১৯ আগস্ট ২০১৯

একটি সেমিনারে ইসলামবিরোধী প্রচারণা

একটি সেমিনারে ইসলামবিরোধী প্রচারণা - ছবি : নয়া দিগন্ত

একটি বাংলাদেশী সংস্থা এবং দু’টি বিদেশী দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে কয়েক বছর আগে ‘দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও ধর্মীয় জঙ্গিবাদ’ বিষয়ের ওপর একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সেমিনারের উদ্বোধন করেন সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ইসলাম আমাদের অন্য ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুই হতে শিখিয়েছে; কোনো রকম অসহিষ্ণুতা শেখায়নি। এ সেমিনারে আমি কয়েকটি বিষয়ের ওপর কথা বলেছিলাম। ছয়টি কর্ম অধিবেশন হয়েছিল, যার পাঁচটিতেই অংশ নিয়েছিলাম।

প্রথম কর্ম অধিবেশনে আমি বলি, এই যে রিলিজিয়াস মিলিট্যান্সি বলা হচ্ছে, অন্যান্য মিলিট্যান্সি বা উগ্রতা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে- এটা এক ধরনের পক্ষপাতিত্বের কারণে হচ্ছে। এটা একটা মতলব হাসিলের জন্য করা হয়েছে, যার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। বিশ্বে মিলিট্যান্সি নামে যা হচ্ছে তার বেশির ভাগই রাজনৈতিক ধরনের। এগুলো ধর্মীয় ধরনের নয়। ফিলিস্তিনে যা কিছু হচ্ছে তা মূলত রাজনৈতিক ধরনের। কাশ্মির, ইরাক ও চেচনিয়ায় যা কিছু হচ্ছে বা হয়েছে, তা মূলত রাজনৈতিক ধরনের। এটিকে ধর্মীয় বলা ঠিক হবে না।

আমরা লক্ষ করেছি, মিলিট্যান্সি সম্পর্কে যেসব আলোচনা হয়েছে তাতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করা বা করতে চেষ্টা করাই যেন অপরাধ। সেখানে বলেছি, ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করা কোনো ভুল হতে পারে না যদি তা গণতান্ত্রিকভাবে ও সাংবিধানিকভাবে করা হয়, আইনসঙ্গতভাবে করা হয়। সেটি রাজনীতির অংশ হিসেবে হতে হবে। আরেকটি শর্ত হচ্ছে, অন্যান্য ধর্মের অধিকার যেন এতে নষ্ট না হয়। ইসলামী রাজনীতি করা কোনো অপরাধ হতে পারে না, এ কথাও সেখানে বলেছিলাম। আরো বলেছি, ধর্মীয় উগ্রতা অনেক সময় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও করা হতে পারে। যেমন ফ্রান্সে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে- মুসলিম মেয়েরা সেখানে মাথা ঢেকে স্কুল-কলেজে বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে পারবে না। এটা তো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মিলিট্যান্সি।

ওই সেমিনারে একটি পেপার সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সেটি হচ্ছে জেরেমি কডরোর পেপার। ফ্রান্সের এই তরুণ স্কলার পিএইচডি থিসিস করেছেন। তার বিষয় ছিল (জিহাদ থেকে রাজনীতি)। এর ওপর তিনি বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর ওপর স্টাডি করেন। সেখানে তিনি দেখালেন, বাংলাদেশ হওয়ার আগেও জামায়াতে ইসলামী জিহাদের ইস্যুতে তাদের মত পরিবর্তন করেছিল। তিনি মন্তব্য করেন- বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর পলিসি বর্তমানে খুব প্রাগমেটিক। বাস্তববাদী হিসেবে তারা কাজ করেছেন। এটিকে পার্টির জাতীয়করণ হয়ে গেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ওই সেশনে বক্তব্য রেখেছিলাম। আমি বলেছিলাম- লেখকের মধ্যে একটা সন্দেহ আছে, যারা উম্মাহ নিয়ে চিন্তা করে, তারা জাতীয় রাজনীতি করে কিভাবে? কিন্তু ব্যাখ্যা করে বলেছিলাম- উম্মাহর সাথে ন্যাশনাল স্টেট বা জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণার কোনো বিরোধ নেই। কেননা, একই সাথে আমাদের উম্মাহর অনুভূতি থাকতে পারে এবং আমরা জাতীয় রাষ্ট্রের সদস্য হতে পারি। ইসলামী শরিয়াহকে একটি জাতীয় রাষ্ট্রে- যেমন, বাংলাদেশে কার্যকর করতে কোনো বাধা নেই। কারণ, শরিয়াহ যেকোনো রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করা যায়। ইসলামের অন্যতম মূল হচ্ছে তার শরিয়াহ।

