস্তুতে ভেজাল দেয়া ও খাওয়া, ভেজাল বিক্রি করা ও ভেজালের প্রতিবাদ না করা; মিথ্যা কথা বলা; পরশ্রীকাতরতা তথা প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে অন্যের ভালো কাজে হিংসা প্রকাশ, গায়ের জোর তথা শক্তি খাটিয়ে অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করা; অন্যের সম্পদ দখল এবং রাষ্ট্রের সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার, অহঙ্কারের তীব্রতা এবং অন্যের ভালো কাজের স্বীকৃতি না দেয়া ইত্যাদি অনেকের প্রবণতায় রূপান্তরিত হয়েছে।

ছোট বেলায় যেগুলোকে আমরা অনৈতিক কাজ মনে করতাম, এখন সেগুলোকে অনৈতিক বলার মতো লোক কমে গেছে। থাকলেও তারা মুখফুটে কথাটি বলেন না। মানুষে-মানুষে পরিবার-পরিবারে পারস্পরিক সহানুভূতি কমে গেছে। সামাজিক উদারতা কমে গেছে। শিশুদের খেলার মাঠ যেমন কমে গেছে, তেমনি শিশুদের মধ্যে মানবতাবোধ জাগিয়ে তোলার প্রক্রিয়া মন্থর। শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবা তথা নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করার প্রবণতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রমান্বয়ে মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত সম্পদশালী হওয়ার আগ্রহ মনের ভেতর এমনভাবে জেঁকে বসেছে যে, এটা করার জন্য খুনখারাবি, ধর্ষণ, রাহাজানি, চুরি, ডাকাতিসহ যেকোনো কিছু করতে মানুষ প্রস্তুত। ধর্ষণ, এর আগে-পরে ভিকটিমকে খুন করা ইত্যাদি এখন পান্তাভাত তুল্য! দেশের মানুষের জন্য কিংবা সমাজের জন্য চিন্তা করার প্রবণতা কমে গেছে। ব্যক্তিগত আচার-আচরণে রুক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে, কমে গেছে আদব। ব্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, লোন দেয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, লোন পরিশোধ না করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, জামানত হিসেবে দেয়া সম্পদের কাগজপত্র জালিয়াতি করার প্রবণতা এবং জালিয়াতিতে সাফল্যও বেড়েছে।

সরকারি চাকরিতে সরকারের রাজনীতিকরণ প্রায় শতভাগ হয়েছে এবং বেসরকারি চাকরিতেও ক্ষমতাসীন রাজনীতির প্রভাব শতভাগ লক্ষ্য অর্জনের পথে আছে। পাকিস্তান আমলের ২২টি পরিবারের বদলে দুই হাজার ২০০ পরিবার বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছে, যারা অর্থনীতির ৯০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। বিয়ের খরচ এবং বিবাহিত হওয়ার আইনগত ও সামাজিক দায়দায়িত্ব এড়ানোর জন্য, বিবাহিত জীবনযাপনের পরিবর্তে তরুণ-তরুণীরা লিভিং টুগেদার করছে (সম্মানিত পাঠক : লিভিং টুগেদারের মানে হলো- সমাজকে এবং দশজনকে বলে বেড়াবেন; আপনারা স্বামী-স্ত্রী, একই কামরায় থাকবেন, দিনেরাতে স্বামী-স্ত্রীর মতো সব কর্ম সম্পাদন করবেন, সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সেটাকে নষ্ট করবেন এবং এক-দুই-তিন-চার বছর পর যদি তরুণ বা তরুণীর কেউ একজন অপরজনকে বিয়ে করতে অপারগ হয় বা যেকোনো কারণে মনোমালিন্য ঘটে, তখন তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেবেন; হয় দেবেন প্রতারণার মামলা, নয় তো নারী নির্যাতনের মামলা, নয় দেবেন ধর্ষণ মামলা)।

এই অনুচ্ছেদের শেষ কথাটি না বললেই নয়; নিরীহ ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষকে সড়কের ওপর পিষে মেরে ফেলার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে এবং এর প্রতিবাদ করার জায়গাটিও স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক অসৎ উদ্দেশ্যে দখল করে ফেলা হচ্ছে। অর্থাৎ যানবাহনে যাত্রী ও পথচারীর নিরাপত্তা প্রায় জিরো হয়ে গেছে। এতক্ষণ কিছু উদাহরণ দিলাম যেগুলো নেতিবাচক।

