১৯ জুন ২০১৯

চোর আর চুরিবিদ্যার কদর

প্রবাদ-প্রবচন হলো সমাজবাস্তবতা; জনমানসের প্রতিফলন। এর প্রভাব সমাজের পরতে পরতে। জন-ইতিহাসে প্রবাদ, প্রবচন আর কিংবদন্তির গুরুত্ব অপরিসীম। প্রচলিত আছে, ‘চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ে ধরা’। বঙ্গীয় সমাজে প্রাচীনকাল থেকে হাল আমলেও চুরিবিদ্যার বেশ কদর আর গুণকীর্তন লক্ষণীয়। ‘চাহিদা’ থাকায় চোরেরাও আদরনীয়। প্রবাদটির সারকথা- সুযোগ থাকলে চুরি করো; সমাজ এ নিয়ে টুঁ-শব্দটিও করবে না; করেও না। চুরি মানে, পরসম্পদ হাতিয়ে নেয়া। এখন প্রত্যক্ষ চুরির দরকার পড়ে না।

একালে চুরি করতে গেলে জানতে হয় আইনকানুন, আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার কূটকৌশল। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যারা সে টাকা ফেরত দেন না, তারা চোর বৈ অন্য কিছু নন। আর এরাই আমাদের সমাজে খবরদারির লাঠি ঘোরান। চার দিকে তাকালে দেখা যাবে, ‘মহাচোর’ হিসেবে পরিচিত লোকেরাই সবচেয়ে সম্মানিত। আমরাও তাদের ‘কুর্নিশ’ করতে দ্বিধা করি না। তাদের এখন পোয়াবারো। একটি প্রবণতা লক্ষণীয়, অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যত দিন পারেন, টাকা আটকে রাখেন। আর ইচ্ছেমতো ভোগ-উপভোগ করেন। এটাই ‘পরের ধনে পোদ্দারি’। ব্যবসার নামে, অথবা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়তে হরদম এ কাজ করছেন তারা। সমাজে তারা এতই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন যে, রাষ্ট্রও কখনো কখনো হয়ে পড়ে অসহায়। করতে হয় আপসরফা। মানে, ‘ঋণ পুনঃতফসিল’ করা। কিন্তু বারবার এ সুযোগ দেয়ার পরও অনেক ঋণখেলাপি বিরাট অঙ্কের ঋণের টাকা পরিশোধ করতে করেন গড়িমসি। ফলে জনগণের আমানতগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকগুলো পড়েছে দুর্বিপাকে। এ কারণে জাতীয় অর্থনীতির খুবই বেহাল দশা।

অনেকে যেনতেনভাবে অর্থকড়ি কামিয়ে বিলাচ্ছেন অকাতরে। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, তা নেহাত দান-দক্ষিণা নয়, ছিল বিনিয়োগ। নির্বাচনে দাঁড়িয়ে অনেকে হয়ে যান ‘জনপ্রতিনিধি’। যা ছিটান, তুলে নেন লাভসহ শতগুণ; একেবারে কড়ায়-গণ্ডায়। অনেকে ‘বাকির খাতা’ শূন্য রাখতে পছন্দ করেন না। ছোটেন নগদের পেছনে। বলে থাকেন, অর্থের গায়ে তো ন্যায়-অন্যায় লেখা থাকে না। যেভাবেই হোক, উচ্ছিষ্টভোগী হলে ক্ষতি কী? এ জন্যই বলা হয়- ‘চোরের সাক্ষী গাঁটকাটা’। কোনো কিছুই হেলাফেলার নয়। এমনিতে আর লোককথার উদ্ভব হয়নি, ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন’। মাঠে খেলতে গেলে অনেক সময় পচা শামুকেও পা কাটে। সব সময়ই সাবধান থাকতে হয়। সতর্ক দৃষ্টির বিকল্প নেই।