আমি বলেছিলাম, এফবিআই’র কোনো ডকুমেন্টের ওপর ভিত্তি করে নিউ ইয়র্কের হামলার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। আমরা এটিও নিশ্চিত নই, যারা এই কাণ্ড ঘটিয়েছে তারা এফবিআই’র এজেন্ট ছিল না। কারণ, এর অপরাধীদের কোনো কোর্টে বিচার করা হয়নি। তারা অপরাধী হিসেবে আমেরিকার কোনো কোর্টেও প্রমাণিত নয়। তার কথা থেকে মনে হয়, ‘এরা সবাই ইসলামের সৈনিক ছিল এবং তারা ইসলামের জন্য জিহাদ করছে। তারা শহীদী মৃত্যুর জন্য রওনা হয়েছে; তারা ইসলামের একটা মহৎ কাজ করেছে।’ তিনি এ কথাগুলো স্পষ্ট করে না বললেও এমন-ই মনে হয়।

কিন্তু আমি ব্যাখ্যা করে বলেছিলাম, ইসলামের সব মতের যত আইন বই আছে, তাতে সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে যে, নিষ্পাপ বেসামরিক লোকদের হত্যা করা, নারী-শিশু ও পুরোহিতদের হত্যা করা, ধর্মস্থান ধ্বংস করা, ফসল নষ্ট করা, প্রভৃতি হারাম। সুতরাং যারাই ইসলামের নামে মানুষ হত্যা করেছে তারা কোনো মতেই ইসলামের কাজ করেনি।

এর দায়দায়িত্ব কোনোভাবেই ইসলামের নয়, তারা যদি মুসলিম হয়েও থাকে (সেটি আমরা জানি না)। তারা যত দোয়াই করুক না কেন, তাদের সেই দোয়া ইসলামসম্মত নয়। ইসলামের সব ফকিহও একমত, যদি কোনো মুসলিম অমুসলিম রাষ্ট্রে বাস করে, তাদের ওই রাষ্ট্রের আইন মেনে চলতে হবে। সুতরাং ওই দেশে বসবাসরত মুসলিম নামধারী কেউ এটি করলে সেটি অন্যায় বলে গণ্য হবে। ইসলামের আন্তর্জাতিক নীতি পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। তখন মুশরিকরা বারবার চুক্তি ভাঙত, অত্যাচার করত। মুসলমানদের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করত না। এসব পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ সা: ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। তার সব নীতি নির্ভরশীল ছিল পরিস্থিতির ওপর। তিনি বদরের যুদ্ধের বন্দীদের মুক্ত করে দিয়েছেন; প্রয়োজনে হুদায়বিয়ার সন্ধি করেছেন; বনি কুরাইজার বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিয়েছেন; আবার মক্কা বিজয়ের পর ক্ষমা করে দিয়েছেন সবাইকে।

সুতরাং ইসলামের আন্তর্জাতিক নীতি পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। এ প্রসঙ্গে ড. সুলেমানের ইসলাম ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বইয়ের কথা উল্লেখ করেছিলাম। শেষে বলেছি, ইসলামী রাষ্ট্রে কে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে? এটা কোনো ব্যক্তি করতে পারে না। এটি রাষ্ট্রকে ঘোষণা করতে হয়। রাষ্ট্রের যিনি মূল, তাকে ঘোষণা করতে হয়। যে কেউ আতা বা হাতা নামে (ক্রিপেনবার্গের উল্লিখিত নামে) যুদ্ধ ঘোষণা করবে, সেটি ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয় এবং এর দায়দায়িত্ব ইসলামের ওপর আসে না। ওই সেশনে আমার মতো অন্যরাও প্রতিবাদ করে বক্তব্য রেখেছেন।

একটি পেপার বাকি ছিল প্রফেসর ক্রিশ্চান ওয়াগনারের। সে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছেন জাস্টিস মোস্তফা কামাল। পেপারটি ছিল রিলিজিয়ান, স্টেট অ্যান্ড কনফ্লিক্ট ইন সাউথ এশিয়া। প্রফেসর ওয়াগনার বলেছিলেন, সাউথ এশিয়ায় রাষ্ট্র গঠনে ধর্ম ভূমিকা রেখেছে। ধর্ম নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান গঠনে ভূমিকা রেখেছে। একটি সোস্যাল ফোর্স হিসেবে এখানে ধর্ম অত্যন্ত শক্তিশালী; কিন্তু ধর্ম জাতিকে সব সময় ধরে রাখতে সমর্থ হয়নি। যেমন- পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ইসলামী ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও পরে পাকিস্তানকে ভাগ হয়ে যেতে হয়েছে।