ইতিবাচক কথার সমষ্টি
রাস্তাঘাটে প্রচুর আধুনিক গাড়ি আছে; প্রাইভেটকারের সংখ্যা প্রচুর; অতি সম্প্রতি উবার এবং পাঠাওসহ রাইড-শেয়ারিং অনেকগুলো কোম্পানি কাজ শুরু করেছে। বড় বড় দালান হয়েছে এবং আরো হচ্ছে; বড় বড় আবাসিক এলাকা হচ্ছে এবং সেখানে মানুষ বাড়ি বানানোর জন্য প্লট কিনছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আট-নয় বছর আগে কুইক-রেন্টাল, ক্যাপটিভ-পাওয়ার ইত্যাদি নামে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র চালু হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। নতুন সমুদ্রবন্দর হচ্ছে পায়রায়; সুন্দরবনের পাশে রামপালে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে, বিশেষায়িত বন্দর হচ্ছে মহেশখালীতে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনেকগুলো ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ স্থাপিত হয়েছে। পদ্মা নদীর ওপর ব্রিজ হচ্ছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম যাওয়া-আসার জন্য শীতলক্ষ্যার ওপর তৃতীয় ব্রিজ এবং মেঘনা-গোমতীর ওপর দ্বিতীয় ব্রিজ নির্মিত হচ্ছে। জাতীয় মহাসড়ক বা ন্যাশনাল হাইওয়েগুলো টু লেন থেকে ফোর লেন হচ্ছে, অনলাইন পত্রিকা মুদ্রিত পত্রিকার সাথে প্রতিযোগিতা করে এগিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি সংবলিত বড় বড় শিল্পকারখানা স্থাপিত হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেন্ট্রাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কয়েদির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন জেলখানা নির্মিত হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট নীতি ও দুর্নীতি সব কিছু বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাটশিল্প তার হারানো গৌরব একটু একটু করে ফিরে পাচ্ছে। শুধু গার্মেন্টসের ওপর নির্ভরশীলতা একটু করে কমছে; বিদেশীদের আউটসোর্সিং কাজ বাংলাদেশে বসে করার জন্য আইটি শিল্প ক্রমান্বয়ে বড় হচ্ছে। অর্থনীতিতে জিডিপির আকার হচ্ছে বড়। এসব উদাহরণ ইতিবাচক বা আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক।

কলাম লিখতে পারিনি কেন?
পাঠক এই কলাম পড়ছেন ৩ এপ্রিল ২০১৯। নয়া দিগন্ত পত্রিকায় আমার সাপ্তাহিক কলাম প্রকাশিত হয় প্রতি বুধবার। কিন্তু গত ২৭ মার্চ কলামটি লিখতে পারিনি, অতএব পাঠক পড়তে পারেননি। অপরপক্ষে বুধবার ২০ মার্চ যে কলামটি প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল, সেটি মঙ্গলবার ১৯ মার্চেই অর্থাৎ এক দিন আগে প্রকাশিত হয়েছিল; কলাম লেখক এবং পত্রিকার যৌথ সম্মতিতে; কারণ ওই দিনের কলামটির বিষয়বস্তুর সাথে ১৯ মার্চের সম্পর্ক ছিল। ২৭ মার্চ কেন কলাম লিখতে পারিনি তারও ব্যাখ্যা দিয়ে রাখলে সহানুভূতিশীল পাঠক আশ্বস্ত থাকবেন। কারণ হলো- নিজে ব্যস্ত ছিলাম এবং আমার সহকর্মী যিনি গবেষণা ও কম্পিউটার কম্পোজে সাহায্য করেন, তিনিও আমার সাথে একই কাজে ছিলেন ব্যস্ত। কাজটি কী? পরের অনুচ্ছেদে বলছি।