কেন যে এমন একটি চৌর্যকর্ম আমাদের সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পেল, তা সত্যিই রহস্যাবৃত। অথচ চৌর্যবৃত্তি করতে হয় আড়ালে-আবডালে; লুকিয়ে আর লোকচক্ষুর অন্তরালে। এ নিয়ে কেউ অল্পবিস্তর ভাবলে পরক্ষণেই পড়েন ধন্দে। কূলকিনারা পাওয়া দুঃসাধ্য। কেউ করতে পারেন এর বিরোধিতা। এটি তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। অবশ্য আমাদের দেশের বাকস্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার রয়েছে বড় প্রশ্ন। এ জন্য সময়ে-অসময়ে মূল্যবান উপদেশ ‘খয়রাত’ করতে পিছপা হন না তারা। মুক্তকণ্ঠের স্বাদ নিতে ভিন্নমত পোষণ করলেও সেই বক্তব্য ধোপে টেকা মুশকিল। অতীত থেকে প্রমাণ চাইলে দেয়া যায় অনায়াসে। হাতেনাতে আর নগদে। ‘বাকি’ বলে কিছু নেই। বাকি শুনেই অনেকে দরাজগলায় পাঠ করতে পারেন কবি ওমর খৈয়াম রচিত বিখ্যাত সেই শের- ‘নগদ যা পাও/ হাত পেতে নাও/ বাকির খাতা শূন্য থাক/ দূরের বাদ্য লাভ কী শুনে, মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক’।

একসময় সালিস ছিল আমাদের গ্রামীণ সমাজের বৈশিষ্ট্য। বৈঠকে সালিসদারদের সামনে নতজানু হয়ে চুরির পক্ষে ধৃত, গরিব চোরের বয়ান শুনে অনেকের মনে করুণা আর দয়া জন্মাত। আত্মপক্ষ সমর্থনে চোরের কথা অনেক সময় ছিল হৃদয়বিদারক। বক্তব্যের ধরন মোটামুটি এমন ছিল- বড়ই অর্থকষ্টে আছি। পরিবারের ভরণপোষণ করতে পারছিলাম না। শিশুর জন্য খাদ্য কিনতেও অপারগ ছিলাম। বউয়ের পরনের কাপড় শত তালিতে ভরা। আর পরতে পারছিল না। লজ্জা নিবারণের আর কোনো শাড়িও নেই। আমার কী-ই বা করার আছে? পরিবারের অসহায় একজন কর্তা হিসেবে চুরি করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। বাধ্য হয়ে মধ্যরাতে অন্যের ঘরে সিঁদকাটা। কিন্তু বেরসিক কুকুরের চিৎকারে কপাল পোড়ে। তবে কুকুরকে দোষ দিই না। প্রাণীটি বড় প্রভুভক্ত।’ যা হোক, সমাজে চোরের সাক্ষী ‘গাঁটকাটা’র আকাল তখনো ছিল না, এখনো নেই।

হাল আমলে দেশে চোরের উপদ্রব কিছুটা কম। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর তৎপরতায় গরিব চোরের দিন শেষ। যুগ পাল্টেছে। বদলে গেছে কৌশল। ছিঁচকে চোরের কপাল পুড়লেও একালে মহাচোরের বাড়বাড়ন্ত। অতীতের সাথে বর্তমান সময়ের পার্থক্য আকাশ আর পাতাল। আগে চুরির সাথে জড়িত প্রায় সবাই ছিল নিঃস্ব। শুধু মদদদাতা ছিল শক্তিধর। সব কালেই তারা হোমরা চোমরা। এখন ব্যাংকে গচ্ছিত গ্রাহকের আমানত ঋণের নামে হাতিয়ে নিতে পারলেই কেল্লাফতে। ক্ষমতার উত্তাপে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া মামুলি বিষয়, আমরা যাকে বলি ‘দুর্নীতি’। দেশে দেশে চোরের ‘থলেদার’দের জায়গা দখল করেছেন রাষ্ট্রের অনেক ক্ষমতাবান।

রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে যারা দুর্নীতি করেন, শেষ পর্যন্ত তাদের পরিণতি ভালো হয় না। একসময় ঠিকই ধরা পড়েন। কেউ জীবদ্দশায় আইনের ফসকা গেরো দিয়ে পিছলে গেলেও হন গণধিকৃত। ফিলিপাইনের স্বৈরশাসক মার্কোস, অথবা কঙ্গোর মবুতু জনরোষে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এখন তাদের পরিচয় ‘গত শতকের দুই বড় চোর’। চুরি করে কেউ ধরা না পড়লেও, চুরিবিদ্যা ‘মহাবিদ্যা’ নয়। যারা ক্ষমতার আরামকেদারায় বসেন, অনেকে হয়তো এ সত্য টের পান দেরিতে, যখন কিছুই করার থাকে না। তবে সত্য কখনো চাপা থাকে না।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নাজিব রাজাক। ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়বেন, তা ছিল কল্পনাতীত। এমনকি তার দেশবাসীও এটা ধারণা করেনি। এক দশক ক্ষমতায় ছিলেন। রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, নিরাপত্তাবাহিনী, এমনকি বিচারপতিরাও ছিলেন অনুগত। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে করেছেন চুরি। তার আমলে সরকারি উন্নয়ন তহবিল থেকে সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলার খোয়া গেছে। এর একটি বড় অংশ জমা পড়ে তার ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে। বিলাসী জীবনে তার স্ত্রীর ‘সুখ্যাতি’ মার্কসপত্নী ইমেলদাকেও হার মানিয়েছে। একবার একটি গোলাপি হীরার আংটি কিনেছিলেন, দাম ‘মাত্র’ দুই কোটি ৭০ লাখ ডলার। ইমেলদার ঘর থেকে শত শত জুতা উদ্ধার করেছিল পুলিশ। নাজিবপত্নীর আলমারিতে পাওয়া গেছে মনোহর নকশার বহু হাতব্যাগ আর কাঁচা টাকা ও গয়না ভরা ২৭৪টি বাক্স।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা। দেশ-দশের কথা ভুলে গিয়ে শুধু আপন সুখচিন্তায় পকেট ভরে সময় কাটালেন। রাষ্ট্রের অর্থে জন্মভিটায় বানিয়েছেন ‘রাজপ্রাসাদ’। খরচ ২০ কোটি ডলার। দলীয় লোকজনই তাকে ক্ষমতা থেকে টেনেহিঁচড়ে নামাল গত বছর। জিম্বাবুয়ের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন রবার্ট মুগাবে। তারও একই দশা। তিনি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাণপুরুষ। তাই বীরের সম্মান ছিল সারা আফ্রিকায়। অথচ দেখা গেল লোকটা আসলে মস্ত বড় এক চোর। দেশের রাজকোষকে ব্যক্তিগত বাজারখরচার ‘তহবিল’ ভেবেছিলেন। তার স্ত্রী গ্রেস (দয়া বা সৌন্দর্য), দেশের লোক নাম দিয়েছিল ‘ডিসগ্রেস’ (অবমাননা)। বিলাসিতায় অনেক রানীকেও হার মানিয়েছেন তিনি। প্যারিসে সওদা করতে গিয়ে এক দিনেই খরচ করেছিলেন লাখ ডলার।

যেসব উদাহরণ দেয়া হলো- তা শুধু চুরি নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার মারাত্মক অপব্যবহারও বটে। এটাই দুর্নীতি। সভ্যতার প্রাথমিক যুগ থেকে শক্তিধরেরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগতভাবে ‘লাভবান’ হয়েছেন। আড়াই হাজার বছর আগে কৌটিল্য, মানে চাণক্য বলে গেছেন, মাছের পচন শুরু মাথায়।’ দুর্নীতির বেলায়ও তা-ই। রাজা সচেতন না থাকলে, সে রাজ্যের উজির, কোটাল, এমনকি লেঠেল সরদার পর্যন্ত সময়-সুযোগ বুঝে দু-দশ (কোটি) টাকা হাতিয়ে নিতে কসুর করেন না। কেন নেন, এর ব্যাখ্যা কৌটিল্য তার অর্থশাস্ত্র বইয়ে দিয়েছেন।