আমার বক্তব্যে বলেছি, ধর্ম আপাতদৃষ্টিতে যদিও দক্ষিণ এশিয়ার একটি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তাদের এক রাখতে পারেনি, তা সত্ত্বেও সেখানে ধর্ম কোনোভাবে দায়ী ছিল না। এর জন্য রাজনীতি ও রাজনীতিবিদেরাই দায়ী ছিলেন। আন্তর্জাতিক নীতির ক্ষেত্রে ধর্ম ভূমিকা পালন করেনি, এটা ঠিক নয়। আন্তর্জাতিক নীতিতে ধর্ম প্রকাশ্যে ভূমিকা পালন করে না; কিন্তু আমরা যদি এর গভীরে যাই তাহলে দেখব, ধর্ম একটি ফ্যাক্টর হিসেবেই দেখা দেয়। সেমিনারে শেষ দিনে দু’টি পেপারের প্রথমটি পড়েছেন তৎকালীন দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। রিলিজিয়াস মিলিট্যান্সি অ্যান্ড ইন্টারফেইথ ডায়ালগের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, রিলিজিয়াস মিলিট্যান্সি শব্দটি সঠিক নয়। তিনি জিহাদ সম্পর্কে বলেন, ইসলামে কোনো আক্রমণাত্মক জিহাদ নেই। তিনি রিলিজিয়াস মিলিট্যান্সি না বলে ‘রিলিজিয়াস ফ্যানাটিসিজম’ বলা যায় বলে মন্তব্য করেছিলেন।

সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল রিলিজিয়ন, ডেমোক্র্যাসি অ্যান্ড সেকুলারিজমের ওপর ভারতের আজগর আলী ইঞ্জিনিয়ারের আলোচনা। সেমিনারের পেপারের ওপর খুবই সিরিয়াস আলোচনা করেছি। আমি প্রশ্ন রেখেছিলাম, আপনার আলোচনা থেকে সেকুলারিজমকে কী করে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্রের তুলনায় সুপিরিয়র বলে গণ্য করা যায়?

কেননা আমরা আপনার আলোচনায় দেখেছি, মোগল আমলে (যে রাষ্ট্রের আইন ছিল শরিয়াহ) সেখানে কোনো দাঙ্গা হয়নি। ভারত ১৯৪৭ সালে ভাগ হয়ে পরে ১৯৫২-তে সেকুলার রাষ্ট্র হওয়ার পর থেকে সে দেশে অসংখ্যবার দাঙ্গা হয়েছে। প্রতি বছর শত শত ছোট-বড় দাঙ্গা হয়েছে। আজকাল হয়তো তা অনেকটা কম। এই বিবেচনায় আমরা সেকুলার রাষ্ট্রকে কী করে উন্নত বলতে পারি? এ প্রসঙ্গে আমি বলেছি- প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ যাদের মধ্যে হলো তারা তো ধর্মীয় রাষ্ট্র ছিল না। মূলত তারা ছিল সেকুলার রাষ্ট্রই। মহাযুদ্ধের ফলে ৮ থেকে ১০ কোটি লোক মারা গেল। এগুলো তো আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালির মতো সেকুলার রাষ্ট্রই করেছে। তাহলে তারা কী করে সুপিরিয়র হয়? সেক্ষেত্রে যদি ইসলামী রাষ্ট্র হয়, সেখানে সব মৌলিক অধিকার দেয়া হয়, অমুসলিম নাগরিকের সিভিল রাইটস সাংবিধানিকভাবে দেয়া হয়, তাহলে তাতে কী অসুবিধা আছে? যেমন- আমরা দেখেছি পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে সবাইকে সিভিল রাইটস দেয়া হয়েছে। এসব রাষ্ট্র যদি ইসলামী রাষ্ট্র হয়ে যায়, তাহলে কী সমস্যা হবে? কোনো সমস্যা আমরা দেখি না। পশ্চিমাদের বিবেচনায় - সেকুলারিজম অর্থাৎ বস্তুবাদের মানে, রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। ইসলামের বেশির ভাগ বড় বড় স্কলারই বলেছেন, সেই অর্থে ইসলামে সেকুলারিজমের কোনো স্থান নেই।

ওআইসি রেজুলেশনে একটি প্রস্তাব আছে, পাশ্চাত্য যে অর্থে সেকুলারিজম গ্রহণ করে ইসলামে সে রকম সেকুলারিজম নেই। এ কথা আলাদা যে, কোনো কোনো রাষ্ট্র সহিষ্ণুতাকেই ‘সেকুলারিজম’ বলা হয়। এটি আসলে সেকুলারিজম শব্দের অযথা ব্যবহার।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার।


আরো সংবাদ