নিউজিল্যান্ডের হতাহতদের প্রতি শোক ও সংহতি প্রকাশ
গত ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি পার্কের পাশের মসজিদে জুমার নামাজের সময় সন্ত্রাসী হামলায় যারা নিহত হয়েছেন, তাদের প্রতি শোক প্রকাশ এবং তাদের পক্ষে ও সার্বিকভাবে শান্তির পক্ষে নিউজিল্যান্ডবাসীর পদক্ষেপগুলোর সাথে সংহতি জ্ঞাপন করার জন্য একটি মিটিং আয়োজন করা; ১৫ মার্চ ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর দু-একদিনের মধ্যেই নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব-দৃষ্টিভঙ্গি-কর্মপন্থা ইত্যাদি বিশ্ববাসীর সামনে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে; সেগুলোর সাথে আমি শতভাগ একমত এবং সে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করি। নিউজিল্যাণ্ডের প্রধানমন্ত্রীর নাম জেসিন্ডা আরডার্ন; তিনি একজন মহিলা। জনসংখ্যার দিক থেকে তিনি ক্ষুদ্র একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু তার প্রশংসনীয় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই তিনি বিশ্বব্যাপী সম্মানজনক পরিচিতি পেয়েছেন এবং অনুসরণীয় এক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার এবং গুরুত্ব ও আকৃতিতে বড়-বাংলাদেশের এমন দলগুলো শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে এবং কাজটি এখানেই শেষ। এ ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই। কারণ, আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশেই প্রত্যহ এত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে যে, হাজার হাজার মাইল দূরে ক্রাইস্টচার্চের ঘটনা নিয়ে মানসিকভাবে ব্যস্ত থাকা কঠিন। তারপরও আমি বা আমার মতো নাগরিক সমাজের অনেকেরই মনটা খারাপ ছিল এ জন্য যে, আমরা তো কিছু করতে পারলাম না। মানুষ কাশ্মিরে মারা যাচ্ছে, ফিলিস্তিনে মারা যাচ্ছে- এটা তো বাস্তব, কিন্তু এই খবরগুলো দেখতে দেখতে প্রায় গা-সওয়া হয়ে যাচ্ছে; অপ্রিয় হলেও এটিই বাস্তবতা। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের ঘটনাটি এত বেশি অপ্রত্যাশিত ছিল যে, কিছু বলার বা করার জন্য মনটা ছটফট করছিল। তাই কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রেরণায় এবং সহযোগিতায়, ক্ষতিগ্রস্ত ও হতাহতদের প্রতি শোক এবং নিউজিল্যান্ডবাসীর পদক্ষেপের সাথে সংহতি প্রকাশের জন্য একটি নাগরিক সভা আহ্বান আয়োজন করা হয়েছিল জাতীয় প্রেস ক্লাবে। মহান আল্লাহর দয়ায় ২৫ মার্চ সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এটি করার জন্য চার-পাঁচ দিন আমাদের কয়েকজনের অনেক ব্যস্ততা ছিল পরিশ্রম হয়েছে; তাই ২৭ মার্চ নির্ধারিত কলামটি লেখা হয়ে ওঠেনি। এই কলামের মাধ্যমে, ওই অনুষ্ঠানের জন্য পরিশ্রমকারী উদ্যোক্তা টিমের অন্যতম মজিবুর রহমান মঞ্জুসহ সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ড. কামাল হোসেন (গণফোরাম), খালেকুজ্জামান (বাসদ), ড. শাহদীন মালিক (প্রখ্যাত আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ), মাওলানা কামালুদ্দীন জাফরী (শিক্ষাবিদ ও ধর্মীয় চিন্তাবিদ), রুমিন ফারহানা (আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী), প্রফেসর দিলারা চৌধুরী (শিক্ষাবিদ), প্রফেসর আবদুল লতিফ মাসুম (শিক্ষাবিদ), কর্নেল ড. আকরাম হোসেন (শিক্ষাবিদ), প্রফেসর রমিত আজাদ (শিক্ষাবিদ), ব্যারিস্টার হোসেন (রাজনীতিবিদ), মাহমুদুর রহমান মান্না (রাজনীতিবিদ), মেজর জেনারেল ফজলে ইলাহী আকবর (নিরাপত্তা ও শান্তিরক্ষা বিশেষজ্ঞ), মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী (রাজনীতিবিদ), ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী (মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ), অধ্যাপক আসিফ নজরুল (শিক্ষাবিদ), আলী হোসেন ফরাজী (রাজনীতিবিদ), জুবায়ের নাহিদ (যুব-রাজনীতিবিদ), অ্যাডভোকেট মাহমুদুল হাসান (যুব-রাজনীতিবিদ), সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী প্রমুখ গণ্যমান্য নাগরিক উপস্থিত ছিলেন।