‘রাজার কাজ পারিষদবর্গের চুরি ঠেকানো। তবে চুরি রোধ সহজ নয়। জিবের ডগায় মধু থাকলে চেখে না দেখা যেমন কঠিন, ঠিক সেই রকম সরকারি অর্থ হাতের নাগালে এলে তা না হাতিয়ে স্থির থাকা বড়ই কঠিন।’ কৌটিল্য কথাগুলো বলেছিলেন তখনকার রাজা চন্দ্রগুপ্তের উদ্দেশে। তার হয়তো প্রত্যাশা ছিল, রাজকোষের চুরি ঠেকাতে ব্যবস্থা নেবেন রাজা। রাজার নিজের তো চুরির ‘প্রয়োজন’ নেই, পুরো রাজ্যই তার, কৌটিল্যের চোখে এটাই ছিল আশার কারণ। এখন অবস্থা পাল্টেছে। রাজরাজড়ারা তেমন আর নেই, যারা আছেন তাদের ‘হাত-পা বাঁধা’। সমস্যা হলো, এখনো অনেক ক্ষমতাবান আছেন, যারা রাজা না হয়েও আচরণে এক একজন রাজা। মুগাবে বা জুমার দৃষ্টান্ত থেকে সেটি স্পষ্ট। আরো একটি বিষয় পরিষ্কার। এসব ক্ষমতাবান ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার করতে পারার কারণ আমরা অর্থাৎ দেশের মানুষ মুখ বুজে তাদের সে সুযোগ দিই। কখনো আমরাই যুক্তি দেখাই- চুরি তো নেতা করেন না, করেন তার পারিষদবর্গ। এ কথাও বলি, ‘এখন যারা ক্ষমতায়, তারা তো রয়ে-সয়ে চুরি করেন। অন্যরা ক্ষমতায় এলে পুকুর গিলবেন।’

তবে জনগণের অর্থ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হলে ক্ষতি দেশবাসীরই। কয়েক বছর আগে মিসরের আলেক্সান্দ্রিয়ায় একটি বহুতল ভবন ধসে ২৫ ব্যক্তি নিহত হন। ভবন নির্মাণে ছিল গলদ। সরকারি পরীক্ষকেরা সে কথা জানতেন, কিন্তু উৎকোচ পেয়ে যান চেপে। এমন ঘটনা আমাদের দেশে হরহামেশাই ঘটছে। রডের বদলে বাঁশ, পরিদর্শক ওই খবর জানেন না, তা নয়।

তাহলে কি এদের অন্যায়ের হাত থেকে জনসাধারণের নিষ্কৃতি নেই? আছে। গোড়াতে যেসব নেতার কথা বলেছিলাম, তাদের পরিণতির দিকে তাকান। প্রত্যেকেই গণরোষে ক্ষমতাচ্যুত। কেউ দেশ থেকে পালিয়েছেন, কেউ শ্রীঘরে। জনগণই তাদের ক্ষমতায় বসায়, ক্ষমতাচ্যুত করে। তাই বলছিলাম, আমাদের সমাজে চুরিবিদ্যা সম্পর্কে যে প্রবাদ প্রচলিত, এর বাস্তবতা আছে বটে। কিন্তু জনগণ আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠলে দুর্নীতি আর চুরির অর্থে গড়া সম্পদের পাহাড় যেকোনো মুহূর্তে লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সে কথা কারো মনে থাকে না। মনে রাখলে আখেরে তাদেরই কল্যাণ হবে বৈকি।

[email protected]


আরো সংবাদ