রাজনৈতিক দল : নতুন ও পুরাতন
এই কলামের শুরুতে কিছু নেতিবাচক ও কিছু ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করেছি। এগুলো আমাদের দেশের তথা আমাদের সমাজেরই বৈশিষ্ট্য। ইতিবাচক বা নেতিবাচক হোক, সব কিছুর জন্য দায়দায়িত্ব জনগণের এবং তাদের প্রতিনিধিদের। জনগণের প্রতিনিধি বলতে সাধারণত রাজনৈতিক অঙ্গনকে বুঝাচ্ছি। কারণ, চূড়ান্ত পর্যায়ে দেশ চালানোর দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের। তারা সাধারণত কোনো-না-কোনো দলের সদস্য। যেকোনো একজন ব্যক্তি যিনি রাজনৈতিক কর্মী বা কোনো একটি দলের দায়িত্বশীল, তিনি যদি সচ্চরিত্রের হন, তিনি যদি উদারপন্থী ও সহনশীল হন, তাহলে তার মতো লোকের সমষ্টির কারণে দলটির মধ্যেও এই বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটে উঠবে।

আবার অনেক সময় দেখা যায়, একজন ব্যক্তি রাজনীতি করেন না, কিন্তু কোনো একটি দলের বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণের পর ওই দলটির দিকে ঝুঁকে পড়েন। তবে ব্যতিক্রমও আছে। কদাচিৎ, এক কোটিতে একজন বা দুইজন ব্যক্তি তথা তাদের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা মিলে দেশের পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নতুন রাজনৈতিক দল শুরু করেন। আমি সে রকম একজন লোক, সমমনা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা বা চালু করেছিলাম; যার নাম বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি। আমাদের কল্যাণ পার্টির বয়স ১১ বছর। প্রধান দু’টি দলের তুলনায় এই বয়স সামান্য। কিন্তু মহান আল্লাহর দয়ায় এবং মানুষের দোয়ায় আমরা ১১টি বছর সম্মানের সাথে পার করেছি।

পরিবর্তনের জন্যই পার্লামেন্টে যাওয়া প্রয়োজন
ক্ষমতাসীন শক্তির পক্ষ থেকে ২০১৪ সালে এবং ২০১৮ সালে জোরালো দাওয়াত পেয়েছি ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে অবস্থান নেয়ার জন্য; সম্মানের ও সমৃদ্ধির সাথে। কিন্তু আমরা এতে সম্মত হইনি। কারণ, বিদ্যমান পরিচয়েই জনগণের মানসপটে আমাদের সম্মান বেশি। আমাদের দলের নীতিবাক্য বা মটো : ‘পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি’। ক্ষমতায় পালাবদল, ইতিবাচক এবং স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের মটো বা নীতিবাক্যের মানে শুধু এটা নয় যে, ক্ষমতায় যে দল আছে, তার পরিবর্তে আরেকটি দলের ক্ষমতায় আরোহণ।

আমাদের মটোর প্রকৃত মানে হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন। এই কলামের প্রথম অনুচ্ছেদের দিকে খেয়াল করলে আমরা বুঝতে পারব, সমাজের নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো রাজনীতির অঙ্গনেও পুরোপুরি আছে। আমরা এর পরিবর্তন চাই। ‘আমরা’ শব্দটি দ্বারা এই কলামে কল্যাণ পার্টি ও সমমনা রাজনৈতিক অঙ্গনকে বোঝাচ্ছি। পরিবর্তন করতে হলে আমাদের এমন একটি অবস্থানে যাওয়া উচিত, যেখানে আমাদের কণ্ঠ শোনা যাবে, যেখানে আমরা নিজেদের মতামত পৃথিবীবাসীকে শুনিয়ে উচ্চারণ করতে পারব। সেই জায়গার নাম ‘পার্লামেন্ট’। ২০০৮ সালের নির্বাচনে কল্যাণ পার্টি অংশগ্রহণ করেছিল। সেই বছর নির্বাচনের দিনের মাত্র পাঁচ সপ্তাহ আগে আমাদের দলটি নিবন্ধন পেয়েছিল। এ দল থেকে ৩৬টি আসনে দলীয় প্রতীক নিয়ে প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ২০ দলীয় জোট অংশগ্রহণ করেনি। কী কারণে করেনি, কেন করেনি, করলে ভালো হতো না মন্দ হতো, এসব আলোচনা আজকের সংক্ষিপ্ত কলামে করা যাবে না।

সাম্প্রতিক নির্বাচন প্রসঙ্গে কিছু কথা
কল্যাণ পার্টির নির্বাচনী প্রতীক হাতঘড়ি হলেও ডিসেম্বর ২০১৮ সালে আমি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছি। আমার আসন চট্টগ্রাম-৫। দুঃখজনক হলেও একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো- আমি ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছিলাম; তথাপি ২০ দলীয় জোটেরই অন্য দু’টি শরিক দল খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের প্রার্থীরা তাদের নিজ নিজ দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন; ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিকের অবগতি বা জানাজানির মধ্যেই। অর্থাৎ ২০ দলীয় জোটের তিনটি দলের তিনজন ব্যক্তি চট্টগ্রাম-৫ আসনে প্রার্থী ছিলেন। আমাদের তিনজনের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে আমরা স্থানীয়ভাবে সমস্যার সমাধান করেছি।

আগামী দিনের রাজনীতির জন্য প্রস্তুতি
২০১৮ সালের নির্বাচনে জোটের পক্ষ থেকে আমাদের দলকে একটি আসন বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। আমরা এতে সন্তুষ্ট না থাকলেও জোটের শৃঙ্খলার স্বার্থে আমরা বিনাবাক্য ব্যয়ে এটা মেনে নিয়েছি। একাধিক আসন পেলে আমরা বিগত সাড়ে সাত বছর জোটের ভেতরে ও অনুকূলে আমাদের দলের পরিশ্রম ও অবদানকে সার্থক মনে করতাম। কিন্তু এই অপ্রাপ্তির কারণে প্রকাশ্যে কোনো উচ্চবাচ্য করিনি। আপাতত করছিও না। ভবিষ্যতে যখন নির্বাচন হবে, তখন আমরা একাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব; আমাদের দলের যারা এবার করতে চেয়েছিলেন তারা এবং অন্যান্য নবাগত তখন সুযোগ পাবেন। সব কিছুই অবশ্য বেগম জিয়ার মুক্তির আন্দোলনের ওপর এবং তার মুক্তির ওপর নির্ভরশীল; কারণ তিনি ‘গণতন্ত্রের মা’, তিনি গণতন্ত্রের প্রতীক। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসটিকে আমরা সাংগঠনিক মাস ঘোষণা দিয়ে পরিশ্রম করে পালন করেছি। ফলে সারা দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ (পুরুষ ও নারী) দলে যোগ দিয়েছেন। ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথা অনলাইনে তারা সদস্য হয়েছেন। এই সব কিছু মিলিয়ে আমরা আগামী দিনের দিকে তাকাচ্ছি। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি গণতন্ত্রের চর্চায় বিশ্বাস করে এবং দলের ঘোষণাপত্রে ও গঠনতন্ত্রে এর প্রতিফলন রয়েছে। জন্মের পর থেকে, গঠনতন্ত্রে বর্ণিত নিয়ম ও সময়সূচি মোতাবেক আমরা দলের ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল করে আসছি। আমাদের কাউন্সিল করার নির্ধারিত সময় ছিল গত ডিসেম্বর মাস। কিন্তু ডিসেম্বর যেহেতু পার্লামেন্ট নির্বাচনের মাস ছিল, সেহেতু আমরা কাউন্সিল করতে পারিনি। অতীতে আমরা জাঁকজমকের সাথেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং তিন বছর পরপর কাউন্সিল একসাথে করেছি। এবার অনিবার্যভাবে দেরি হওয়ায় ৬ এপ্রিল কাউন্সিল করছি। অর্থাৎ, মাত্র তিন দিন পর আমাদের কাউন্সিল। শুভাকাক্সক্ষীদের কাছ থেকে তাদের অব্যাহত শুভেচ্ছা কামনা করছি।

মিরাজের রাত্রি
পাঠক কলাম পড়ছেন ৩ এপ্রিল ২০১৯ বুধবার, হিজরি বা ইসলামী ক্যালেন্ডার মোতাবেক ২৬ রজব মাসে। হিজরি পঞ্জিকায় রাত আগে আসে, দিন আসে পরে। অর্থাৎ মঙ্গলবার দিবাগত রাত ছিল ২৬ রজবের রাত্রি এবং এই রাত্রিটি হলো পবিত্র মিরাজের রাত। মিরাজ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘ঊর্ধ্বারোহণ’। লাইল বা লাইলুন শব্দের অর্থ রাত্রি। ফারসি ‘শব’ শব্দের অর্থও রাত্রি। আমাদের সমাজে ‘শব-ই-মিরাজ’ বা লাইলাতুল মিরাজ নামের সাথে আমরা পরিচিত। মিরাজের রাত্রিতে মহান আল্লাহ নিজস্ব অজাগতিক নিয়মে প্রিয় নবী সা:-কে মক্কা নগরীর কাবা শরিফের উঠান থেকে প্রথমে জেরুসালেমের বায়তুল মোকাদ্দাস মসজিদে নেন। অতঃপর সেখান থেকে সব আসমানি ধাপ উত্তরণ করিয়ে, নিজের আরশ পর্যন্ত নিয়ে যান। পবিত্র কুরআনের ১৫ নম্বর পারার শুরু এবং ১৭ নম্বর সূরার শুরু একসাথে। ১৭ নম্বর সূরার নাম ‘বনি ইসরাইল’; সাম্প্রতিককালে কোনো কোনো মুদ্রিত কুরআনে একই সূরাকে ‘সূরা ইসরা’ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। এই সূরার শুরুতেই মিরাজের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা আছে। উল্লিখিত প্রথম আয়াতে আরবিতে একটি শব্দ আছে-ইসরা। কুরআনের শব্দ ‘ইসরা’, এর অর্থও রাত্রিকালীন ভ্রমণ; কাবা শরিফ থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস পর্যন্ত যে ভ্রমণ এটাকে বলা হয়েছে ‘ইসরা’।

মিরাজ শব্দটি প্রথম আয়াতে নেই। মিরাজের উদ্দেশ্য কী ছিল, সেটা সূরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতে বর্ণিত আছে। মিরাজ রজনীতে, মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে কিছু সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। এর বিবরণ সূরা বনি ইসরাইলের ২২ থেকে ৪৪ নম্বর আয়াতে আছে। যথা- ০১. আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করা যাবে না; ০২. পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে; ০৩. নিকট আত্মীয়-স্বজনের অধিকার দিতে হবে; ০৪. মিসকিনদের ও পথশিশুদের অধিকার দিতে হবে; ০৫. অপচয় করা যাবে না; অপচয়কারী শয়তানের ভাই; ০৬. কার্পণ্য করা যাবে না; ০৭. সন্তান হত্যা করা যাবে না; ০৮. ব্যভিচারের কাছেও যাওয়া যাবে না; ০৯. মানুষকে হত্যা করা যাবে না; ১০. এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা যাবে না; ১১. প্রতিশ্রুতি পালন করতে হবে; ১২. মাপে পূর্ণ দিতে হবে; ১৩. অজ্ঞতার সাথে কোনো কিছু করা যাবে না; ১৪. পৃথিবীতে গর্বের সাথে চলা যাবে না; ১৫. প্রিয় নবীজী সা:-এর উম্মতের জন্য উপহার দেয়া হয়েছে নামাজ এবং বলা হয়েছে, সব বিশ্বাসী মুমিনের জন্য নামাজ মিরাজস্বরূপ; ১৬. মিরাজের সময় মহান আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় বন্ধুর মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিল, সেই সংলাপের অংশবিশেষকে তাশাহ্হুদ নাম দিয়ে নামাজে দুই রাকায়াত বা চার রাকয়াতের সময় বসে পড়ার রেওয়াজ করা হয়েছে; এই বাধ্যতামূলক কাজটি শরিয়াহর পরিভাষায় ওয়াজিব। আজ মিরাজ রজনী-পরবর্তী দিন। এই কলামে কথাগুলো লেখার উদ্দেশ্য, সম্মানিত পাঠক সমাজের স্মৃতিতে বা বিবেচনায় বিষয়টিকে তরতাজা করে দেয়া।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

www.generalibrahim.com.bd


আরো সংবাদ